জ্বর হলে কি কি করণীয়?
জীবনে জ্বরে আক্রান্ত হননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কিন্তু এ জ্বর খুব সাধারণ থেকে গুরুতর হতে পারে। আজ আমরা এ বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছ থেকে বিস্তারিত জানব।
এনটিভির নিয়মিত স্বাস্থ্যবিষয়ক অনুষ্ঠান স্বাস্থ্য প্রতিদিনের একটি পর্বে জ্বর নিয়ে কথা বলেছেন ডা. আফসানা বেগম। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন ডা. শাখাওয়াত হোসেন।
সাধারণভাবে কী কী ধরনের জ্বর হয় এবং জ্বর হলে তাৎক্ষণিকভাবে করণীয় কী, সঞ্চালকের এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. আফসানা বেগম বলেন, সবচেয়ে কমন যে জ্বরটা হয়, সেটা হচ্ছে ভাইরাল ফিভার/জ্বর। এ ভাইরাল ফিভারের সঙ্গে সবাই কমবেশি পরিচিত। এতে বেশি কিছু করার নেই। যে ধরনের উপসর্গ হবে, যেমন জ্বর থাকলে প্যারাসিটামল থেকে হবে, খুব বেশি জ্বর না থাকলে কোনো কিছু না খেলেও চলবে। শুধু গা-টা স্পঞ্জ করে দিলে চলবে। মাথাব্যথা থাকলে প্যারাসিটামল খেতে হবে। অবশ্যই প্রচুর পানিজাতীয় খাবার, যেকোনো ধরনের তরল খাবার খেতে হবে। একইসঙ্গে বিশ্রাম নিতে হবে। বিশ্রাম নিলে খুব দ্রুত জ্বরটা কমে যায়। এ ছাড়া আরও অনেক ধরনের জ্বর আছে, যেমন ব্যাকটেরিয়ার জন্য হয়। ব্যাকটেরিয়ার জন্য হয় টাইফয়েড ফিভার। তা ছাড়া নিউমোনিয়া হতে পারে, ম্যালেরিয়া হতে পারে... আরও অনেক ধরনের জ্বর আছে, এগুলো আমাদের দেশে খুব কমন।
জ্বর হলে কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত:
সঞ্চালকের এ প্রশ্নের জবাবে ডা. আফসানা বেগম বলেন, সাধারণত ভাইরাল জ্বরটা চার থেকে পাঁচ দিন পর্যন্ত থাকে। ভাইরাল জ্বরে কিছু ফিচার থাকে, যেমন নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ জ্বালাপোড়া করা, মাথাব্যথা এবং জ্বরটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হাই গ্রেড থাকে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। যেমন, যদি জ্বরের সাথে খুব সিরিয়ার হেডেক/খুব বেশি মাথা ব্যাথা, কোনোভাবেই কমছে না। অথবা জ্বরের সাথে অনেক কাশি, কফ। অনেক সময় দেখা যায়, কফের সাথে রক্ত যাচ্ছে। এগুলোর ক্ষেত্রে কিন্তু প্রথমেই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। বমি হলেও যেতে হবে। তা না হলে যদি শুধু সিম্পল জ্বর বা গা ব্যথা থাকে, সে ক্ষেত্রে বাসায় তিন দিনের মতো অপেক্ষা করতে হবে। ভাইরাল জ্বর হলে তিন-চার দিনের মাথায় আস্তে আস্তে কমে যেতে থাকে।
জ্বর হলে প্রাথমিক চিকিৎসা:
হঠাৎ করে আপনার অথবা আপনার পরিবারের কারও জ্বর আসতে পারে। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে কী করবেন, তা আজ আমরা একজন চিকিৎসকের কাছ থেকে জানব।
এনটিভির নিয়মিত স্বাস্থ্যবিষয়ক এক আয়োজনে এ নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন ডা. তানজিয়া খানম তম্পা। তিনি বলেন, হঠাৎ করে জ্বরে আক্রান্ত হওয়া, এটা অনেকের কাছেই অতি আতঙ্কের, আবার অনেকের কাছে অল্প মাত্রার আতঙ্কের, আবার অনেকের কাছে হয়তো কোনো কিছুই না। কিন্তু জ্বর আমাদের কাছে এ রকম, আমাদের শরীরে যখন কোনো ইনফেকশন কিংবা কোনো মাত্রায় ইনফ্ল্যামেশন তৈরি হয়, অথবা শরীরে কোনো ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাস, ভাইরাস, যদি সংক্রমণ হয়, সেটা ফার্স্ট সিম্পটম বা চিহ্ন হচ্ছে জ্বর। জ্বর আমরা তখনই বলি, যখন স্বাভাবিক তাপমাত্রা কিছুটা হলেও বেড়ে যাবে। সেটা কত? আমরা জ্বর বলছি তাকে, যদি ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি রেশিও চলে যায়, তাকে আমরা জ্বর বলছি।
জ্বর হলে করণীয় সম্পর্কে ডা. তানজিয়া খানম তম্পার পরামর্শ, যদি ঘরে এমন দেখা যায়, কিছু মাত্রায় শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি, তাহলে সে ক্ষেত্রে আমরা কী করতে পারি; আমরা মাথায় পানি ঢালতে পারি, গা মুছিয়ে দিতে পারি। কিন্তু পানিটা কী ধরনের হতে পারে। পানিটা যে একদম ঠাণ্ডা হবে, তা নয়। পানিটা হালকা কুসুম গরম হতে হবে। সে ক্ষেত্রে আরেকটা জিনিস খেয়াল রাখতে হবে, পানি ঢালার সময় সেই পানি যেন কোনোভাবেই কানের ভেতরে ঢুকে না যায়। আরেকটা জিনিস আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, যখন জ্বর আসবে এবং জ্বরটা যদি ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপরে ওঠে, সে ক্ষেত্রে আমরা ওষুধ প্রয়োগ করব। এর আগে আমরা কখনওই ওষুধ প্রয়োগ করব না। ওষুধ প্রয়োগের ব্যাপারটা অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হতে হবে।
ডা. তানজিয়া খানম তম্পা বলেন, বাসাবাড়িতে অধিকাংশ মানুষ জানেন, নাপা অথবা প্যারাসিটামল-জাতীয় ওষুধপত্র খেলেই জ্বর ভালো হয়ে যায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে মনে করা হয় যে ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত আসলেই নাপা অথবা প্যারাসিটামল-জাতীয় ওষুধপত্র খাওয়া উচিত নয়। এবং ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপরে উঠলেই এই ওষুধপত্র নেওয়া উচিত এবং যদি সে ক্ষেত্রেও জ্বর নিয়ন্ত্রণে না আসে তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খেতে হবে।
কিছু সাবধানতা জরুরি যেমন,
শরীরকে আর্দ্র রাখুন:
ভাইরাল ইনফেকশনের সময় শরীরকে আর্দ্র রাখা জরুরি। তাই এ সময় পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করুন এবং তরলজাতীয় খাবার খান।
ব্যক্তিগত সুরক্ষা:
ভাইরাস জ্বরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সময় অন্যান্য সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। তাই এমন কোনো কাজ করবেন না যাতে আবারও সংক্রমিত হয়ে পড়েন; ব্যক্তিগত সুরক্ষা বজায় রাখুন।
বিশ্রাম নিন:
আপনাকে আরো ক্লান্ত করে তুলতে পারে এমন কাজ এড়িয়ে চলুন। বিশ্রাম খুব জরুরি এই সময়। তাই বিশ্রাম নিন এবং শিথিল থাকার চেষ্টা করুন। এটি শরীরকে স্বাভাবিক কার্যক্রমে পুনরায় ফিরে আনতে সাহায্য করবে।
স্বাস্থ্যকর খাবার খান:
শরীরের শক্তি পুনরায় ফেরাতে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া জরুরি। খাদ্যতালিকায় কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ভিটামিন-জাতীয় খাবার রাখুন। এমন খাবার বেছে নিন যেটি সহজে হজম হবে। এই সময় চিকেন স্যুপও খেতে পারেন। এটি শরীরকে ঠিকঠাক করতে বেশ কাজে দেবে।
রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ান:
খাদ্যতালিকায় ভিটামিন সি, ভিটামিন ডি-জাতীয় খাবার রাখুন। এই ভিটামিনগুলো শরীর পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে এবং রোগ নিরাময়েও বেশ উপকারী।
চিকিৎসকের পরামর্শ:
যেকোনো রোগেই লক্ষণ বুঝে চিকিৎসা করা জরুরি। তাই নিজে নিজে কোনো ওষুধ খেতে যাবেন না। ওষুধ খাওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ভেষজ বা হারবাল চা খান:
পানীয় হিসেবে ভেষজ চা খেতে পারেন। তবে আপনি যদি শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ান, তবে ভেষজ চা খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সর্বোপরি জ্বর সারাতে নিজের শরীরের যত্ন নিন।
জ্বর কেন হয় এবং জ্বর হলে কী করণীয়, এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে উপর্যুক্ত ভিডিও তে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র:
- ডা. শাখাওয়াত হোসেন,
- ডা. তানজিয়া খানম তম্পা,
- ডা. আফসানা বেগম,
- এনটিভি।
- কালের কণ্ঠ।
- Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই