খাদ্যে থাকা চিনির উৎস সম্পর্কে জানুন এবং খাওয়ার পরে সঠিকভাবে ব্রাশ করুন:
চিনির বহুবিধ স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে। অনেক অসুখবিসুখের মতো দাঁতে ক্যারিজ বা ক্ষয়রোগের জন্যও সবচেয়ে বেশি দায়ী এই চিনি। বিভিন্নভাবে চিনি খাই আমরা। সব সময় যে জেনেশুনে খাই তা নয়। যেমন—পিজা বা পাউরুটি। এতে চিনি থাকে। বাজার থেকে আনা সব ধরনের বেকারি পণ্যেই চিনি থাকে। আইসক্রিম, চকোলেট, চিপস, কেক—এগুলোতে চিনি আছে তা তো সবারই জানা। এই চিনি যখন দাঁতের গায়ে লেগে থাকে, তা মুখের ভেতরে থাকা ব্যাকটেরিয়ার জন্য খাবারের ভালো উৎস। এই চিনি থেকেই ব্যাকটেরিয়া অর্গানিক এসিড উত্পন্ন করে। যখন চিনি খাওয়া হয়, তখন এমনিতেই মুখের ভেতরে এসিডিটির মাত্রা বেড়ে যায়। এনামেল ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। সহজেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। আবার সব রকম চিনিই একই ধরনের ক্ষতিকর নয়। উচ্চমাত্রার চিনি থাকে প্রক্রিয়াজাতকৃত খাবারে। যতই বলা হোক সুগার ফ্রি, আসলে এসব খাবারে রিফাইন্ড চিনি থাকে। এ ধরনের চিনি থাকে ক্যান্ডি, সিরিয়াল, কোলা ও বিস্কুটে। অন্যদিকে প্রাকৃতিক উৎস থেকে আসা খাদ্যগুলোতে স্বল্পমাত্রার চিনি ও উচ্চমাত্রার ফাইবার থাকে। যেমন—সবজি ও ফলমূল। এগুলোতে চিনি থাকে গ্লুকোজ, ফ্রুকটোজ, সুক্রোজ—এই ফর্মে, যা কম ক্ষতিকর। আবার উচ্চমাত্রার ফাইবার থাকে বলে হজমও হয় দেরিতে। চিনিরই আরেকটি ধরন স্টার্চ। এটিও মূলত উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে আসে। এগুলোর মধ্যে আছে শিম, কলা ইত্যাদি। পরিমিত পরিমাণে খেলে এগুলো দাঁতের জন্যও ভালো, শরীরের জন্য তো বটেই।
 |
| অনেকে একই টুথপেস্ট বছরের পর বছর ব্যবহার করেন। তা না করে বিভিন্ন কম্পানির টুথপেস্ট ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ব্যবহার করুন। |
কিন্তু কোমল পানীয়, সোডা, বাজার থেকে কেনা প্যাকেটজাত ফলের জুস, স্পোর্ট ড্রিংকস, এনার্জি ড্রিংকস-এগুলোতে প্রচুর চিনি থাকে। শহুরে মানুষ এগুলো বেশি পান করে। আবার গ্রামের দিকেও যে ধরনের জুস, এনার্জি ড্রিংকস পাওয়া যায়, তাতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানও নিয়ন্ত্রণ করা থাকে না।
খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করলেই যে ক্যারিজ হয়ে যাবে, তা নয়। যথাযথভাবে পরিষ্কার করলে ক্যারিজের হাত থেকে রক্ষা পাওয়াও সম্ভব। এ জন্য অন্তত দুই বেলা ভালো মানের টুথব্রাশ ও টুথপেস্ট দিয়ে ব্রাশ করতে হবে। প্রতিবেলা খাবারের পর দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা খাদ্যকণা পরিষ্কার করতে ফ্লস করতে হবে। এ ছাড়া দাঁতের ওপরের দিকে থাকা ছোট ফিসারগুলো ফিসার সিল্যান্ট দিয়ে ভরাট করে দিতে হবে। এ জন্য ডেন্টিস্টের কাছে যেতে হবে।
সঠিকভাবে, সময় মত, কুলি এবং মেসওয়াক/ব্রাশ করুন;
খাবার খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দাঁত ব্রাশ করতে নেই। খাওয়ার সময় মুখের ভেতর লালা এসে খাদ্যবস্তু খানিকটা নরম করে দেয়। তখন মুখের ভেতর এসিডিক পরিবেশ তৈরি হয়। এই এসিডের কারণে এনামেল নরম হয়ে যায়। খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রাশ করলে এই নরম এনামেল ক্ষয়ে যায়। কিন্তু কিছু সময় (৩০-৬০ মিনিট) পর ব্রাশ করলে তা হয় না। কারণ ততক্ষণে লালার ভেতরে থাকা রাসায়নিক উপাদান এনামেলকে আবার শক্ত করে ফেলে।
- দিনে/রাতে অন্তত পাঁচবার নামাজের ওযু করার আগে (জয়তুন, নিম, আম, ইত্যাদি গাছের ডাল দিয়ে) মিসওয়াক/ব্রাশ করাটা অত্যন্ত জরুরি।
- খাওয়ার পর ভালো করে কুলিকুচি করে মুখ ধুয়ে নিন এবং সারাদিনে অন্তত ৩ থেকে ৪বার হাল্কা গরম পানি ও লবণ দিয়ে কুলিকুচি করুন।
- সকালবেলা নাস্তার পরে এবং রাতে শোওয়ার আগে ব্রাশ করাটা জরুরি, এরপর শুধুই পানি ছাড়া কিছু খাওয়াটা ঠিক নয়। অন্য কিছু খাইলেও আবার ব্রাশ করতে হবে। ব্রাশের উল্টাপিঠ (হালকা খাজ কাটা অংশ) দিয়ে জিহ্বা টাকে ভালো করে ঘষে নিবেন এবং সবশেষে ব্রাশ, মুখ, এবং জিব্বা ভালো করে ধুয়ে নিবেন।
- সবসময় উন্নতমানের টুথপেস্ট এবং টুথব্রাশ ব্যবহার করুন। সস্তার ১০-১৫ টাকা দামের ব্রাশ কিনে ভাবছেন টাকা বাঁচিয়ে ফেললেন! কিন্তু দাঁতের ক্ষতির কারণে যে আপনাকে হাজার হাজার টাকা খরচ করতে হবে সে কথা কি ভেবেছেন? এই ব্রাশগুলোর ব্রিসল অনেক শক্ত হয়ে থাকে যা দাঁতের উপরের এনামেলের ক্ষতি করে। তাই দাম দিয়ে হলেও একটু নামী ব্র্যান্ডের ভাল নরম ব্রিসলের ব্রাশ ব্যবহার করুন ।
- ব্রাশ করার সময় দাঁতের উপর খুব বেশি চাপ দেবেন না। অনেকে মনে করে জোরে জোরে চাপ দিয়ে ব্রাশ করলে তবেই দাঁতের ময়লা দ্রুত পরিষ্কার হবে । আর এতেই ক্ষতিটা হয় বেশি। খুব বেশি জোরে চাপ দিয়ে ব্রাশ করতে গেলে দাঁতের এনামেল নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
- অতিরিক্ত সচেতন মানুষ দাঁতের সুরক্ষায় খাওয়ার পর পরই দাঁত ব্রাশ করে ফেলেন যা উল্টো দাঁতের ক্ষতিই করে বেশি। খাওয়ার পর পরই বিশেষ করে অ্যাসিডিক খাবার ও ফলমূল খাওয়ার পর দাঁত ব্রাশ করলে দাঁত ক্ষয় হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে যায়। খাওয়ার পরপর কুলকুচি করে, খাওয়ার অন্তত ৩০ থেকে ১ ঘণ্টা পর দাঁত ব্রাশ করাটাই সঠিক পদ্ধতি।
- অনেকেরই ধারণা অনেকটা সময় ধরে ব্রাশ করলে ভাল করে দাঁত পরিষ্কার হবেই কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভুল একটি ধারণা। প্রতিটা জিনিসেরই একটি নির্দিষ্ট সময় রয়েছে। ২ মিনিটের বেশি দাঁত ব্রাশ করা দাঁতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ।
- দাঁতের সৌন্দর্যের জন্য ৪৫ ডিগ্রী অ্যাঙ্গেল করে ব্রাশ করুন। মুখের ভিতরের সবকোনায় ব্রাশ পৌঁছান। ব্রাশকে (উপরে নিচে) উল্লম্বভাবে ব্যবহার করুন। ডানে বামে বা সোজাসুজি ভাবে ব্রাশ করলে আপনার দাঁতের ফাঁকে ফাঁকে খাদ্যের ছোট ছোট কণা আরও বেশি করে জমে গিয়ে আপনাকে বিপাকে ফেলতে পারে। সুতরাং দাঁতের আয়ু বাড়াতে সতর্ক হয়ে ব্রাশ করুন সঠিক পদ্ধতি মেনেই।
ব্রাশ এবং দাঁতের যত্ন।
দাঁতের স্বাস্থ্যের জন্য আমরা মাঝে মাঝে মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করে থাকি। থ্যারাপিউটিক এবং কসমেটিক উভয় ধরনের মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করা হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এলকোহল যুক্ত মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করা ঠিক নয়। দাঁত ব্রাশ করার পর পর মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করা যাবে না। দাঁত ব্রাশ করার কমপক্ষে ৩০ মিনিট পর মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করতে হবে। কারণ টুথপেস্টে যে ট্রাইক্লোসান থাকে তা ৩০ মিনিট পর্যন্ত বাঁধা দেয় দাঁতে কোনো কিছু লেগে থাকার জন্য। কিন্তু অনেককে দেখা যায় দাঁত ব্রাশ করার পর পর মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করে থাকেন। এতে মাউথ ওয়াশের কার্যকারিতা কমে যায়। অসুস্থ অবস্থায় একজন মানুষ যখন টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করতে পারে না, তখন মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করা যায়।
কৃত্রিম দাঁত পরিষ্কার করার সময় টুথব্রাশ দিয়ে স্বাভাবিক দাঁতের মত পরিষ্কার করতে হবে। কৃত্রিম দাঁত পরিষ্কার না করলে দাঁতে এবং মুখে বিভিন্ন রোগ এবং ছত্রাক সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। মাঝে মাঝে দেখা যায় কৃত্রিম দাঁত পাশের দুই দাঁতের সাথে ফিক্সড করে লাগিয়ে দেওয়া হয়। সাধারণত হাতুড়ে ডাক্তাররা ক্ষতিকর ক্যামিকেল দিয়ে এসব লাগিয়ে থাকেন। এতে করে পাশের দুই দাঁত নষ্ট হওয়া সহ রোগির মুখে ক্যান্সার হতে পারে। এসব বিষয়ে সাধারণ জনগণকে সচেতন করে তুলতে হবে।
আঁকাবাঁকা দাঁতের চিকিৎসা করার সময় দাঁতের উপরিভাগে ব্রেস পড়ানো হয়ে থাকে। ব্রেস পড়ানোর কারণে অধিক পরিমাণে খাদ্যকণা দাঁতে জমে থাকতে পারে। এসব পরিষ্কার করার জন্য আঁকাবাঁকা চিকিৎসা চলাকালীন সময়ে বিভিন্ন ডিজাইনের এবং বিভিন্ন আকৃতির ছোট ছোট ব্রাশ পাওয়া যায়। এসব ব্রাশ দিয়ে চিকিৎসা শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিয়মিত দাঁত পরিষ্কার করতে হবে। তা না হলে অনেকগুলো দাঁতে ক্যারিজ হতে পারে। দাঁতের ব্রিজ বা ইমপ্ল্যান্ট করা হলে পাশের দাঁতগুলো পরিষ্কার রাখতে হবে। ব্রিজের ক্ষেত্রে পাশের দাঁতগুলো না রাখলে পেরিওডন্টাল রোগ হয়ে ব্রিজ অকার্যকর হয়ে উঠতে পারে। ইমপ্ল্যান্ট এর ক্ষেত্রে একইভাবে পরিষ্কার রাখতে হবে। পরিষ্কার না রাখলে চারপাশের টিস্যুগুলো রোগাক্রান্ত হয়ে ইমপ্ল্যান্ট ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সম্ভাবনা কম হলেও অসম্ভব কিছু নয়।
দাঁতের যত্নে শুধু মাত্র ব্রাশ করলেই হবে না বরং জনগণকে বোঝাতে হবে দুই দাঁতের মধ্যবর্তী স্থানে ব্রাশ করার মাধ্যমে পরিষ্কার রাখার জন্য। একজন রোগি আসলে দেখা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুই দাঁতের মাঝখানে ক্যারিজ নিয়ে এসেছে। শুধু মাত্র দুই দাঁতের মাঝখানে সঠিকভাবে পরিষ্কার করলে দন্তক্ষয়ের পরিমাণ অনেক কমে আসবে। মাউথ ওয়াশ যে সব সময় ব্যবহার করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। তবে মাড়ি রোগে অথবা দাঁতের স্কেলিং করার পর ক্লোরোহেক্সিডিন মাউথ ওয়াশ কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে।
নবজাতকের দাঁতের যত্নে তুলা অথবা গজ দিয়ে মাড়ি পরিষ্কার করে দিতে হবে। অন্যথায় ছত্রাক সংক্রমণ দেখা দিবে। শিশু মায়ের দুধ খাওয়ার পর দাঁত পরিষ্কার করে দিতে হবে অথবা দুধের বোতলে কিছুটা পানি পান করালে দাঁত পরিষ্কার হয়ে যাবে। অন্যথায় নার্সিং বোতল ক্যারিজ দেখা দিবে। এতে করে অনেকগুলো দাঁতে একসাথে ক্যারিজ দেখা দিতে পারে। শিশু একটু বড় হলে বেবি টুথব্রাশ ব্যবহার করা উচিৎ।
বড়দের ক্ষেত্রে পরিবারের সবার টুথব্রাশ একসাথে রাখা উচিৎ নয়। কারণ এতে করে ছত্রাক সংক্রমণ সহ করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে। টুথব্রাশ হোল্ডার নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। কারণ টুথব্রাশ হোল্ডারে লক্ষ লক্ষ জীবাণু বসবাস করে। পরিবারের সবার টুথব্রাশগুলো আলাদা আলাদা ভাবে রাখা উচিৎ।
দাঁত ব্রাশে আমরা যে ৭টি ভুল করি:
সঠিক নিয়মে ব্রাশ করা দাঁতকে সুস্থ রাখে।
দাঁত ব্রাশের একটি প্রধান কারণ হচ্ছে ক্ষয় রোধ করা। তবে শুধু ব্রাশ করলেই চলবে না। এর কিছু সঠিক পদ্ধতি রয়েছে, যা মেনে না চললে মাড়ি এবং দাঁতের ক্ষতি হতে পারে। এ ছাড়া বেশির ভাগ লোকই ব্রাশের জন্য বেশি সময় ব্যয় করে না।
কাজের চাপ বা দেরিতে ঘুম থেকে ওঠার কারণে অনেক সময়েই বেশি হলে এক-দেড় মিনিট দাঁত ব্রাশ করি আমরা। ডেনটিস্টরা বলেন, দুই থেকে তিন মিনিট ধরে দাঁত ব্রাশ করা সবচেয়ে ভালো। দাঁত ব্রাশের সময় আমরা কিছু ভুল করি, যার কারণে দাঁত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে দাঁত ব্রাশের ক্ষেত্রে আমাদের সাতটি ভুলের কথা।
- ভালো করে দেখি না- দাঁত ব্রাশের সময় আমরা সাধারণত আয়নার দিকে ভালো করে খেয়াল করি না। অধিকাংশ সময় মাড়ি এবং জিহ্বা পরিষ্কারের কথা ভুলে যাই। এগুলো মুখের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর ফলে প্লাক, ব্যাকটেরিয়া তৈরি হতে পারে, যার ফলে মাড়ি সংক্রমিত হয়। তাই ব্রাশ করার সময় জিহ্বা ও মাড়ি ভালোভাবে দেখে পরিষ্কার করতে হবে।
- এলোপাতাড়ি ব্রাশ করা- আমরা অনেকেই এলোপাতাড়ি দাঁত ব্রাশ করি বা বুঝি না কীভাবে সঠিক নিয়মে দাঁত ব্রাশ করতে হয়। এর ফলে দাঁত নাজুক ও দুর্বল হয়ে পড়ে। ব্রাশের ব্রিসলকে ৪৫ ডিগ্রি করে ঘুরিয়ে ব্রাশ করতে হবে। ওপরের দাঁত পরিষ্কার করার সময় ব্রাশটি নিচের দিকে টানতে হবে, আর নিচের পাটি পরিষ্কারের সময় ওপরের দিকে টানতে হবে। সামনের অংশের পর ভেতরের অংশও ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে।
- জোরে ব্রাশ করা- অনেকে খুব শক্তভাবে বা জোরে দাঁত ব্রাশ করে থাকেন। নিয়মিত এই চাপের ফলে দাঁতের ওপরের এনামেল ক্ষয়ে গিয়ে ডেনটিন বেরিয়ে আসে। এটি মাড়িকেও স্পর্শকাতর করে তোলে এবং সমস্যা বাড়িয়ে দেয়। তাই এভাবে ব্রাশ করা চলবে না।
- ভুল ব্রাশ নির্বাচন- কেনার আগে অবশ্যই দেখে নিন ব্রাশটি নরম কি না। তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, সঠিক নিয়মে দাঁত ব্রাশ করা না হলে নরম ব্রাশও ব্যাকটেরিয়া রোধ করতে পারে না। তাই কোন ব্র্যান্ডের ব্রাশ কিনবেন এ বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন।
- দীর্ঘদিন একই ব্রাশ ব্যবহার- শুনতে অদ্ভুত শোনালেও এটাই সত্যি যে ট্রুথব্রাশই হতে পারে জীবাণুর স্বর্গ। এ কারণেই দীর্ঘদিন একই ব্রাশ ব্যবহার করা ঠিক নয়। কেননা ব্রিসলের মধ্যে ব্যকটেরিয়া বাসা বাঁধতে পারে। এর ব্যবহারে দাঁতের ক্ষতি হয়। তাই চিকিৎসকদের পরামর্শ, তিন মাস পরপর টুথব্রাশ বদলে ফেলুন। এ ছাড়া ব্রাশ ব্যবহারের পর একে গরম পানি দিয়ে ধুতে হবে এবং শুষ্ক রাখার চেষ্টা করতে হবে।
- ভুল টুথপেস্টের ব্যবহার- বেকিং সোডা আছে এমন টুথপেস্ট ব্যবহারে দাঁতের দাগ দূর হয়, তবে এটি কখনো কখনো এনামেলের জন্য ভালো নাও হতে পারে। তাই গবেষকদের মতে, দাঁত উজ্বল করবে এমন টুথপেস্ট কেনার আগে জেনে নিন এটি দাঁতের জন্য ভালো হবে কি না।
- ভালোভাবে ধুতে হবে- দাঁত ব্রাশের পর অনেকেই তাড়াহুড়ো করে কুলি করেন। ফলে মুখের ব্যাকটেরিয়া মুখেই থেকে যায়। তাই ব্রাশের পর ভালোভাবে পানি দিয়ে মুখ ধুতে হবে বা অ্যালকোহল নেই এমন মাউথওয়াশ ব্যবহার করতে হবে।
বাজারে প্রচলিত টুথপেস্ট এবং ব্রাশ সম্পর্কে সাবধান থাকুন:
দাঁত ও মুখের যত্নে সকালে নাস্তার পর এবং রাতে ঘুমানোর আগে একটি ভালো টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করতে হবে। ভালো টুথপেস্টের উপাদান সম্পর্কে সাধারণ জনগণের জানা খুবই জরুরী।
ফ্লোরাইডযুক্ত একটি টুথপেস্ট ব্যবহার করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে টুথপেস্টে ফ্লোরাইডের মাত্রা যেন ১০০০ - ১২০০ পি.পি.এম এর মধ্যে হয়। ফ্লোরাইরেডের পরিমাণ বেশি হলে দাঁতে ফ্লোরোসিস হয়ে থাকে। এতে করে দাঁত ভঙ্গুর প্রকৃতির হতে পারে। দাঁতে রঙের পরিবর্তন আসতে পারে। ফ্লুরাইড দাঁতের এনামেলকে শক্তিশালী করে, প্লাকের অ্যাসিড উৎপাদনক্ষমতাকে ধীর করে দিয়ে দাঁতের ক্ষয় রোধ করে। ক্যারিজ প্রতিরোধে ফ্লোরাইডের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। এনামেলের উপাদানের সঙ্গে ফ্লোরাইড মিশে শক্ত একটি প্রতিরোধী আবরণী তৈরি করে। ফ্লোরাইড কিছু খাবারে পাওয়া যায়, থাকে পানিতেও। আর ফ্লোরাইড থাকে টুথপেস্টে। কিছু খাবারে দাঁতের ক্যারিজ কম হয়। এ ধরনের খাবার হলো চিজ বা পনির। পনির খেলে পাকস্থলীর এসিডিটির মাত্রা কমে যায়। গরুর দুধও উপকারী। এতে থাকে ল্যাকটোজ, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, সেজেন। এর সবই ক্যারিজ প্রতিরোধে কাজ করে। কিন্তু রাতের বেলা ফিডারে করে শিশুকে দুধ দিলে তা ক্ষতি করবে। আবার যেসব শিশু মাতৃদুগ্ধ পান করে, তাদেরও ক্যারিজ কম হয়। চিনি ও দুধ ছাড়া ব্ল্যাক চা ও সবুজ চাও দাঁতের জন্য উপকারী। ডার্ক চকোলেট বা চিনি কম আছে—এমন চকোলেটেও ক্যারিজ কম হয়। তাই টুথপেস্ট কেনার আগে তাতে ফ্লুরাইড আছে কি না, তা দেখে নিতে পারেন।
প্রতিটি টুথপেস্টের দাঁত পরিষ্কার করার একটি ক্ষমতা থাকে। টুথপেস্টের আর.ডি.এ যে ৩০ - ৮০ এর মধ্যে থাকে। আর.ডি.এ বলতে বুঝায় রিলেটিভ ডেন্টিন এব্রেশন। এর মাত্রা ৩০ এর নিচে হলে দাঁত পরিষ্কার কম হবে। তবে টুথপেস্টের আর.ডি.এ এর মাত্রা ১৫০ এর বেশি হলে দাঁতের এনামেল এবং ডেন্টিন ক্ষয় হয়ে যাবে। তাই এসব বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে।
টুথপেস্টে এন্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান ট্রাইক্লোসান রয়েছে। সেনসোডাইন টুথপেস্টে ট্রাইক্লোসান থাকে না। ট্রাইক্লোসান জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করে থাকে। তবে খেয়াল রাখতে হবে টুথপেস্টে ট্রাইক্লোসানের পরিমাণ যেন বেশি না হয়। বেশি হলে শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ব্যহত হতে পারে- বিশেষ করে মুখে। টুথপেস্টে ট্রাইক্লোসান থাকলেও এফডিএ এন্টিব্যাকটেরিয়াল সাবানে ট্রাইক্লোসান সংযোজনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ত্বকে সরাসরি সংযোগের কারণে ত্বকের প্রদাহ, কন্টাক্ট ডার্মাটাইটিস সহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করে থাকে। যাই হোক আমরা টুথপেস্ট এর আলোচনায় ফিরে যাই। ট্রাইক্লোসান মাড়ির প্রদাহ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার সাথে যুদ্ধ করতে সাহায্য করে থাকে। যাদের মাড়ি রোগ আছে তারা ট্রাইক্লোসান সমৃদ্ধ টুথপেস্ট ব্যবহার করতে পারেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টুথপেস্ট কলগেট টোটাল একটি আদর্শ ট্রাইক্লোসান সমৃদ্ধ টুথপেস্ট।
টুথপেস্টের আরেকটি উপাদান এসএলএস বা সোডিয়াম লরিল সালফেট। সোডিয়াম লরিল সালফেট এর কারণে টুথপেস্টের ফেনা উৎপন্ন হয়ে থাকে। এসএলএস যুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহার করলে অথবা এসএলএস এর পরিমাণ বেশি হলে মুখে আলসার বা ঘাঁ দেখা দেয়। তাই মুখের স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে টুথপেস্ট ব্যবহার করতে হবে।
দাঁতের সংবেদনশীলতা বা শিরশিরানি ভাব উপশমের মূল উপাদান হলো পটাশিয়াম নাইট্রেট, স্ট্যানাস ফ্লোরাইড এবং স্ট্রন্টিয়াম ক্লোরাইড। টুথপেস্টের সক্রিয় উপাদান দাঁতের স্নায়ুগুলো শান্ত করতে সাহায্য করে এবং গরম বা ঠান্ডা খেলে শিরশিরানি ভাব কম করে। তাই যাদের দাঁতে শিরশিরানির সমস্যা রয়েছে, তারা অন্য টুথপেস্ট ব্যবহার না করে এই উপাদান সমৃদ্ধ টুথপেস্ট ব্যবহার করুন।
যাদের দাঁতে খাবার জমে থেকে দাগের সৃষ্টি হয়েছে, তারা অ্যাবরেসিভ সমৃদ্ধ টুথপেস্ট ব্যবহার করুন। কারণ, অ্যাবরেসিভের কাজ হলো দাঁতের এনামেল নষ্ট না করে, আলতো করে দাঁতের ওপর দিক স্ক্রাব করে ময়লা অপসারণ করা। তাই জমে থাকা ময়লা এবং দাগ দূর করতে অ্যাবরেসিভ সমৃদ্ধ টুথপেস্ট ব্যবহার করুন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যাবরেসিভ সমৃদ্ধ টুথপেস্ট সবসময় হালকা প্রকৃতির হওয়া উচিত। এ ধরনের পেস্টে উপাদান হিসেবে আরও থাকা উচিত ক্যালশিয়াম কার্বনেট, ডিহাইড্রেটেড সিলিকা জেল এবং হাইড্রেটেড অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড।
অনেকেরই এই পেস্টের স্বাদ ও গন্ধ পছন্দ নয়। তাই অনেক কোম্পানি মিষ্টি স্বাদের জন্য টুথপেস্টে স্যাকারিন ও সরবিটল যোগ করে। তাই খেয়াল রাখবেন আপনার কেনা টুথপেস্টে এর পরিমাণ বেশি কি না। কেননা, বেশি পরিমাণে চিনি থাকা টুথপেস্ট আপনার দাঁতের সুরক্ষা নয়; বরং ডেকে আনে মারাত্মক ক্ষতি।
বিভিন্ন রঙের টুথপেস্ট এবং এর সাথে মুখের ঘা এর সম্পর্ক:
মানসিক চাপ ও চলমান সামাজিক অস্থিরতার কারণে মুখের আলসার প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কারণ মুখের সবগুলো আলসারের প্রকৃত কারণ এখনও অজানা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং জেনেটিক কারণে মুখের আলসার হয়ে থাকে। অনেক সময় দেখা যায় উন্নত চিকিৎসা প্রদানের পরও রোগীর মুখে আলসার বা ঘাঁ বারবার দেখা যায়। এক্ষেত্রে আমরা একবারও ভাবি না বা লক্ষ করি না কোন্ টুথপেষ্ট রোগী ব্যবহার করছে। কারণ টুথপেষ্টের রসায়নের কারণে মুখের আলসার ভাল নাও হতে পারে।
টুথপেষ্টের মন্দ রাসায়নিক উপাদানের একটি হলো সোডিয়াম লরিল সালফেট যা দেখতে সাদা বা ক্রিম রঙের হয়ে থাকে। সোডিয়াম লরিল সালফেট বা এস.এল.এস একটি ডিটারজেন্ট যা টুথপেষ্ট, সেভিং ক্রিম, শ্যাম্পু, হেয়ার কন্ডিশনার, বডিওয়াশ ইত্যাদি প্রসাধন সামগ্রীতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এস.এল.এস এর কারণেই টুথপেষ্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করার সময় ফেনা উৎপন্ন হয়ে থাকে। এস.এল.এস কে টুথপেষ্টের ফোমিং এজেন্টও বলা হয়। টুথপেষ্টের অতিরিক্ত ফেনা দেখে আনন্দিত হবার কিছুই নেই। এস.এল.এস ত্বকে এলার্জিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে থাকে। এর সাথে কারো যদি এলার্জি থাকে তাহলে এলার্জিক মুখের আলসার দেখা দিয়ে থাকে।
আপনার দাঁত ও ওরাল মিউকোসার ধরণ দেখেই নির্ধারণ করতে হবে কোন টুথপেষ্ট আপনার জন্য ভাল। টুথপেষ্টের গায়ে সাংকেতিক চিহ্ন এবং উপাদান দেখে টুথপেষ্ট ব্যবহার করা উচিৎ। টুথপেষ্ট কিভাবে তৈরী করা হয়েছে তা বুঝা যায় টুথপেষ্টের গায়ে নিচের দিকে চারকোনা চিহ্নের রঙ দেখে।
(ক) সবুজ রঙ: টুথপেষ্টের গায়ে সবুজ রঙের চারকোনা চিহ্ন থাকলে বুঝতে হবে এটি ন্যাচারাল টুথপেষ্ট। সবুজ রঙের চিহ্নযুক্ত টুথপেষ্ট মুখের আলসার রোগীদের জন্য সবচেয়ে ভালো। কারণ এটি ব্যবহারের ফলে সাধারণত কোনো এলার্জিক প্রতিক্রিয়া হয় না।
(খ) নীল রঙ: টুথপেষ্টে নিচের দিকে নীল রঙের চারকোনা চিহ্ন থাকলে বুঝতে হবে ঐ টুথপেষ্ট ন্যাচারালের পাশাপাশি ওষুধ হিসাবেও ব্যবহারযোগ্য। উদাহরণ স্বরূপ লাল মাশরুম দিয়ে তৈরী গ্যানোফ্রেশ টুথপেষ্ট সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে তৈরী। আবার এই টুথপেষ্ট কারো মাথা ধরলে বাম হিসাবে ব্যবহার করা যায়। যাদের টুথপেষ্টে এলার্জি রয়েছে তারা নীল রঙের চিহ্নযুক্ত টুথপেষ্ট প্রাথমিকভাবে ব্যবহার করতে পারেন।
 |
| চিত্র: চারকোনা চিহ্নের নীল রঙ। |
(গ) লাল রঙ: টুথপেষ্টে লাল রঙের চারকোনা চিহ্ন থাকলে বুঝতে হবে সেই টুথপেষ্টটি প্রাকৃতিকভাবে তৈরী হলেও তাতে রাসায়নিক উপাদান রয়েছে।
(ঘ) কালো রঙ: টুথপেষ্টের গায়ে কালো রঙের চারকোনা চিহ্ন থাকলে বুঝতে হবে টুথপেষ্টটি সম্পূর্ণভাবে রাসায়নিক পদ্ধতিতে তৈরী করা হয়েছে। যাদের মুখে বারবার আলসার হয়ে থাকে তাদের কালো চিহ্নযুক্ত টুথপেষ্ট ব্যবহার না করাই ভালো।
দাঁতের শিরশিরভাব বা অতি সংবেদনশীল দূর করার জন্য আমরা বিভিন্ন টুথপেষ্ট ব্যবহার করে থাকি। তবে এসব টুথপেষ্ট দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহার করার ঠিক নয়। এসব টুথপেষ্টের উপাদানের মধ্যে থাকে পটাশিয়াম নাইট্রেট, স্ট্রোনটিয়াম ক্লোরাইড এবং অন্যান্য উপাদান যা দাঁতের নার্ভের ব্যথার নির্দেশনা বাধাগ্রস্থ করে থাকে। পটাশিয়াম নাইট্রেট তুলনামূলকভাবে নিরাপদ উপাদান যা ব্যবহার করা যায়। স্ট্রোনটিয়াম ক্লোরাইড জাপান সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কারণ এটি কসমেটিকে ব্যবহারের জন্য নিরাপদ নয়। তাই এক্ষেত্রে আমরা এস.এল.এস মুক্ত পটাশিয়াম নাইট্রেটযুক্ত টুথপেষ্ট একটি সীমিত সময়ের জন্য ব্যবহার করতে পারি। দাঁতের অতিসংবেদনশীলতার জন্য ব্যবহৃত টুথপেষ্টগুলো দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহার করা যায় না। দীর্ঘমেয়াদে এসব টুথপেষ্ট ব্যবহার করলে দাঁতের স্বাভাবিক উজ্জলতা নষ্ট হয়। এ ছাড়া মুখের অভ্যন্তরে মিউকাস মেমব্রেনের ক্ষতিসাধন হতে পারে।
আমরা টুথপেষ্ট ছাড়াও বিভিন্ন নামীদামী মাউথওয়াশ ব্যবহার করে থাকি। এমনকি সুগন্ধিযুক্ত মাউথওয়াশ ব্যবহার করে আত্মতৃপ্তি লাভ করে থাকি। সবার অবগতির জন্য জানা প্রয়োজন এসব মাউথওয়াশ ব্যবহারের কারণে যাদের বারবার মুখে আলসার হয়ে থাকে তাদের আলসার কখনোই ভালো হতে চায় না। কারণ এর কিছু উপাদান আলসার সারানোর ক্ষেত্রে বিঘ্ন সৃষ্টি করে থাকে। তবে হ্যাঁ, এসব মাউথওয়াশ কিছু নিয়ম-কানুনের মাধ্যমে ব্যবহার করলে তেমন ক্ষতি হয় না। তবে ব্যবহার না করে থাকতে পারলেই ভালো। অতএব, মুখের আলসারের চিকিৎসার জন্য মুখস্থ মলম, ভিটামিন, মাউথওয়াশ কোনো সমাধান তো দিবেই না বরং সাময়িকভাবে আলসার ভালো হতে পারে কিন্তু পরবর্তীতে মুখের আলসার ব্যাপকভাবে দেখা দেয় যা ভালো হতে সময় নেয় এমনকি যথাযথ উন্নত চিকিৎসা প্রদানের পরও। তাই মুখের চিকিৎসার ক্ষেত্রে যত্নবান হতে হবে এবং সুস্থ স্বাভাবিক সরল জীবন যাপন করতে হবে।
ভালো মানের টুথব্রাশ চেনার উপায়:
ডাক্তাররা সব সময় পরামর্শ দেন খাওয়ার পরে অবশ্যই ভালোভাবে দাঁত ব্রাশ করবেন। এতে খাওয়ার পরে মুখ ও দাঁতের মধ্যে থাকা জীবাণুকে সহজেই বের করা ফেলা যায়। মুখ পরিষ্কার রাখার ফলে দাঁতের ক্ষয়রোগ, গিংগিভিটিজ, পিরিওডন্টাল রোগ, হ্যালিটোসিস বা মুখের দুর্গন্ধ এবং অন্যান্য দন্তজনিত সমস্যা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
সচেতনভাবে দাঁত ব্রাশ করার পাশাপাশি নিয়মিত দন্তচিকিৎসকের মাধ্যমে দাঁত পরিষ্কার করলে দাঁতের ক্যালকুলাস বা টারটার এবং দাঁতে অবস্থানরত ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া দূরীভূত হয়। পেশাদারীভাবে দাঁতের পরিষ্কারের জন্য টুথ স্কেলিং করা হয়। এ পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতির প্রয়োগ দেখা যায়।
এছাড়াও, টুথব্রাশের সাহায্যে দাঁত পরিষ্কার রাখার উদ্দেশ্যই হচ্ছে দাঁতের আবরণ ও ফাঁকা জায়গায় অবস্থানরত ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াকে দূরে রাখা।
দাঁতের যত্নে দুই দাঁতের মধ্যবর্তী স্থানে পরিষ্কার করা অত্যন্ত জরুরী। কারণ দুই দাঁতের ফাঁকে খাদ্যকণা জমে থাকলে দাঁতে ক্যারিজ দেখা দিবে। দুই দাঁতের ফাঁকে পরিষ্কার করার জন্য ইন্টারডেন্টাল ব্রাশ ব্যবহার করতে হবে। ইন্টারডেন্টাল ব্রাশ ব্যবহার করলে দুই দাঁতের মাঝখানে খাবার জমে থাকবে না। দাঁতের যত্নে দাঁত ব্রাশ করার আগে ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করতে হবে। এটি দাঁত পরিষ্কার করার জন্য বিশেষ ধরনের সূতা। ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করার মাধ্যমেও দুই দাঁতের মধ্যবর্তী খাদ্যকণা সহজেই পরিষ্কার করা যায়। তবে ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করার সময় খেয়াল রাখতে হবে ফ্লস যেন মাড়িতে আঘাত না করে। মনে রাখতে হবে ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করা হয় দাঁতের জন্য। মাড়ির জন্য নয়। ভালোভাবে ডেন্টাল ফ্লস করার পর ভালো একটি টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করতে হবে।
বাজারে প্রচলিত অনেক ধরনের টুথব্রাশই আছে। আমরা অনেক সময় হিমসিম খেয়ে যাই কোনটা রেখে কোনটা কিনব। একটি ভালো টুথব্রাশ আপনার স্বাস্থ্য সুরক্ষায় যেমন কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে, তেমনি একটি নিম্নমানের টুথব্রাশ আপনার স্বাস্থ্যহানির কারণ হতে পারে। সৃষ্টি করতে পারে দন্ত ক্ষয় রোগ, মাড়ির প্রদাহ সহ বিভিন্ন রোগ।
তাই ভালো মানের টুথব্রাশ কেনার আগে যেসব বিষয়গুলো ভালোভাবে লক্ষ্য করা উচিত সেগুলো হলো-
- ব্রাশের সঙ্গে ‘হাইজেনিক ক্যাপ’ আছে কিনা সেটি লক্ষ্য করা। এটি একটি প্লাস্টিকের তৈরি আবরণ যা ব্রাশের ফিলামেন্ট গুলুকে ঢেকে রাখে।
- ব্রাশের ফিলামেন্টগুলো অবশ্যই নরম হতে হবে। ‘হার্ড ব্র্যাশ’ বা শক্ত টুথব্রাশ মাড়ির প্রদাহ ও দন্ত ক্ষয় রোগের অন্যতম প্রধান কারণ। দীর্ঘদিন এটি ব্যবহার করলে দাঁতের মাড়ি নিচের দিকে নেমে যাওয়া, দাঁত শির শির করা সহ বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হয়। এ সমস্যাগুলোর চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
- টুথব্রাশের ‘নেক’ বা ঘাড় এটি সোজা হলেই ভালো হয়। এটি বাঁকানো বা হেলানো থাকলে খুব একটা কাজে লাগে না।
- ‘হ্যান্ডেল’ বা যে স্থানটি ধরে আমারা ব্রাশ করি সেটি সহজেই হাতের মুঠোয় আসে এমন টুথব্রাশ ব্যবহার করা ভালো।
- ছয় সপ্তাহ পর আপনার ব্রাশটি ফেলে দিবেন। সাধারণত দেখা যায়, ছয় সপ্তাহের ভেতর ব্রাশের ফিলামেন্টগুলো ফেটে যায়। ব্যাটারি চালিত ব্রাশের কার্যকারিতা অনেক বেশি, তবে এটি সহজ লভ্য নয়। অবশ্যই ছয় মাস অন্তর অন্তর ডেন্টাল সার্জনের পরামর্শ নিবেন।
- অধিকাংশ দন্তবিশারদ বা ডেন্টিস্টগণ শক্ত প্রকৃতির টুথব্রাশের পরিবর্তে নরম ও নমনীয় প্রকৃতির টুথব্রাশ ব্যবহারের জন্য পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কেননা, শক্ত ক্ষুদ্র বা কুঁচি প্রকৃতির তন্তু দিয়ে তৈরি টুথব্রাশের ঘর্ষণে দাঁতের এনামেল নষ্ট হয়ে যায় এবং দাঁতের মাড়িকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর ফলে ব্যক্তির মনে যন্ত্রণাদায়ক, অসস্তিকর কিংবা বিরক্তিকর অনুভূতির সৃষ্টি হয়।
একই সঙ্গে দৈনিক চিনি এবং টক জাতীয় খাবারও কম গ্রহণ করা উচিত। খাদ্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দাঁতের সুস্থতা নিশ্চিত করা যায় ও দাঁতকে সুরক্ষা করার প্রধান উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ডেন্টিস্ট বা দন্তচিকিৎসকগণ পরামর্শ দেন যে, প্রতিদিন খাদ্য গ্রহণের পর সকালে কিংবা রাতে দু'বার নিয়মিতভাবে দাঁত ব্রাশ করতে হবে। এর ফলে দাঁতের গঠন সুন্দর ও মজবুত হবে এবং ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার হাত থেকে দাঁতের ক্ষয়রোধ করবে।
প্রতি তিন মাস অন্তর টুথব্রাশ পরিবর্তন করা উচিত। অবশ্য ওই সময়ের পূর্বেই টুথব্রাশ পরিবর্তন করা যেতে পারে। ফ্লুরাইডযুক্ত টুথপেস্ট বা মাউথওয়াশ ব্যবহার করা উচিত, যা দাঁতকে আরও সুরক্ষিত রাখবে।
এছাড়া প্রতি ছয় মাস পরপর ডেন্টিস্ট বা দন্তচিকিৎসকের নির্দেশমালা অনুসরণ করা উচিত।
দাঁতের জন্য ছোট ব্রাশ নাকি বড় ব্রাশ?
নিয়ম করে দাঁত ব্রাশ, কুলকুচা, জিব্বা মালিশ, মাড়ি মালিশ—দৈনন্দিন এই কাজগুলো করলেই দাঁত ভালো থাকবে, এমনটা ভেবে নেওয়ার কোনো কারণ নেই। এই কাজগুলো করার পরও দাঁতে সমস্যা হতে দেখা যায়। তাই দাঁতের সুস্থতায় কাজগুলো করলেই শুধু হবে না, করতে হবে ঠিকঠাকমতো।
শুধু দাঁত ব্রাশ করলেই হবে না, মানতে হবে সঠিক নিয়ম, করতে হবে ঠিকঠাকমতো। ডানে–বাঁয়ে করে দাঁত ব্রাশ করাটা ভুল প্রক্রিয়া। ওপর-নিচ করে দাঁত ব্রাশ করতে হবে দুই থেকে তিন মিনিট। অনেকেই ভাবেন, বড় হয়ে গেলেই বুঝি বড় ব্রাশ ব্যবহার করতে হবে, তা কিন্তু নয়। খেয়াল রাখতে ব্রাশটি মাড়ির শেষ সীমানা পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে কি না। আর সেটা বেবি টুথ ব্রাশ হলেও অসুবিধা নেই। তবে ব্রাশ কেনার আগে খেয়াল রাখতে হবে, ব্রাশের ওপরের অংশটি যেন নরম হয়। শক্ত হলে মুখের চামড়ার ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তিন মাস পরপর অবশ্যই টুথ ব্রাশ বদলে ফেলতে হবে।
তথ্যসূত্র:
- ডাক্তার আইরিন খাতিজা, ডেন্টাল সার্জন, BDS স্পার্কল ডেন্টিস্ট্রি, Health Care Bangla Tv.
- ডা. এম আই আকাশ, রিসেন্ট ডেন্টাল হেলথ, হাতিরপুল, ঢাকা, কালের কণ্ঠ।
- ডাঃ মোঃ ফারুক হোসেন, ইমপ্রেস ওরাল কেয়ার, বর্ণমালা সড়ক, ইব্রাহিমপুর, ঢাকা,
- ডাঃ মোঃ ফারুক হোসেন, মুখ ও দন্তরোগ বিশেষজ্ঞ,
- দৈনিক ইনকিলাব।
- সময় টিভি।
- নিউজ ১৮ বাংলা।
- সুরাইয়া নাজনীন, প্রথম আলো।
কোন মন্তব্য নেই