উৎসেচক এবং লালা (Enzyme & Saliva) কি? খাদ্য হজমে কেন প্রয়োজন? Enzyme সমৃদ্ধ খাবার গুলো কি কি?
লালা ও এনজাইম:
ধরো, তোমার সামনে এক থালা রসগোল্লা বা এক টুকরো পাকা তেঁতুল রাখা হলো। মুখের ভেতর তরল পদার্থের উপস্থিতি অনুভব করছ? তোমার ডান হাতটি সাবান দিয়ে ধুয়ে একটি আঙুল দিয়ে জিহ্বা থেকে কিছুটা তরল নাও। এর বর্ণ কেমন পর্যবেক্ষণ করো।
লালা পানির মতো আঠালো ও বর্ণহীন তরল। আমরা খাবার মুখে নিয়ে দাঁত দিয়ে চিবুতে থাকি। জিব খাবারগুলোকে নেড়েচেড়ে দেখে। যেন এগুলো ভালো করে চিবানো যায়। মুখের মধ্যে ওই খাবারগুলো লালার সঙ্গে মিশ্রিত হয়। খাদ্যদ্রব্য হজমের জন্য এটি খুব প্রয়োজনীয়। এতে থাকে শতকরা ৯৮ ভাগ পানি ও ২ ভাগ Enzyme বা জৈব রাসায়নিক পদার্থ। লালার এনজাইমকে বলে টায়ালিন। অর্থাৎ খাদ্য গ্রহণের পর মুখগহ্বর থেকে যে লালারস নিঃসৃত হয়, সেখানে টায়ালিন থাকে। ওই টায়ালিন শর্করাকে মলটোজে পরিণত করে।
লালার জীবাণু-প্রতিরোধী ক্ষমতা আছে। মুখের ভেতরকার জীবাণুকে এটি মেরে ফেলে। মুখের পেছনে অবস্থিত লালাগ্রন্থি থেকে এটি নিঃসৃত হয়। খাদ্য (Digestion) পরিপাকে লালার বিশেষ ভূমিকা আছে। লালা খাদ্যবস্তুকে পিচ্ছিল করে ও গিলতে সাহায্য করে। প্রতিদিন আমাদের মুখে ১.৫ লিটার লালা তৈরি হয়। লালার একটি কাজ হলো মুখের মধ্যে এসিডের সমতা রক্ষা করা, যাতে এনজাইমগুলো সক্রিয় থাকে।
ছোট শিশুদের লালা নিঃসৃত হয় বেশি। এর কারণ হলো জন্মের পর কয়েক বছর ধরে শিশুর লালাগ্রন্থিগুলো বেশি সক্রিয় থাকে। কখনো কখনো ঘুমন্ত অবস্থায় কারো কারো মুখ থেকে লালা নির্গত হয়। লালাগ্রন্থি থেকে লালা ক্ষরণ হয়। লালায় থাকা পানি খাদ্যকে নরম করে।
তোমরা হয়তো ভাবছ এনজাইম কী? যে প্রোটিন জীবদেহে অল্পমাত্রায় বিদ্যমান থেকে বিক্রিয়ার হারকে ত্বরান্বিত করে কিন্তু বিক্রিয়া শেষে নিজেরা শর্ত সাপেক্ষে অপরিবর্তিত থাকে তাই এনজাইম। এনজাইমকে জৈব অণুঘটকও বলা হয়। কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন ও সালফার মৌল মিলে এটি তৈরি হয়। কিছু কিছু এনজাইমে ফসফরাস, তামা, দস্তা, লোহা, ম্যাঙ্গানিজ, ম্যাগনেসিয়াম প্রভৃতি মৌল থাকে বলেও জানা গেছে।
এনজাইমের কিছু ভৌত বৈশিষ্ট্য বা এনজাইমের ধর্ম :
- এনজাইম তাপে বিনষ্ট হয়। নির্দিষ্ট (সীমিত) তাপমাত্রা পর্যন্ত এনজাইম ভালো কাজ করে।
- এনজাইম একটি প্রোটিন।
- এর কার্যকারিতা পিএইচ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সব এনজাইমই pH ৬-৯ এর মধ্যে বেশি ক্রিয়াশীল।
- এনজাইম খুব অল্পমাত্রায় বিদ্যমান থেকে বিক্রিয়ার হার ত্বরান্বিত করে। এনজাইম এমন এক বস্তু, যা খাদ্যবস্তুর সঙ্গে মিশে রাসায়নিক ক্রিয়ায় সাহায্য করে, কিন্তু নিজে অংশ নেয় না।
লালার এনজাইম শ্বেতসারকে পরিবর্তন করে শর্করায় (মলটোজ) পরিণত করে। এ কারণে শর্করাজাতীয় খাবার চিবানোর পর কিছুক্ষণ মুখে রাখলে মিষ্টি লাগে। এক্ষেত্রে জিভ আমাদের খাদ্যবস্তু গিলতে সাহায্য করে। মুখের শেষ প্রান্ত থেকে দুটি নল আমাদের দেহের ভেতরের দিকে নেমে গেছে। এই নলের মতো অংশটিকে অন্ননালি বলে। এই নালি দিয়ে খাদ্য ও পানীয় পাকস্থলীতে পৌঁছায়।
পাকস্থলীতে এনজাইমের বৈচিত্র্যময় কাযর্ক্রম:
খাবার খাওয়ার পরে তা পাকস্থলীতে গিয়ে হজম হয় ডাইজেস্টিভ জুসের মাধ্যমে, যেখানে থাকে নানারকমের বিশেষ এনজাইম। মানুষ ও পশুর এলিম্যান্টারি ট্রাক্টকে একটা জটিল রাসায়নিক গবেষণাগারের সঙ্গে তুলনা করা চলে। খাবার খাওয়ার পর সেটা শরীরের ভেতরে প্রবেশ করে। তারপর সেই খাবারের সঙ্গে মেশে নানারকমের ডাইজেস্টিভ জুস এই জুস তৈরি হয় গøযান্টের মাধ্যমে, গøযান্ডের সংখ্যা অনেক। এই গøযান্টর বিশেষ বিশেষ খাবারের জন্য প্রয়োজনীয় ডাইজেস্টিভ জুস উৎপন্ন করে। তারপর খাবার এক অংশ থেকে আরেক অংশে যাওয়া শুরু করে। এরপর শুরু হয় হজমের কাজ। এ সময়ে জটিল রাসায়নিক যৌগগুলো পরিণত হয় সহজ-সরল রাসায়নিক যৌগে, যা শরীরের জন্য প্রয়োজনীয়। শরীর যা হজম করতে পারে না বা যা শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় নয়, সেটা শরীর থেকে বের হয়ে আসে।
দুটো স্তরে খাবার হজম হয়। প্রথম স্তরে খাবার এলিম্যান্টারি স্ট্রাক্ট দিয়ে পার হয় যেখানে খাবার দলায় পরিণত হয়। এখানে এনজাইমের ঘনত্ব কম থাকে। হজমের প্রাথমিক কাজটা এখানে শুরু হয়। খাবারের দলাটা প্রথমে ছোট ছোট দলায় পরিণত হয়। তারপর পরিণত হয় আলাদা আলাদা অণুতে।
হজমের দ্বিতীয় স্তরে এ অনুগুলো ভাঙতে শুরু করে। এ সময়ে খাবার ক্ষুদ্রান্ত্রে প্রবেশ করে এবং ক্ষুদ্রান্ত্রের দেয়ালের পাশে এসে দ্রæত হজম হয়। হজমের এ প্রক্রিয়াটা মানুষের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে প্রয়োজনীয় এনজাইম পাওয়া যায়। তাই বেশি পরিমাণ খাবার এখানে খুব অল্প সময়ে হজম হতে পারে। আবার বিরতি দিয়ে এনজাইম বের হতে পারে। যেসব এনজাইম ক্ষুদ্রান্ত্রের দেয়ালে জমা থাকে সেগুলো অনেক দিন ধরে ব্যবহার করা যায়। হজমের এ স্তরে খাবার পুরোপুরি হজম হয়। হজমকৃত খাবারের পুষ্টি রক্তে গিয়ে মেশে। আর এ কাজটা হয় ক্ষুদ্রান্ত্রের দেয়ালের পাশেই। ফলে খাবার থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি হারিয়ে যাওয়ার আগেই রক্তে মিশতে পারে। মানুষ অসুস্থ হয়। অসুস্থ মানুষের অনেকের আবার এ সময় এলিম্যান্টারি গøযান্ড প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এর ফলে হজমের কোনো ব্যাঘাত ঘটে না। এটা এক রহস্য যা মানুষ এখন বুঝতে পারে। ত্রæটিপূর্ণ গøযান্ট থেকে যে এনজাইম বের হয় তার পরিমাণ হয় অল্প। কিন্তু সেটা জমা থাকে ক্ষুদ্রান্ত্রের দেয়ালে। ফলে এলিম্যান্টারি গøযান্ড বন্ধ হয়ে গেলেও হজমের কাজটা পুরোপুরিই চলে। ক্ষুদ্রান্ত্রের দেয়াল বা উপরি অংশ তৈরি এপিথেলিয়াল সেল দ্বারা। এসব সেলে আছে প্রচুর পরিমাণ অতি ক্ষুদ্র শুট। প্রতিটি কোষে থাকে প্রায় ৩ হাজারের মতো শুট। এর ফলে ক্ষুদ্রান্ত্রের দেয়াল থেকে বের হয় প্রয়োজনীয় এনজাইম। আবার এসব কোষেই জমা থাকে প্রয়োজনীয় এনজাইম। খাবার হজমের প্রক্রিয়ায় এ এনজাইমগুলো ক্যাটালিস্ট হিসেবে কাজ করে। অথার্ৎ খাবার হজমের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। এনজাইম না থাকলে খাবার হজম হতো অনেক সময় নিয়ে। ক্ষুদ্রান্ত্রের দেয়ালের যেসব জায়গায় এনজাইমের ঘনত্ব বেশি হয়, সেখানে খাবার দ্রæত হজম হয়।
আপনার (Digestive System) পাচনতন্ত্র তৈরি করতে অনেক অঙ্গ একসাথে কাজ করে। এই অঙ্গগুলি আপনার পেটের খাবার এবং তরলগুলি গ্রহণ করে এবং সেগুলিকে সহজ আকারে বিভক্ত করে, যেমন প্রোটিন, শর্করা, চর্বি এবং ভিটামিন। তারপরে পুষ্টিগুলি ক্ষুদ্রান্ত্র জুড়ে এবং রক্ত প্রবাহে পরিবাহিত হয়, যেখানে তারা শরীরের বৃদ্ধি এবং মেরামতের জন্য শক্তি সরবরাহ করে।
এই প্রক্রিয়ার জন্য (Digestive Enzymes) পাচক এনজাইমগুলি প্রয়োজনীয়, কারণ তারা চর্বি, প্রোটিন এবং কার্বোহাইড্রেটের মতো অণুগুলিকে আরও ছোট অণুতে ভেঙে দেয় যা সহজেই শোষিত হতে পারে।
তিনটি প্রধান ধরনের পাচক এনজাইম আছে:
- Protease: প্রোটিনকে ছোট ছোট পেপটাইড এবং অ্যামিনো অ্যাসিডে ভেঙ্গে দেয়।
- Lipases: চর্বিকে তিনটি ফ্যাটি অ্যাসিড এবং একটি গ্লিসারল অণুতে ভেঙে দেয়।
- Amylases: স্টার্চের মতো কার্বোহাইড্রেটকে সরল শর্করায় ভেঙে দেয়।
যেসব এনজাইমগুলি ক্ষুদ্রান্ত্রে অটোমেটিক তৈরি হয় তার মধ্যে Lactase, Maltase, Amylases, Lipases এবং Sucrase রয়েছে। যখন শরীর পর্যাপ্ত পরিপাক এনজাইম তৈরি করতে না পারলে খাদ্যের অণু সঠিকভাবে হজম হতে পারে না। এটি ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতার মতো হজমের ব্যাধি হতে পারে। তখন, (Natural Digestion) প্রাকৃতিক হজম/পাচক Enzyme সমৃদ্ধ খাবার খাইলে হজমের উন্নতিতে সাহায্য করতে পারে।
নিচে কিছু Enzyme সমৃদ্ধ খাদ্যের উল্লেখ করা হলো;
১- (Pineapple) আনারস:
আনারস হজম এনজাইম সমৃদ্ধ একটি সুস্বাদু গ্রীষ্মমন্ডলীয় ফল। বিশেষ করে, আনারসে Bromelain নামক পাচক (Digestion) এনজাইমের একটি গ্রুপ থাকে। এই এনজাইমগুলি হল Protease, যা অ্যামিনো অ্যাসিড সহ প্রোটিনকে এর বিল্ডিং ব্লকগুলিতে ভেঙে দেয়। এটি প্রোটিন হজম এবং শোষণে সহায়তা করে। Bromelain প্রোটিনকে অ্যামিনো অ্যাসিডে পরিণত করতে সাহায্য করে।
শক্ত মাংসকে নরম করার জন্য ব্রোমেলেন গুঁড়ো আকারে কেনা যেতে পারে। যারা প্রোটিন হজম করতে (সমস্যা হয়) সংগ্রাম করেন তাদের সাহায্য করার জন্য এটি একটি (Health Supplements) স্বাস্থ্য সম্পূরক হিসাবেও পাওয়া যায়।
(Pancreatic Insufficiency) অগ্ন্যাশয়ের অপ্রতুলতাযুক্ত লোকদের উপর একটি গবেষণাই এমন একটি অবস্থা যেখানে অগ্ন্যাশয় পর্যাপ্ত (Digestive Elnzymes) পরিপাক এনজাইম তৈরি করতে পারে না, দেখা গেছে যে অগ্ন্যাশয় এনজাইম পরিপূরকের সাথে Bromelain গ্রহণ করলে একা এনজাইম পরিপূরকের চেয়ে বেশি হজম হয়।
২- (Papaya) পেঁপে:
পেঁপে আরেকটি গ্রীষ্মমন্ডলীয় ফল যা পাচক এনজাইম সমৃদ্ধ। আনারসের মতো পেঁপেতেও প্রোটিস থাকে যা প্রোটিন হজম করতে সাহায্য করে। যাইহোক, তারা Papains নামে পরিচিত প্রোটিসের একটি ভিন্ন গ্রুপ ধারণ করে। অর্থাৎ পেঁপেতে পাচক এনজাইম Papains থাকে, (which breaks down protein into building blocks) যা অ্যামিনো অ্যাসিড সহ প্রোটিনকে বিল্ডিং ব্লকে ভেঙে দেয়।
পাপাইন Meat Tenderizer এবং হজমের পরিপূরক (Digestive Supplement) হিসাবেও পাওয়া যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে যে Papaya-Based Formulas গ্রহণ করলে IBS-এর পরিপাক উপসর্গ যেমন কোষ্ঠকাঠিন্য এবং ফোলাভাব সহজ হতে পারে।
আপনি যদি পেঁপে খেতে চান, তবে সেগুলিকে পাকা এবং রান্না না করে খেতে ভুলবেন না, কারণ (Exposure to heat) তাপের সংস্পর্শে তাদের হজমের এনজাইমগুলিকে ধ্বংস করতে পারে।
এছাড়াও, কাঁচা বা আধা-পাকা পেঁপে গর্ভবতী মহিলাদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে, কারণ এটি সংকোচনকে উদ্দীপিত করতে পারে। অর্থাৎ পেঁপে খাওয়ার সর্বোত্তম ধরন হলো পাকা পেঁপে খাওয়া। কিছু ক্ষেত্রে কাঁচা পেঁপে সালাদ হিসেবেও (গর্ভবতী মহিলা ব্যতীত) খেতে পারেন।
৩- (Mango) আম:
আম একটি রসালো গ্রীষ্মমন্ডলীয় ফল যা গ্রীষ্মকালে জনপ্রিয়। এগুলিতে হজমকারী এনজাইম Amylases থাকে - একদল এনজাইম যা Starch (একটি জটিল কার্ব) থেকে শর্করাকে Glucose and Maltose এর মতো শর্করাতে ভেঙে দেয়। আমের অ্যামাইলেজ এনজাইম ফল পাকার সঙ্গে সঙ্গে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ কারণে আম পাকতে শুরু করলে মিষ্টি হয়ে যায়। অর্থাৎ আমে পাচক এনজাইম অ্যামাইলেজ থাকে, যা স্টার্চ (একটি জটিল কার্ব) থেকে শর্করাকে গ্লুকোজ এবং মল্টোজের মতো শর্করাতে ভেঙে দেয়। অ্যামাইলেজ আম পাকাতেও সাহায্য করে।
অ্যামাইলেজ এনজাইমগুলি (Pancreas & Salivary Glands) অগ্ন্যাশয় এবং লালা গ্রন্থি দ্বারাও অটোমেটিক ভাবে তৈরি হয়। তারা কার্বোহাইড্রেট ভেঙে ফেলতে সাহায্য করে যাতে তারা সহজেই শরীর দ্বারা শোষিত হয়।
এই কারণেই প্রায়শই গিলে ফেলার আগে খাবারকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে চিবিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়, কারণ লালার মধ্যে থাকা অ্যামাইলেজ এনজাইমগুলি সহজে হজম এবং শোষণের জন্য কার্বোহাইড্রেট ভাঙতে সাহায্য করে।
৪- (Banana) কলা:
কলা হল আরেকটি ফল যাতে রয়েছে প্রাকৃতিক পাচক এনজাইম। কলাতে Amylase and Glucosidase রয়েছে, এনজাইমের দুটি গ্রুপ যা স্টার্চের মতো জটিল কার্বোহাইড্রেটকে ছোট এবং আরও সহজে শোষিত শর্করাতে ভেঙে দেয়।
আমের মতো, কলা পাকতে শুরু করার সাথে সাথে এই এনজাইমগুলি স্টার্চকে চিনিতে ভেঙে দেয়। এ কারণেই পাকা হলুদ কলা কাঁচা সবুজ কলার চেয়ে অনেক বেশি মিষ্টি।
তাদের এনজাইম বিষয়বস্তুর উপরে, কলা খাদ্যতালিকাগত ফাইবারের একটি দুর্দান্ত উত্স, যা হজমের স্বাস্থ্যকে সহায়তা করতে পারে। একটি মাঝারি কলা (118 গ্রাম) 3.1 গ্রাম ফাইবার প্রদান করে।
34 জন মহিলার উপর দুই মাসের গবেষণায় কলা খাওয়া এবং (healthy gut bacteria) স্বাস্থ্যকর অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধির মধ্যে সংযোগের দিকে নজর দেওয়া হয়েছে। যে মহিলারা প্রতিদিন দুটি কলা খেয়েছেন তাদের অন্ত্রে স্বাস্থ্যকর ব্যাকটেরিয়া একটি (modest non-significant) শালীন, অ-উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণেই তাদের পেট গ্যাসের কারণে ফোলাভাব কম ছিল।
৫- (Honey) মধু:
এই সুস্বাদু তরলটি পাচক এনজাইম সহ অনেক উপকারী যৌগ সমৃদ্ধ। নিম্নলিখিত এনজাইমগুলি মধুতে পাওয়া যায়, বিশেষ করে কাঁচা মধুতে।
মধুতে নিম্নে লিখিত এনজাইমগুলি রয়েছে;
- Diastase: স্টার্চকে মল্টোজে ভেঙ্গে ফেলে।
- Amylases: স্টার্চকে গ্লুকোজ এবং মল্টোজের মতো শর্করাতে ভেঙে দেয়।
- Invertases: সুক্রোজ, এক ধরনের চিনিকে ভেঙে গ্লুকোজ এবং ফ্রুক্টোজে পরিণত করে।
- Protease: প্রোটিনগুলিকে অ্যামিনো অ্যাসিডে ভেঙে দেয়।
পরিপাকতন্ত্রের স্বাস্থ্য উপকারিতা পেতে চাইলে আপনাকে শুধু কাঁচা মধু কেনার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে, কারণ কাঁচা মধু উচ্চ তাপের সংস্পর্শে আসে না। আর প্রক্রিয়াজাত মধু গরম করা হতে পারে, যা হজমের এনজাইমগুলিকে ধ্বংস করে।
৬- (Ginger) আদা:
আদা হাজার হাজার বছর ধরে রান্না এবং ঐতিহ্যগত ওষুধের একটি অংশ। আদার কিছু চিত্তাকর্ষক স্বাস্থ্য উপকারিতা এবং পাচক enzyme এর জন্য দায়ী করা যেতে পারে।
আদার মধ্যে প্রোটিজ Zingibain থাকে, যা প্রোটিনকে তাদের বিল্ডিং ব্লকে হজম করে। zingibain বাণিজ্যিকভাবে আদা দুধের দই তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়, যা একটি জনপ্রিয় চীনা মিষ্টি।
