First Aid Present

Lifestyle Modification এবং প্রাকৃতিক খাদ্য, পানীয়, শাকসবজি, গাছ, ডালপালা, ফল, মসলা, পাতা ও ফুল ইত্যাদির দ্বারা প্রাথমিক চিকিৎসা।

বর্ষায় দূরে থাকুক ব্যাধি

বৃষ্টির ঝিরিঝিরি শব্দে ব্যাকুল হয় মন। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির ফোঁটা ধরতে ধরতে নস্টালজিক হননি এমন কেউ নেই বললেই চলে। খোলা আকাশে বৃষ্টিতে ভেজেনি এমন প্রেমিকজুটি কি আছে? এ সময় রোগবালাই হলে আনন্দ তো মাটি হয়ই, ঘিরে ধরে অবসাদ। সচেতন হলে রোগবালাই দূরে রাখা সম্ভব।

বর্ষায় বাইরের খাবার যত কম খাওয়া যায় ততই ভাল। বাইরের খোলা খাবার, অপরিশোধিত জল থেকে ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়ে। শিশুদের ডায়রিয়া থেকে ডিহাইড্রেশন হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়াও বর্ষায় পানিবাহিত রোগ এবং মশা বাহিত রোগ থেকে বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।
সাধারণ সর্দি-জ্বর : বর্ষাকালে সর্দি-জ্বর-কাশির প্রকোপ বাড়ে। ঘরে ঘরে দেখা দেয় এ সমস্যা। এটি স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া, যা ঋতু পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কযুক্ত। সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত হলে প্যারাসিটামল সেবন করুন। দিনে চারবার প্যারাসিটামল সেবন করতে পারেন। জ্বর হলেই এন্টিবায়োটিক সেবন করবেন না। এটি খুবই মারাত্মক। জ্বর সাত দিনের বেশি হলে, মাত্রা খুব বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে এন্টিবায়োটিক সেবনের প্রয়োজন হতে পারে। সর্দি-কাশি থাকলে এন্টিহিস্টামিন যেমন ফেক্সোফেনাডিন, ডেসলোরাটিডিন, রুপাডিন রাতে একটা সেবন করতে পারেন। এ ছাড়া কুসুম গরম পানিতে আদার রস, লেবুর রস, মধু, লবঙ্গ, তুলসি পাতার রস মিশিয়ে পান করুন। এতে আরাম পাবেন। কাশি যদি সহজেই না সাড়ে তাহলে এন্টিবায়োটিক সেবনের প্রয়োজন হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ মতো এন্টিবায়োটিক সেবন করতে পারেন।

শিশুদের ক্ষেত্রে ইনফ্লুয়েঞ্জা, সর্দিজ্বর:
এই সময়ে প্রায়ই সর্দিজ্বরে ভোগে শিশু। সমস্যা জটিল হলে নিউমোনিয়াও হতে পারে।
আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি থেকে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস বাতাসে ছড়ায়, রোগীর ব্যবহার্য বস্তু থেকেও ছড়ায়। শিশুকে তাই হাঁচি-কাশির রোগী থেকে দূরে রাখুন। সাবান-জলে হাত ধুয়ে শিশুকে পরিচর্যা করবেন। অন্যের ব্যবহার্য তোয়ালে, চাদর, রুমাল ইত্যাদি শিশুকে ধরতে দেবেন না। এমনকি অন্যের ব্যবহৃত সেলফোন, দরজার হাতল ইত্যাদি থেকেও জীবাণু দেহে প্রবেশ করে।
সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত ছোট্ট শিশুকে খাওয়ার পানি বা দুধ পানের আগে হালকা গরম পানিতে পাতলা কাপড় চুবিয়ে সরু শলাকার মতো করে নাসারন্ধ্র পরিষ্কার করে দিলে সুবিধা হয়। লবণপানির নাকের ড্রপও ব্যবহার করা যায়। কাশি প্রশমনে নিরাপদ মধু, তুলসীপাতার রস, লেবুমিশ্রিত কুসুম গরম পানি খাওয়ানো যায়। জ্বর হলে শিশুর ওজন অনুযায়ী প্যারাসিটামল সিরাপ ও বেশি করে তরল পান করানো উচিত।
যদি জ্বর অনেক বেশি হয়, শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়, বুকের দুধ পানে অসমর্থ হয়, শ্বাসের সঙ্গে বুকের নিচের অংশ দেবে যায়, তবে নিউমোনিয়া হয়েছে বিবেচনা করে দ্রুত হাসপাতালে নিন।

ডায়রিয়া ও টাইফয়েড : বর্ষার পানিতে ঢুবে যায় বিশুদ্ধ পানির উৎস ও সরবরাহকারী পাইপলাইন। অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে বন্যা হলে ঢুবে যায় টিউবওয়েল, পানির ট্যাংক। ময়লা-আবর্জনায় দূষিত হয় খাবার পানি। ফলে বাদল দিনে ডায়রিয়া ও টাইফয়েডের প্রকোপ বাড়ে। খাবার পানি বিশুদ্ধ করতে পারলে কিন্তু ডায়রিয়ার সমস্যা থেকে মুক্তি মেলে খুব সহজেই। পানি ফুটালে বিনা খরচেই বিশুদ্ধ করা যায়। পানি ফুটতে শুরু করলে কমপক্ষে আরো ১০ মিনিট জ্বাল দিন। হ্যালোট্যাব দিয়েও পানি বিশুদ্ধ করতে পারেন। পানি বিশুদ্ধ করার পর পরিষ্কার পাত্রে সংরক্ষণ করুন। ডায়রিয়া হলে প্রতিবার পায়খানার পর যতটুকু পারেন ওরস্যালাইন পান করুন। আপনা-আপনি ডায়রিয়া ভালো হবে। অযথা অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করবেন না। কলেরা ও টাইফয়েডে আক্রান্ত হলে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করলে তাড়াতাড়ি ভালো হয়। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবন নয়। খাবারের আগে ও শৌচকর্মের পর হাত সাবান দিয়ে ভালো করে পরিষ্কার করুন। এ ছাড়া প্রতি বছর টাইফয়েডের টিকা নিতে পারেন।

শিশুদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়া: ২৪ ঘণ্টায় শিশুর যদি তিন বা ততোধিকবার পাতলা পায়খানা হয়, তবে ডায়রিয়া বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়। ডায়রিয়ার কারণে শিশু পানিস্বল্পতায় ভোগে। রক্তে লবণের ঘাটতি হয়ে শিশু মারাও যেতে পারে।

ডায়রিয়া হলে শুরু থেকেই খাওয়ার স্যালাইন খাওয়াতে হবে।

ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে শুধু বুকের দুধ পান করানো, শিশুর পানীয়জল ও খাবার তৈরিতে সতর্কতা, রোটাভাইরাস-প্রতিরোধী ভ্যাকসিন ব্যবহার শিশুকে ডায়রিয়ায় আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করবে। ডায়রিয়ার সময় জিংক সেবনে ডায়রিয়ার মেয়াদ ও তীব্রতা দুই-ই হ্রাস পাবে।

টাইফয়েড:

বর্ষার অতি পরিচিত অসুখ। মূলত পানিবাহিত রোগ।

কারণ : বর্ষাকালে অপরিচ্ছন্নতা থেকে এই রোগ ছড়ায়। সালমোনেলা টাইফোসা ভাইরাসের প্রকোপ বর্ষা কালে খুব বেড়ে যায়। পানিতে বা অশুদ্ধ খাবারে টাইফয়েডের জীবাণু বেশি পরিমাণে জন্মায়। তা শিশুর পেটে গেলেই টাইফয়েড জাঁকিয়ে বসবে।

লক্ষণ : জ্বর, পেটে ব্যথা এই রোগের প্রধান লক্ষণ। জীবাণুর বাড়বাড়ন্ত হলে মাথাব্যথাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।

সাবধানতা : টাইফয়েডের জীবাণু তাড়ানো খুব কঠিন। দীর্ঘ সময় তাপমাত্রা না নামলে টাইফয়েড থেকে হয়ে যেতে পারে বড়সড় ক্ষতি। অসুখ সেরে গেলেও গলব্লাডারে এই জীবাণু থেকে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। তাই এই রোগ থেকে খুব সাবধান। শিশুকে পরিচ্ছন্ন রাখুন। পরিষ্কার জল আর খাবারও খাওয়ান। কেউ টাইফয়েডে আক্রান্ত হলে, তাকে বাকিদের থেকে দূরে রাখতে হবে। অন্য ঘর হলে সবচেয়ে ভালো হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আক্রান্তর নিয়ম মেনে চিকিৎসা করাতে হবে।

ডেঙ্গু : বৃষ্টির পানি টব, টায়ার, ডাবের খোসা, ছাদ, নিচু স্থানে জমা হয়। পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করে। এদের কামড়ে দেখা দেয় ডেঙ্গু। এটি অন্য সাধারণ ভাইরাস জ্বরের মতোই। হঠাৎ করেই প্রচণ্ড জ্বর (১০৩-১০৪ ডিগ্রি) দেখা দেয়। সাথে থাকে মাথা ব্যথা, শরীর ব্যথা, জয়েন্টে ব্যথা, চোখের নিচে ব্যথা ( চোখ নড়ালে ব্যথা অনুভূত হয়)। জ্বর সাধারণত ২-৭ দিন পর কমে যায়। বেশির ভাগ রোগীর ক্ষেত্রেই আর সমস্যা হয় না। তবে বিপত্তি ঘটে যদি রক্তক্ষরণের ঘটনা ঘটে। রক্তক্ষরণ সাধারণত জ্বর কমে যাওয়ার ২-৩ দিন পর হতে পারে। তাই জ্বর ভালো হওয়ার পর খেয়াল রাখতে হবে ব্রাশ করার সময় দাঁতের গোড়া দিয়ে রক্তপাত হচ্ছে কি না, প্রস্রাব লালচে হচ্ছে কি না, মলের সাথে রক্ত যায় কি না, নাক দিয়ে রক্ত পড়ে কি না বা রক্ত চোখে জমাট বেঁধেছে কি না। আবার অনেক সময় শরীরের অভ্যন্তরে রক্তক্ষরণ হতে পারে যেটা বাইরে থেকে দেখা সম্ভব নয়। রক্তচাপ কমে গেলে, দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্রাব না হলে, পেটে ব্যথা হলে, শরীরের তাপমাত্রা কমে গেলে, অতিরিক্ত পরিমাণে ঘাম হলে, অজ্ঞান হয়ে পড়লে বোঝা যায় শরীরের অভ্যন্তরে রক্তক্ষরণ হতে পারে। এসব উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। জটিলতা দেখা না দিলে এর চিকিৎসা সাধারণ সর্দি-জ্বরের মতোই।

এছাড়াও অতিরিক্ত জ্বর, গায়ে ব্যথা, দুর্বলতা, র‌্যাশ বড় সমস্যা ডেকে আনতে পারে।

ডেঙ্গিজ্বরে প্ল্যাটিলেট কমে গেলেই কি আতঙ্কিত হবেন?

প্ল্যাটিলেট বা অনুচক্রিকার স্বাভাবিক মাত্রা দেড় লাখ থেকে সাড়ে চার লাখ। অনেক জ্বরেই এটা কমে তবে এক লাখের নিচে কমে জটিল সময়ে। ক্ল্যাসিকেল ডেঙ্গিতে কমলেও এক লাখের বেশি থাকে। শুধু জ্বর বা রক্তক্ষরণ থাকলেই সেটি ডেঙ্গি হিমরেজিক ফিভার নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে ডেঙ্গি হিমরেজিক ফিভার হতে হলে প্ল্যাটিলেট কাউন্ট এক লাখের নিচে থাকতে হবে। হিমাটক্রিট ২০ শতাংশের বেশি হতে হবে। এর সঙ্গে রক্তনালি লিকিংয়ের অন্য সমস্যা (যেমন প্রোটিন কমে যাওয়া, পেটে বুকে পানি জমা) থাকবে। বিশ্বে ৪০ কোটি লোকের ডেঙ্গি হয়; ৫ লাখের হিমরেজিক।

প্ল্যাটিলেট পরীক্ষা কেন দরকার : প্ল্যাটিলেট এক লাখের কম হলে সেটি হিমরেজিক। প্রাকটিক্যালি ডেঙ্গি ব্যবস্থাপনায় প্ল্যাটিলেট পরীক্ষার ভূমিকা শুধু ডায়াগনসিসের জন্যই এবং এটুকুই। ৮৯-৯০ শতাংশ ডেঙ্গি রোগীর প্ল্যাটিলেট কমে তবে ১০-২০ শতাংশের ক্রিটিক্যাল লেভেল (২০ শতাংশ)-এর নিচে যায়। ৫ শতাংশ ডেঙ্গি রোগীর মারাত্মক রক্তক্ষরণ (ব্লাড ট্রান্সফিউশন লাগে) জটিলতা হয়। ২০০০০-এর নিচে নামলে রক্তক্ষরণের ভয় থাকে। প্ল্যাটিলেট যদি ৫০০০-এর কম হয় তখন ব্রেন, কিডনি, হার্টের মধ্য রক্তক্ষরণের ভয় থাকে। ডেঙ্গিতে প্ল্যাটিলেট কমার সঙ্গে অন্য অনেক (অন্তত আরও ১১ কারণ) কারণে রক্তক্ষরণ হয়। এককভাবে প্ল্যাটিলেট দিয়ে লাভ হওয়ার কথা নয়।

তথ্য উপাত্ত : ২০ হাজারের নিচে হলেই অনেকে প্ল্যাটিলেট দিতে চায়। বিজ্ঞান সাময়িকী, বই পুস্তক পড়লে দেখা যায়, যারা ২০ হাজারে দিয়েছে আর যারা দেয়নি ওদের মধ্যে end of the crisis, রক্তক্ষরণের মাত্রা/ ধরনের কোনো তারতম্য হয়নি। অসুখের পরিণতিরও আলাদা কিছু ছিল না। কলকাতা স্বাস্থ্য বিভাগের প্রস্তাব হলো- ১০ হাজার পর্যন্ত দরকার নাই; তার নিচে হলে ডাক্তার যা decission দিবে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা হবে। গত কয়েক বছরে কয়েক হাজার রোগী চিকিৎসা নিলেও প্ল্যাটিলেট পাওয়া রোগীর সংখ্যা নগণ্য; ২০০০ সালের পরে প্রায় নাই বললেই চলে।

কত বাড়ে : এক ইউনিট প্ল্যাটিলেট দিলে বাড়ে ২০০০০; তাই প্ল্যাটিলেট দিলে ৫+২০০০০ বা ১০+২০০০০ বা ১৫+২০০০০ হয় যা প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম। সংখ্যা প্রয়োজন মতো বাড়ে না।

আতঙ্ক : ২০ হাজার বা তার নিচে হলে রোগী/ আত্মীয় স্বজনের আতঙ্ক ছাড়া কিছু হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় প্ল্যাটিলেট ৮/১০/১২ হাজার কিন্তু রক্তক্ষরণ নাই। কার্যকরী (active) প্ল্যাটিলেট থাকার কারণে এটি হয়। রক্তক্ষরণ না থাকলে প্ল্যাটিলেট পরীক্ষার দরকার কি? বারবার করায় টেনশন বাড়ে উপকার হয় না। আবার মেশিনে গুনলে ভুল হয় কারণ প্ল্যাটিলেট ক্লাপ্মে থাকায় মেশিন অনেকগুলোকে একসঙ্গে একটা ধরে সংখ্যা নিরূপণ করে।

ব্লাড ফর ব্লাড : রক্তক্ষরণ হলে রক্ত দিতে হবে (ব্লাড ফর ব্লাড); প্ল্যাটিলেট নয়। প্ল্যাটিলেট দেওয়াও ঝামেলা। এক ইউনিটের জন্য চার জনকে ব্লাড দিতে হয়, খরচ ২ হাজার ৬০০ টাকা। একজন থেকেও ইদানীং নেওয়া যায় যেটি ব্যয়বহুল, সর্বত্র নাই।

হিসাবমতে ডেঙ্গির চিকিৎসায় প্ল্যাটিলেটের দরকার নেই। বারবার প্ল্যাটিলেট পরীক্ষা না করলেও চলে।

শিশুদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গুজ্বর:

বর্ষাকাল এডিস মশার বংশবিস্তারের সময়। ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক এ মশা শিশুকে দংশন করলে ডেঙ্গুজ্বরও হতে পারে।

আক্রান্ত শিশু প্রথম কয়েক দিন উচ্চমাত্রার জ্বরে ভোগে। সঙ্গে ত্বকে র্যাশ, মেরুদণ্ডে ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, মাংসপেশিতে ব্যথা, কখনো বা মাড়ি, মলপথে রক্তপাতসহ হোমোরেজিক ডেঙ্গু হতে পারে।

সাধারণ ডেঙ্গুজ্বরে চিকিৎসা হলো প্রচুর পানি ও তরল পান, জ্বর কমাতে প্যারাসিটামল ও বিশ্রাম। রক্তপাত হলে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। এডিস মশা দিনের বেলা কামড়ায়। তাই দিনেও শিশুকে ফুলহাতা জামা ও প্যান্ট পরান, মশারি খাটিয়ে ঘুম পাড়ান। ফুলের টব, ডাবের খোসা, ক্যানের খালি পাত্র, গাড়ির টায়ার, হাঁড়ি-পাতিলে জমা পানি প্রতিদিন পরিষ্কার করুন।

ম্যালেরিয়া:

এটিও মশাবাহিত রোগ। বর্ষাকালের সবচেয়ে কমন অসুখ।

কারণ : বর্ষায় এখানে-সেখানে জমে থাকা জলে মশা সহজে বংশবিস্তার করে। মেয়ে অ্যানোফিলিস মশার কামড়ে এই রোগ ছড়ায়।

লক্ষণ : শুরু হয় হালকা জ্বর দিয়ে। তারপর ক্রমশ উত্তাপ বাড়তে থাকে। ম্যালেরিয়ার প্রধান লক্ষণ নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসা। শরীর প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে এই অসুখের কারণে।

সাবধানতা : ডেঙ্গির মতো এক্ষেত্রেও শিশুকে মশারির মধ্যে রাখার চেষ্টা করুন। বাড়ির চারপাশে জল জমে থাকতে দেবেন না। শিশু ম্যালেরিয়ার আক্রান্ত কি না, তা রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই টের পাওয়া যায়। এই অসুখ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ওষুধের কোর্স করাতেই হবে।

চিকুনগুনিয়া: সংক্রমিত অ্যাডিস অ্যালবোপিকটাস মশার কামড়ে চিকুনগুনিয়া হয়। বর্ষার জমা জলে এই মশা ডিম পাড়ে ও দিনের আলোয় কামড়ায়।

ইনফ্লুয়েঞ্জা:

শিশুদের ক্ষেত্রে এটা খুব সাধারণ একটা সমস্যা। একে সাধারণ জীবাণুঘটিত অসুখই বলা যায়।

কারণ : বাতাসে এ অসুখের জীবাণু প্রচুর পরিমাণে ছড়িয়ে থাকে। বর্ষাকালে তাদের বাড়বাড়ন্ত হয়। শুধু শিশুদের কেন, বড়দেরও নাক বা মুখ দিয়ে এই জীবাণু ঢুকে শরীরে রোগবালাই বাড়িয়ে দিতে পারে।

লক্ষণ : প্রচণ্ড সর্দি, সঙ্গে জ্বর। গলা ভেঙে যায় বহু বাচ্চার ক্ষেত্রেই। শরীরে ব্যথাও হয় এর বাড়াবাড়ি হলে।

সাবধানতা : শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যত বেশি থাকে, শিশুর শরীর এই ভাইরাসের সঙ্গে তত ভালো করে মোকাবিলা করতে পারে। ফলে শিশুকে পুষ্টিকর তো বটেই পাশাপাশি ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার খেতে দিন। চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে ডায়েট-চার্ট বানিয়ে নিতে পারেন। অসুখটা হলে চিকিৎসকই বলে দিতে পারবেন, কী-কী ওষুধ খাওয়াতে হবে।

গ্যাসট্রোএনটেরাইটিস:

বর্ষাকালে জীবাণুঘটিত রোগের অন্যতম। সহজ কথায় যাকে বলে পেটের গোলমাল।

কারণ : বর্ষাকালে শিশুরা অপরিচ্ছন্ন হাতে কোনো খাবার খেলে বা হাত মুখে দিলে এই রোগ ছড়াতে পারে। একসঙ্গে নানাবিধ জীবাণুর আক্রমণে এই অসুখ হয়।

লক্ষণ : পেটের ব্যাপক গণ্ডগোল এর প্রধান লক্ষণ। পাশাপাশি বহু শিশুরই বমি হতে থাকে এই রোগের কারণে। শরীর প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে।

সাবধানতা : শিশুকে সব সময় পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করুন। দেখুন যেন নোংরা হাতে কোনো খাবার না খায়। ফিল্টার করা জল খাওয়ান। একবার এই রোগে আক্রান্ত হলে ওকে মসলাপাতি দেওয়া খাবার বা অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার দেবেন না। চিকিৎসকের থেকে জেনে নিন ওষুধের তালিকা। এমনকি এই রোগের সূত্র ধরে পড়ে কলেরা পর্যন্ত হতে পারে। তাই সে বিষয়েও সাবধান থাকুন।

হেপাটাইটিস এ:

পানিবাহিত রোগ। শিশুদের পাশাপাশি বড়দেরও হতে পারে।

কারণ : অপরিশুদ্ধ পানি থেকে তো বটেই, পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তির মল থেকেও এই রোগের জীবাণু ছড়ায়। মলের ওপর মাছি বা অন্য পতঙ্গ বসার পর সেগুলো যদি কোনো ফল বা খাবারে বসে, তা হলে সেখান থেকে এই জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে।

লক্ষণ : জন্ডিসের মতো চোখ হলুদ হয়ে যায় অনেকের ক্ষেত্রেই। কারণ এই জীবাণু আক্রমণ করে মানুষের লিভারে। খিদে কমে যায়, বমি হতে থাকে এবং পেটের ভয়ঙ্কর গোলমাল হয়।

সাবধানতা : শিশুদের ভ্যাকসিন দেওয়াটা দরকারি। পাশাপাশি খুব পরিশুদ্ধ পানি এবং খাবার দিতে হবে। দরকার হলে ফুটিয়ে পানি খাওয়াতে হবে। বাইরের কাটা ফল বা অন্য খাবার এ মৌসুমে নয়। রোগে আক্রান্ত হলে ততক্ষণাৎ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে।

জন্ডিস: বর্ষায় অপরিশোধিত জল থেকে হেপাটাইটিস ভাইরাসের সংক্রমণ হয়। হেপাটাইটিসের সংক্রমণে রক্তের বিলিরুবিনের মাত্রে বেড়ে গিয়ে জন্ডিস দেখা দেয়। এই সময় বাইরের জল ভুলেও খাবেন না।

লেপ্টোস্পিরোসিস:

একে ওয়েলস সিনড্রম-ও বলে। বর্ষাকালে অপরিশুদ্ধ পানি থেকে এই রোগ ছড়ায়।

কারণ : সংক্রমিত পশুদের প্রস্রাবের মাধ্যেম জল, মাটি থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমণ ছড়ায়। মূলত অপিরশুদ্ধ পানি থেকেই এই রোগ ছড়ায়। তবে শিশুরা মাঠে খেলার সময় কাদা মাখলে, সেই কাদা যদি কোনো কারণে মুখে যায়, তা হলেও এই অসুখ হতে পারে।

লক্ষণ : মোটের উপর ইনফ্লুয়েঞ্জার মতোই লক্ষণ এই রোগের। মাথাব্যথা, জ্বর, সারা গায়ে যন্ত্রণা, প্রদাহ এই রোগের লক্ষণ।

সাবধানতা : মাঠে খেলতে গেলে, ঠিকঠাক জুতো পরে পাঠান। পাশাপাশি আপনার বাড়িতে পোষ্য থাকলে তাকেও পরিচ্ছন্ন রাখুন। কারণ বাইরে থেকে সে ঘুরে এলে, তার সূত্র ধরেও এই জীবাণু আপনার শিশুর কাছে পৌঁছে যেতে পারে। এই রোগে আক্রান্ত হলে চিকিৎসকের সঙ্গে সত্ত্বর যোগাযোগ করুন।

কলেরা: পরিচ্ছন্নতার অভাব ও দুর্বল হাইজিনের কারণে খাবার, জল সংক্রমিত হলে দ্রুত হারে ছড়িয়ে পড়ে কলেরা। কলেরা ভয়াবহ আকার ধারণে করলে তা প্রাণঘাতীও হতে পারে।

ভাইরাল ফিভার: যে কোনও মরসুমেই ভাইরাল ফিভার হতে পারে। তবে বর্ষায় ভাইরাল ফিভারের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি হয়। জ্বর, গায়ে ব্যথা, দুর্বলতার সঙ্গে এই জ্বর ৩-৭ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়।

ইনফেকশন: বর্ষায় রাস্তার খোলা খাবার থেকে গ্যাস্ট্রোএন্টারাইটিস বা পেটের ইনফেকশনের সমস্যা আকছারই হয়ে থাকে।

বর্ষায় বৃষ্টির পানি উপভোগের পাশাপাশি আরও কিছু সাবধানতা অবলম্বন করতে পারেন:

বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে:

জমে থাকা পানিতে মশার বিস্তার বাড়ে, যা থেকে ডেঙ্গু বা অন্যান্য ভাইরাসজনিত জ্বর ছড়ায়। বর্ষায় যেহেতু অনেক বৃষ্টি হয়, তাই বাড়ির চারপাশে পানি জমে থাকার সম্ভাবনাও বাড়ে। আর তাই বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। কোথাও যেন বৃষ্টির পানি জমে না থাকে। এর সঙ্গে এখন করোনার কঠিন পরিস্থিতি পার করছে সবাই। একদমই জ্বর বা ঠান্ডাজনিত কোনো অসুখ বাধানো যাবে না। তাতে করোনার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

সঙ্গে রাখুন ছাতা ও রেইনকোট:

নীল নবঘনে আষাঢ়গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে।

ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।

কবি তাঁর কবিতায় মেঘলা দিনে বাইরে যেতে বারণ করলেন ঠিকই; কিন্তু কাজের ব্যস্ততায় সেই সুযোগ কোথায়। টানা বর্ষায় দৈনন্দিন কাজের ব্যাঘাত ঘটায়। তাই বলে তো সারা দিন বাসায় বসে থাকা যাবে না। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় অবশ্যই সঙ্গে রাখুন ছাতা ও রেইনকোট। বাসার অন্য সদস্যদের জন্যও কিনে রাখুন ছাতা। পুরোনো ছাতা থাকলে পুরোদমে বর্ষা আসার আগেই তা মেরামত করে নিন।

বাদ দিন ভাজাপোড়া:

বৃষ্টির দিনে একটু ভাজাপোড়া খেতে নাকি সবারই ভালো লাগে। তাই বলে প্রতিদিন ইচ্ছামতো ভাজাপোড়া খেতে থাকলে কিন্তু বিপদ। বর্ষা ঋতুতে বদহজমের সমস্যা দেখা দেয়। তাই খাবারের তালিকায় নজর রাখতে হবে। ভাজাপোড়া, অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। যেহেতু করোনা ও সিজনাল অসুখের ঝুঁকি থাকছে, তাই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভিটামিন সি-জাতীয় খাবার বেশি খান। শাকসবজি ভালো করে ধুয়ে রান্না করে খান। সুষম খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন।

পর্যাপ্ত পানি পান করুন:

বর্ষায় একটু শীত শীত অনুভব হওয়াতে অনেকেরই কম পানি পান করা হয়। কম পানি খেলে ডিহাইড্রেশনের সমস্যা দেখা দেয়, তেমনি বেশি খেলেও সমস্যা হয়। তাই সঠিক পরিমাণে পানি পান করুন। পানি শরীরের অনেক ক্ষতিকর উপাদান বের করে দেয়। রাস্তার ধারের ফলের রস, শরবত, লাচ্ছি ইত্যাদি এড়িয়ে চলুন।

গরম পানীয় পানের অভ্যাস করুন:

পানি আমরা সবাই কমবেশি পান করি। এ ক্ষেত্রে গরম পানি পান করার অভ্যাস গড়ে তোলা হলে বেশ ভালো হয়। স্বাস্থ্যকর গরম পানি শরীর উষ্ণ রাখার পাশাপাশি বিভিন্ন জীবাণুর ইনফেকশন থেকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করবে। এ ছাড়া গরম পানি পান করলে হজমক্ষমতার উন্নতি ঘটে। ফলে, শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমার সুযোগই থাকে না। শুধু তা-ই নয়, গরম পানি অ্যাডিপোস টিস্যু বা ফ্যাট ভেঙে ফেলেও ওজন হ্রাসে সাহায্য করে। তবে এই গরম পানি অবশ্য ঈষদুষ্ণ।

নিয়মিত শরীরচর্চা করুন:

বর্ষায় হয়ে ওঠা কবিমনে কিছু আলসেমি চলে আসতে পারে। সব আলসেমি ঝেড়ে ফেলে নিয়মিত শরীরচর্চা করুন। নিয়মিত শরীরচর্চায় রক্তসঞ্চালন ভালো হয় এবং শরীর ফিট থাকে। শরীরে নানা ব্যথা কমাতে যোগব্যায়াম করুন। জিমে যেতে না পারলে বাসায় থেকেই শরীরচর্চা সম্ভব। আজকাল ইউটিউব বা সোশ্যাল সাইটে সঠিক নিয়মে শরীরচর্চার টিউটোরিয়াল খুব সহজেই পাওয়া যায়।

তথ্যসূত্র:

  • ডা: হুমায়ুন কবীর হিমু, নিউরোলজিস্ট, ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টার, উত্তরা, ঢাকা, নয়া দিগন্ত।
  • বারডেম হাসপাতালের মেডিসিন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. খাজা নাজিম উদ্দিন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ সাখাওয়াত আলম, যুগান্তর।
  • ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, এবং সাহিদা আক্তার, প্রথম আলো।
  • আনন্দবাজার।
  •  Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই

Popular Post

Blogger দ্বারা পরিচালিত.