এলার্জি থেকে অ্যাজমা এবং হে-ফিভার থেকে অতিরিক্ত হাঁচি? এখানে ফুলের রেনুর কাজ কি?
কিভাবে এলার্জি থেকে অ্যাজমা?
বাসাবাড়িতে বিভিন্ন জায়গায় জমে থাকা ধুলোবালি, অফিসের খাতাপত্র বা ফাইলে জমে থাকা ধুলো এবং রাস্তাঘাটে প্রতিনিয়ত যে ধুলো উড়ছে তা হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের প্রধান উদ্রেককারী।
এলার্জি ও অ্যাজমা যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। এলার্জি থেকে শ্বাসনালি আক্রান্ত হওয়ার সম্ভ্ভাবনা থাকে। আর তা থেকেই দেখা দেয় অ্যাজমা বা হাঁপানি। এলার্জি সৃষ্টিকারী এলার্জনগুলো হলো- ফুলের রেণু, ঘরের ও পুরোনো ফাইলের ধুলা, কোনো কোনো ফলমূল-শাকসবজি-খাদ্যদ্রব্য, দূষিত বাতাস ও ধোঁয়া, বিভিন্ন ধরনের ময়লা, কাঁচা রঙের গন্ধ, ঘরের চুনকাম। এলার্জি সৃষ্টিকারী আরেকটি এলার্জন হচ্ছে ছত্রাক। এসব এলার্জন এলার্জিক বিক্রিয়া করে হাঁপানি রোগের সৃষ্টি করে। হাঁপানি রোগীদের অবশ্যই এগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। মাইট নামক এক ধরনের পোকা ঘরের অনেক দিনের জমে থাকা ধুলাবালিতে থাকে। এই মাইট ছাড়াও এলার্জিজনিত হাঁপানির একটি প্রধান কারণ হচ্ছে ধুলো। বাসাবাড়িতে বিভিন্ন জায়গায় জমে থাকা ধুলোবালি, অফিসের খাতাপত্র বা ফাইলে জমে থাকা ধুলো এবং রাস্তাঘাটে প্রতিনিয়ত যে ধুলো উড়ছে তা হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের প্রধান উদ্রেককারী। ধুলোবালি মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে শ্বাসযন্ত্রে প্রবেশ করে শ্বাসকষ্টের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। অন্য সব এলার্জনের চেয়ে ধুলো খুব সহজে নিশ্বাসের সঙ্গে মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করতে পারে। ফলে দ্রুত সর্দি-কাশি হয় এবং শ্বাসকষ্টের সৃষ্টি হয়। ঘরে বা অফিসে জমে থাকা ধুলো রাস্তার ধুলোর চেয়ে বেশি ক্ষতিকারক। রাস্তার ধুলোতে থাকে অজৈব পদার্থ যাতে হাঁপানি, অ্যাজমা, সর্দি, কাশি, হাঁচি বা শ্বাসকষ্টের তেমন কষ্ট হয় না। তবে রাজপথে যে যানবাহন চলাচল করে তাতে যে ধুলোবালি, ধোঁয়া থাকে তা হাঁচি বা শ্বাসকষ্টের উদ্রেককারী অন্যতম পদার্থ।
পুরোনো জমে থাকা ধুলো বা ময়লা হাঁপানির জন্য ক্ষতিকর। কারণ এতে মাইট, ফুলের রেণু, তুলার আঁশ, পোষা প্রাণীর লোম, ব্যাকটেরিয়া এবং বিভিন্ন প্রকার ছত্রাক মিশে থাকে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাইটের কারণেই প্রধানত ধুলোবালি অ্যাজমা রোগীদের জন্য বিপজ্জনক। শহরে দূষিত বায়ুর কারণে এ ধরনের রোগীর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ছাড়া ঋতু পরিবর্তনের ওপরও হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের হ্রাস-বৃদ্ধি নির্ভর করে। আমাদের দেশের আবহাওয়া প্রধানত শুস্ক। শুস্ক আবহাওয়ার কারণে বাতাসে মাইটের পরিমাণ বেশি। যাদের ধুলোর কারণে শ্বাসকষ্ট এলার্জির সৃষ্টি হয়, তাদের কতগুলো বিষয়ের প্রতি সতর্ক থাকতে হবে- এমন পরিবেশে চলা যাবে না, যেখানে ধুলোর পরিমাণ বেশি। ঘর পরিস্কার এবং বিছানাপত্র ঝাড়া দেওয়ার সময় মুখে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। বিভিন্ন খাদ্যের কারণে হতে পারে এলার্জি। যেমন গরুর মাংস, ইলিশ মাছ, বোয়াল মাছ, চিংড়ি মাছ, মসুরের ডাল, পুঁইশাক, মিষ্টিকুমড়া, পাকা কলা, আনারস, বেগুন, নারিকেল, হাঁসের ডিম।গরুর দুধ শিশুদের এলার্জির কারণ হতে পারে। ঠান্ডা পানীয়ও কোনো কোনো ব্যক্তির জন্য ক্ষতিকর হয়ে থাকে। অ্যাজমার কারণগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে অ্যাজমাও নিয়ন্ত্রণে থাকবে। আমাদের দেশেও এখন হাঁপানির অনেক যুগোপযোগী চিকিৎসা এবং ওষুধ রয়েছে। ইনহেলার হাঁপানির শেষ চিকিৎসা নয়; বরং শনাক্ত হওয়ার পর ইনহেলারের সঠিক ব্যবহার হাঁপানিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। এজন্য রোগটিকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। অনেকের ভুল ধারণা করে থাকে যে, হাঁপানি একবার হলে তা আর কোনোদিন ভালো হবে না। কিন্তু সঠিক সময়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে হাঁপানি রোগটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
ঋতুভিত্তিক হে-ফিভার কি?
হে-ফিভার (হে-জ্বর-খড় জ্বর) অনেকের মনে হতে পারে এটি হয়তো একটি বিশেষ ধরনের ফিভার বা জ্বরের প্রকারভেদ। কিন্তু আসলে ফিভার বা জ্বরের সাথে এর কোনো সম্পর্কই নেই। প্রকৃত পক্ষে এটি একটি বিশেষ ঋতুভিত্তিক হাঁচিজনিত এলার্জিক রোগ। এটি একটি বিশেষ ঋতুতে প্রতি বছর এবং বছরের পর বছর ওই রোগীর উপসর্গ হতে দেখা যায় এবং এসব রোগীর ক্ষেত্রে নাক ও চোখ দিয়ে পানি পড়তেও দেখা যায়।
ফুলের রেনু কিভাবে হে-ফিভার নিয়ে আসে?
উপসর্গ বা লক্ষণগুলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে তীব্র আকারে দেখা দেওয়ায় প্রচণ্ড কষ্টদায়কও হতে পারে আবার হালকা বা সামান্য উপসর্গ নিয়েও দেখা দিতে পারে। যেহেতু একটি বিশেষ ঋতুতে এই রোগটি দেখা দেয় কাজেই সেই ঋতুর সাথে নিঃসন্দেহে এর সম্পর্ক রয়েছে। ওই একটি বিশেষ সময়ে বাতাসে যে ফুলের রেণু উড়ে বেড়ায় সেই ফুলের রেণুর প্রভাবেই মূলত এই রোগটি দেখা দেয় এবং এতে যারা আক্রান্ত হয় তাদের মধ্যে বংশানুক্রমিক এলার্জিক প্রবণতা লক্ষ করা যায়।
লক্ষণ : হাঁচির সঙ্গে তালু, চোখ ও নাকে জ্বালা ভাব থাকতে পারে। নাক ও চোখ থেকে পানি পড়বে এবং তীব্র হাঁচির প্রভাব থাকবে সকালের দিকে। সকালের দিকে এর তীব্রতার কারণ হচ্ছে ওই বাতাসের পুষ্পরেণুর উপস্থিতি থাকে সবচেয়ে বেশি। হাঁচির সঙ্গে থাকতে পারে কাশি। এর সঙ্গে আরও থাকতে পারে হাঁপানি।
তবে সাধারণত এই হাঁপানি বা শ্বাসকষ্ট কম ক্ষেত্রেই উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। তবে হাঁচি কাশি ও হাঁপানি একই সঙ্গে উপস্থিত নাও থাকতে পারে। এর বাইরেও থাকতে পারে খাদ্য গ্রহণের অনিচ্ছা, শারীরিক দুর্বলতা ও অধিক নিদ্রার প্রবণতা। এই রোগকে সঠিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে রোগীর পারিপার্শ্বিক বা বংশানুক্রমিক ইতিবৃত্ত অবশ্যই ভালোভাবে জানা প্রয়োজন।
চিকিৎসা পদ্ধতি:
সেই সঙ্গে অবশ্যই যে পুষ্পরেণুতে রোগীর এলার্জি রয়েছে তা অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে এবং সে ক্ষেত্রে সন্দেহভাজন পুষ্পরেণুর নির্যাস দিয়ে স্কিন টেস্ট করলে তা জানা যায়। আর এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যেহেতু প্রকৃত এলার্জি সৃষ্টিকারী পুষ্পরেণু শনাক্ত করা যায় তাই নির্দিষ্ট সেই পুষ্পরেণুর নির্যাস ব্যবহার করে হাইপোসেনসিটাইজেশন পদ্ধতিতে চিকিৎসা করলে ভালো ফলাফলও পাওয়া যায়। অন্য সব এলার্জির বিক্রিয়ার ক্ষেত্রে যেমন অ্যান্টিহিস্টামিন ব্যবহার করা হয় এ ক্ষেত্রেও তা অবশ্যই করা প্রয়োজন। তবে কোনো অ্যান্টিহিস্টামিন এ ক্ষেত্রে রোগীর জন্য কার্যকরী তা একাধিক অ্যান্টিহিস্টামিন ব্যবহারের মাধ্যমে কোনটি উপযুক্ত তা নির্ণয় করে নিয়ে সেটি ব্যবহার করলে যথার্থ ফল পাওয়া যাবে। এলার্জিক বিক্রিয়ার ফলে যে হিস্টামিন তৈরি হয় তা নিষ্ক্রিয় করার ক্ষমতা ওই ওষুধের সমভাবে নাও থাকতে পারে। তাই যার ক্ষেত্রে সেটা উপযুক্ত তাকে সেটাই দিতে হবে। তবে এই ক্ষেত্রে অ্যান্টিহিস্টামিন ওষুধের প্রয়োগ যে অতিশয় ফলপ্রসূ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে উপযুক্ত চিকিৎসা কিন্তু হাইপোসেনসিটাইজেশন পদ্ধতি। এই পদ্ধতির মাধ্যমে প্রকৃত এলারজেনটি খুঁজে বের করে তাকে নিষ্ক্রিয় করা হয়। তবে সাধারণভাবে অ্যান্টিহিস্টাসিনই এ ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। যদিও তাতে কিছু কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও আছে যেমন অনেক রোগীর ক্ষেত্রেই এতে ঘুম ঘুম ভাব দেখা দেয়। এ ধরনের সব ওষুধের ঘুম ভাবের ক্ষমতা কিন্তু সমপরিমাণ নয়। কোনোটি বেশি আবার কোনোটিতে কম ঘুমভাব হয়। যেটিতে বেশি ঘুমভাব হয় ওই ধরনের অ্যান্টিহিস্টামিন অবশ্যই রাতে খাওয়া উচিত এবং এ ধরনের ওষুধ খেয়ে কখনোই গাড়ি চালানো উচিত নয়। এ ছাড়াও আবার কোনো কোনো অ্যান্টিহিস্টামিন ব্যবহারের ফলে কেন্দ্রীয় স্নায়ুমণ্ডলীর উত্তেজনা দেখা দেয় এবং সে ক্ষেত্রে রোগীর মধ্যে মানসিক চাপ, অনিন্দ্রা দেখা দিয়ে থাকে। কাজেই অকারণে অ্যান্টিহিস্টামিন ব্যবহার কখনই সঙ্গত নয়। যারা হে-ফিভাবে ভোগেন তাদের মনে রাখতে হবে ওই সুনির্দিষ্ট ঋতুতে আক্রান্তের খামারে বা বাগানে কাজ করা উচিত নয়। ঘরের জানালা বন্ধ রাখা উচিত। এছাড়া এয়ারকন্ডিশনার চালালে ভালো থাকা যেতে পারে।
তথ্যসূত্র:
- ডা. একেএম মোশাররফ হোসেন, সমকাল।
- ডা: দিদারুল আহসান, চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ, আল-রাজি হাসপাতাল, ফার্মগেট, ঢাকা, বাংলাদেশ প্রতিদিন।
- Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই