সাইনোসাইটিসে ভুকছেন না তো?
সাইনাস বা সাইনোসাইটিস কি এবং এর কাজ কি?
সাইনুসাইটিস (ইংরেজিঃ Sinusitis, যা Rhinosinusitis নামেও পরিচিত) হচ্ছে সাইনাস মেমব্রেনের (আবরণী) একটি যন্ত্রনাদায়ক প্রদাহ ।
সাধারণত সাইনুসাইটিস সাধারণ সর্দি-কাশির মতো একটি সাধারণ ভাইরাল সংক্রমণ হিসেবে শুরু হয়। এই সংক্রমণ সাধারণত ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে কমে যায়। এই সময়ে অণুনাসিক গঠনগুলি ফুলে যেতে পারে এবং সাইনাসে তরল পদার্থ স্থির হয়ে যেতে পারে যা তীব্র সাইনুসাইটিসের দিকে পরিচালিত করে। এটি সংক্রমণের ষষ্ঠ দিন থেকে ১৫ তম দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। সংক্রমণের ১৫ তম দিন থেকে ৪৫ তম দিন পর্যন্ত সাবঅ্যাকিউট স্টেজ এর পরে ক্রনিক স্টেজে আসে। যখনই একটি দীর্ঘস্থায়ী পর্যায়ের রোগীর অনাক্রম্যতা আঘাত করে তখন সংক্রমণটি "সাইনুসাইটিসের তীব্র" পর্যায়ে চলে যায় এবং অনাক্রম্যতা বেড়ে গেলে দীর্ঘস্থায়ী অবস্থায় ফিরে যায়।
মানুষের নাকের আশপাশের হাঁড়গুলোর ভেতরে কিছু গহ্বর/কুঠুরি রয়েছে, যা বাতাসে পূর্ণ থাকে। এই গহ্বরগুলোই সাইনাস। মূলত শরীরে বাতাস চলাচলে সাহায্য করে থাকে এই অঙ্গটি। একজন মানুষের নাকের আশপাশে সব মিলিয়ে প্রায় আটটি সাইনাস থাকে। ম্যাক্সিলারি সাইনাস, স্পেনয়েড সাইনাস, ইথময়েড সাইনাস, ফ্রন্টাল সাইনাস নামে নাকের দুই পাশে দুটি করে সাইনাস থাকতে পারে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে ম্যাক্সিলারি সাইনাস। যখন কোনো কারণে সাইনাসের কোষগুলোতে কোনো প্রকার প্রদাহ হয়, তখন এটাকে সাইনোসাইটিস বলে। বা কোন কারণে যদি সাইনাসগুলির মধ্যে ঘা বা প্রদাহ হয় তখন তাকে সাইনুসাইটিস বলে। লক্ষণ গুলি মূলত মুখ ও নাকে প্রদাহ, মাথাব্যথা, ঘ্রাণশক্তি লোপ ইত্যাদির মতো হতে পারে। সাইনাস গাত্রে সর্দি, মিউকাস জমে এই প্রদাহের সৃষ্টি করে। সাইনোসাইটিসের সাধারণত সাইনাসের ফাঁপা অংশগুলো তরল (ফ্লুইড) দিয়ে আটকে যায়। সেখানে প্রদাহ হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন জীবাণু বংশবিস্তার করতে পারে।
![]() |
| একটি CT scan যা এথময়েড সাইনুসাইটিস প্রদর্শন করছে। |
সাইনাসগুলোর সঙ্গে মধ্য কর্ণের এবং নাকের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে। এদের মূল কাজ-
- বায়ুকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ করা,
- মাথার হাড়কে হালকা রাখে,
- শরীরে বাতাস চলাচলে সাহায্য করে,
- শব্দ এবং গলার স্বর নিয়ন্ত্রণ করে,
- দেহের ভারসাম্য রক্ষা করে,
- মাথার কংকালের মধ্যে যদি এই বাতাস না থাকতো তাহলে এই মাথা নিয়েই আমাদের চলাচল করা সম্ভব হতো না অর্থাৎ মাথাকে হালকা রাখে এই সাইনাসগুলো।
সাইনাসে প্রদাহ হলে নাক দিয়ে সর্দি পড়তে পারে মাথা ব্যথা করতে পারে। সাইনাসের মধ্যে পুঁজ জমতে পারে, টিউমার হতে পারে ইত্যাদি। সাইনোসাইটিসকে বিভিন্ন কারণে বিজ্ঞজনেরা রাইনো (নাক) সাইনোসাইটিস বলছেন- যদিও একথার মধ্যে মতভেদ আছে।
যদি কারও সাইনোসাইটিস ১২ সপ্তাহের বেশি সময়কাল সমস্যা করে তখন তাকে ক্রনিক (দীর্ঘমেয়াদি) সাইনোসাইটিস বলা হয়। এই সমস্যা আবাল-বৃদ্ধি-বনিতা সবারই হতে পারে। এই সমস্যায় নাক বন্ধ হয়ে যেতে পারে, মাথা ধরা, মাথা ব্যথা করতে পারে। সাধারণত ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়াজনিত কারণে সাইনাসজনিত সমস্যা হয়ে থাকে।
কারণ এবং উপসর্গ : ফাংগাস, অ্যাজমা, এসপিরিন জাতীয় ওষুধ। প্রকৃতি থেকে ডাস্ট অর্থাৎ ধুলাবালি, কলকারখানার ধোঁয়া, সুগন্ধি, ঝাঁঝাল গন্ধ, মরিচের গুঁড়া, ধূমপান, দন্ত রোগসহ আরও অনেক কারণের জন্য রাইনোসাইনোসাইটিস হতে পারে। গ্যাস্ট্র এসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স, পোস্ট নেজাল ড্রিপসিন্ড্রম ইত্যাদি কারণও জড়িত থাকতে পারে। কিছু ভাইরাল ইনফেকশনের জন্য হতে পারে। ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনের জন্য হতে পারে। আবার কিছু মেকানিক্যাল অবসট্রাকশনের জন্য হতে পারে। যেমন : নাকের হাড় বাঁকা, নাকের মাংস বৃদ্ধি পাওয়া। যেকোনো সাইনাসে যদি ড্রেনেজটা ঠিকমতো না হয়, তখন এই রোগটি হতে পারে।
সাইনাস সমূহের প্রদাহের মধ্যে ম্যাগজিলারি সাইনাসের প্রদাহ সবচেয়ে বেশি হয়। একিউট সাইনুসাইটিস এবং শ্বাসনালীর উপরের অংশের ইনফেকশন থেকে, অ্যালার্জি, অপুষ্টি, স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ হতে, দীর্ঘদিন ধরে দাঁতের রোগ থেকে হতে পারে। অপর্যাপ্ত পরিমাণে ফুসফুসের রক্তে অক্সিজেনের সাথে কার্বনডাই অক্সাইডের প্রবেশ। শ্বাসনালীর ছিদ্র চিকন হওয়া। বেশিরভাগ সাইনাসের প্রদাহ নাকের ইনফেকশন থেকে হয়ে থাকে।
আরো কিছু কারণ এবং উপসর্গ নীচ উল্লেখ করা হলো...
- সাইনোসাইটিস বিভিন্ন কারণে হতে পারে। এর একটি অ্যালার্জিক রাইনাইটিস। সাধারণত নাকের মিউকাস মেমব্রেনের প্রদাহ ও ফুলে যাওয়াকেই রাইনাইটিস বলা হয়। এতে নাক ভারী হয়ে যায়, নাকের ভেতরের শিরা (ভেইন), মিউকাস মেমব্রেন ফুলে গিয়ে নাকের ভেতরে ব্লক তৈরি করে। চুলকানো, চোখ চুলকানো চোখ দিয়ে পানি পড়া।
- ঠান্ডাজনিত সাইনোসাইটিস হতে পারে। নাক বন্ধ থাকা, নাক দিয়ে সর্দি ঝরা, নাকের মধ্যে শুলশুল করা।
- কারও নাকে যদি মাংস বেড়ে যায়, পলিপ থাকে কিংবা নাকের হাড় বাঁকা থাকে, তাদের সাইনাসের সমস্যা হতে পারে।
- ডিএনএস বা ডিভিয়েটেড ন্যাসাল সেপটামের কারণেও সাইনোসাইটিস হতে পারে।
- টনসিলাইটিস ও এডিনয়েডে সংক্রমণও একটি কারণ।
- মাথা ধরা, ব্যথা করা, নাকের গন্ধ-বাসনার অনুভূতি লোপ পেতে পারে। গলার প্রদাহ, শ্বাস-প্রশ্বাসে দুর্গন্ধ হতে পারে। অ্যাজমার রোগীদের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। চোখ ঝাপসা হয়ে যাওয়া, খাদ্যের স্বাদ পাওয়া যায় না, সর্বোপরি জ্বরও হতে পারে।
- আহারে অরুচি আসতে পারে, দাঁত ব্যথা করতে পারে। নাক-কান-গলা এদের মধ্যে একটির সঙ্গে অন্যটির সংযোগ রয়েছে। স্বাভাবিকভাবে যা বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।
আরো কিছু স্পেসিফিক লক্ষণ গুলি..
মাথার সামনের অংশে ব্যথা। মুখে ব্যথা, মাথা ভার ভার অনুভব হওয়া। নাক ভার হয়ে থাকা, কিংবা নাক দিয়ে পানি পড়া, অথবা নাক বন্ধ মনে হওয়া। সর্দি, জ্বর, কাশি হওয়া। গাঢ়, হলদে রঙের ন্যাসাল ডিসচার্জ। ঘ্রাণশক্তি কমে যাওয়া। নিশ্বাসের সময় ব্যতিক্রমী ঘ্রাণ পাওয়া। সাইনাসগুলোর ঠিক ওপরেও চাপ চাপ ব্যথা থাকে। খাবারের স্বাদ বা রুচি নষ্ট হয়ে যায়। অনেক সময় এর সঙ্গে জ্বর, গা মেজমেজ করা। মানসিক অবসাদ।
সর্দিজনিত প্রদাহ বা অ্যালার্জিজনিত সমস্যার সঙ্গে সাইনাসের সম্পর্ক হলো সর্দিজনিত বা অ্যালার্জিক রাইনাইটিসের কিছু লক্ষণ থাকে। যেমন : ঘন ঘন হাঁচি দিবে, নাক দিয়ে পানি আসবে।
এ ছাড়া দেখা যাচ্ছে, কপালে ব্যথা হয় বা কাজে অমনোযোগী হয়ে পড়ে, খিটখিটে স্বভাব হয়ে দাঁড়ায়। কর্মক্ষেত্রে অমনোযোগী, কর্মক্ষেত্রে অনেক সময় তার নষ্ট হয়ে যায়।
তীব্র সাইনুসাইটিসের সাথে যুক্ত অন্যান্য লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে কাশি, ক্লান্তি, হাইপোসমিয়া, অ্যানোসমিয়া এবং কানের পূর্ণতা বা চাপ।
সাইনাস ইনফেকশনের কারণে নাকের পথ আটকে যাওয়ার কারণে মধ্য-কানের সমস্যাও হতে পারে। এটি মাথা ঘোরা, "একটি চাপযুক্ত বা ভারী মাথা" বা মাথার মধ্যে কম্পিত সংবেদন দ্বারা প্রদর্শিত হতে পারে। পোস্টনাসাল ড্রিপও দীর্ঘস্থায়ী রাইনোসাইনুসাইটিসের একটি উপসর্গ।
দীর্ঘস্থায়ী সাইনোসাইটিসের লক্ষণগুলির মধ্যে নাক বন্ধ হওয়া, মুখের ব্যথা, মাথাব্যথা, রাতের বেলা কাশি, পূর্বের ছোটখাটো বা নিয়ন্ত্রিত হাঁপানির উপসর্গের বৃদ্ধি, সাধারণ অস্বস্তি, ঘন সবুজ বা হলুদ স্রাব, মুখের পূর্ণতা বা আঁটসাঁট ভাব যা বাঁকানোর সময় আরও খারাপ হতে পারে। মাথা ঘোরা, ব্যথা দাঁত, এবং দুর্গন্ধ। প্রায়শই, দীর্ঘস্থায়ী সাইনোসাইটিস অ্যানোসমিয়া হতে পারে, ঘ্রাণশক্তি হারাতে পারে।
কয়েক ধরনের সাইনোসাইটিসের অবস্থান:
অ্যাকিউট সাইনোসাইটিস: এর উপসর্গগুলো সাধারণত ২-৪ সপ্তাহ থাকে।
সাবএকিউট সাইনোসাইটিস: এ ক্ষেত্রে উপসর্গগুলো ৪-১২ সপ্তাহ থাকে।
ক্রনিক সাইনোসাইটিস: উপসর্গ ১২ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে থাকলে একে ক্রনিক সাইনোসাইটিস বলে।
চার জোড়া প্যারানাসাল সাইনাস হল ফ্রন্টাল, এথমোয়েডাল, ম্যাক্সিলারি এবং স্ফেনয়েডাল সাইনাস। এথময়েডাল সাইনাসগুলিকে সামনের এবং পশ্চাৎভাগের ইথময়েড সাইনাসে বিভক্ত করা হয়, যার বিভাজনটিকে মধ্য অনুনাসিক শঙ্খের বেসাল ল্যামেলা হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। রোগের তীব্রতা ছাড়াও, নীচে আলোচনা করা হয়েছে, সাইনোসাইটিসকে সাইনাস গহ্বর দ্বারা শ্রেণীবদ্ধ করা যেতে পারে যা এটি প্রভাবিত করে:
ম্যাক্সিলারি - ম্যাক্সিলারি (গাল) এলাকায় ব্যথা বা চাপ সৃষ্টি করতে পারে যেমন, দাঁত ব্যথা বা মাথাব্যথা
ফ্রন্টাল - সামনের সাইনাস গহ্বরে ব্যথা বা চাপ সৃষ্টি করতে পারে (চোখের উপরে অবস্থিত), মাথাব্যথা, বিশেষ করে কপালে
এথময়েডাল - চোখের মাঝখানে/পেছনে, নাকের উপরের অংশের পাশ (মেডিয়াল ক্যান্থি) এবং মাথাব্যথা; এর মধ্যে ব্যথা বা চাপের ব্যথা হতে পারে
স্ফেনয়েডাল - চোখের পিছনে ব্যথা বা চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তবে প্রায়শই মাথার উপরে, মাস্টয়েড প্রক্রিয়ার উপরে বা মাথার পিছনে অনুভূত হয়।
কাদের হয় : সাইনোসাইটিস কাদের হয়, সেটি নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। যেকোনো বয়সের মানুষেরই সাইনাসের সমস্যা হতে পারে। তবে যাঁদের সাধারণ ঠান্ডাজনিত সমস্যা আছে বা সাইনাসে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন, তাঁদের ঝুঁকি বেশি থাকে। তবে তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের বেশি হয়।
সাইনুসাইটিস সাধারণত এমন ব্যক্তিদের মধ্যে দেখা যায় যাদের অন্তর্নিহিত অবস্থা যেমন অ্যালার্জি, বা নাকের গঠনগত সমস্যা এবং জন্মগতভাবে ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কম অনাক্রম্যতা রয়েছে । বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একটি ভাইরাল সংক্রমণের কারণে হয়। হাঁপানি, সিস্টিক ফাইব্রোসিস, এবং দুর্বল ইমিউন ফাংশনযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে পুনরাবৃত্তি পর্বের সম্ভাবনা বেশি।
প্রতিরোধ:
প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম—কথাটি সাইনোসাইটিসের ক্ষেত্রে অনেকটাই প্রযোজ্য। প্রতিরোধের জন্য যা করতে হবে—
- যারা দীর্ঘমেয়াদী রাইনোসাইনোসাইটিসে আক্রান্ত তাদের জীবন যাত্রার মানে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। যেমন-ঠান্ডা খাওয়া, ঠান্ডা লাগানো নিষেধ। রাস্তাঘাটে চলাফেরার সময় এমনকি কর্ম ক্ষেত্রে যদি ধুলাবালির প্রকোপ থাকে, সে ক্ষেত্রে সাধারণ মাস্ক নয়, সার্জিক্যাল মাস্ক ব্যবহার করবেন। বাড়িতে লোমশ গৃহপালিত জীব-জন্তু পোষা যাবে না। যথা- গরু, ছাগল, ভেড়া, কুকুর, বিড়াল, খরগোশ, হরিণ, মহিষ ইত্যাদি। সর্বক্ষেত্রে সূতির কাপড় ব্যবহার করতে হবে। কার্পেট ব্যবহার করা যাবে না। কেরোসিন বা লাকড়ির চুলা ব্যবহার করা যাবে না।
- স্বাস্থ্য ভাল রাখার জন্য সঠিক পরিমাণে সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ করা। বিশুদ্ধ বায়ু সেবন এবং বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। ধুমপান করা যাবে না।। এমনকি উক্ত বাড়িতে ধুমপায়ী বাস করলেও পরোক্ষভাবে রোগীর সমস্যা থাকবে। সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। প্রতিদিন নিয়মিত ও প্রয়োজনমতো ব্যায়াম, খেলাধুলা, কায়িক পরিশ্রম করা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী।
- যে কোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতিরেকে ওষুধ সেবন করা উচিত নয়। স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। অসুস্থ হলে সুখ চলে যায়। সুখ না থাকলে মন মর্জিও ভালো থাকে না। যে কোন অসুস্থতাই মনে করে দেয় সুস্থ থাকা কতটা জরুরি। তারপরও যদি সাইনোসাইটিস থেকে মুক্তি না মেলে তখন অপারেশন পর্যন্ত করার প্রয়োজন হয়।
- ধুলো–বালি থেকে দূরে থাকুন। ঘন ঘন যেন ঠান্ডা না লেগে যায়, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
- পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন এবং প্রচুর ভিটামিনযুক্ত খাবার খান। প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি যুক্ত খাবার খান।
- সরাসরি ফ্যানের নিচে বা এসি বরাবর থাকবেন না। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর সময় সতর্ক থাকুন।
- গরম ভাপ বা মেন্থলের ভাপ নিতে পারেন। এর মাধ্যমে দ্রুত শ্লেষ্মা বের হয়ে সাইনাসের সমস্যায় দ্রুত উপশম দেয়।
- ধূমপান থেকে দূরে থাকুন।
- ঠান্ডা খাওয়া যাবে না।
- অ্যারোসোল, মশার কয়েলের ধোঁয়া, এয়ারফ্রেশনারসহ যেকোনো ধরনের ধোঁয়া ও স্প্রে থেকে দূরে থাকুন।
- যাঁদের সাইনাসের সমস্যা আছে, তাঁরা বাইরে বের হলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করুন।
- কিছু ক্ষেত্রে হাত ধোয়া, ধূমপান এড়ানো এবং টিকাদানের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা যেতে পারে।
সাইনাসের সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খেয়ে রোগটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
অনেক সময় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
প্রাথমিক চিকিৎসা কিংবা ওষুধের মাধ্যমে প্রতিকার না পেলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে পরবর্তী পদক্ষেপ নিন।
কিছু খাবার এড়িয়ে চলবেন:
সাইনাসের সমস্যা হলে মাথা ব্যথা, নাক বন্ধ থাকা, নাক দিয়ে সর্দি পড়াসহ নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়। সাধারণত ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়াজনিত কারণে সাইনাসজনিত সমস্যা হয়ে থাকে।
সাইনোসাইটিসে আক্রান্ত হলে কিছু নিয়মকানুন মেনে চলা জরুরি। সেই সঙ্গে খাবারের ব্যাপারেও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। সাইনোসাইটিস হলে কিছু খাবার এড়াতে পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। যেমন-
১. যাদের সাইনোসাইটিসের সমস্যা বেশি থাকে তাদের বিভিন্ন ধরণের দুগ্ধজাতীয় খাবার যেমন-দুধ, পনির, মাখন, আইসক্রীম, দই ইত্যাদি এড়িয়ে চলা উচিত।
২. লাল মাংস খেলে প্রদাহ বাড়ে। এ কারণে সাইনাস থাকলে লাল মাংস এড়িয়ে চলা উচিত। এছাড়া বিভিন্ন ধরণের প্রক্রিয়াজাত মাংসও সাইনাসের জন্য ক্ষতিকর।
৩. বেশি মসলাদার খাবারে অ্যাসিটিডি বাড়ে। তখন সাইনাসের সমস্যাও বাড়ে।
৪. ক্যাফেইনজাতীয় জাতীয় খাবার খেলেও অ্যাসিটিডি বাড়ে। এতে সাইনাসের সমস্যা দেখা দেয়।
চিকিৎসা : এক কোর্স এন্টিবায়োটিক, এন্টিহিস্টামিন প্রয়োজনে মন্টিলুকাস্ট, কিটোটিফেন, অক্সি বা জাইল মেটাজলিন নাকের ড্রপ ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। ক্ষেত্র বিশেষে বিশেষ করে যাদের নাক বন্ধ থাকে- তাদের ক্ষেত্রে কর্টিকোস্টেরয়েড নাকের স্প্রে পর্যন্ত দিতে হয়। যেহেতু অ্যালার্জির জন্য একাধিক ফ্যাক্টর থাকে কাজেই ওষুধও একাধিক ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। ২ সপ্তাহের বেশি এন্টিহিস্টামিন ব্যবহারেও যদি ভালো ফল না পাওয়া যায় সে ক্ষেত্রে ওষুধের গ্রুপ বদল করতে হয়। মেনথল ভ্যাপার সকাল-বিকাল ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে। তারপরও যদি কাক্সিক্ষত ফল না পাওয়া যায়, নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞগণ অ্যান্ট্রাল ওয়াশ পর্যন্ত করেন। সেটিও একাধিকবার প্রয়োজন হতে পারে।
অ্যালার্জিজনিত সমস্যায় রোগীরা মেডিসিন, নাক-কান, গলা এবং বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞগনের চিকিৎসা নেন। তবে সবার আগে একজন রেজিস্ট্রার ফিজিশিয়ানের নিকট যাবেন। তিনি রক্তের রুটিন পরীক্ষা, অ্যালার্জির পরীক্ষা, বুকের এক্স-রে, এবং সাইনাসের এক্স-রে করে রোগী কোন ধরণের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নিকট গেলে উপকৃত হবেন-তিনি তার নিকট পাঠাবেন।
টেলিস্কোপ ছাড়া সাইনাসের অভ্যন্তরে অবলোকন করা বা কোনো রকম অপারেশন করা সম্ভব নয়। সাইনাস নাকের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। এন্ডোস্কোপিক সাইনাস সার্জারির মাধ্যমে ৯০% এরও বেশি সাইনাসজনিত সমস্যা নিরাময় করা সম্ভব। উন্নত বিশ্বে ক্রনিক সাইনোসাইটিস ও নাকের পলিপের একমাত্র চিকিৎসা এন্ডোস্কোপিক সার্জারি করা। বাংলাদেশে এ চিকিৎসা শুরু হয়েছে- তবে সার্জনদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা প্রয়োজন।
নাকের এক্স-রে করলে প্যারান্যাজাল সাইনাসের সমস্যা, নাকের হাড় বাঁকা বোঝা যায়।
রক্তের রুটিন পরীক্ষা, অ্যালার্জির পরীক্ষা করা ইত্যাদি করে রোগ নির্ণয় করা যায়। বুকের এক্স-রে সব ধরনের রোগীদের জন্য বাধ্যতামূলক। প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা, এছাড়া বয়স ৪০ পার হলে রক্তের সুগার এবং ইসিজি করা হয়।
একজন চিকিৎসক সাধারণত এই পরীক্ষাগুলো করে বুঝতে পারেন-ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ফাংগাসজনিত কারণে নাকি অন্য কোন অ্যালার্জিজনিত কারণে সাইনোরাইনাইটিস হয়েছে।
যার অ্যালার্জিজনিত কারণে রাইনাইটিস হয়-তার যে কেবল মাত্র একটি অ্যালার্জেনের জন্য সমস্যা হবে তা নয়। একই ব্যক্তির একাধিক অ্যালার্জেন-অ্যালার্জিক রাইনাইটিস করে যাকে বলা হয় মিশ্র প্রকৃতির অ্যালার্জিক রাইনাইটিস।
এ যাবৎ কাল ৫৬টি অ্যালার্জেন শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে যার মধ্যে ২৫ প্রকার খাদ্য রয়েছে।
তথ্যসূত্র:
- ডা. রফিক আহমেদ, সহকারী অধ্যাপক, বক্ষব্যাধি মেডিসিন বিভাগ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, যুগান্তর।
- ডা. এম আর ইসলামনাক কান গলা ও হেড-নেক সার্জন এবং কনসালট্যান্ট, ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল, ঢাক, প্রথম আলো।
- ডা. মো. কামাল মাসুদ, বর্তমানে তিনি শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজের ইএনটি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত, এনটিভি।
- হেলদিবিল্ডার্জড> সময় টিভি।
- উইকিপিডিয়া।
- Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই