জ্বর হলেই ঔষধ নয়
চারদিকে অনেকেই জ্বরে আক্রান্ত। কারও ফ্লু, কারও ডেঙ্গু, কারও আবার চিকুনগুনিয়া। এমনিতে জ্বর কিন্তু খারাপ নয়। শরীরের যেকোনো সংক্রমণ বা প্রদাহের বিপরীতে প্রথম প্রতিরোধব্যবস্থা হলো জ্বর।
শরীরের তাপমাত্রা ৯৯ ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপর গেলে জ্বর হয়েছে বলে ধরা যায়। জ্বর হলেই যে ডাক্তারের কাছে ছুটতে হবে বা ওষুধ খেয়ে জ্বর নামাতে হবে, ব্যাপারটি তা নয়। বেশির ভাগ জ্বরই ভাইরাসজনিত। এতে কোনো ওষুধ লাগে না। এমনিতেই পাঁচ থেকে সাত দিন পর সেরে যায়।
জ্বর নামাতে শরীরের নিজস্ব কৌশল আছে। কাঁপুনি ও শীত শীত অনুভূতির মাধ্যমে জ্বর আসে। এরপর ঘাম দিয়ে ছেড়ে যায়। এ সময় শরীর বাড়তি তাপমাত্রা হারায়।
জ্বরে কাবু হলে বাড়িতে কিছু কৌশলের মাধ্যমে নামানোর চেষ্টা করতে পারেন। এতে কাজ না হলে সাধারণ প্যারাসিটামল-জাতীয় ওষুধ খাওয়া যায়। তবে চিকিৎসককে না জানিয়ে কখনোই দোকান থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাবেন না। অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেন-জাতীয় ওষুধও না। তাহলে আসুন জেনে নিই বাড়িতে আমরা কী ব্যবস্থা নিতে পারি।
১. খুব জ্বর এলে হালকা গরম পানি দিয়ে গোসল করে নিতে পারেন। পানির তাপমাত্রা আপনার শরীরের তাপমাত্রার চেয়ে দুই ডিগ্রি কম হবে। বাথটাবে বা ঝরনার ধারায় গোসল করা ভালো। বাড়তি তাপমাত্রা পানিতে চলে যাবে। ১৫ থেকে ২০ মিনিটের বেশি ভিজবেন না। গোসল সেরে দ্রুত শুকনো তোয়ালে দিয়ে পানি মুছে নিন। বিছানায় কাঁথা বা কম্বলের নিচে ঢুকে পড়ুন। দেখবেন একটু পর ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে যাচ্ছে।
২. I-) জ্বর হলে রোগীর পুরো শরীর স্পঞ্জিং (ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে দেওয়া) করিয়ে দিতে হবে। টানা প্রায় ১০ মিনিট অবিরাম স্পঞ্জিং করলে তাপমাত্রা কমে যেতে পারে। তবে যাদের অতিরিক্ত ঠান্ডা লাগা বোঝা যাবে, যেমন কাশি ও বুকের মধ্যে ঘড়ঘড়ে ভাব দেখা দিলে তাদের স্পঞ্জিং করার সময় বুকে যাতে ঠান্ডা না লাগে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তাদের ঠান্ডা পানি মোটেও খাওয়া যাবে না। তাদেরকে গরম পানি মিশিয়ে খাওয়ানো ভালো। স্পঞ্জিং করার সময় হালকা করে ফ্যান ছেড়ে রাখতে পারেন। আবার খেয়াল রাখতে হবে যাতে বাতাস রোগীর শরীরে যেনো ডাইরেক্ট না লাগে।
II-) গোসল সম্ভব না হলে শরীরের ত্বক স্পঞ্জ করতে পারেন। পরিষ্কার সুতির পাতলা কাপড় গামলার পানিতে ভিজিয়ে চিপে নিন। পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকবে (গরম বা বরফ-ঠান্ডা নয়)। এবার এই ভিজে কাপড় দিয়ে সারা শরীর মুছে নিন। ভেজা কাপড় দিয়ে মোছার পর শুকনো কাপড়ের সাহায্যে পানি মুছে নিন। জ্বর না কমা পর্যন্ত এটা করতে থাকুন।
III-) রোগীর হাত এবং পায়ের তলা মুছে দিতে হবে। এতে রোগী স্বস্তি অনুভব করবে ।
৩. জ্বরের মধ্যে ভেষজ চা যেমন হারবাল চা এবং গ্রিন চা বেশ কাজে দেয়। চায়ের মধ্যে এক টুকরো আদা, এলাচি, লবঙ্গ বা খানিকটা মধু মিশিয়ে এই হারবাল চা তৈরি করা যায়।
তবে আপনি যদি শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ান, তবে ভেষজ চা খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সর্বোপরি জ্বর সারাতে নিজের শরীরের যত্ন নিন।
৪. জ্বর হলে শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়ে। তাই প্রচুর পানি ও তরলজাতীয় খাবার খেতে হবে। নয়তো জিব শুকিয়ে যাবে। প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাবে বা গাঢ় হয়ে যাবে। তাই জ্বর হলে দিনে দুই থেকে আড়াই লিটার পানি পান করুন। বুকে একবার কফ জমে গেলে তা বের করা কঠিন। এমনকি ইনফেকশনও হতে পারে। তাই সর্দি-কাশির সময় কোনোভাবেই যেন বুকে কফ না বসে, সে জন্য খেতে হবে প্রচুর পরিমাণে তরল খাদ্য। শুধু পানি খেতে হবে না। খেতে পারেন গরম জুস বা স্যুপ জাতীয় খাবার, এটা খেলে খেলেও দেখবেন ঘাম হচ্ছে এবং জ্বর নেমে যাচ্ছে। এক কাপ পানিতে দুই চামচ আপেল সিডার ভিনেগার ও এক চামচ মধু মিশিয়ে দিনে দু-তিনবার পান করুন। এটি শরীরের তাপমাত্রা বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে।
৫. জ্বর হলে শরীরের বিপাকক্রিয়া বাড়ে। তাই বাড়তি ক্যালরির প্রয়োজন হয়। অনেকে জ্বর হলে কিছু খাবেন না বলে ঠিক করেন। এতে নিজেরই ক্ষতি। অল্প হলেও পুষ্টিকর কিছু খেতে হবে। জ্বরের রোগীর পথ্য বলে আসলে কিছু নেই। সবই খাওয়া যায়। তবে তেল-মসলাযুক্ত খাবার হজম করতে কষ্ট হয়। বিপাকে ক্যালরিও বেশি খরচ হয়। তাই সহজপাচ্য খাবারই ভালো। সবজি মেশানো জাউভাত, পরিজ, ওটমিল, স্যুপ যেমন টমেটো ও গাজরের স্যুপ ইত্যাদি যথেষ্ট পুষ্টি জোগাবে। ফলের রস বা ফল খেতে চেষ্টা করুন। বিশেষ করে ভিটামিন সি-যুক্ত ফল, যেমন: কমলা, মালটা, লেবু, জাম্বুরা, আনারস ইত্যাদি। ভিটামিন সি রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করবে।
চালের সুজি- জ্বরের সময় আরেকটি উপকারী খাবার হলো চালের সুজি, সঙ্গে সামান্য আদাকুচি ও সিদ্ধ করা সবজি।
৬.বিশ্রাম নিন ফ্লু অনেক সময় ছোঁয়াচে হতে পারে। আপনার ফ্লু যেন অন্য কাউকে আক্রান্ত না করে তার জন্য ঘরেই বিশ্রামে থাকুন। এ ছাড়া বিশ্রামে থাকলে সংক্রমণের আশঙ্কা কমে। এ সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমিয়ে নিন। ঘুম ভাঙলে দেখবেন শরীর অনেক চাঙ্গা লাগছে।
৭.ভিটামিন সি বেশি করে খান যা আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। শরীরে ভিটামিনের অভাব হলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন বাইরের রোগজীবাণু সহজেই আক্রমণ করতে পারে। ফ্লুও হতে পারে। ফ্লুকে কমাতে হলে ভিটামিন সি খাওয়া জরুরি। কিছু খাবারে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ বি ও সি। খাবারের একটি সঠিক তালিকা তৈরি করার চেষ্টা করুন। যাতে শরীরে সবধরনের ভিটামিন ঠিকমত প্রবেশ করতে পারে।
৮. রোগীকে একটু খোলা জায়গাতে রাখতে হবে যাতে করে রোগী আরও দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবে ।
জ্বর ১০৫ ডিগ্রির ওপর উঠে গেলে অনেক কাশি, পেটব্যথা, প্রস্রাবে জ্বালা, বেশি বমি হলে, জ্বরের ঘোরে অসংলগ্ন আচরণ করলে বা অচেতনের মতো হলে অবশ্যই দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি। এক সপ্তাহের বেশি জ্বর থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ দরকার।
৯. এছাড়াও শরীর ব্যথায় পথ্য হিসেবে প্যারাসিটামল জাতীয় ঔষধ গ্রহণ করা যেতে পারে।
তথ্যসূত্র:
- Prof.Dr M Mojibul Haque, PHD, ND, FDM Consultant (Natural Integrative and Functional Medicine) The Center of Integrative Medicine LLC Texas USA.
- Wikipedia .
- প্রথম আলো।
- স্বাস্থ্য বিষয়ক ওয়েবসাইট বোল্ডস্কাই থেকে যুগান্তর।
- স্বাস্থ্য বিষয়ক ওয়েবসাইট হেলথ জার্নাল থেকে
- বাংলাদেশ প্রতিদিন।
- NTV .
- Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই