ঘুমের মধ্যে নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়া বা স্লিপ এপনিয়া রোগের লক্ষণ ও করণীয় এবং স্লিপ এপনিয়ার সাথে সিওপিডি সম্পর্ক কি?
ঘুমের মধ্যে নিঃশ্বাস নেওয়া ও প্রশ্বাস ছাড়ার প্রক্রিয়াটি কখনো থেমে যাওয়ার কথা নয়। কেননা, আমাদের মস্তিষ্কের রেসপিরেটরি সেন্টার সদা জাগ্রত থাকে। কিন্তু কখনো কারও কারও ঘুমের ভেতর শ্বাসনালির পথটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মস্তিষ্কের নির্দেশে ঘন ঘন ও গাঢ় নিঃশ্বাস নিতে থাকে মানুষটি। ১০ সেকেন্ড বা এর বেশি সময় শ্বাস এভাবে বন্ধ থাকলে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলে হাইপোক্সিয়া। মস্তিষ্ক তখন বাধ্য হয়ে রোগীকে জাগিয়ে তোলে। যাদের এই প্রবণতা আছে, তাদের সারা রাতে বারবার একই ঘটনা ঘটতে থাকে। কিন্তু সকালে হয়তো তাদের তা মনে থাকে না। এই রোগের নাম Sleep Apnea or Obstructive Sleep Apnea:
এ রোগে আক্রান্ত রোগীরা ঘুম ভাঙার পর শ্বাস নেয় এবং সঙ্গে সঙ্গে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। খুবই জটিল অবস্থায় সারারাতে বারবার শ্বাস বন্ধ ও ঘুম ভাঙা এ চক্রটি চলতে থাকে। ফলে ঘুমিয়েও ঘুম পূরণ হয় না। এ ঘটনাগুলো যেহেতু গভীর ঘুমের মাঝে ঘটছে তাই রোগী তার এ সমস্যা বুঝতে পারে না। সকালে ঘুম থেকে উঠে হয়তো তাদের মনেও থাকে না। যেহেতু বারবার ঘুম ভাঙার ফলে ঘুমিয়ে কখনো ঘুম পূরণ না হওয়ার ফলে সারাদিন ঘুম ঘুম ভাব থাকে।
আর Chronic Obstructive Pulmonary Disease (COPD) হচ্ছে ফুসফুসের একগুচ্ছ রোগ। এ রোগের মাঝে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী ব্রঙ্কাইটিস ও এম্ফাসিমা দীর্ঘস্থায়ী অ্যাজমা। এটি সাধারণত আটকে থাকা বা সরু শ্বাসনালি অথবা অভ্যন্তরীণ কাঠামোর প্রদাহ অথবা ফুসফুসের বায়ু থলির ক্ষতির কারণে শ্বাসকষ্ট দেখা যায়।
দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্টের রোগ সিওপিডি। সিওপিডিতে শ্বাসকষ্ট ঘুমকে প্রভাবিত করতে পারে বিভিন্নভাবে। যারা সিওপিডিতে ভুগছেন, তারা বেশিরভাগ কম/বেশি ঘুমের সমস্যার অভিযোগ করেন। সামগ্রিকভাবে সিওপিডিতে আক্রান্ত ব্যক্তির ঘুমের গুণগত মান ও সময় কমে যায়, রাতে শ্বাস নিতে কষ্ট হয় এবং তারা প্রায়ই জেগে উঠতে পারেন।
ফুসফুসের জার্নালে একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৬ শতাংশ পর্যন্ত সিওপিডি রোগী স্লিপ এপনিয়ায় ভোগেন। স্লিপ এপনিয়ার সঙ্গে সিওপিডি যুক্ত হলে চিকিৎসকরা এটিকে ‘ওভারল্যাপ সিনড্রোম’ হিসাবে উল্লেখ করে থাকেন। সিওপিডি রোগীদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেশি থাকে। স্লিপ এপনিয়ার সঙ্গে সিওপিডি যুক্ত হলে এটি উচ্চ রক্তচাপ, পালমোনারি হাইপারটেনশন, অ্যারিথমিয়া, হার্ট ফেইলিওর এবং চিকিৎসা না করা হলে স্ট্রোকের দিকে নিয়ে যায়। স্লিপ এপনিয়া আক্রান্ত রোগীদের পালমোনারি হাইপারটেনশন হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। পালমোনারি হাইপারটেনশন হলো এক ধরনের ফুসফুসের উচ্চ রক্তচাপ। এটি ফুসফুসের ধমনিতে এবং হৃৎপিণ্ডের ডানদিকে রক্তচাপ বৃদ্ধি করে।
পালমোনারি হাইপারটেনশনের রোগীদের শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা এবং বুকে চাপ অনুভব করে। চিকিৎসা না করালে, সিওপিডির মতো পালমোনারি হাইপারটেনশন ও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খারাপ হয়। স্লিপ এপনিয়াতে সৃষ্ট প্রদাহ সিওপিডিতে প্রদাহকে আরও খারাপ করতে পারে।
ধূমপান স্লিপ এপনিয়া এবং সিওপিডি উভয়ের সঙ্গেই জড়িত। ধূমপান প্রদাহকে ট্রিগার করে, উভয় অবস্থার ঝুঁকি বাড়ায়। অতিরিক্ত ওজন স্লিপ এপনিয়ার ঝুঁকিকে বাড়িয়ে দেয়। এটি পুরুষদের মধ্যে স্লিপ এপনিয়া হওয়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ এবং নারীদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া সিওপিডির রোগীদের রাতের লক্ষণগুলো সাধারণত উপেক্ষা করা হয়। রোগটি শনাক্ত করার প্রয়োজনে সিওপিডিতে আক্রান্ত ব্যক্তির মাঝে যদি কোনো রাতের উপসর্গ থেকে থাকে সেগুলো অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে অবহিত করা প্রয়োজন। এ উপসর্গগুলোর মধ্যে যে কোনো একটির উপস্থিতি যদি সিওপিডির রোগীর মাঝে থাকে তবে চিকিৎসকে জানানো প্রয়োজন :
* রাতে নাক ডাকা,
* রাতে হাঁপানি বা দম বন্ধ হয়ে যাওয়া বা অনুভব করা,
* সকালে মাথাব্যথা,
* দিনেরবেলা অতিরিক্ত ঘুম,
* স্থূলতা,
* দিনেরবেলা রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কম থাকা,
* দিনেরবেলা কার্বন ডাই অক্সাইড বৃদ্ধি পাওয়া,
* পালমোনারি হাইপারটেনশন,
* ডানদিকের হার্ট ফেইলিওর,
* পলিসিথেমিয়া (রক্তে লাল রক্ত কোষের উচ্চ ঘনত্ব),
* ডায়াবেটিস, হার্ট ফেইলিউর বা স্ট্রোকের ইতিহাস, ইত্যাদি।
এ ক্ষেত্রে চিকিৎসক ঘুমের পরীক্ষার মাধ্যমে রোগীর ঘুমের অসুবিধাগুলোর ব্যাপারে সহযোগিতা করতে পারবে। পলিসোমনোগ্রাফি অথবা স্লিপ টেস্ট একটি সর্বাধুনিক পরীক্ষা পদ্ধতি যার মাধ্যমে খুব সহজেই এ রোগটি নির্ণয় করা যায়। ঘুমের পরীক্ষার/স্লিপ এপনিয়া পরীক্ষা, যা পলিসোমনোগ্রাফি (PSG) নামেও পরিচিত। এটি আপনার শ্বাস-প্রশ্বাসের ধরন, রক্তের অক্সিজেনের মাত্রা এবং ঘুমের পর্যায় এবং ঘুমের মাঝের পরিবর্তনগুলো ব্যাপকভাবে ধারণ করা হয়।
এ পরীক্ষাটি দ্বারা ঘুমের মাঝে কখন, কতবার এবং কী ধরনের শ্বাস বন্ধ হচ্ছে তা বোঝা যায়। আবার কিছু রোগীর জন্য একটি বিকল্প হলো হোম স্লিপ টেস্ট (এইচএসটি), যেখানে রোগীরা তাদের নিজের বাসায় এবং নিজের বিছানায় ঘুমাতে পারে (যদিও পরীক্ষাটি ল্যাবে করানো উত্তম)। রোগ নির্ণয়ের পর চিকিৎসার মাধ্যমে উপসর্গগুলোর তীব্রতা কমাতে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারে। চিকিৎসার লক্ষ্য হলো শ্বাস-প্রশ্বাস এবং রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা উন্নত করা এবং রক্তে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ কমানো।
চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেসার/পিএপি (PAP) থেরাপি, অক্সিজেন থেরাপি, ব্রঙ্কোডাইলেটর এবং পালমোনারি রিহাবিলেশন। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় বহুল প্রচলিত চিকিৎসা হলো পিএপি (PAP) ডিভাইস এর ব্যবহার। এ মেশিনটি দ্বারা ঘুমের মাঝে শ্বাস বন্ধ সমস্যাটি দূর করা যায়। মেশিনটি দ্বারা একটি নির্দিষ্ট চাপে বাতাস প্রবাহ হয়, যা রোগীর নাক বা নাক-মুখ দিয়ে শ্বাসনালিতে প্রবেশ করে এবং স্লিপ এপনিয়া হতে বাধা দেয়। রাতের ভালো ঘুম এবং জীবনের মানের উন্নতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত চিকিৎসায় রোগের লক্ষণগুলো কমিয়ে দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগুলোর ঝুঁকি কমায়।
এবার আরোও কিছু প্রশ্নের মাধ্যমে একটু ভালো করে জানার চেষ্টা করি..
প্রশ্ন : স্লিপ এপিনিয়া বিষয়টি কী?
উত্তর : স্লিপ এপিনিয়া হলো ঘুমের একটি সমস্যা। এটা প্রাপ্তবয়স্কদের বেশির ভাগ সময়ে হয়। তবে এটা এখন অনেক সময় বাচ্চাদেরও হয়। একজন মানুষ যখন ঘুমিয়ে যায়, তখন যদি তার দম বন্ধ হয়ে যায়, এটি অনেক সময় একবার থেকে ৩০ বারও হতে পারে, তখন তাকে স্লিপ এপিনিয়া বলে। এই সমস্যায় অক্সিজেন পরিবহন কমে যায়। শ্বাসটা বন্ধ হয়ে আসে। রোগী খুব জোর দিয়ে নিজেকে জাগিয়ে ফেলে, এর পর আবার সে ঘুমিয়ে যায়। মূলত ঘুমের মধ্যে যে শ্বাসটা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, এটাই স্লিপ এপিনিয়া। হঠাৎ করে এই শ্বাসকষ্টটার কারণে তার ঘুমটা ভেঙে যায়। এটি খুব প্রচলিত একটি সমস্যা।
কিন্তু অনেক মানুষই এটা বুঝতে পারে না। বুঝতে পারে না কারণ, আমরা এই বিষয়ে জানতাম না। যত আমরা জানতে পারছি, ততই এটা নিয়ে কথা হচ্ছে। আমরা মানুষকে জানানোর চেষ্টা করছি। এই জিনিসটি আসলে একটি সমস্যা।
অনেকে বুঝতে না পেরে ভাবে, তার বালিশটা ঠিক নেই। ঠান্ডা লেগেছে। শোয়াটা ঠিকমতো হচ্ছে না। এগুলো বলে অনেকে বিষয়টি এড়িয়ে যায়। তবে এটা অনেক জটিলতার দিকে যেতে পারে।
প্রশ্ন : যে ব্যক্তির এই সমস্যা হচ্ছে, সে তো বিষয়টি বুঝতে পারছে না। তাহলে তার পাশে যে ঘুমাচ্ছে, সে কীভাবে সমস্যাটি বুঝবে?
উত্তর : এই রোগীগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সে সমস্যাটি সহজে বুঝতে পারছে না। সে বিশ্রামহীন থাকে। অবসাদগ্রস্ত থাকে, ক্লান্ত থাকে। কাজে কোনো মনোযোগ দিতে পারে না। সাধারণত দিনের বেলায় এরা খুব ঝিমায়। এমনকি কাজ করতে গিয়ে ঝিমিয়ে পড়ে। এ রকম অনেক রোগী আছে।
অনেকে হয়তো ভাবে, এটি চাপের জন্য হচ্ছে। তবে আসলে এই বিষয়টি এর জন্য হয় না। তার সঙ্গী যে সঙ্গে ঘুমায়, সে এটা বলতে পারে। সাধারণত তারাই রোগীকে আমাদের কাছে নিয়ে আসে।
প্রশ্ন : আপনাদের কাছে এসে তাদের অভিযোগটা কী থাকে?
উত্তর : বলে, বারবার রাতে ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। এ রকমও রোগী আছে, যাদের রাতে ৩০ বার করে ঘুম ভাঙে। যাদের জটিলভাবে এপিনিয়া হয়, তাদের এই সমস্যা হয়। আবার অনেকে আসে শুধু নাক ডাকার অভিযোগ নিয়ে। অনেকে জোরে জোরে নাক ডাকে এবং ঘুম ভেঙে যায়।
প্রশ্ন : নাক ডাকার সঙ্গে কি স্লিপ এপিনিয়ার কোনো সম্পর্ক রয়েছে?
উত্তর : সম্পর্ক অবশ্যই আছে। আমরা যেটা দেখেছি, স্লিপ এপিনিয়া সাধারণত তিন ধরনের—একটা সেন্ট্রাল, আরেকটি অবস্ট্রাকটিভ, আরেকটি মিক্সড। যে বিষয়টি অবস্ট্রাকটিভ, অর্থাৎ ঘুম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এটার একটা বিষয় হচ্ছে নাক ডাকা। অনেকে জোরে জোরে শ্বাস ফেলে, বিশেষত যাদের নাকে সমস্যা হয়, তারা এটা ভাবে। তাই আমরা ইএনটি চিকিৎসকরা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিশেষ করে অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ এপিনিয়া যাদের আছে, সেটাতে আমরা কাজ করি। এই বাধাগুলো আমরা সারানোর চেষ্টা করি।
তবে,
ওজন বেশি হলে ঘুমের সময় শ্বাসনালীকে ঘিরে গলা এবং আশেপাশের জায়গাগুলো সরু হয়ে যায়। এছাড়া নাকের মাংসপেশী অনেক সময় বড় হয়ে যায়। এসব ক্ষেত্রে ঘুমের মধ্যে মুখ দিয়ে হা করে নিঃশ্বাস নিতে হয় এবং তখন নাক ডাকার শব্দ হয়। তাই নাক ডাকলেই তাকে স্লিপ অ্যাপনিয়া বলা যায় না।
তবে স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্তরাও নাক ডাকে। তাদের ঘুমের মধ্যে সাধারণত জোরে জোরে শ্বাস নিতে হয় এবং দম আটকে আসায় ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে।
প্রশ্ন : স্লিপ এপিনিয়ার সময় ঘুমের মধ্যে শরীরে কি ঘটে?
উত্তর : কোন ব্যক্তির স্লিপ অ্যাপনিয়া যখন হয়, তখন সেই ব্যক্তি ঘুমানোর অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকেন। ওই ব্যক্তির শ্বাস নেয়ার গতি অনেক বেড়ে গেলে এক পর্যায়ে হঠাৎ শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। তবে কিছুক্ষণ শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ থাকার পর আবার তা শুরু হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেউ ঘুমের মধ্যে যখন জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে, তখন হঠাৎ করে শ্বাস-প্রশ্বাস পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় কেন?
বার বার যখন শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়া হয়, তখন যে বাতাস বের হয় তাতে শরীর থেকে মূলত কার্বন ডাই অক্সাইড বেরিয়ে যায়। কার্বন ডাই অক্সাইডের লেভেল কমে গেলে একজন মানুষের শরীরে থাকা সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়।
এরপর কিছুক্ষণ দম বন্ধ থাকার কারণে শরীরের সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমে আবার কার্বন ডাই অক্সাইডের লেভেল বেড়ে গেলে তখন নার্ভাস সিস্টেম আবার উজ্জীবিত হয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস ফিরে আসে। এই পরিস্থিতিটা বেশ জটিল এবং এক্ষেত্রে অনেকে সময় একজন মানুষের মৃত্যুও ঘটে।
প্রশ্ন : কারা সাধারণত এই সমস্যায় ভোগে এবং কেন?
উত্তর : বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি পুরুষদের এবং এটি বড়দের রোগ। মধ্যবয়সী পুরুষেরা এবং অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলকায় লোকেরা বেশি আক্রান্ত হন। জন্মগতভাবে চোয়ালের হাড়ে সমস্যা বা অতিরিক্ত অ্যালকোহল বা ঘুমের ওষুধ সেবনকারী ব্যক্তিদেরও বেশি হয়। স্থূলকায় ব্যক্তিদের গলার ভেতর অতিরিক্ত চর্বি জমে অনেক সময় শ্বাসনালিকে সরু করে দেয়।
এখন দেখতে পাচ্ছি বাচ্চাদের ক্ষেত্রেও এ ধরনের সমস্যা হয়। যেসব বাচ্চার এডিনয়েড থাকে, নাকটা বন্ধ থাকে, তারা মুখ খুলে ঘুমায়, তাদের ঠিকমতো ঘুম হয় না। এডিনয়েডের সমস্যার সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চার গলাটাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাই গলাও বন্ধ, নাকও বন্ধ; বাচ্চাটা আর ঠিকমতো ঘুমাতে পারছে না। তখন স্লিপ এপিনিয়াটা তার মধ্যে চলে আসছে।
প্রশ্ন : আক্রান্ত হলে বুঝব কীভাবে?
উত্তর : যে কোন ধরনের স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির সমস্যাগুলো ঘুমের মধ্যে হয়, ফলে অনেকেই তা বুঝতে পারেন না। তবে ওই ব্যক্তির পাশে কেউ যদি ঘুমায়, তিনি হয়তো বুঝতে পারবেন। রোগীর পাশে ঘুমানো ব্যক্তি রোগীর লক্ষণগুলো খেয়াল করে তার সন্দেহের কথা জানালে তখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়ার ব্যবস্থা করা উচিত। তাছাড়া;
সারা রাত ঘুমের পরও ঘুম না হওয়ার অনুভূতি এবং দিনের বেলা বারবার ঘুমে তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে থাকলে সাবধান হোন। স্লিপ এপনিয়ার রোগীরা দিনের বেলা অবসাদ ও ঘুম ঘুম ভাবে সারাক্ষণ আক্রান্ত থাকেন তাই তাঁদের রাস্তাঘাটে দুর্ঘটনার ঝুঁকি প্রায় তিন গুণ বেশি। মনোযোগের অভাব, খিটখিটে মেজাজ, কর্মক্ষেত্রে অসফলতা ও বিষন্নতার হারও তাঁদের বেশি। হূদেরাগের আশঙ্কাও বেশি অন্যদের চেয়ে।
রাতে জোরে নাক ডাকা, হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া ও জোরে শ্বাস নেওয়ার মতো ঘটনা হয়তো আপনার শয্যাসঙ্গী লক্ষ করে থাকতে পারেন। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার সাহায্যে রোগ ও রোগের তীব্রতা নির্ণয় করা যায়। পলিস মনোগ্রাফি বা স্লিপ টেস্ট করানোর মাধ্যমে বাংলাদেশেই এখন সঠিকভাবে অ্যাপনিয়া পরীক্ষা করা যায় বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
![]() |
| রোগীর ঘুম পরীক্ষা করে স্লিপ অ্যাপনিয়া নির্ণয় করা সম্ভব। |
প্রশ্ন : অ্যাপনিয়ায় আক্রান্তের একজন রোগীর অভিজ্ঞতা বলুন?
উত্তর : ঢাকায় একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত একজন নারী এই রোগের জন্য নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন গত দুই বছর ধরে।
নাম পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষাজীবনে তার উচ্চতার তুলনায় শরীরের ওজন অনেক বেড়ে যায়। তখন ঘুমের মধ্যে নাক ডাকা এবং জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেয়ার বিষয়টি তিনি বুঝতে পারেন।
কিন্তু ওই সময়ে তার দম বন্ধ হয়ে যেতো না।
তবে বছর তিনেক আগে এক রাতে ওই নারী টের পান যে হঠাৎ করে তার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, ফলে তার ঘুম ভেঙে যায় এবং তিনি হুড়মুড় করে বিছানায় উঠে বসেন।
এরপর মাঝে মাঝেই এমন পরিস্থিতিতে তার ঘুমের ব্যাঘাত হতো।
আরেক রাতে তার একেবারে ভিন্ন ধরনের এক অভিজ্ঞতা হয়।
ওই নারী বলছিলেন যে ঘুমের মধ্যে হঠাৎ তার দম বন্ধ হয়ে গেলে তার ঘুম ভেঙে যায়। কিন্তু তিনি অনুভবন করেন, বিছানায় শোয়া অবস্থা থেকে তার উঠে বসার এবং এমনকি কথা বলার শক্তি নেই।
বেশ কিছুটা সময় পর তার শ্বাস-প্রশ্বাস ফিরে এলে তিনি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হন।
এরপর তিনি দুই বছর ধরে চিকিৎসা করাচ্ছেন। তিনি ব্রেন বা নিউরো সমস্যা থেকে অ্যাপনিয়ায় ভুগছেন - এমনটাই চিকিৎসক চিহ্নিত করেছেন।
এখন তিনি নিয়মিত চিকিৎসা নিয়ে কিছুটা ভাল আছেন। তবে তাকে আজীবন চিকিৎসা নিতে হবে।
প্রশ্ন : অ্যাপনিয়া কত ধরনের হয়?
উত্তর : অবস্ট্রাকশন বা শ্বাস প্রশ্বাসের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হলে তাকে অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া বলা হয়। গলায় টনসিল ফুলে গিয়ে এমনটা হতে পারে। শ্বাসনালী এবং গলার সংযোগ স্থলে অনেক সময় মাংসপেশী ফুলে যায়, যেটাকে অ্যাডনয়েড বলা হয়। এছাড়া অনেক সময় নাকের ভেতরে মাংসপেশী বড় হয়ে যায়।
এই সমস্যাগুলো শ্বাস-প্রশ্বাসে বাধা সৃষ্টি করে, যাকে অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ওজন বেশি বা শরীরে মেদ বেশি রয়েছে, এমন বয়স্ক মানুষ ও শিশু এই অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ায় বেশি ভোগে।
হৃদপিন্ড, ব্রেন এবং নিউরো সমস্যা থেকে একজনের শরীরের সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমে নানা ধরনের জটিলতা হয় এবং তখন ওই ব্যক্তি স্লিপ অ্যাপনিয়ায় ভুগতে পারেন। এই সমস্যা অনেক সময় জটিল এবং গুরুতর হয়।
তবে দুই ধরনের অ্যাপনিয়াতেই মৃত্যু ঝুঁকি রয়েছে।
প্রশ্ন : স্লিপ এপিনিয়ার চিকিৎসা আপনারা কীভাবে করেন?
উত্তর : আমাদের দেশে এখনো এর চিকিৎসার বিষয়টি ঠিকভাবে হয়নি। বিদেশে করা হয়। ঘুমের ধরন ঠিক করা হয়। একটি মানুষকে ঘুমের ল্যাবে নিয়ে গেলে ঘুমিয়ে যায় সে। কিছু যন্ত্র শরীরে লাগানো থাকে, তখন ঘুমের ধরনটাকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। ঘুমন্ত অবস্থায় তার কী হয়, এটা দেখা হয়। আমাদের দেশের কয়েক জায়গায় এখন এটা শুরু করা হয়েছে। তার পর যখন নাক-কান-গলার চিকিৎসকের কাছে আসে, আমরা দেখি, কোথায় কোথায় বাধাপ্রাপ্ত (Obstruction) হচ্ছে। কোনো বাধা আছে কি না। নাকটা পরিষ্কার আছে কি না। আদৌ তার কোনো সমস্যা আছে কি না। তার গলাটা পরিষ্কার আছে কি না। তার পেশিগুলো যে আছে, এটা ঠিক আছে কি না। অনেকের দেখা যায়, ছোট ঘাড়, তাদের শোয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা হয়, আবার নাকটা যদি ব্ন্ধ থাকে, তখনো যে ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারে না।
কারণটা আগে বের করতে হবে। বাইরের দেশে স্লিপ এন্ডোসকোপি করা হচ্ছে। দেখা হচ্ছে, ঘুমের মধ্যে কোন টিস্যুটা বেশি ফুলে যাচ্ছে। এই জিনিসগুলো নির্ণয় করা হলে পরে সার্জারি করা হয়। প্রথমেই আমরা রোগীকে যেটা দিই, স্লিপ এপ বলে একটি মেশিন আছে, ওইটা পজিটিভ এয়ার প্রেশার দেওয়া হয়। এটা দিলে পেশিগুলো আর সমস্যা করে না। ওগুলো খোলা থাকে। তখন রোগী শ্বাস নিতে পারে। কম স্লিপ এপিনিয়া যাদের আছে, তাদের ক্ষেত্রে স্লিপ এপ ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া সার্জারির দিকে যাই আমরা।
অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে দেখা হয় যে শ্বাসনালীকে কেন্দ্র করে কোন জায়গাগুলোতে বাধা আছে - পরে সেগুলো চিহ্নিত করে তা অপসারণ করতে হয়। এমন ক্ষেত্রে অল্প সময়ে এই সমস্যা থেকে মুক্তি মিলতে পারে।
কিন্তু জটিল স্লিপ অ্যাপনিয়া যেহেতু শরীরের অন্যান্য অনেক গুরুতর সমস্যা থেকে হয়, তাই এর চিকিৎসা আজীবন চালাতে হতে পারে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
প্রশ্ন : এ ধরনের চিকিৎসার পরে কি রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যায়?
উত্তর : একদম সুস্থ হয়ে যায়। তার ঘুম আসে। সে ক্লান্ত থাকে না। তার নিয়মিত কার্যক্রমগুলো ঠিকমতো করতে পারে। দেখা যায়, স্লিপ এপিনিয়া যাদের থাকে, তাদের হার্ট অ্যাটাকের সমস্যা হয়। সেগুলো থেকে তারা নিরাপদে থাকে।
প্রশ্ন : স্লিপ এপিনিয়া থেকে কিভাবে সাবধানতা অবলম্বন করব?
উত্তর : এই সমস্যাতে ঘুমের মাঝে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আমাদের রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণও কমে যায়। এটি একটি প্রাণঘাতী বিষয়।
তবে সঠিক চিকিৎসা নিলে এই রোগ ভালো হয়ে যায়।
চিকিৎসা না নিলে মারাত্মক জটিলতা হতে পারে। এই রোগে ব্লাড প্রেশার বেড়ে যাওয়া, বুকে ব্যথা অনুভব করা, অসংযত হার্টবিট, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, ঘুমের মাঝে মারা যাওয়া, ডিপ্রেশন ইত্যাদি।
জীবনযাত্রার পরিবর্তন করলে স্লিপ এপনিয়াতে আক্রান্ত হওয়ার হার কমে যায়
এই রোগ থেকে বাঁচতে কী করবেন-
১. অতিরিক্ত ওজন কমাতে হবে, ১০ শতাংশ ওজন কমালে স্লিপ এপনিয়া ২৫ শতাংশ কমে যায়। তাই শরীরের উচ্চতা অনুযায়ী ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
২. নাক বন্ধ ও অ্যালার্জির চিকিৎসা নিন। নাক বন্ধ উপশমকারী ওষুধ ব্যবহার করুন,
৩. অ্যালকোহল ও ধূমপান বন্ধ করুন,
৪. ঘুমের ওষুধ খাবেন না,
৫. শোয়ার ভঙ্গি পরিবর্তন করুন। চিত হয়ে শুয়ে তাকলে স্লিপ এপনিয়া বাড়ে। চিৎ হয়ে না ঘুমিয়ে কাত হয়ে ঘুমান। ঘুমের মাঝে চিৎ না হওয়ার জন্য পিঠের নিচে বালিশ ব্যবহার করুন,
৬. ক্লান্ত ও ঘুম পাওয়া অবস্থায় গাড়ি অথবা ভারী মেশিনারিজ অপারেট করবেন না।
৭. সুষম খাবার খান।
৮. নিয়মিত ব্যায়াম করুন।
এর পরও সমস্যা থাকলে রাতের বেলা বিশেষ শ্বাসযন্ত্রের ব্যবহার বা অস্ত্রোপচারের সাহায্য নিতে হতে পারে। তার জন্য দ্রুত ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।
তথ্যসূত্র:
- ডা. ফাতেমা ইয়াসমিন, ইনজিনিয়াস পালমো ফিটের স্লিপ কনসালট্যান্ট, শ্যামলী, ঢাকা, যুগান্তর।
- ডাক্তার এস এম আব্দুল্লাহ আল মামুন, শ্বাসযন্ত্রের ঔষধ বিভাগের সিনিয়র পরামর্শক এবং সমন্বয়কারী, স্কয়ার হাসপাতাল, মাছরাঙ্গা টেলিভিশন।
- কসমেটিক সার্জন ডা. ফেরদৌস কাদের মিনু,
- ডাক্তার মশিউর রহমান, নাক-কান-গলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, বসুন্ধরা আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ, এনটিভি।
- ডাক্তার সাকলায়েন রাসেল, সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান 'ভাসকুলার সার্জারি বিভাগ', ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল।
- ডা. মো. তৌছিফুর রহমান, মেডিসিন বিভাগ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, প্রথম আলো।
- জাতীয় নাক কান গলা ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, বিবিসি বাংলা।
- Edited: Natural_Healing.


কোন মন্তব্য নেই