First Aid Present

Lifestyle Modification এবং প্রাকৃতিক খাদ্য, পানীয়, শাকসবজি, গাছ, ডালপালা, ফল, মসলা, পাতা ও ফুল ইত্যাদির দ্বারা প্রাথমিক চিকিৎসা।

(Head injury) মাথায় আঘাত পেলে প্রাথমিক চিকিৎসা কী?

মাথায় ছোটখাট আঘাত পেলেও অনেকে তা নিয়ে ভাবেন না। কারও তেমন ধারণা নেই যে, সামান্য মাথার আঘাতই পরবর্তীতে মস্তিষ্কে নানা রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।

বিভিন্ন কারণে মানুষ মাথায় আঘাত পায়। মাথায় আঘাত পাওয়ার বেশ উন্নত চিকিৎসাই এখন বাংলাদেশে করা হচ্ছে।
মাথায় আঘাত লাগার কারণ:

মাথায় আঘাতের প্রধান কারণ হলো সড়ক দুর্ঘটনা। এ ছাড়া উঁচু কোনো স্থান থেকে পড়ে যাওয়া, খেলাধুলা, কাজ করতে গিয়ে আঘাত ইত্যাদি কারণেও মানুষ মস্তিষ্কে আঘাত পান। ট্রাফিক আইন মেনে না চলা, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, হেলমেট না পরে মোটরসাইকেল চালানো সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। নিয়মকানুন মেনে চললে মাথায় আঘাতের হার অনেকটাই কমানো সম্ভব।

মস্তিষ্কের আঘাতের ধরন:

মাথায় আঘাত পেলে খুলির ভেতর থাকা মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মস্তিষ্কের আঘাত দুই ধরনের—ফোকাল ও ডিফিউজ। মস্তিষ্কের ক্ষতি প্রাইমারি বা সেকেন্ডারি হয়ে থাকে। সরাসরি মাথায় আঘাতের জন্য যে ক্ষতি হয়, তা হলো প্রাইমারি ইনজুরি। মাথায় আঘাতের পর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ফলে পরবর্তী সময়ে মস্তিষ্ক ঝুলে নেমে আসে (হার্নিয়েশন) বা পানি জমে ফুলে যায় (ইডিমা)। এটাকে তখন সেকেন্ডারি ইনজুরি বলে।

তীব্রতা অনুসারে মস্তিষ্কে আঘাত সামান্য, মাঝারি ও মারাত্মক হতে পারে। আঘাতে মস্তিষ্কের সম্পূর্ণ অংশ যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে তাকে ‘ডিফিউজ এক্সোনাল ইনজুরি’ বলে। মাথায় আঘাত পেলে অবশ্যই যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে হাসপাতালে নিতে হবে। এমনকি বাইরে থেকে রোগীকে দেখতে স্বাভাবিক মনে হলেও তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিন। রোগীর আঘাতের সম্পূর্ণ ইতিহাস জেনে, শারীরিক পরীক্ষা করে চিকিৎসক আঘাত ও ক্ষতির মাত্রা নির্ণয়ের জন্য মস্তিষ্কের সিটি স্ক্যান করতে পারেন। ঘাড়ের আঘাত দেখার জন্য সারভাইক্যাল স্পাইনের এক্স–রে করতে হবে। নিকটস্থ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার পর নিউরোসার্জারি বিভাগে সুচিকিৎসার জন্য পাঠাতে হবে। মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে বেশি রক্তক্ষরণ হলে অস্ত্রোপচার করতে হবে।

মাথায় আঘাত লাগলেই কি ব্রেইন বা মস্তিষ্কের আঘাত হয়?

মস্তিষ্কে সামান্য আঘাতও জীবনের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে৷ তবে এটাও সত্য যে মানুষের মস্তিষ্ক রক্ষায় রয়েছে শক্ত খুলি৷ তাই মাথায় আঘাত লাগা মানেই মস্তিষ্কে আঘাত নয়৷

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাথায় প্রচণ্ড জোরে কেউ ঘুসি মারলে বা বেকায়দায় পড়ে গেলে কিংবা দুর্ঘটনার কারণে আঘাত লাগলে মাথার খুলি, মস্তিষ্ক এবং তার মধ্যে থাকা রক্তনালীগুলো আক্রান্ত হতে পারে৷

এ ধরনের আঘাতের প্রভাব মস্তিষ্কের উপর কতটা পড়ছে, তা খুব দ্রুত অনুধাবন করা সহজ নয়৷ মস্তিষ্কে বিপজ্জনক রক্তক্ষরণ কিংবা মস্তিষ্ক ফুলে যাওয়ার মতো ব্যাপার অনেক সময় দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টা, এমনকি কয়েক দিন পরও ঘটতে পারে৷ তাই চিকিৎসকরা প্রায়ই রোগীর বাহ্যিক পরিবর্তন দেখে আঘাতের গভীরতা বোঝার চেষ্টা করেন৷ যেমন, রোগী কেমন আচরণ করছেন, কারো ডাকে সাড়া দেওয়ার সময় তিনি চোখ খুলছেন কিনা, তিনি স্বাধীনভাবে হাঁটাচলা করছেন কিনা, রোগীকে হালকা আঘাত করা হলে তিনি কি সাড়া দিচ্ছেন আর আঘাতের পর রোগী কতক্ষণ অচেতন ছিলেন৷

মাথায় আঘাত এবং মস্তিষ্কের আঘাতের আরোও যে পার্থক্য রয়েছে....,

মস্তিষ্কের আঘাতজনিত জখম বা অন্তঃকরোটির জখম বা মস্তিষ্কের জখম হচ্ছে এমন একটি অবস্থা যখন বাহ্যিক কিছুর আঘাত বা চাপ প্রয়োগের কারণে মস্তিষ্কে জখম সৃষ্টি হয় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি মস্তিষ্কের ট্রমা, ব্রেইন ট্রমা, ট্রমাটিক ব্রেইন ইনজুরি ইত্যাদি নানা নামে পরিচিত। মস্তিষ্কের এই জখম আঘাতের তীব্রতা, আঘাতের প্রকার (যেমন মাথার ওপরে চাপ প্রয়োগকারী আঘাত নাকি মাথার ভেতরে ভেঙ্গে প্রবেশ করার মতো আঘাত), বা অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের (যেমন মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট একটি স্থানে বা বিস্তৃত কোনো অংশে) ওপর ভিত্তি করে শ্রেণীবিন্যাস করা হয়। মাথার জখম মস্তিষ্কের জখমের সমার্থক নয় কারণ মাথার জখমের ব্যপকতা আরও বেশি। মাথার ত্বক ও করোটির হাড়ও মাথার জখমের অংশ যা মস্তিষ্কের জখমের সাথে সংশ্লিষ্ট নাও হতে পারে। মস্তিষ্কের জখমের ফলে শারীরিক, চেতনা, সামাজিক, আবেগ, এবং আচরণগত লক্ষণ ও উপসর্গ দেখা দিতে পারে যার ফলাফল সম্পূর্ণ সুস্থতা থেকে স্থায়ী অক্ষমতা বা মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

মাথায় আঘাত পাওয়ার পর যে লক্ষণ প্রকাশ পায়...,

মাথায় আঘাতের পর রোগীর অচেতন হয়ে পড়া, বমি হওয়া, নাক দিয়ে রক্ত বা তরল আসা, কান দিয়ে রক্ত বা তরল আসা, চোখের মণি অস্বাভাবিকতা, তীব্র মাথা ব্যথা, চোখের চারপাশ কালচে হওয়া, বেশি ঘুম ঘুম ভাব, অজ্ঞান হওয়া বা কোমা, অস্থিরতা বা অস্বাভাবিক আচরণ, বারবার বমি করা, শ্বাস-প্রশ্বাস কমে যাওয়া, খিঁচুনি, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, কথা বলতে সমস্যা হওয়া, চোখে সমস্যা হওয়া। এ ধরনের সমস্যা দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে।

মাথায় আঘাতের প্রথম পর্যায়:

ট্রোম্যাটিক ব্রেইন ইনজুরি' (টিবিআই) বলতে বোঝায় বাইরে থেকে প্রাপ্ত আঘাতের ফলে মস্তিষ্কের ক্ষতি হওয়া৷ আর বলা বাহুল্য, মস্তিষ্কে সামান্য আঘাতও জীবনের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে৷

ট্রোম্যাটিক ব্রেইন ইনজুরি' অনেকক্ষেত্রে তেমন কোনো ক্ষতির কারণ নাও হতে পারে৷ আবার তা মৃত্যুর কারণও হতে পারে৷ চিকিৎসকরা মস্তিষ্কের জখমের পরিমাণ বিবেচনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায় নির্ধারণ করেছেন৷ প্রথম কিংবা হালকা পর্যায়কে বলা হয় ‘কনকাশন৷' এর অর্থ হচ্ছে, প্রচণ্ড আলোড়ন, আঘাত বা উত্তেজনার ফলে মস্তিষ্কের ক্ষতি৷ এই পর্যায়ে সাধারণত আঘাত লাগার কয়েকদিনের মধ্যেই মস্তিষ্ক আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে৷

মাথায় আঘাতের দ্বিতীয় পর্যায়:

রোগী যখন মাথায় আঘাত লাগার পর ১৫ মিনিট বা তার বেশি সময় অচেতন থাকেন, তখন সেই আঘাতের মাত্রাকে দ্বিতীয় পর্যায়ের বিবেচনা করা হয়৷ মাথায় আঘাতের পর ক্ষতির মাত্রা যাচাইয়ের সহজ পন্থা হচ্ছে, রোগী কতক্ষণ ধরে অচেতন আছেন তা বিবেচনা করা৷ রোগী যত বেশি সময় ধরে অচেতন থাকবেন ক্ষতির মাত্রা তত বেশি বলেই ধরে নিতে হবে৷ দ্বিতীয় পর্যায়ের আঘাতের ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে চার সপ্তাহের বেশি সময় নিতে পারে৷ তবে এ ধরনের আঘাতের পরিণতিতে রোগীর মনোযোগের সমস্যা হতে পারে, মাঝে মাঝে মাথা ব্যথা করতে পারে, এমনকি তার আচরণও অস্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে৷ কয়েক বছর পর্যন্ত এসব সমস্যা থেকে যেতে পারে৷

মাথায় আঘাতের তৃতীয় পর্যায়:

রোগী যদি মাথায় আঘাত লাগার পর এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অচেতন থাকেন, তাহলে তাঁর ‘টিবিআই'-এর মাত্রা তৃতীয় পর্যায়ের বিবেচনা করা হয়৷ আর রোগীর উপর এধরনের আঘাতের পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে৷ বিশেষ করে তাঁর শারীরিক এবং মানসিক – উভয় ক্ষতি হতে পারে৷ এক্ষেত্রে রোগীর হৃদযন্ত্রের কর্মকাণ্ডে ব্যাঘাত ঘটতে পারে, তিনি পঙ্গু হয়ে যেতে পারেন, এমনকি তাঁর ব্যক্তিত্বে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটতে পারে৷ তৃতীয় পর্যায়ের ক্ষতি সাধারণত অপূরণীয় হয়৷

মস্তিষ্কের ক্ষতির মাত্রা পরীক্ষায় এখন ‘ইমেজিং প্রযুক্তি' ব্যবহার করা হয়৷ এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে রোগীর মস্তিষ্কের ত্রিমাত্রিক স্ক্যান করা হয়৷ তখন চিকিৎসকরা সহজেই মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হচ্ছে কিনা, বা কোথাও ফুলে গেছে কিনা কিংবা কোনো নির্দিষ্ট অংশ আক্রান্ত হয়েছে কিনা তা বুঝতে পারেন৷

মস্তিষ্কে মাঝারি বা তীব্র আঘাত পাওয়া রোগীদের হাসপাতালের ‘নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে' রাখা হয়৷ তাঁদের মাথায় দ্রুত অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে৷ মানুষের খুলির আকার নির্দিষ্ট৷ কিন্তু দেখা যায়, আঘাতের ফলে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হচ্ছে কিংবা কোনো অংশ ফুলে যাচ্ছে৷ তখন চিকিৎসকরা মাথার খুলিতে ফুটা করে মস্তিষ্কের চাপ কমানোর চেষ্টা করেন৷ এক্ষেত্রে রোগীকে ওষুধও দেওয়া হয়৷

মাথায় আঘাত লাগার পর যা করবেন:

  • মাথায় আঘাতপ্রাপ্তদের অধিকাংশ মারা যান আমাদের অজ্ঞতার কারণে, টানাহেঁচড়ার জন্য। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই লক্ষ্য রাখতে হবে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস ঠিক আছে কি-না। আহত ব্যক্তির শ্বাসপথ পরিষ্কার করার পরও যদি শ্বাস না নেয় তবে আহত ব্যক্তির মুখের সঙ্গে মুখ লাগিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস চালু করতে হবে।মাথায় আঘাত লাগার পর যদি বড় কোনো সমস্যা দেখা নাও যায় তার পরেও তার হৃৎস্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি পরিমাপ করতে হবে কোনো অস্বাভাবিকতা রয়েছে কি না, জানার জন্য। পাশাপাশি কোনো অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। 
  • আঘাত লাগার পর যদি অজ্ঞান হয়ে যায় তাহলে স্পাইনাল ইনজুরির আশঙ্কা গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। এক্ষেত্রে মেরুদণ্ডে যেন কোনো নড়াচড়া না পড়ে সেজন্য মাথা ও পিঠ সোজা অবস্থায় স্ট্রেচারে করে সাবধানে হাসপাতালে নিতে হবে বা অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে হবে। 
  • অজ্ঞান ব্যক্তিকে পুরোপুরি চিত করে শুইয়ে দেওয়া বিপজ্জনক। এ কারণে জিহ্বা পেছনে উল্টে গিয়ে শ্বাসনালি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এ জন্য চামচ জাতীয় কিছু মুখে প্রবেশ করিয়ে রাখলে এ সম্ভাবনা কমে যায়।
  • রক্তপাত হলে ক্ষতস্থানের ওপর পরিষ্কার কাপড় বা ব্যান্ডেজ রেখে স্থিরভাবে হাত দিয়ে চেপে রাখুন কমপক্ষে ১৫ মিনিট। তবে ক্ষত গভীর হলে প্রাথমিক চিকিৎসার পাশাপাশি তাকে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। 
  • মাথা থেকে রক্তক্ষরণ হতে থাকলে পরিষ্কার কোনো কাপড় দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে রাখতে হবে। কোনো কাপড় ভিজে গেলে সে কাপড় না সরিয়ে অন্য একটি কাপড় দিয়ে চেপে ধরতে হবে। যদি খুলির কোনো হাড় ভেঙে যায় তাহলে বেশি চাপ দিয়ে ধরা যাবে না। এতে করে মস্তিষ্কে আঘাত লেগে আরও সমস্যা হবে।
  • আঘাত যদি অত্যন্ত গভীর হয় এবং খুলিতে ফ্র্যাকচারের আশঙ্কা থাকে তাহলে রক্ত বন্ধের জন্য সরাসরি জোরে চাপ দেওয়া ঠিক হবে না। জীবাণুমুক্ত গজ দিয়ে হালকাভাবে চেপে রাখতে হবে। 
  • মাথায় আঘাত লাগার পর বমি হওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক লক্ষণ। এক্ষেত্রে তাকে নড়াচড়া করার সময় বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। স্ট্রেচারে ওঠাতে হবে। সম্ভব না হলে দেহ যথাসম্ভব সোজা রাখতে হবে। 
  • যদি আহত ব্যক্তি বমি করতে থাকেন তাহলে শুধু মাথা কাত না করে মাথা, ঘাড় ও দেহ কাত একসঙ্গে কাত করতে হবে। এতে করে বমি ফুসফুসে প্রবেশ করবে না।
  • মাথায় আঘাত লাগার পর সে স্থানে কিছুক্ষণ বরফ দেওয়া যেতে পারে।
  • মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে নিতে হবে। মেরুদণ্ডের ক্ষেত্রে ঘাড়ে আঘাত পাওয়া ব্যক্তির মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেশি। সেক্ষেত্রে ঘাড় যদি খানিকটা শক্ত থাকে বা আঘাতের চিহ্ণ পাওয়া যায় তাহলে আহত ব্যক্তিকে ঘাড়ে কোনো অবস্থায় নাড়া যাবে না। এতে স্নায়ুরুজ্জু ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে তাৎক্ষণিক মৃত্যু হতে পারে। মাথার নিচে বালিশ ব্যবহার করা উচিত নয়। মাথা সামনের দিকে না ঝুঁকে পেছনের দিকে ঝুঁকে থাকা নিরাপদ। সেজন্য একটা তোয়ালে বা গামছা গোল করে পেচিয়ে ঘাড়ের নিচে দেওয়া সুবিধাজনক, যেন ঘাড় পেছনের দিকে ঝুঁকে থাকে। তবে মাথার নিচে অবশ্যই কোনো কিছু দিবেন না। অনেকে আহত ব্যক্তিকে ধরে জোরে ঝাকাঝাকি করেন। মাথা ধরে ডাকাডাকি করেন। এটা কিন্তু মারত্মক হতে পারে। মেরুদণ্ডে আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ওঠানো বা নামানোর ক্ষেত্রে ৬-৮ জন একসঙ্গে ধরে সমান রেখে শোয়াতে হবে। একটি গাছের গুলাইকে যেভাবে স্থানান্তর করতে হয় সেভাবে করতে হবে। বিশেষ করে খেয়াল রাখতে হবে মাথা ও ঘাড়ের দিকে। ঘাড়ের দু পাশে দুটি হাত দিয়ে স্থির করে নিতে হবে।
  • মাথায় আঘাত লাগলে পুরো ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, আহত ব্যক্তি আঘাত লাগার পর পুরোপুরি ভালো হলেও ২-৩ ঘণ্টা পর বমি করতে পারে, অজ্ঞান হতে পারে। এ জন্য কেউ ঘুমালে তাকে ২-৩ ঘণ্টা পর জাগিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতে হবে যে ঠিকমতো উত্তর দেয় কি-না। এ সময় কোনো কিছু না খেতে দেওয়াই ভালো।
  • মাথায় আঘাতের পর যদি অসুস্থতা অনুভূত হয় তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এক্ষেত্রে মাথা ঘোরা, হতবুদ্ধিতা, সিদ্ধান্তহীনতা, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, আঘাতের স্থানে ফুলে যাওয়া, রক্তপাত, হাঁটতে অসুবিধা ইত্যাদি লক্ষণগুলো দেখা গেলেও অবহেলা করবেন না। আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে এমন কোনো হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে, যেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের ব্যবস্থা রয়েছে। 

মাথায় আঘাত লাগার পর যা করবেন না:

  • মাথায় আঘাত লাগার পর সে স্থান পানি দিয়ে ধুবেন না। 
  • কোনো জিনিস বিদ্ধ হলে তা চিকিৎসকের সহায়তা ছাড়া বের করবেন না। 
  • হেলমেট পরা অবস্থায় আঘাত লাগার পর তা যদি আটকে যায় তাহলে তা অদক্ষ হাতে খুলতে যাবেন না।
  •  মাথায় আঘাত লাগার পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা খুব সাবধানে থাকুন। এ সময় অ্যালকোহল পান করা থেকে বিরত থাকুন।

মাথায় আঘাতের বিষয়ে কথা বলছেন, ডা. সৌমিত্র সরকার।
প্রশ্ন : হেড ইনজুরি বা মাথায় আঘাত পাওয়ার পেছনে কী কী কারণ রয়েছে?

উত্তর : আসলে মাথায় আঘাত পাওয়ার অনেকগুলো কারণ রয়েছে। যার মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনা। দেখা গেছে, প্রায় ৪১ ভাগ মানুষ আঘাত পায় সড়ক দুর্ঘটনায়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যতগুলো সড়ক দুর্ঘটনায় রোগী মারা যাচ্ছে, এর মধ্যে ৭০ ভাগই মাথায় আঘাত পেয়ে মারা যাচ্ছে। এ ছাড়া ওপর থেকে পড়ে যাওয়া, মারামারি করে মাথায় আঘাত পাওয়া অথবা কোনো ভারী জিনিস মাথার ওপর পড়ে যাচ্ছে-এসব কারণেও মাথায় আঘাত পায়।

আরো কিছু আঘাত রয়েছে, ‘অকুপেশনাল হ্যাজার্ড’ বলি যেগুলোকে। কাজ করতে গিয়ে ভারী যন্ত্রপাতি পড়ে গেল। আরো কিছু আঘাত রয়েছে, যেগুলো আমাদের দেশের জন্য প্রচলিত। যেমন : অনেক সময় হয়তো মাথার মধ্যে একটা ডাব পড়ে গেল। মাথার মধ্যে তাল পড়ে গেল। এমনকি অনেক সময় কাঁঠালও পড়ে।

আরেকটি আঘাত হয়, বাচ্চারা হয়তো টিভি ট্রলি টান দিতে গিয়ে টিভিটা পড়ে যায়। আমাদের দেশের মানুষজন খুব হালকা ট্রলি ব্যবহার করে টিভি রাখার জন্য। এগুলো সাধারণত মাথায় আঘাত পাওয়ার কারণ।

প্রশ্ন : মাথায় আঘাতটি খুব মারাত্মক হয়েছে কি না, সেটি বোঝার জন্য কি কোনো উপসর্গ রয়েছে?

উত্তর : আসলেই মাথায় আঘাত মারাত্মক একটি বিষয়। কারণ আমাদের দেহের যতগুলো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আছে, সবগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্ক। দেহের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গই খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেদিক থেকে মস্তিষ্ক সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যক্রমকে নিয়ন্ত্রণ করে। উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, একটি পরিবারে যেমন অভিভাবক থাকে এবং তার প্রতিটি সদস্যের কার্যক্রমকে সে নিয়ন্ত্রণ করে। ঠিক একইভাবে মস্তিষ্ক তার সবগুলো অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে নিয়ন্ত্রণ করে। সে ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে যদি সামান্য আঘাতও হয় মস্তিষ্কের সমগ্র অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। সে জন্য মস্তিষ্কের আঘাতকে যদি মারাত্মক বলা হয় সেটা ভুল হবে না।

প্রশ্ন : মাথায় আঘাত পাওয়ার কারণে কী কী সমস্যা হতে পারে?

উত্তর : মাথায় আঘাত পাওয়ার পর একজন রোগী অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। অথবা সে দ্বিধায় পড়ে যেতে পারে। সে কোনো কিছু মনে রাখতে পারছে না। আবার মাথাব্যথার অভিযোগ করে। সঙ্গে বমি হয়, চোখে ঝাপসা দেখে। আবার অনেক সময় নাক ও কান দিয়ে রক্ত আসতে পারে। অথবা পানির মতো আসতে পারে। অথবা দুই চোখের চারদিকে কালো হয়ে যেতে পারে। কানের পেছনেও অনেক সময় কালো হয়ে যায়। আবার কারো কারো মাথায় আঘাত পেলে খিঁচুনি হয়। শরীরের এক দিক অবশ হয়ে যেতে পারে। কথা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অসংলগ্ন কথা বলে। এগুলো থাকলে আমরা বলি মাথায় আঘাত পেয়েছে।

প্রশ্ন : সাধারণত একজন মানুষ মাথায় আঘাত পেলে তাৎক্ষণিক কী করতে হবে?

উত্তর : মাথায় আঘাত পাওয়া রোগীর সঙ্গে অন্য আঘাত থাকতে পারে। যেমন- তার ঘাড়ে সারভাইক্যাল ইনজুরি থাকতে পারে। তার লাম্বোসেকরাল কোমড স্পাইনাল ইনজুরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে তার নড়াচড়া হতে হবে খুব সীমিত।

যদি মাথায় আঘাত পাওয়া কোনো রোগী দেখতে পাই প্রথমে দেখতে হবে, শ্বাসপ্রশ্বাস নিচ্ছে কি না ঠিকমতো। যদি শ্বাসপ্রশ্বাস ঠিক না থাকে দেখব নাকে মুখে কোনো বাধা আছে কি না। শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক হওয়ার জন্য সেটি ছোট করতে হবে। অথবা কৃত্রিমভাবে মুখে মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া যেতে পারে। যদি দেখা যায়, মাথা থেকে রক্ত বের হচ্ছে জায়গাটি চেপে ধরে বন্ধ করতে হবে। আর তার নড়াচড়াটা এ জন্য সীমাবদ্ধ যে যদি বেশি টানাটানি করা হয় হয়তো ঘাড়ে আঘাত পেয়ে যেতে পারে। সেই অবস্থায় তাকে আস্তে আস্তে তুলে কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে।

প্রশ্ন : এই ধরনের আঘাত নিয়ে যখন কেউ আসে, আপনারা প্রাথমিকভাবে কী করেন?

উত্তর : সব জায়গায় নিউরো সেন্টার নেই। তাই বলে কি রোগী চিকিৎসা পাবে না? যেকোনো থানা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিৎসাটা প্রথমে দিতে হবে। দেখতে হবে সে ঠিকমতো শ্বাস নিচ্ছে কি না, তার রক্ত পড়া বন্ধ করা হলো কি না। তারপর যেখানে বড় ধরনের কাটা থাকবে সেখানে সেলাই করা হলো কি না। তার সে অনুযায়ী রোগীকে মেডিকেল কলেজগুলোতে পাঠাতে হবে।

হাসপাতালে নিয়ে এলে যদি দেখা যায় যে রোগীর খিঁচুনি হচ্ছে, রোগী অজ্ঞান হয়ে আছে তখন আমরা শারীরিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখি। বিশেষ করে সিটি স্ক্যান করে দেখি তার শরীরের ভেতরে কোনো রক্তক্ষরণ আছে কি না। সে অনুযায়ী তার চিকিৎসা দিই।

প্রশ্ন : বাংলাদেশে মাথায় আঘাতে চিকিৎসা কী রকম হচ্ছে এবং মানসম্মত হচ্ছে কি না চিকিৎসা?

উত্তর : এটি আমাকে সবাই জিজ্ঞেস করে। মাথায় আঘাত পাওয়া রোগীদের সবচেয়ে বেশি চিকিৎসা নিউরো সার্জনদের দিতে হয়। কারণ মেডিকেল কলেজগুলোতে মাথায় আঘাত পাওয়ার রোগীই সবচেয়ে বেশি। মাথায় আঘাত পাওয়া রোগীর মধ্যে কিছু হয়তো ওষুধে ভালো হয়, আর কিছু সংখ্যক রোগীকে অস্ত্রোপচার করতে হয়। এই অস্ত্রোপচারগুলো আমাদের দেশে যা হচ্ছে এবং বাইরের দেশে যা হচ্ছে তা প্রায় কাছাকাছি। কারণ রক্তক্ষরণ হচ্ছে মস্তিষ্কের ভেতরে সেটিই বের করে দিতে হবে। এটিই আমাদের চিকিৎসা।

প্রশ্ন : আমরা যে অনেক সময় টিভিতে দেখছি মাথায় একবার আঘাত পেয়ে স্মৃতিশক্তি চলে গেছে, আবার দ্বিতীয়বার আঘাত পেয়ে স্মৃতি ফিরে এসেছে। এটি আসলে কতটুকু যুক্তিযুক্ত?

উত্তর : এটি আসলে খুব মজার একটি বিষয়। আসলে মাথায় আঘাত পেলে মানুষের স্মৃতিবিভ্রম হতে পারে। এগুলোকে বলে এমনিসিয়া। এগুলো মাথায় আঘাত পাওয়ার পরপর হয়। দেখা যায় রোগী সবকিছু ভুলে যাচ্ছে। তবে আরেকটি আঘাত পেয়ে স্মৃতি ফিরে আসবে এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রমাণিত নয়। সেক্ষেত্রে বিষয়টি নাটকীয়ই হবে।

এ বিষয়ে পরামর্শ;

অনেকেই মনে করেন, মাথায় আঘাত লাগলেই নিশ্চিত মৃত্যু। ব্যাপারটা আসলে সে রকম নয়, বরং যত দ্রুত সম্ভব, পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে আঘাতের মাত্রা নির্ণয় এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করলে ক্ষতির মাত্রা কমবে।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে মাথায় আঘাত লাগার পর রোগীকে আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ মনে হলেও পরে হঠাৎ অবস্থা জটিল হতে পারে।

শিশুদের মাথায় আঘাত লাগলে করণীয় কি? এ বিষয়ে কথা বলেছেন, ডা. মো. জিল্লুর রহমান। বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের নিউরোসার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান।

তথ্যসূত্র:

  • শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরো সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. সৌমিত্র সরকার, এনটিভি।
  • অধ্যাপক হারাধন দেবনাথ, নিউরোসার্জারি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, প্রথম আলো।
  • ডয়চে ভেলে।
  • ডা. মো. জিল্লুর রহমান। বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের নিউরোসার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান, এনটিভি।
  • উইকিপিডিয়া।
  • টাইমস অফ ইন্ডিয়া> কালের কণ্ঠ।
  • ডা. কাজী মহিবুর রহমান, সহকারী অধ্যাপক, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সাইন্স, আগারগাঁও, ঢাকা, সমকাল।
  • ডাক্তার হুমায়ুন কবির হিমু, এনটিভি।
  • Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই

Popular Post

Blogger দ্বারা পরিচালিত.