(Electric shock) প্রাথমিক চিকিৎসাই শক কি? এবং শক থেকে বাঁচার উপায়:
ইলেকট্রিক শক:
পরিবাহী ও অপরিবাহী শব্দ দুটির সঙ্গে অনেকেই পরিচিত। তামা, লোহা, সিলভার, পানি, কপার ও অ্যালুমিনিয়াম ইত্যাদি বিদ্যুৎ পরিবাহী। প্লাস্টিক, রাবার ইত্যাদি বিদ্যুৎ অপরিবাহী। পরিবাহী তারের চতুর্দিকে অপরিবাহী বস্তু ব্যবহৃত হয়। অনেক দিন ব্যবহারের ফলে এই অপরিবাহী বস্তু নষ্ট হয়ে ফেটে যায় এবং পরিবাহী তার বাইরে বের হয়ে আসে। এই ত্রুটিপূর্ণ তারের সঙ্গে মানবদেহের সংস্পর্শ হলে বৈদ্যুতিক শক লাগে। বৈদ্যুতিক শক তখনই অনুভূত হয়, যখন বিদ্যুৎ মানবদেহের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। অর্থাৎ মানবদেহের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হওয়ার ফলে সৃষ্ট অনুভূতিকে ইলেকট্রিক শক বলে। অল্প পরিমাণ প্রবাহ খুব একটা অনুভূতি সৃষ্টি করতে না পারলেও বেশি বিদ্যুৎ প্রবাহ শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পুড়ে যাওয়া থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে।
বিদ্যুৎ প্রবাহ দুই ধরনের হয়। এসি (AC) বিদ্যুৎ প্রবাহ ও ডিসি (DC) বিদ্যুৎ প্রবাহ। এসি বিদ্যুৎ প্রবাহ আকর্ষণ করে টেনে নেয়। ডিসি বিদ্যুৎ প্রবাহ শুধু ধাক্কা মারে। সে জন্য এসি বিদ্যুৎ প্রবাহ বেশি মারাত্মক। ইলেকট্রিক শক লাগার জন্য সর্বনিম্ন যে বিদ্যুৎ প্রবাহ দরকার তা নির্ভর করে বিদ্যুতের ধরন ও কম্পাঙ্কের ওপর। শরীরের ভেতর দিয়ে ৬০ হার্জ (কম্পাকের এসআই একক) কম্পাঙ্কের এসি বিদ্যুৎ প্রবাহ ১ মিলি অ্যাম্পিয়ার (আরএমএস) হলেই একজন ব্যক্তি তা অনুভব করতে পারে; কিন্তু ডিসি হলে কমপক্ষে ৫ মিলি অ্যাম্পিয়ার লাগে অনুভূতি সৃষ্টি করতে। মানবদেহে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলে দেহের রোধের জন্য তাপ উৎপন্ন হয়। এই তাপ দেহের বাইরের বা ভেতরের অংশ পুড়ে ফেলতে সক্ষম। ৪ অ্যাম্পিয়ারের বেশি প্রবাহ টিস্যু পুড়ে ফেলে, হৃৎপিণ্ড বন্ধ করে দেয় এবং মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে।
ইলেকট্রিক শকের ক্ষতিকর প্রভাব:
- পুড়ে যাওয়া,
- পেশির নিয়ন্ত্রণ হারানো,
- স্নায়ুুতন্ত্রের ক্ষতি,
- শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি।
- ক্রিটিকাল কেয়ার এবং ইমারজেন্সি মেডিসিন' বিশেষজ্ঞ ডা. রাগিব মনজুর বলছেন, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলে সবচেয়ে বড় শারীরিক সমস্যা দুটো।"একটি হলো পুড়ে যাওয়া এবং অন্যটি হল হৃদযন্ত্রের উপরে চাপ সৃষ্টি হওয়া। তিনি বলছেন, অনেক সময় 'কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট' হয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ব্যক্তি মারাও যেতে পারেন।" "এছাড়া বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলে স্নায়ুর উপর চাপ তৈরি হয়, আক্রান্ত ব্যক্তি জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারেন। শরীরের যে অংশে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েছেন সেই অংশ অথবা পুরো শরীর অবশ হয়ে যেতে পারে, ঝিমঝিম করতে পারে, শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথা হতে পারে। "
- আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক সমস্যা কতটা গুরুতর হবে তা নির্ভর করে বিদ্যুতের ভোল্টেজের মাত্রা, কতক্ষণ বিদ্যুতের সাথে তার সংস্পর্শ ছিল, তার হার্ট অথবা অন্য কোন শারীরিক সমস্যা আছে কিনা - এসব কিছুর উপরে।
- আবাসিক ভবনে বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা হলে তার ভয়াবহতা কম হয় - কারণ বিদ্যুতের ভোল্টেজ কম থাকে। ঢাকা শহরে অগ্নিকান্ডের ৭৫ শতাংশই বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে ঘটে।
বৈদ্যুতিক শকড এর সময় কি করবেন:
কেউ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলে তার আশপাশে যারা থাকেন - প্রায়শই তারা তাৎক্ষণিক করণীয় সম্পর্কে জানেন না। অনেকেই ঘাবড়ে যান। কিন্তু খুব সহজ কিছু বিষয় জানা থাকলে বহু মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই এমন দৃশ্য দেখলে মাথা ঠান্ডা করুন এবং দ্রুত নিচের ব্যবস্থাগুলি গ্রহণ করুন:
- কারো শরীরে বিদ্যুেতর তার জড়িয়ে গেলে বা কেউ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলে সঙ্গে সঙ্গে মেইন সুইচ বন্ধ করে দিতে হবে। তা সম্ভব না হলে বিদ্যুৎ অফিসে ফোন দিয়ে সংযোগ বন্ধ করার ব্যবস্থা করতে হবে। সংযোগটি বন্ধ হয়ে গেলে এতে আক্রান্ত ব্যক্তি বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে এমনিতেই আলাদা হয়ে যাবেন।
- কোনো কারণে সুইচ বন্ধ করতে না পারলে পায়ে জুতো বা স্যান্ডেল পরে, শুকনো কাঠের টুকরো, বাঁশ, রাবার দিয়ে তৈরি কোনকিছু দিয়ে বা শুকনো কাপড় হাতে জড়িয়ে দূরত্ব বজায় রেখে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ব্যক্তিকে বৈদ্যুতিক উৎস থেকে ধাক্কা দিয়ে ছাড়িয়ে দিতে হবে বা আলাদা করতে হবে।
- এরপর হাতে রবারের দস্তানা এবং পায়ে রবারের স্যান্ডেল পরিধান করে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ব্যক্তিকে উদ্ধার করতে হবে।
- এরপর বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ব্যক্তিকে কাঠের ওপর শুইয়ে দিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ব্যক্তির শরীর (বুক, পিঠ, হাত-পায়ের তালু, ঘাড় ইত্যাদি) মালিশ করে তার রক্ত চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে।
- শ্বাসক্রিয়া চলছে কি না তা পরীক্ষা করতে হবে। যদি না চলে তবে, দুই চোয়ালের মাঝে দুই দিকে চাপ দিয়ে মুখ খোলা অবস্থায় মুখে মুখ লাগিয়ে ফুঁ দিতে থাকুন (আর্টিফিসিয়াল ব্রিদিং, মাউথ টু মাউথ)। প্রতি মিনিটে আনুমানিক ২০ বার। এভাবেই কৃত্রিমভাবে শ্বাসক্রিয়া চালাতে হবে। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ব্যক্তির হৃদপিণ্ড সঞ্চলন বন্ধ হয়ে গেছে বলে মনে হলে দ্রুত তার বুকের ওপর জোরে জোরে চাপ দিতে হবে। ডাক্তারি ভাষায় একে বলা হয় 'CPR' বলে - যা বাংলাদেশে অনেকেই করতে পারেন না।
- হালকা শক লাগলে একটু বিশ্রাম নিলে এবং গরুর দুধ খেলে দুর্বলতা কেটে যাবে।
- বেশি শক লাগলে বা আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর পুড়ে গেলে, হার্টের সমস্যা হলে, অবস্থা গুরুতর হলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
- হাসপাতালে না নেয়া পর্যন্ত তাকে বালিশ ছাড়া মাটিতে একপাশে কাত করে শুইয়ে দিতে হবে। শরীরের কাপড় ঢিলা করে দিতে হবে।
- বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ব্যক্তির শ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে কৃত্রিমভাবে শ্বাস দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে যতক্ষণ না হাসপাতালে পৌঁছা সম্ভব হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত এবং রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করত হবে।
- জিহ্বা উল্টে গেছে কিনা পরীক্ষা করুন, উল্টে গেলে আঙুল দিয়ে তা সোজা করে দিন।
- নাক-মুখে কিছু আটকে থাকলে তা পরিষ্কার করে দিতে হবে - তা না হলে আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাসরোধ হয়ে যেতে পারে।
| বিদ্যুৎ প্রবাহ রয়েছে এমন কোনো খোলা তারের সংস্পর্শে এলে যে কোন ব্যক্তির দেহে বিদুৎতায়ন হয়ে অনেক আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে থাকেন। একেই বলে শক খাওয়া। |
বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ব্যক্তিকে উদ্ধার করার সময় যে কাজগুলো করা যাবে না:
- এরকম বহু ঘটনা রয়েছে যে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার পর পাশের মানুষটিকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেও আক্রান্ত হয়েছেন। তাই আগে নিজেকে সেভ করুন এরপরে অন্যকে বাঁচানোর চেষ্টা করুন।
- বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ব্যক্তিকে বাঁশ বা কাঠ দিয়ে আলাদা করার সময় রোগীকে যেন বেশি আঘাত না লাগে।
- মনে রাখবেন মেইন সুইচ বা সংযোগ বন্ধ করা সম্ভব না হলে, কোনভাবেই নিজে খালি হাতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ব্যক্তিকে স্পর্শ করা যাবে না।
- কোনভাবেই ধাতব এবং ভেজা কিছু ব্যবহার করা যাবে না।
- ভেজা যায়গায় ঘটনাটি ঘটলে নিজেকে বাঁচাতে সেখান থেকে সরে যাওয়াই ভাল।
বৈদ্যুতিক শক এড়াতে সতর্কতা:
বাংলাদেশে অসতর্কতার কারণেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঘটনা বেশি ঘটে, বলছেন বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিসের সাবেক কর্মকর্তা একেএম শাকিল নেওয়াজ। তিনি বলছেন, প্রায়ই কাটা বিদ্যুতের তার পড়ে থাকে বিভিন্ন যায়গায়।
►"বিদ্যুতের তার, সুইচ এবং সংযোগের জন্য দরকারি অন্যান্য যন্ত্র নিয়মিত পরীক্ষা করা, ত্রুটি থাকলে তা সারিয়ে নেয়া, দরকার হলে তার বা সুইচ ইত্যাদি বদলে ফেলার অভ্যাসও নেই অনেকের।"
তিনি বলছেন, বিদ্যুতের তার টেপ দিয়ে জোড়া লাগানোর প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।
►"ঘরে যত্রতত্র মাল্টি-প্লাগ ব্যবহার করা উচিত নয়। ঘর যাতে স্যাঁতসেঁতে না থাকে এবং বিদ্যুতের উৎসের কাছাকাছি ভেজা কিছু না থাকে - সেটি নিশ্চিত করতে হবে। "
►শাকিল নেওয়াজ বলছেন, অন্য কোথাও থেকে অবৈধ সংযোগ নেয়ার ফলে প্রচুর দুর্ঘটনা ঘটে। এর অন্যতম কারণ জোড়া দেয়া তার বৃষ্টিতে ভিজে যায়।
►শাকিল নেওয়াজ বলছেন, "বিদ্যুতের কাজে খরচ বাঁচানোর চেষ্টা না করে মানসম্পন্ন তার ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কিনতে হবে। যত কিলোওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হবে - সেই চাপ নেয়ার উপযুক্ত সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হবে।"
►তিনি বলছেন, প্রায়ই দেখা যায় কোন ভবন তৈরির পর ইচ্ছেমত এসি ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক সামগ্রী বসানো হচ্ছে - যা বিদ্যুতের লোড বাড়িয়ে দেয়।
►"কোন সমস্যা হলে বিদ্যুৎ সংযোগ নিজেই বন্ধ হয়ে যাবে এমন অটোমেটিক সার্কিট ব্রেকার এবং মেইন সুইচ থাকা খুবই জরুরী। সবসময় 'আর্থিং' করা থাকতে হবে।"
এমনকি কোন অনুষ্ঠান আয়োজনের সময়ও একই ধরনের ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি।
►বৈদ্যুতিক শক এড়াতে চাইলে ভেজা হাতে বৈদ্যুতিক সুইচে হাত দেওয়া যাবে না।
►বিদ্যুতের কাজ করার আগেই মেইন সুইচ বন্ধ করে নিতে হবে।
►রাবারের জুতা পরে বিদ্যুতের কাজ করতে হবে।
►বাড়ি-ঘর বা অফিসের সব বৈদ্যুতিক তার ও আর্থিং ঠিক আছে কি না তা দেখে নিতে হবে।
আরো পড়তে পারেন...
বজ্রপাতে আক্রান্তদের প্রথম চিকিৎসা কিভাবে?
প্রাথমিক চিকিৎসায় ABC এবং CPR কি?
প্রাথমিক চিকিৎসা বা প্রাথমিক সুরক্ষা কি?
তথ্যসূত্র:
- 'ক্রিটিকাল কেয়ার এবং ইমারজেন্সি মেডিসিন' বিশেষজ্ঞ ডা. রাগিব মনজুর, বিবিসি বাংলা।
- কালের কণ্ঠ।
- অগ্নিকাণ্ড এবং দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিসের সাবেক পরিচালক একেএম শাকিল নেওয়াজ, বিবিসি বাংলা।
- Edited: Natural_Healing.
কোন মন্তব্য নেই