শিশুর নাক ডাকা এবং নাক দিয়ে হঠাৎ রক্ত পড়লে
শিশুদের ক্ষেত্রে যেকোনো রোগেরই মাত্রা সাধারণত একটু বেশিই হয়। আর তাই নাক দিয়ে রক্ত পড়লে অনেকেই ভয় পেয়ে যান। যদিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই রক্তপাত তেমন কোনো জটিলতা তৈরি করে না। তবে এই রক্তপাত খুব কম সময়ের মধ্যে ভালো হয়ে গেলেও এর সঠিক কারণ খুঁজে দেখা ভীষণ জরুরি। তাই এমন ঘটনা ঘটলে শিশুকে অবশ্যই শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখানো উচিত।
কেন হয়?নাকের ঝিল্লি আবরণী খুবই পাতলা। এখানে রক্তনালীর সংখ্যাও বেশি থাকে এবং এগুলো অগভীর। তাই সামান্য আঘাতেই রক্ত পড়তে পারে।
কারণসমূহ:
* ব্লাড সারকুলেশন বা রক্ত চলাচলের সমস্যা থেকে এটি হতে পারে
* অক্সিজেন ঘাটতির কারণেও হতে পারে
* এলার্জি বা ঠান্ডা থেকেও হতে পারে
* শুষ্ক আবহাওয়া বা দীর্ঘ সময় রোদে থাকা
* নাকের ভেতর আঘাত পাওয়া
* নাকের ইনফেকশন
* নাকের টিউমার
* উচ্চ রক্তচাপ
* বংশগত
* ওষুধ
সঙ্গে সঙ্গে কি করবেন:
* রক্ত যতক্ষণ পড়তে থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত শান্ত থাকুন এবং শিশুকেও শান্ত রাখুন কোনোভাবেই জোর করে বন্ধ করতে যাবেন না। এবং কোনভাবেই নাক চেপে ধরা যাবেনা।
* তুলা বা টিস্যু পেপার সাবধানে ব্যবহার করবেন। শিশুর নাক দিয়ে রক্ত পড়তে দেখলে অনেকেই তাড়াহুড়া করে তোলা বা টিস্যু পেপার দিয়ে নাকে চেপে ধরেন, এতে অসুবিধা নেই তবে কিছুক্ষণ পর পর তুলা বা টিস্যু পরিবর্তন করে দিতে হবে।
* মাথা সোজা করে ধরুন এবং একটি ভেজা পাতলা কাপড় নাকের উপরে দিয়ে ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা করুন।
* একটি ভেজা কাপড় শিশুর ঘাড়ের উপরে রেখে দিন এতে আরাম পাবে শিশু।
* শিশুর নাক দিয়ে রক্ত পড়লেই এর পিছনে যে সব সময়ই বড় কারণ থাকে তা নয়। তবে সতর্ক থাকা ভালো। তবে রক্ত পড়া শুরু হওয়া থেকে যদি ২০ মিনিট পরেও বন্ধ না হয় তবে ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত।
* শিশুকে সামনের দিকে ঝুঁকোতে হবে (তর্জুনি ও বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে শক্তভাবে চেপে রাখতে হবে ১০ মিনিট)।
* পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে
* নাকের পাশে বরফ দেয়া যায়
* ভয় পেলে বা বেশি রক্ত গেলে হাসপাতালে যেতে হবে
* রক্ত বন্ধ হলেও শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখাতে হবে
* প্রয়োজনে নাকের ভেতর প্যাক দিতে হতে পারে।
* সামান্য সার্জারি লাগতে পারে।
সাবধানতা:
রক্ত পড়া বন্ধ করতে অনেকেই শিশুদের মাথা পেছনের দিকে হেলিয়ে দেন। এটা কিন্তু করা যাবে না। কারণ রক্ত গলার ভিতর দিয়ে পেটের মধ্যে চলে যেতে পারে এবং তা থেকে পরে আবার বমি হতে পারে।
নাক দিয়ে রক্ত পড়ার সময় শিশুকে চিত করে সোয়ানো যাবে না কারণ এতে রক্ত শ্বাসযন্ত্রের মধ্যে প্রবেশ করে পরবর্তীতে শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা হতে পারে বিষয়টি তখন জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
রক্ত পড়া অবস্থায় শোয়ানো যাবে না। রক্তপাতের পর কয়েক ঘণ্টা নাক পরিষ্কার করা যাবে না। শিশুদের নখ ছোট রাখতে হবে এবং নাকে হাত দেয়ার অভ্যাস ত্যাগ করাতে হবে। শুষ্ক মৌসুমে নাকের সামনের দিকে পেট্রোলিয়াম জেলি দেয়া যেতে পারে।
মাস্ক ব্যবহার করতে হবে ধুলাবালিতে গেলে। সঠিক কারণ খুঁজে ডাক্তারের পরামর্শমত চিকিৎসা নিতে হবে। এ অবস্থায় আতঙ্কিত হওয়া যাবে না।
শিশুর নাক ডাকা নিয়ে চিন্তিত?
শিশুদেরও নাক ডাকে। যখন ঘুমের মধ্যে কারও নাক ও মুখ দিয়ে বাতাস স্বতঃস্ফূর্তভাবে চলাচল করতে পারে না, তখন জিভ, গলা গহ্বরের ওপরিভাগ বা প্যালেট এমনকি টনসিল, এডিনয়েড গ্রন্থিতে বায়ু ধাক্কা বা ঘুরপাক খেয়ে শব্দ উৎপন্ন হয়।
ফলে ঘুমের মধ্যে নাক দিয়ে বিচিত্র আওয়াজ বেরোয়।
নাক ডাকার কারণ:
- শিশুদের ক্ষেত্রে নাক ডাকার অন্যতম কারণ নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া বা নাক জ্যাম হয়ে যাওয়া। ঠান্ডা লাগলে বা অ্যালার্জিতে এই ঘটনা ঘটে।
- সাইনাস সমস্যায় বা প্রদাহে ঝুমঝুমি বাজার মতো শব্দ উৎপাদন করে।
- নাসিকাপর্দা বাঁকা থাকলে বা দুই নাকের মধ্যবর্তী দেয়াল বেশি বেঁকে থাকলেও নাকে শব্দ হয়। জন্মগতভাবেই এমন থাকতে পারে।
- টনসিল ও নাকের পেছনে গলার ওপর দিকে এডিনয়েড গ্রন্থি নানা প্রদাহ বা সংক্রমণে বড় হয়ে গেলে শ্বাসকষ্ট বা নাকে শব্দ হয়।
- অতিরিক্ত ওজনের কারণে গলায় বায়ু চলাচলের পথ সংকীর্ণ হয়ে আসে। স্থূল শিশুদের নাক ডাকে।
- শিশুদেরও স্লিপ অ্যাপনিয়া হয়। এতে শিশুর রাতের বেলা স্বল্পকালীন শ্বাসরোধ হয় ও আবার ঠিক হয়। ফলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, দিনের বেলায় স্কুলে মনঃসংযোগ দিতে পারে না। খিটখিটে মেজাজের হয়ে যায়। তীব্র মাথা ব্যথায় ভোগে।
সমস্যার সমাধান:
- বিছানার মাথার দিক কয়েক ইঞ্চি উঁচুতে রাখা উচিত।
- চিত না হয়ে বরং এক কাত হয়ে শোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
- ঘুমানোর আগে বেশি ভরপেট না-খাওয়া ভালো। শিশুর খাবার ঘুমের অন্তত এক ঘণ্টা আগেই শেষ করুন।
- অ্যালার্জি বা ঠান্ডা লাগা থেকে প্রতিরোধ করুন। লবণপানির দ্রবণ দিয়ে নাক পরিষ্কার করে দিন।
- স্থূলকায় হলে ওজন কমানোর জন্য সচেষ্ট হোন।
- নাক বাঁকা, এডিনয়েড, টনসিল বা স্লিপ অ্যাপনিয়ার সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা করুন। কেননা এগুলো কেবল নাক ডাকা সমস্যা নয়, বরং শিশুর বিকাশকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
তথ্যসূত্র:
- ডা. সৈয়দা নাফিসা ইসলাম, কনসালট্যান্ট, শিশু বিভাগ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। চেম্বার: (১) ডা. নাফিসা’স চাইল্ড কেয়ার শাহ মখদুম, রাজশাহী। (২) আমানা হাসপাতাল, ঝাউতলী মোড়, লক্ষ্মীপুর, রাজশাহী, মানবজমিন।
- নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ বা ইএনটি স্পেশালিস্ট, ডাক্তার পেটার রেনার, জার্মানি, ডয়চে ভেলে।
- ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী, শিশুরোগ বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, প্রথম আলো।
- Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই