First Aid Present

Lifestyle Modification এবং প্রাকৃতিক খাদ্য, পানীয়, শাকসবজি, গাছ, ডালপালা, ফল, মসলা, পাতা ও ফুল ইত্যাদির দ্বারা প্রাথমিক চিকিৎসা।

চোখ দেখেই বুঝে নিতে পারেন আপনার কী রোগ হয়েছে

চোখ আমাদের দেহের প্রধান ইন্দ্রিয়গুলির মধ্যে একটি। দৃষ্টিশক্তির পাশাপাশি মস্তিষ্কের কার্যকারিতাতেও বিশেষ প্রভাব ফেলে চোখ। ফলে এই ইন্দ্রিয়টি কোনও ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে আপনার সারা শরীরেই দেখা দিতে পারে একাধিক সমস্যা। এখন অতিমারি-পরবর্তী সময়ে ঘরে বসে কাজকর্ম করতে করতে চোখের উপরেই চাপ পড়ছে বেশি। ফলে ছোটখাটো অস্বস্তি আমরা এড়িয়েই যাই বেশির ভাগ সময়ে। অথচ চোখ সংক্রান্ত কিছু অসুবিধা থেকে হতে পারে গুরুতর কোনও রোগও। নিয়মিত তাই চক্ষু-বিশারদের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
চোখের তারা বা মণি আলোক সংবেদনশীল। আলো কম বা বেশি হলে এটি ছোট বা বড় হয়।।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, স্যানডিয়াগোর বিজ্ঞানীরা একটি স্মার্টফোন অ্যাপ তৈরি করেছেন যেটি ব্যবহার করে আলঝাইমার্স এবং অন্যান্য স্নায়ু রোগের লক্ষণ শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

এই অ্যাপটি মোবাইল ফোনের ইনফ্রারেড ক্যামেরা ব্যবহার করে মানুষের চোখের তারার আকৃতিতে সামান্যতম পরিবর্তন হলে তা ধরতে পারে, এবং সেই ডেটা ব্যবহার করে মানুষের বুদ্ধিগত ক্ষমতার অবস্থা পর্যালোচনা করতে পারে।

প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে মানুষের চোখের মধ্য দিয়ে এখন নানা ধরনের অসুখ-বিসুখের লক্ষণ শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।

চোখ যেহেতু স্বচ্ছ, তাই শরীরের অন্যান্য অঙ্গের তুলনায় এর ওপর পরীক্ষা চালানো অনেক সহজ।

কিন্তু কোন যন্ত্রপাতি ছাড়াই শুধু চোখের দিকে তাকিয়ে এখন বেশ কিছু রোগের লক্ষণ শনাক্ত করা যায়।

আপনার নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে এরকম কিছু লক্ষণ আপনি খুঁজে দেখতে পারেন।

চোখের তারার মাপ:

চোখের ওপর আলো পড়লে চোখের তারায় তার প্রতিক্রিয়া হয় দ্রুত। যেখানে আলো উজ্জ্বল সেখানে চোখের তারা ছোট হয়ে যায়। আর যেখানে আলো থাকে কম সেখানে চোখের তারা বড় হয়ে যায়।

চোখের তারা যে গতিতে ছোট-বড় হয়, সেই গতি কমে গেলে তার মাধ্যমেও নানা ধরনের অসুখ-বিসুখের লক্ষণ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। যেমন, আলঝাইমার্স রোগ কিংবা কেউ কোন ওষুধ অথবা মাদকদ্রব্য সেবন করছেন কিনা তাও বোঝা যায় এই তারা কত দ্রুত ছোট-বড় হয় তার ওপর।

কারও চোখের তারা বড় দেখা গেলে বোঝা যায় সেই ব্যক্তি কোকেন বা অ্যামফিটামিন জাতীয় মাদক ব্যবহার করেছে। যারা হেরোইনের মত মাদক সেবন করেন তাদের চোখের মণি ছোট দেখা যায়।

লাল কিংবা হলুদ চোখ:

চোখের যে অংশটি সাদা তাকে বলে শ্বেত মণ্ডল বা স্ক্লেরা (sclera)। এর রঙে কোন পরিবর্তন হলেও বোঝা যায় দেহে কোন সমস্যা তৈরি হয়েছে।

চোখের সাদা অংশ হলুদ হলে জন্ডিসসহ লিভারের সমস্যার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
টকটকে লাল চোখ অতিরিক্ত মদ্যপান কিংবা মাদক সেবনের লক্ষণ।

তবে কোন ধরনের রোগ জীবাণুর সংক্রমণ কিংবা প্রদাহ হলেও চোখ লাল হতে পারে। এই সমস্যা কিছু দিনের মধ্যে চলে যায়।

যদি চোখের রঙ বেশি দিন লাল থাকে তাহলে বুঝতে হবে সংক্রমণ অথবা প্রদাহ মারাত্মক।

আপনি যদি কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার করেন তাহলে তার কারণেও চোখে এই প্রতিক্রিয়া হচ্ছে বলে ধরে নেয়া যায়।

কখনও কখনও গ্লুকোমা নামে এক ধরনের চক্ষু রোগের জন্য চোখ লাল হয়ে থাকে।

এই পরিস্থিতিতে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। তা না হলে রোগীর অন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

শ্বেত মণ্ডল যখন হলুদ দেখা যাবে তখন বুঝতে হবে রোগী জন্ডিস হয়েছে। আপনার লিভার ঠিকভাবে কাজ না করলেও চোখ হলুদ দেখা যাবে।

জন্ডিস নানা কারণে হয়ে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে লিভারের প্রদাহ, বা হেপাটাইটিস। তবে জেনেটিক কিংবা অটো-ইমিউন রোগ, ভাইরাস কিংবা টিউমারের জন্যও চোখ হলুদ হতে পারে। কোন কোন ওষুধ সেবনের জন্য চোখ হলুদ দেখা যেতে পারে।

চোখের ভেতরে কোন ছোট রক্তনালী ফেটে গেলে ছোট আকারে রক্ত শ্বেত মণ্ডলীতে ছড়িয়ে পড়ে।
রক্তের ছাপ:

চোখের শ্বেত মণ্ডলীতে রক্তের দাগ, যাকে বলে সাবকনজাংকটিভাল হেমারেজ, দেখলে যে কারও ভয় লাগার কথা। চোখের ভেতরে কোন ছোট রক্তনালী ফেটে ছোট আকারে রক্ত শ্বেত মণ্ডলীতে ছড়িয়ে পড়ে।

বেশিরভাগ সময়ে বোঝা যায় না যে কেন এরকম ঘটনা ঘটে। এবং কিছু দিনের মধ্যে এটা সেরে যায়। তবে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস কিংবা যাদের রক্ত সহজে জমাট বাঁধে না তাদের চোখেও এরকম রক্তের ছাপ দেখা যেতে পারে।

অ্যাসপিরিনের মতো যেসব ওষুধ দিয়ে রক্ত পাতলা করা হয় তার জন্যও এটা ঘটতে পারে। যদি ঘন ঘন এরকম ঘটতে থাকে তাহলে আপনার উচিত হবে ডাক্তারের সাথে কথা বলে ঐ ওষুধের সঠিক ডোজ ঠিক করা।

কর্নিয়া ঘিরে রিঙ:

কর্নিয়া হচ্ছে স্ক্লেরা অর্থাৎ আপনার চোখের সাদা অংশের সামনে স্বচ্ছ পর্দা। একে ঘিরে কোন সাদা বা ধুসর রিঙ দেখা গেলে বুঝতে হবে রোগীর দেহে উচ্চ মাত্রায় কোলেস্টেরল রয়েছে অথবা হার্ট ডিজিজের ঝুঁকি বেশি।

বয়োবৃদ্ধের চোখের মনি ঘিরে ধুসর রিঙ।
এর মাধ্যমে অ্যালকোহল আসক্তিও শনাক্ত করা যায়। কখনও কখনও বয়োবৃদ্ধ মানুষের চোখে এই রিঙ দেখা যায়। একারণেই এর নাম "অ্যারকাস সেনাইলিস।"

চোখের মেদ:

কখনও কখনও আপনার চোখের সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিবর্তনগুলো আসলে সমস্যা হিসেবে খুবই মৃদু এবং সহজেই এর চিকিৎসা সম্ভব।

পিংগুয়েকুলা হচ্ছে হলুদ এক ধরনের টুকরো যেটা চোখের সাদা অংশে দেখা যায়। এটা তৈরি হয় মেদ এবং প্রোটিন থেকে। চোখের ড্রপ দিয়ে কিংবা ছোট অপারেশন করে এটা দূর করা যায়।

চোখের শ্বেত মণ্ডলীতে আরেক ধরনের হালকা গোলাপি রঙের গ্রোথ দেখা যায়, যার নাম টেরিজিয়াম (pterygium)।

এটা এমনিতে কোন সমস্যা না। কিন্তু চোখের রঙিন অংশ অর্থাৎ কর্নিয়াতে এটা ছড়িয়ে পড়লে দৃষ্টি সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ভাগ্যক্রমে টেরিজিয়াম বিস্তার লাভ করে খুবই ধীর গতিতে। এবং পিংগুয়েকুলার মতোই এটাকে তুলে ফেলা যায়।

একে বাড়তে দিলে টেরিজিয়াম কর্নিয়ার ওপর একটা আস্তরণ তৈরি করে যার ফলে দৃষ্টি সমস্যা দেখা দেয়।

দীর্ঘসময় ধরে সূর্যের আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি চোখে লাগার পর পিংগুয়েকুলা অথবা টেরিজিয়াম দেখা দেয় বলে মনে করা হয়।

ফোলা চোখ:

কান্নাকাটি ছাড়াই অনেকের চোখ এমনিতেই ফোলা থাকে। এটা মানুষের মুখের গঠনপ্রকৃতির একটা স্বাভাবিক অংশ।

চোখ কোটর ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইলে তার সাথে থাইরয়েড সমস্যার যোগাযোগ থোকতে পারে।
কিন্তু কারও চোখ যখন স্বাভাবিক অবস্থা থেকে হঠাৎ করেই ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসতে চায়, তখন বুঝতে হবে তার থাইরয়েড গ্রন্থিতে এমন কোন সমস্যা তৈরি হয়েছে যার দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।

কিন্তু দুটি চোখের মধ্যে কোনো একটি ফুলে উঠলে বুঝতে হবে কোন আঘাত, সংক্রমণ, কিংবা চোখের পেছনে কোনো টিউমারের জন্য এটা ঘটতে পারে।

চোখের পাতায় যেসব অসুখ:

চোখের পাতা থেকেও নানা ধরনের অসুখ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়। তবে এগুলো সাধারণত অশ্রু-নালীর নানা সমস্যার জন্য দেখা দিতে পারে।

আঞ্জনি চোখের একটা সাধারণ সমস্যা। কিছুদিনের মধ্যে এটি একাই সেরে যায়।
এরকম একটি সাধারণ সমস্যা হচ্ছে stye বা chalazion। যাকে বাংলায় আঞ্জনি বলা হয়। চোখের ওপরের কিংবা নিচের পাতা ফুলে লাল হওয় ওঠে। যে গ্রন্থির মাধ্যমে চোখে তেল যায় সেটি বন্ধ হয়ে গেলে এই সমস্যা দেখা দেয়।

আঞ্জনি সাধারণত এমনিতেই চলে যায়। কখনও কখনও চোখে গরম পট্টি ব্যবহার করা হলেও এটি আর থাকে না।

চোখ ওঠা:

কনজাংকটিভাইটিস বা চোখ ওঠাও বিভিন্ন দেশে খুবই পরিচিত একটি চোখের রোগ। এর চিকিৎসাও বেশ সুলভ।

এর বাইরে চোখের পাতায় অকুলার মাইয়োকিমিয়া তৈরি হয় চুলকানি থেকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই সমস্যা তৈরি হয় মানসিক চাপ, পুষ্টির অভাব কিংবা অতিরিক্ত কফি পানের জন্য।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো কারণে চোখ সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে একাধিক সমস্যায় ভুগতে হয় রোগীদের। তাই চোখের কোনো সমস্যাকেই হালকাভাবে না দেখার পরামর্শ দিয়েছেন চক্ষু বিশারদরা।
১। হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি: শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ালে আইরিশের পাশে সাদা, ধূসর বা নীল বলয় তৈরি হয়। যদিও বার্ধক্যজনিত কারণেও এমন রিং দেখা যায় বা নিম্ন-ঘনত্বের লাইপোপ্রোটিনের মাত্রার কারণেও হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই হাই কোলেস্টেরল উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। যা আগে থেকেই আপনি জেনে নিতে পারেন চোখের মাধ্যমে।

২। ক্যানসার: স্তন ক্যানসারের লক্ষণ প্রকাশ পায় চোখে। ক্যানসারের কোষ যখন শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে তখন আপনার চোখ আপনাকে তা জানাতে পারে।

ক্যানসারে চোখের টিস্যুর মাঝারি স্তরগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক সময় চোখে অস্বাভাবিক ক্ষত বা টিউমারও দেখা যায়। তাই ঝাপসা দৃষ্টি, ব্যথা বা চোখে ঝলকানি কিংবা ভাসমান কিছু অনুভূত হলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

৩। রেটিনার ক্ষতি: অনেক সময় চোখের দৃষ্টিসীমার মধ্যে ধুলোর মতো বস্তু দেখা যায়। বারবার জলের ঝাপটা দিয়ে চোখ পরিষ্কার করলেও সেগুলো যায় না। দৃষ্টিসীমার মধ্যে ঘোরাঘুরি করতে থাকে। এগুলোকে ফ্লোটার বলা হয়। রেটিনা ছিঁড়ে গেলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে চোখের মধ্যে এমন ফ্লোটার দৃশ্যমান হয়। এমন লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা করা উচিত নয়।

৪। ডায়াবেটিস: ঝাপসা দৃষ্টি চোখের একটা সাধারণ সমস্যা। তবে টাইপ ২ ডায়াবেটিস হলেও এমনটা হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে হাই ব্লাড সুগার থাকলে রক্তনালীতে চাপ সৃষ্টি হয়, ফলে চোখে রক্তের মতো লাল দাগ দেখা যায়। চোখে এমন দাগের অর্থ, রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

৫। ছানি বা ম্যাকুলার ডিজেনারেশন: ইদানীং দিনের বেশির ভাগ সময় কম্পিউটার, টিভি বা মোবাইলের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঝাপসা হয়ে আসে দৃষ্টি। চোখ অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়লে এই ঘটনা ঘটতেই পারে। ডায়াবেটিসের কারণে চোখে ঝাপসা দৃষ্টি হতে পারে। অনেক সময় ঘুম কম হলে, ক্লান্তি লাগলেও এমনটা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কখনও তা হতে পারে ছানি বা ম্যাকুলার ডিজেনারেশনের লক্ষণও।

৬। অনিদ্র: অনিদ্রায় ভুগলে চোখ লাল হয়ে থাকে এবং চোখে নিয়মিত অস্বস্তি লেগেই থাকে। এর ফলে আক্রমণ করতে পারে অন্য কোনও গুরুতর রোগ।

৭। কাছের জিনিস দেখতে বাঁধা: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাছের জিনিস দেখতে অসুবিধা তৈরি হতে পারে। অনেককেই দেখা যায় চোখ থেকে বই বা খবরের কাগজ অনেকটা দূরে রেখে পড়তে। এই সমস্যা এড়িয়ে না গিয়ে অবিলম্বে চিকিত্সকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

৮। অদৃশ্য লক্ষণ: সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শরীরের অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ চোখেও ফেলতে পারে তার প্রভাব। হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি তো রয়েছেই। তা ছাড়া রেটিনার রক্তনালীগুলিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ফলে হাইপারটেনসিভ রেটিনোপ্যাথি প্রায় অনিবার্য। আয়নায় আপনার চোখ দেখার সময় এটি সাধারণ ভাবে চোখে পড়বে না। তাই নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।

চোখের কিছু সাধারন সমস্যা যা আমরা সচরাচর এড়িয়ে যাই:

প্রশ্ন : চোখের সাধারণ সমস্যা বলতে আমরা কোনো সমস্যাগুলোকে বলে থাকি?

উত্তর : সাধারণ সমস্যা যদি আমরা ধরে থাকি, জনসাধারণের ক্ষেত্রে এক নম্বর বিষয় হলো, কম দেখা। দুই নম্বর বিষয় হলো, সাধারণ রোগ- তবে প্রচণ্ড চোখ ব্যথা, লাল চোখ- এগুলো নিয়েও আসতে পারে।

আসলে নিজে থেকেই প্রতিবছর বা দুই বছর বা পাঁচ বছর অন্তর অন্তর চিকিৎসকের কাছে সাধারণ চেকআপ করানো জরুরি। অনেক রোগ রোগী বহন করে, তবে ধীরে ধীরে এগুলো প্রকট হচ্ছে রোগী বুঝতে পারেন না। অন্য একটি রোগের কারণে যদি চিকিৎসকের কাছে যান, তখন দেখা যায় তার একটি খারাপ রোগ রয়ে গেছে, অন্য একটি রোগ ধরা পড়ছে। এই দুই তিনটা ধরনের মধ্য থেকেই আমাদের কাছে রোগীগুলো চলে আসে।

প্রশ্ন : চোখে কম দেখা মানে কী? এটি কেন হয়?

উত্তর : প্রাথমিক যে অভিযোগ তারা করে, সেটি হলো, আমি কম দেখি। একে আবার দুটো স্তরে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম স্তর হলো, হয়তো রোগী বলতে পারে আমি চোখে একটু কম দেখছি। আগে বিষয়টি ছিল না। আর দ্বিতীয় বিষয় হলো, যারা চল্লিশের ঊর্ধ্বে বা চল্লিশ ছুঁই ছুঁই করছে, তখন কম দেখার সমস্যা হয়। চল্লিশেই চালশে। সেই চালশেরও একটি বিষয় রয়েছে। আমাদের এসব অঞ্চলে এটি ৩৫ থেকে শুরু হয়।

পশ্চিমা বিশ্বে সাধারণত এটি ৪২ বছর থেকে শুরু হয়। তো এই ৪০ বছর বয়সী অনেক রোগী আমাদের কাছে আসে। সন্ধ্যা হলে খবরের কাগজ পড়তে অসুবিধা হয়, বই পড়তে অসুবিধা হয়। কাছের জিনিস দেখতে অসুবিধা হয়। সাধারণত এই দুটো অভিযোগ খুব বেশি থাকে। আর যারা হঠাৎ করে কম দেখতে শুরু করে যে আমি ঘুম থেকে উঠে কিছু দেখতে পারছি না। এসব লোকের ৭০ থেকে ৮০ ভাগ দৃষ্টিশক্তি হয়তো নষ্ট হয়ে গেছে।

আর ভিজুয়াল ফিল্ডের (দৃশ্য পরিসর) সমস্যাটি চিকিৎসা বিজ্ঞানে আমরা সুনির্দিষ্টভাবে বুঝি। জন সাধারণ পরিসরের বিষয়টি বোঝে না। যারা অনেক সচেতন তারা হয়তো বিষয়টি বোঝে। তবে এটি সংখ্যায় কম। অনেকে বলে, আমি বামদিক দিয়ে হাঁটতে গেলে হয়তো হোঁচট খাই। গাড়ি চালাতে গেলে সমস্যা হয়। পশ্চিমা বিশ্বে যেহেতু অনেক লোক গাড়ি চালায় তাই সেখানে এটি খুবই প্রকট। আমাদের মধ্যে এটি প্রায়ই মিস হয়।

আরেকটি বিষয় অভিযোগ করে, ‘পর্দার মতো সামনে কিছু পড়ে আছে।’ অথবা ‘হঠাৎ করে আমার একদিক ঢেকে গেল।’

প্রশ্ন : যদি ঝাপসা বা কম দেখার পরও সঠিক চিকিৎসা না নিই কী ক্ষতি হতে পারে?

উত্তর : আপনি যেটি বলেছেন, আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপটে এটি আসলেই সত্যি কথা এবং এটি সবচেয়ে বেশি হয় মহিলাদের। বিশেষ করে যারা গ্রামে থাকে। সংসার নিয়ে তারা ব্যস্ত। এই ছোটোখাটো জিনিসগুলো তারা এড়িয়ে যায়। মনে করে, এটি বললে হয়তো মানুষ বিরক্ত হবে। এই সমস্যা হয় চশমার পাওয়ারের জন্য। আসলে সে তো চল্লিশের কাছে এসেছে। এই জিনিসগুলো তারা পরিহার করে। তবে প্রতিটি মানুষ যখন চল্লিশের কোঠায় আসবে সবারই এই সমস্যা হবে। কারো আগে শুরু হবে বা কারো পরে শুরু হবে। তবে এমনো রোগী রয়েছে, গ্রাম থেকে এসেছে এটি নিয়ে মাথা ঘামায় না।

প্রশ্ন : এই সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি হয়ে গেলে কোনো ক্ষতি হয় কি?

উত্তর : ক্ষতি একটিই হয় পাওয়ারটা বাড়তে থাকে। তবে অন্ধত্বের দিকে তারা যাবে না।

প্রশ্ন : পাওয়ার সমন্বয় নিয়ে আপনারা বেশ বিব্রত অবস্থায় পড়েন। এ বিষয়ে আপনার পরামর্শ কী?

উত্তর : কতগুলো বিষয় কাজ করে। এক নম্বর বিষয় হলো আমরা প্রথমে যন্ত্র রোগীর চোখে বসিয়ে পাওয়ার (Power) আন্দাজ করি। মনে রাখতে হবে, এই যন্ত্র কখনো সঠিক পাওয়ার দেবে না। যন্ত্রের কাজই হচ্ছে একটি পাওয়ারের গড় মাপ দেওয়া। সেটা এক-একটি রোগীর জন্য একেক রকম হতে পারে। যে রোগীর পাওয়ার এক লাগবে যন্ত্র কখনো তাকে ১২ পাওয়ার বলবে না। সে এক, দেড় বা দুই বলতে পারে। এটি চিকিৎসকের দায়িত্ব। চিকিৎসক পরিমাপ বুঝে দেবেন। রোগী চালিয়ে নিতে পারবেন দুই চার পাঁচ বছর পর্যন্ত, এ ধরনের পাওয়ার আমরা বুঝেই দেই। 

প্রশ্ন : শিশুরা অনেক সময়ই চশমা পড়তে চায় না। অবহেলা করে। শিশুদের ক্ষেত্রে যাদের পাওয়ারে সমস্যা রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে চশমা পড়া কতটা জরুরী?

উত্তর : আসলে বড়দের কিন্তু চশমা পড়া অতি জরুরী নয়। বড়রা চশমা না পড়লে তার হয়তো কোন লেখা পড়তে অসুবিধা হবে। তিনি ঝাপসা দেখবেন। কখনও চোখ ব্যাথা হতে পারে। মাথা ব্যাথাও হতে পারে। কিন্তু শিশুদের বিষয়টা পুরোপুরি ভিন্ন। ধরুন একটি শিশু অভাব, অনটন বা অবহেলার কারণে বড় বা লম্বা হলো না। কিন্তু বয়স বৃদ্ধির পর যদি অনেক পুষ্টিকর খাবার খাওনো হয় সে কি আর লম্বা হবে? হবে না। ঠিক তেমনি ভাবে ধরুন একটি শিশুর ৫ বছর বয়সে চোখের সমস্যা ছিলো। তখন তার একটি চশমা প্রয়োজন। কিন্তু সেটা যদি না দেওয়া হয় বা না ব্যবহার করা হয় তবে তার সেই ঝাপসা দৃষ্টি সারাজীবনের জন্য ঝাপসাই থেকে যেতে পারে। যেটাকে আমরা লেজি আই বা অলস চোখ বলি।

প্রশ্ন : অলস চোখ সম্পর্কে কিছু বলুন!

উত্তর : শিশুদের অলস চোখ চশমা দিয়ে সমাধান করা যায়। যেমন ধরুন কোন একটি শিশুর চোখ বেকে আছে। তার ক্ষেত্রে দেখা যায় চশমা দেওয়ার পর চোখ অনেকটা সোজা হয়ে আসে। যাদের ক্ষেত্রে চশমা দিয়ে বাকা চোখ সোজা হয় না তাদের জন্য আমরা বিভিন্ন ধরণের ব্যাম দিতে পারি। অথবা প্রয়োজনে আমরা অপারেশন করতে পারি।

প্রশ্ন : চোক হালকা বাকা থাকলে অনেকেই বলেন লক্ষ্মি ট্যারা। এটা কি?

উত্তর : আসলে কোন ট্যারাই কিন্তু লক্ষ্মি নয়। সকল ট্যারা চোখেরই কিন্তু চিকিৎসার করা উচিত।

প্রশ্ন : ল্যাসিক সার্জারি কি?

উত্তর : যাঁদের চোখের পাওয়ার আছে কিন্তু চশমা বা কনট্যাক্ট লেন্স পরতে চান না, তাঁদের জন্য আধুনিক একটি চিকিৎসাব্যবস্থার নাম ল্যাসিক সার্জারি। এক্সাইমার লেজার রশ্মির সাহায্যে চোখের কর্নিয়ায় আকৃতি বা গঠনের পরিবর্তন করে সম্পূর্ণ চোখের পাওয়ারের পরিবর্তন করা হয়। ল্যাসিক-পদ্ধতির অপারেশন এর প্রকারভেদের মাধ্যমে মাইনাস বা প্লাস পাওয়ারকে পরিবর্তন করে বিনা পাওয়ার বা জিরো পাওয়ার করা হয়।

প্রশ্ন : ল্যাসিক সার্জারি কী এবং কেন?

উত্তর : সাধারণত দৃষ্টিজনিত সমস্যা অর্থাৎ দুরের বা কাছের বস্তু দেখতে সমস্যা হওয়া বা ঝাপসা দেখা এধরনের চক্ষু সমস্যার সমাধানের জন্যই ল্যাসিক সার্জারি করা হয়ে থাকে। যারা দেখার সমস্যার কারণে (+) বা (-) চশমা ব্যবহার করেন তাদের ক্ষেত্রেই বেশীরভাগ সময় চিকিৎসকগণ ল্যাসিক সার্জারি করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তবে ঠিক এগুলো ছাড়াও আরো কিছু চিকিৎসায় ল্যাসিক সার্জারি করা হয়। ল্যাসিক সার্জারিতে Laser এর সাহায্যে মূলত চোখের কর্নিয়ার পুরুত পরিবর্তন করে ঝাপসা দেখা বা কম দেখার সমস্যা দূর করা হয়। যাতে রোগীকে চশমা ব্যবহার করতে না হয় বা ভারী চশমার পরিবর্তে খুব অল্প পাওয়ারের চশমা হলেই চলে।

ল্যাসিক একটি ব্যথাহীন, রক্তপাতহীন, এবং প্রায় ঝুঁকিহীন চক্ষু সার্জারি।

তথ্যসূত্র:

  • বারবারা পিয়ার্সওনেক, ব্রিটেনের অ্যাংলিয়া রাসকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক, বিবিসি বাংলা।
  • ডা. শেখ মাহবুব উস সোবহান, বারডেম জেনারেল হাসপাতালের চক্ষু বিজ্ঞান বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক ও পরামর্শক।
  • আনন্দবাজার> সময় টিভি।
  • ডা. হারুন-উর-রশিদ (প্রথিতযশা চক্ষু রোগ বিশেষজ্ঞ, সিনিয়র কনসালট্যান্ট, প্রখ্যাত ল্যাসিক, ফ্যাকো ও গ্লোকমা বিশেষজ্ঞ, ঢাকা আই কেয়ার হাসপাতাল)।
  • Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই

Popular Post

Blogger দ্বারা পরিচালিত.