চোখ ওঠা রোগের কারণ, করণীয় ও বর্জনীয়
চোখ ওঠার মৌসুম চলছে। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ বেড়ে গেছে চোখ ওঠার সমস্যা। শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সি মানুষ এই অসুখে আক্রান্ত হচ্ছে। প্রায় প্রতিটি ঘরে কেউ না কেউ এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। গরমে আর বর্ষায় চোখ ওঠার প্রকোপ বাড়ে। একজন আক্রান্ত হলে পরিবারের সবাই আক্রান্ত হচ্ছে। এটি একটি সংক্রমণ। যেটি প্রায় মহামারির পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই রোগের নাম কনজাংটিভাইটিস বা কনজাংটিভার। সাধারণ ভাষায় যাকে ‘চোখ ওঠা’ বলে। এটি মারাত্মক ছোঁয়াচে। রোগটি ছোঁয়াচে হওয়ায় দ্রুত অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে আমাদের দেশে শীতকালীন আবহাওয়ায় চোখ ওঠার সমস্যা বেশি দেখা দেয়। তবে চোখ ওঠার পরে অবশ্যই চোখের বাড়তি যত্ন নিতে হয়।
আমাদের চোখের সাদা অংশ এবং চোখের পাতার ভিতরের অংশ একটা স্বচ্ছ পাতলা পর্দা দিয়ে আবৃত থাকে, সেটার নাম কনজাংটিভা। এটায় যদি ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা অ্যালার্জির কারণে প্রদাহ হয় তখন তাকে বলা হয় কনজাংটিভাইটিস। এটাকে বাংলায় চোখ ওঠা রোগ বলা হয়।
চোখ ওঠার কারণ:
ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) চক্ষু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. চন্দ্র শেখর মজুমদার জানান, এই রোগটি ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়া ২ কারণেই হতে পারে। আবার কখনও কখনও অ্যালার্জির কারণেও এ রোগ হয়ে থাকে। যে মৌসুমে বাতাসে আদ্রতা বেশি থাকে, সে সময় এ রোগটা বেশি হয়।
যাদের চোখে জ্বালাপোড়ার সঙ্গে ময়লা আসে তাহলে সেটা ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন। একে বলে ব্যাকটেরিয়াল কনজাংকটিভাইটিস। আর শুধু ভাইরাল ইনফেকশন হলে চোখ জ্বালাপোড়া করে এবং লাল হয়ে যায়। এক্ষেত্রে চোখে হাত দেয়া যাবে না। এলার্জি হয় এমন খাবার এড়িয়ে যাওয়াই ভালো।
আক্রান্ত ব্যক্তির চশমা, তোয়ালে, রুমাল, টিস্যু পেপার, বালিশ বা প্রসাধনী কোনো সুস্থ ব্যক্তি ব্যবহার করলে তারাও আক্রান্ত হতে পারেন। বিশেষ করে অসুস্থ ব্যক্তির চোখের পানি কোনো সুস্থ ব্যক্তির চোখে লাগলে তারও আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অধিক। অপরিচ্ছন্ন ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও চোখ ওঠার অন্যতম কারণ।
অপরিষ্কার বা নোংরা জীবনযাপন চোখ ওঠার অন্যতম কারণ। চোখ ওঠা রোগে চোখ লাল হয়ে যায়। আর এমনটি হয় এই কনজাঙ্কটিভার রক্তনালিগুলো প্রদাহর কারণে ফুলে বড় হয়ে যাওয়া এবং তাতে রক্তপ্রবাহ বেড়ে যাওয়ার কারণে।
চোখ ওঠার লক্ষণ:
- প্রথমে এক চোখ আক্রান্ত হয় তারপর অন্য চোখে ছড়িয়ে পড়ে,
- চোখের সাদা অংশ বা কনজাংটিভা লাল বা টকটকে লাল দেখাবে,
- চোখে চুলকানি ও চোখ ফুলে যাওয়া,
- চোখ জ্বালাপোড়া করা,
- চোখ ব্যথা করে ও খচখচে অনুভূত হয়,
- চোখে জ্বালাপোড়ার সঙ্গে ময়লা আসে,
- চোখের ভেতরে কিছু আছে এমন অনুভূতি হয়,
- চোখ থেকে বারবার পানি পড়ে, চোখের পাতায় পুঁজ জমে ও পাপড়িতে যা আঠার মতো লেগে থাকে,
- চোখের পাতা লাল হয়ে ফুলে চোখ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে,
- সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর চোখের পাতা খুলতে কষ্ট হয়,
- আলোর দিকে তাকালে অস্বস্তি লাগা, সবকিছু ঘোলা ঘোলা দেখা, চোখ দিয়ে পানি পড়া, চোখের কোনায় ময়লা (যা কেতুর নামে প্রচলিত) জমা, চোখ ফুলে যাওয়া চোখ ওঠার লক্ষণ।
যেসব খাদ্যে খেতে হবে:
চোখ ওঠার সমস্যায় ভুগলে সেরে ওঠার জন্য কিছু খাবারও খেতে হবে আবার কিছু খাবার বাদ দিতে হবে। চোখের নানা সমস্যায় উপকারী কিছু খাবার আমাদের হাতের নাগালেই পাওয়া যায়;
কিসমিস: কিশমিশে পর্যাপ্ত পলিফেনলস থাকায় শরীর থেকে ফ্রি র্যাডিকেলস দূর করে। সেই সঙ্গে এটি চোখের মাসলের উন্নতিতেও সাহায্য করে। চোখ ভালো রাখতে চাইলে তাই নিয়মিত কিশমিশ খেতে হবে। রাতে কিশমিশ ভিজিয়ে রেখে সকালে সেই পানি খেলেও উপকার পাবেন।
পিংক সল্ট: বিশেষজ্ঞরা বলেন, চোখ ভালো রাখতে বিশেষভাবে কাজ করে পিংক সল্ট। পিংক সল্ট চোখের জন্য ভালো। এই লবণে আছে ৮০টির বেশি মাইক্রো-মিনারেলস, যা চোখের বিভিন্ন সমস্যা দূর করতে কাজ করে। তাই চোখ ওঠার সমস্যা দেখা দিলে খাবারে পিংক সল্ট যোগ করতে পারেন, তবে তা অতিরিক্ত খাবেন না। কারণ, অতিরিক্ত লবণ শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
হলুদ ও কমলা রঙের ফল: এই দুই রঙে প্রচুর ভিটামিন এ থাকে। তাই চোখ উঠলে হলুদ ও কমলা রঙের ফল চোখের সমস্যা দূর করতে সাহায্য করবে।
সবুজ শাক: গাঢ় সবুজ রঙের শাক খেলেও উপকার মিলবে। সবুজ শাকে প্রচুর ফলিক অ্যাসিড থাকে, যা দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে সাহায্য করে।
খেতে মানা যা:
চোখ ওঠার সমস্যায় ভুগলে সেই সময়ের জন্য কিছু খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো। তার মধ্যে আছে—
- রিফাইন্ড খাবার,
- অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার,
- প্রসেসড মিট,
- গ্রিল করা মাংস,
- ডুবো-তেলে ভাজা খাবার,
- মার্জারিন,
- ক্যান ফুড।
- দিনে কয়েকবার চোখ পরিষ্কার করতে হবে, পরিষ্কার করার পর হাত সাবান দিয়ে ধুতে হবে বা স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হবে।
- কোনো অবস্থাতেই চোখ ঘষাঘষি বা রগড়ানো যাবে না।
- বালিশের কভার, মুখ মোছার গামছা বা তোয়ালে, চশমা নিয়মিত গরম পানিতে ডিটারজেন্ট দিয়ে পরিষ্কার করে রাখতে হবে।
- হাঁচি দেওয়ার সময় নাক, মুখ ঢেকে রাখুন এবং ব্যবহৃত টিস্যু ময়লার ঝুড়িতে ফেলুন।
- চোখ সম্পূর্ণ ঠিক না হওয়া পর্যন্ত কন্টাক্ট লেন্স পরা যাবে না।
- ইনফেকশন থাকা অবস্থায় কোন লেন্স পরে থাকলে সেটি ফেলে দিন।
- আক্রান্ত চোখে কোন প্রসাধনী দেওয়া যাবে না।
- অ্যালার্জি এড়াতে কালো চশমা বা সানগ্লাসে চোখ ঢেকে রাখতে পারেন।
- ডা. চন্দ্র শেখর মজুমদার বলেন, এক্ষেত্রে চোখে হাত দেওয়া যাবে না। এলার্জি হয় এমন খাবার এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। যেহেতু রোগটি ছোঁয়াচে, তাই যতটা সম্ভব আইসোলেশনে থাকা ভালো। ছোঁয়াচে এবং বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় বলে লোকজন থেকে দূরে থাকতে বলা হয়।
- এ সময় সানগ্লাস পরে থাকতে হবে। চুলকানি হলে রোগী ঠাণ্ডা এবং অ্যালার্জিজনিত রোগের ওষুধ খেতে পারেন। চোখের কিছু ড্রপ রয়েছে, আমরা সেগুলো সাজেস্ট করি। তবে অনেকেই বারবার চোখে হাত দেয় বা চুলকায়। এতে চোখের ক্ষতি হতে পারে। তবে ভয়ের তেমন কোনো কারণ নেই। সাধারণত ৬-৭ দিনেই এটি ভালো হয়ে যায়।
- কোনো আইড্রপের মেয়াদ প্যাকেটে এক-দুই বছর থাকলেও একবার এর মুখ খুললে ২৮ দিনের বেশি ব্যবহার করা যাবে না।
- আক্রান্ত চোখে নোংরা পানি, ধুলাবালি, দূষিত বাতাস যেন চোখে প্রবেশ না করে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এছাড়া সকালে ওঠার পর চোখে পানি দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। অনেকে চোখ ওঠলে বারবার পানি দিয়ে পরিষ্কার করেন বা চোখে পানির ঝাপটা দেন। এটি মোটেই ঠিক নয়।
- চোখ উঠলে চশমার ব্যবহার করুন। এতে চোখে স্পর্শ করা কমবে এবং ধুলাবালু, ধোঁয়া থেকে চোখ রক্ষা পাবে। আলোয় অস্বস্তিও কমবে, রোদে চোখ জ্বলা কমাবে।
- চোখ ওঠা ছোঁয়াছে রোগ, তাই যাদের চোখ ওঠেছে, তাদের সংস্পর্শ পরিহার করতে হবে। চোখ আক্রান্ত ব্যক্তির রুমাল, কাপড়চোপড়, তোয়ালে ব্যবহার করা যাবে না। এমনকি হ্যান্ডশেকের মাধ্যমেও অন্যরা আক্রান্ত হতে পারেন। এ জন্য হাত তাড়াতাড়ি ধুয়ে ফেলতে হবে। নোংরা হাত চোখে লাগানো যাবে না।
- কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাইরাসের আক্রমণের পর ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ঘটে। এ জন্য দিনে তিন থেকে চারবার চোখের অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ ক্লোরামফেনিকল ব্যবহার করতে হবে। ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ না হলেও সেকেন্ডারি ইনফেকশন প্রতিরোধ করার জন্য এটি ব্যবহার করা যায়। চোখে চুলকানি থাকলে অ্যান্টিহিস্টামিন সেবন করতে হবে। এ ক্ষেত্র অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
- দৃষ্টি ঝাপসা হলে, চোখ খুব বেশি লাল হলে, খুব বেশি চুলকালে বা অতিরিক্ত ফুলে গেলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
- চোখ ঘষে চুলকানো যাবে না। অন্য কারও আই ড্রপ ব্যবহার করা উচিত হবে না। এতে আবার কনজাংটিভাইটিস হতে পারে।
- নিজের ব্যবহার করা প্রসাধনসামগ্রী ও ব্যক্তিগত কাপড়চোপড় অন্য কাউকে ব্যবহার করতে দেয়া যাবে না। একইভাবে অন্যের ব্যবহৃত প্রসাধনসামগ্রী ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র রোগীর ব্যবহার করা চলবে না।
- ভিটামিন সি এর পাশাপাশি সুষম খাবার খাওয়া।
- এ সময়ে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে।
তথ্যসূত্র:
- ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) চক্ষু বিভাগের প্রধান, অধ্যাপক ডা. চন্দ্র শেখর মজুমদার,
- বাংলাদেশ আই হসপিটালের চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও সার্জন ডা. ইশতিয়াক আনোয়ার,
- ডা. সাফী খান, চক্ষু বিশেষজ্ঞ,
- যুগান্তর।
- রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক ফাতিমা-তুজ জোহরা,
- অধ্যাপক ডা. এ. কে. খান, চক্ষু বিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞ ও সার্জন, গণবিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা,
- সময় টিভি।
- পুষ্টিবিদ, ইসরাত জাহান, প্রথম আলো।
- মানবকণ্ঠ।
- corona.gov.bd
- Edited: Natural_Healing.



কোন মন্তব্য নেই