এটি অন্যান্য protease থেকে ভিন্ন, এটি প্রায়শই মাংসকে নরম করার জন্য ব্যবহৃত হয় না, কারণ এটির একটি ছোট শেলফ লাইফ। অর্থাৎ আদার মধ্যে পাচক এনজাইম জিঙ্গিবাইন রয়েছে, যা একটি প্রোটিজ। এটি পরিপাকতন্ত্রের মাধ্যমে খাদ্যকে দ্রুত সরাতে সাহায্য করে এবং শরীরের নিজস্ব হজমকারী এনজাইমের উৎপাদনকে বাড়িয়ে দিয়ে হজমে সহায়তা করতে পারে।
অনেক সময় পেটে বসে থাকা খাবারকে বদহজমের কারণ বলে মনে করা হয়। সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের এবং যাদের বদহজম আছে তাদের গবেষণায় দেখা যায় যে, আদা সংকোচনের প্রচার করে খাদ্যকে দ্রুত পাকস্থলীর মধ্য দিয়ে যেতে সাহায্য করে।
প্রাণীজ গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে, আদা সহ মশলা শরীরের নিজস্ব হজমকারী এনজাইমের উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করে যেমন amylases এবং lipases। আদা বমি বমি ভাব এবং বমির জন্য একটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ চিকিত্সা বলে মনে হচ্ছে।
৭- Avocados:
অ্যাভোকাডো অন্যান্য ফলের থেকে ভিন্ন, কারণ এতে স্বাস্থ্যকর চর্বি বেশি এবং চিনি কম।
এগুলিতে পাচক এনজাইম lipase থাকে। এই এনজাইম ফ্যাট/চর্বির অণুগুলিকে ছোট অণুতে হজম করতে সাহায্য করে, যেমন fatty acids and glycerol, যা শরীরের পক্ষে শোষণ করা সহজ। অ্যাভোকাডোতে polyphenol oxidase সহ অন্যান্য এনজাইমও রয়েছে। এই এনজাইমটি অক্সিজেনের উপস্থিতিতে সবুজ অ্যাভোকাডোকে বাদামী করার জন্য দায়ী
Lipase আপনার (pancreas) অগ্ন্যাশয় দ্বারা অটোমেটিক তৈরি করা হয়, তাই এটি আপনাকে খাদ্য থেকে গ্রহণ হবে না। যদিও lipase শরীর দ্বারা তৈরি হয়, তবে অ্যাভোকাডো খাওয়া বা lipase supplement গ্রহণ করা উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবারের পরে হজমকে সহজ করতে পারে।
৮- (Kiwi Fruit) কিউই ফল:
কিউই ফল হল একটি ভোজ্য বেরি যা প্রায়শই হজম সহজ করার জন্য সুপারিশ করা হয়। এটি হজমকারী পাচক এনজাইমের একটি বড় উৎস, বিশেষ করে Actinidine নামে একটি protease। এই এনজাইম হজমে সহায়তা করতে এবং প্রোটিন হজম করতে সাহায্য করে এবং বাণিজ্যিকভাবে শক্ত মাংসকে নরম করার জন্য ব্যবহার করা হয়। উপরন্তু, কিউইফ্রুটে অন্যান্য অনেক এনজাইম রয়েছে যা ফল পাকাতে সাহায্য করে।
একটি প্রাণী গবেষণায় দেখা গেছে যে, ডায়েটে কিউইফ্রুট যোগ করা গরুর মাংস, গ্লুটেন এবং সয়া প্রোটিন বিচ্ছিন্ন পেটে হজমের উন্নতি করে। এটি তার অ্যাক্টিনিডেন সামগ্রীর কারণে বলে মনে করা হয়েছিল।
অনেক মানব-ভিত্তিক গবেষণায় আরও পাওয়া গেছে যে কিউইফ্রুট হজমে সাহায্য করে, ফোলাভাব কমায় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে।
৯- Kefir:
কেফির হল একটি (Fermented) গাঁজানো দুধের পানীয় যা (Popular in Natural Health Community) প্রাকৃতিক স্বাস্থ্য সম্প্রদায়ে জনপ্রিয়।
এটি দুধের মধ্যে কেফির "(grains) বীজ/দানা" যোগ করে তৈরি করা হয়। এই "বীজ/দানা" আসলে (yeast) খামিরের মত, lactic acid bacteria, and acetic acid bacteria এর সংস্কৃতি যা ফুলকপির মতো।
গাঁজন করার সময়, ব্যাকটেরিয়া দুধের প্রাকৃতিক শর্করা হজম করে এবং তাদের (organic acids and carbon dioxide) জৈব অ্যাসিড এবং কার্বন ডাই অক্সাইডে রূপান্তর করে। এই প্রক্রিয়াটি এমন পরিস্থিতি তৈরি করে যা ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধিতে সাহায্য করে কিন্তু পুষ্টি, এনজাইম এবং অন্যান্য উপকারী যৌগ যোগ করে।
কেফিরে lipase, protease এবং lactase সহ অনেকগুলি পাচক এনজাইম রয়েছে। এই এনজাইমগুলি যথাক্রমে চর্বি, প্রোটিন এবং lactose অণুগুলিকে ভেঙে দেয়।
lactose দুধের একটি চিনি যা প্রায়শই খারাপভাবে হজম হয়। সেই lactose হজমে সাহায্য করে Kefir তে উৎপন্ন Lactase. একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে কেফির, ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতাযুক্ত লোকেদের মধ্যে ল্যাকটোজ হজমের উন্নতি করেছে।
১০- Sauerkraut:
Sauerkraut হল এক ধরণের (Fermented) গাঁজানো বাঁধাকপি, যার একটি স্বতন্ত্র টক স্বাদ রয়েছে। শুধুই বাঁধাকপি এবং অল্প লবণের মাধ্যমে এটি তৈরি করা হয়।
গাঁজন প্রক্রিয়াটি (Fermentation Process) হজমকারী এনজাইমগুলিও যোগ করে, যা আপনার পাচক এনজাইম গ্রহণের পরিমাণ বাড়ানোর একটি দুর্দান্ত উপায় করে তোলে। অর্থাৎ Sauerkraut হল এক ধরনের গাঁজানো বাঁধাকপি যা অনেক পরিপাক এনজাইমে সমৃদ্ধ। Sauerkraut এর প্রোবায়োটিক বৈশিষ্ট্যগুলি হজমের লক্ষণগুলিকে সহজ করতে সাহায্য করতে পারে।
পাচক এনজাইম ধারণ করার পাশাপাশি, sauerkraut একটি প্রোবায়োটিক খাদ্য হিসাবে বিবেচিত হয়, কারণ এতে (healthy gut bacteria) স্বাস্থ্যকর অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া রয়েছে, যা আপনার হজমের স্বাস্থ্য এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
রান্না করা স্যুরক্রাউটের পরিবর্তে কাঁচা বা (unpasteurized) আনপাস্তুরাইজড স্যুরক্রাউট খাওয়া নিশ্চিত করুন। রান্না করলে উচ্চ তাপমাত্রাই এর পাচক এনজাইম নিষ্ক্রিয়/নষ্ট করতে পারে।
১১- Kimchi:
কিমচি হল একটি মশলাদার কোরিয়ান সাইড ডিশ, যা গাঁজন করা সবজি থেকে তৈরি করা হয়।
Sauerkraut এবং Kefir এর মতো এবং গাঁজন প্রক্রিয়াই স্বাস্থ্যকর ব্যাকটেরিয়া যোগ করে, যা পুষ্টি, এনজাইম এবং অন্যান্য সুবিধা প্রদান করে।
কিমচিতে Bacillus প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া রয়েছে, যা proteases, lipases এবং amylases তৈরি করে। এই এনজাইমগুলি যথাক্রমে প্রোটিন, চর্বি এবং কার্বস হজম করে।
হজমে সহায়তা করার পাশাপাশি, কিমচি অন্যান্য অনেক স্বাস্থ্য উপকারের সাথে যুক্ত। এটি কোলেস্টেরল এবং অন্যান্য হৃদরোগের ঝুঁকির কারণগুলি কমাতে বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে
100 জন তরুণ, সুস্থ অংশগ্রহণকারীদের উপর একটি গবেষণায়, বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, যারা সবচেয়ে বেশি কিমচি খেয়েছেন তাদের মোট রক্তের কোলেস্টেরল সবচেয়ে বেশি হ্রাস পেয়েছে। উচ্চতর মোট রক্তের কোলেস্টেরল হৃদরোগের জন্য একটি ঝুঁকির কারণ।
১২-Miso:
মিসো জাপানি রন্ধনশৈলীতে একটি জনপ্রিয় মশলা।এটি Soybeans, লবণ এবং Koji দিয়ে গাঁজন করে তৈরি করা হয়, Koji এক ধরনের (Fungus) ছত্রাক।
কোজির বৈশিষ্ট্য হলো lactase, lipases, proteases এবং amylase সহ বিভিন্ন পাচক এনজাইম যোগ করা।
Miso খাবার হজম এবং শোষণ করার ক্ষমতা উন্নত করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, গবেষণায় দেখা গেছে যে, মিসোর ব্যাকটেরিয়া হজমের সমস্যাগুলির সাথে যুক্ত লক্ষণগুলি কমাতে পারে, যেমন (irritable bowel disease) খিটখিটে অন্ত্রের রোগ।
Soybeans গাঁজন তাদের পুষ্টির গুণমান উন্নত করতে সাহায্য করে তাদের Anti-Nutrient সামগ্রী হ্রাস করে। অ্যান্টিনিউট্রিয়েন্টগুলি এমন যৌগ যা খাবারে প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায়, যা তাদের সাথে আবদ্ধ হয়ে পুষ্টির শোষণকে বাধা দিতে পারে।
উপরের এইসব এনজাইম প্রাণীদেহে নানাভাবে প্রভাব ফেলে। মানুষের মুখে খাবারের জন্য যে লালা অটোমেটিক তৈরি হয় তা ওই এনজাইমের পক্ষ থেকেই আসে। এটি খাদ্যবস্তুকে গলিয়ে হজমে সাহায্য করে। সাপের Enzyme (উৎসেচক) সবচেয়ে বেশি থাকার কারণে সাপ অতি দ্রুত যেকোনো বড় খাবার সহজে গিলে ফেলতে পারে তার এই ক্ষমতার মাধ্যমে। বিভিন্ন মৌল বা আয়ন উৎসেচকের কো-ফ্যাক্টর রূপে কাজ করে উৎসেচকের ক্রিয়াকে ত্বরন্বিত করে।
তথ্যসূত্র:
- ডাক্তার মুজিবুর রহমান এম. ডি কার্ডিয়লজিস্ট, ফাউন্ডার ভেন্টেজ ন্যাচারাল হেল্থ সেন্টার, থাইল্যান্ড।
- মো. মিকাইল ইসলাম নিয়ন, সহকারী শিক্ষক (ভৌতবিজ্ঞান), ঝিনুক মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, চুয়াডাঙ্গা, কালের কণ্ঠ।
- তামজিদ হোসেন, যায়যায়দিন।
- উইকিপিডিয়া।
- healthline.com
- liveeatlearn.com
- alphafoodie.com
- Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই