শ্বাসকষ্ট কেন হয়, কী করবেন?
শীতকালে অনেকেরই শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। শর্দি-কাশি থেকে অনেক সময় এই সমস্যা দেখা দেয়। আবার হাঁপানি ও অ্যাজমা থেকেও এই সমস্যা দেখা দেয়। শীতকালে হাঁপানি-অ্যাজমা রোগীদের অসুখ আরও প্রকট আকার ধারণ করে। আবার বর্তমানে করোনাকালীন প্রায় সব রোগীর মুখেই শোনা যায় শ্বাসকষ্টের কথা।
| শ্বাসকষ্ট হলে হাঁপানি ভেবে নানা ধরনের ওষুধ না খেয়ে আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। শ্বাসকষ্টের কারণ নির্ণয় করে সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নিতে হবে। ধূমপান বর্জন করুন। ধুলাবালু ও দূষণ থেকে দূরে থাকুন। |
শ্বাসকষ্ট শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া, শ্বাস নিতে না পারা, শ্বাস নিতে সমস্যা হওয়া, রেসপিরাটরি ডিসট্রেস নামেও পরিচিত।
এই অনুভূতির কোনো শরীরবৃত্তীয় কারণ না থাকলেও শ্বাসকষ্টের কারণে একজন ব্যক্তির এমন অনুভূতি হতে পারে।
শ্বাসকষ্ট কাকে বলে? সাধারণ শ্বাসকষ্ট এবং হাঁপানির পার্থক্য কি? বিভিন্ন ধরনের শ্বাসকষ্টের সংক্ষিপ্ত বিবরণ:
পরিশ্রমের পর আমরা হাঁপাতে থাকি। একটু দৌড়ালে বা পরিশ্রম করলে সবারই শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুততর হয়। এটা কিন্তু শ্বাসকষ্ট নয়। যদি শ্বাসপ্রশ্বাসের হার বৃদ্ধির পাশাপাশি নিশ্বাস নিতে ও ছাড়তে কষ্ট হয়, তাহলে তাকে শ্বাসকষ্ট বলে। এটি আসলে রোগের লক্ষণ। সঠিক ও সুষ্ঠু চিকিৎসায় এ সমস্যা ভালো হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
অনেকেই মনে করেন, শ্বাসকষ্ট মানেই হাঁপানি। কিন্তু সব শ্বাসকষ্টই হাঁপানি নয়। হাঁপানি হলে বিশেষ ধরনের শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। এটি হঠাৎ করে শুরু হয়। এরপর বুকের ভেতরে বাঁশির মতো শব্দ হতে থাকে। একই সঙ্গে কাশি ও বুকের ভেতর শ্বাস বন্ধ ভাব অনুভূত হয়। হাঁপানি ছাড়াও হৃদ্রোগে শ্বাসকষ্ট হতে পারে। হৃৎপিণ্ডের বাঁ দিকের অংশ অকেজো হয়ে পড়লেও তীব্র শ্বাসকষ্ট হয়। এর নাম হৃদ্যন্ত্রের হাঁপানি। এর কারণ ফুসফুসের নিচের অংশে পানি জমা হওয়া। এত সমস্যায় রোগী শুয়ে থাকতে পারে না, চিত হলেই বাড়ে। ফুসফুস ও হৃদ্যন্ত্রের হাঁপানি—উভয় রোগের ক্ষেত্রেই শ্বাসকষ্ট থাকে। হৃদরোগজনিত শ্বাসকষ্ট বোঝার কতগুলি উপায় রয়েছে। যেমন, মধ্য বয়সের পর প্রথম শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়া এবং শ্বাসকষ্টের সঙ্গে হাত-পা ফুলে যাওয়া বা শরীরে জল জমা। পরিশ্রমের সময় শ্বাসকষ্ট হওয়া এবং বিশ্রাম গ্রহণে শ্বাসকষ্ট কমে যাওয়া। রাতে বিছানায় শুতে গেলে শ্বাসকষ্ট ও কাশি হওয়া। মধ্যরাতে শ্বাসকষ্টের জন্য ঘুম ভেঙে যাওয়া। ডায়াবেটিস রোগীদেরও শ্বাসকষ্ট হয়। হার্ট অ্যাটাকের পরবর্তীতে শ্বাসকষ্ট হয়। অনেক দিন থেকে উচ্চরক্তচাপে ভোগা রোগীর শ্বাসকষ্ট হয়। বাইপাস অপারেশনের পর অনেক সময় শ্বাসকষ্ট হওয়া। হার্ট ভাল্বে সমস্যা রয়েছে এমন রোগীর শ্বাসকষ্ট হয়।
ইনহেলার ব্যবহার করে এবং অ্যাজমার চিকিৎসা গ্রহণের পরেও শ্বাসকষ্ট না-কমলে এবং বুক ধড়ফড়ের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট হলে মনে করবেন হয়তো আপনার হৃদরোগ অনেক জটিল আকার ধারণ করেছে এবং এর জন্য আপনাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। যদি হঠাৎ শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং শ্বাসকষ্টের সঙ্গে বুকের ভিতর চাপ বা ব্যথা অনুভূত হয়, শরীর অত্যধিক ঘেমে যায়, তবে সেটি হার্ট অ্যাটাক বা হার্ট স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে। সে ক্ষেত্রে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হাসপাতালে যেতে হবে, তা না হলে জীবন বিপন্ন হতে পারে। শ্বাসকষ্ট হৃদরোগের একটি মারাত্মক লক্ষণ, কাজেই সব ধরনের শ্বাসকষ্টকে অ্যাজমা বা হাঁপানি মনে করে টোটকায় চিকিৎসা চালালে জটিলতা বাড়বে। চিকিৎসক রোগীর বয়স, লক্ষণ এবং বুক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে অনায়াসে বলে দিতে পারেন, রোগী কোন ধরনের হাঁপানিতে ভুগছেন।
ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিসের কারণেও শ্বাসকষ্ট হয়। এ রোগের বিভিন্ন কারণের মধ্যে অতিরিক্ত ধূমপান, ধুলা ও ধোঁয়াময় পরিবেশ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বংশগত কারণে হয়ে থাকে। ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিসের সঙ্গে ফুসফুসের হাঁপানির অনেক মিল আছে। যদিও এ দুটি রোগ সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরন ও প্রকৃতির। ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিসে শ্বাসকষ্ট দিন দিন বাড়তেই থাকে।
শ্বাসকষ্ট হলে হাঁপানি ভেবে নানা ধরনের ওষুধ না খেয়ে আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। শ্বাসকষ্টের কারণ নির্ণয় করে সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নিতে হবে। ধূমপান বর্জন করুন। ধুলাবালু ও দূষণ থেকে দূরে থাকুন।
এ সম্পর্কে-
ডা. মোহাম্মদ তৌফিক হাসান আরেকটু সুন্দর করে ক্লিয়ার করেছেন,
অ্যাজমা হলে শ্বাসকষ্ট হয়। তবে সব শ্বাসকষ্ট কিন্তু অ্যাজমা নয়। শ্বাসকষ্টের বিভিন্ন কারণ রয়েছে।
প্রশ্ন : শ্বাসকষ্ট মানেই কি অ্যাজমা?
উত্তর : আসলে আমাদের সবার ভেতরেই একটি ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। সেটি হলো, শ্বাসকষ্ট মানেই সেটি অ্যাজমা। দেখা যায়, বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞের কাছে না গিয়ে অন্য কোথাও গেলে তাদের ইনহেলার বা অন্যান্য ওষুধ ধরিয়ে দেয়। তবে শ্বাসকষ্টের একজন রোগী যদি আমার কাছে আসে, তাহলে আমাকে দেখতে হবে তার যে শ্বাসকষ্ট হয়েছে, সেটি আসলে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার জন্য হয়েছে, নাকি অন্য কোনো কারণের জন্য হয়েছে। অনেক সময় দেখা যায়, একটি রোগীর যদি হার্ট ফেইলিউর হয়, তাহলে কিন্তু রোগীর শ্বাসকষ্ট হয়।
আবার একজন রোগীর হয়তো কোনো মানসিক অস্থিরতা রয়েছে, যেকোনো কারণে তার মানসিক কোনো দুশ্চিন্তা রয়েছে, তারাও কিন্তু শ্বাসকষ্ট নিয়ে চলে আসে। তাদের যে অবস্থা থাকে যে মনে হয়, এখনই তাকে শ্বাসকষ্টের চিকিৎসা না নিলে সে মারা যাবে। তার সঙ্গে যারা আসে, তারা এমন চিন্তা করে থাকে। এ ধরনের আরো কিছু কাছাকাছি রোগ রয়েছে। তারাও আসলে শ্বাসকষ্টের উপস্থাপন নিয়েই আসে। সেটি আসলে হাঁপানি নয়।
প্রশ্ন : সেগুলো কী?
উত্তর : সেগুলোর মধ্যে একটি হলো হার্টের রোগ। একে আমরা হার্ট ফেইলিউর বা লেফ্ট ভেন্টিকুলার ফেইলিউর বলি। এরপর ফুসফুসের কিছু রোগে সমস্যা হতে পারে। একে আইএলডি বলে। তার যে শ্বাসনালি বা যে রেসপিরেটরি ইপিথিলিয়াম রয়েছে, ভেতরে যে অক্সিজেন ও কার্বন ডাইঅক্সাইডের চলাচল, সেটা যদি কোনো কারণে বন্ধ হয়ে যায়, তাহলেও রোগীর শ্বাসকষ্ট হতে পারে।
কারো যদি ডিপ্রেশন, উদ্বেগ বা প্যানিক ডিজঅর্ডার থাকে, তারাও শ্বাসকষ্ট নিয়ে আমাদের কাছে আসতে পারে। সিওপিডিতেও শ্বাসকষ্ট হয়।
সিওপিডির শ্বাসকষ্ট আর হাঁপানির মধ্যে খুব সূক্ষ্ম একটি পার্থক্য লক্ষ করি আমরা। আমাদের স্যাররা বেশ সুন্দর কথা বলতেন। একটি হলো কাশির ওপরে শ্বাস। আরেকটি হলো কাশের ওপর শ্বাস। হাঁপানি রোগীর প্রথমে শ্বাসকষ্ট হবে। এরপর যখন আরো জটিল অবস্থায় যাবে, তখন তার কাশি দেখা দেয়। আর সিওপিডির রোগীগুলো প্রথমেই কাশি নিয়ে আসে। তারপর ধীরে ধীরে তারা শ্বাসকষ্টের দিকে আসে।
শ্বাসকষ্টের কারণ:
শ্বাসকষ্ট কেন হয় ও করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক ও কনসালটেশন সেন্টারের বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ আজিজুর রহমান।
* শর্দি লাগলে অনেকের শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়,
* হাঁপানি বা অ্যালার্জি থাকলে,
* শিশুদের যাদের অ্যাডনয়েড সমস্যা থাকে তাদের শ্বাসকষ্ট হয় শীতের সময়,
* হিস্টিরিয়া রোগীর ভয়ানক শ্বাসকষ্ট হতে পারে। অনেক সময় দেখেছি ক্রিমিজনিত কারণেও শিশু শ্বাসকষ্টে ভুগছে। সেই শিশুকে মাসের পর মাস হাঁপানির ওষুধ খাওয়ানো হয় কিন্তু এক কোর্স ক্রিমির ওষুধ দেওয়াতেই শিশুর শ্বাসকষ্ট কমে গিয়েছে। পরিবেশ দূষণজনিত অ্যালার্জি থেকেও শ্বাসকষ্ট হয়।
* সাইনোসাইটিস, হার্ট ফেইলিওর, নিউমোনিয়া ইত্যাদি রোগ দেখা দিলে,
* ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি)। এছাড়াও বহুবিধ কারণে শ্বাসকষ্টের অনুভূতি হতে পারে,
* জ্বরসহ বেশ কিছু শারীরিক রোগেও শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোর দহন বা মেটাবলিজম বেড়ে যাওয়ার জন্য নিশ্বাসের হার বেড়ে যায়। হাইপারভেন্টিলেশন সিন্ড্রোমের কারণটা যদিও খুব স্পষ্ট নয়, তবে এটার সঙ্গে উৎকণ্ঠা আর এক ধরনের ভয় পাওয়ার রোগের (প্যানিক ডিসঅর্ডারের) সম্পর্ক আছে। সেই অর্থে এটা মনের রোগ,
* প্যানিক ডিজঅর্ডার, অবসাদ বা অ্যাংজাইটি নিউরোসিস মনের রোগ। এর থেকেও দম বন্ধ লাগে। শ্বাসের সমস্যা হয়। এতে শারীরিক প্রয়োজনের চেয়ে বেশি করে শ্বাস নেওয়ার জন্য রক্তের কার্বন ডাই-অক্সাইড শ্বাসের সঙ্গে অত্যধিক মাত্রায় বেরিয়ে যায় ও রক্তে ক্ষারের মাত্রা বেড়ে যায়। দেখা গিয়েছে, উৎকণ্ঠা আর ভয় পেলে প্রায় ২৫ থেকে ৮৩ শতাংশ ক্ষেত্রে একধরনের শ্বাসকষ্ট অনুভূত হয়, যার কোনও শারীরিক কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।
* রক্তশূন্যতা, কোনও কারণে রক্তে অম্লের পরিমাণ বেড়ে গেলে (মেটাবলিক অ্যাসিডোসিস) শ্বাসকষ্ট হতে পারে। মাত্রাতিরিক্ত ডায়াবেটিস, কিডনির অকার্যকারিতা, ল্যাকটেট জমে যাওয়া বা শরীরে নানা ধরনের বিষাক্ত পদার্থের উপস্থিতির কারণে এমনটা হতে পারে। অত্যধিক ওজন বেড়ে যাওয়াও শ্বাসকষ্টের একটা অন্যতম কারণ। স্থূলতার কারণে অনেকের রাতে স্লিপ অ্যাপনিয়া হয় এবং যন্ত্র লাগিয়ে শ্বাস নিতে হয়। শোয়ার পর কিছু ব্যক্তির শ্বাস নিতে অসুবিধা হয়,
* নাকের সমস্যা ও অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার কারণে এমন হতে পারে।
* ব্রঙ্কাইটিস, পেটের সমস্যা, গ্যাস ও হজমের সমস্যা, অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং টেনশনে থাকলেও শ্বাসকষ্ট হতে পারে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটির জন্য দায়ী ফুসফুসের সমস্যা। মূলত অবস্ট্রাকটিভ লাং ডিজিজের কারণেই শ্বাসকষ্ট হয়। এই ধরনের দু’টি বড় রোগ রয়েছে। একটা হল হাঁপানি বা অ্যাজমা আর অন্যটি হল ‘ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ’ (সিওপিডি)। হাঁপানি বা অ্যাজমা মূলত একটা জেনেটিক রোগ। অ্যাজমাকে দ্রুত শনাক্ত করতে পারলে এই মৃত্যুহার অনেকটাই কমানো সম্ভব। অ্যাজমার ক্ষেত্রে স্টেরয়েড ইনহেলেশন দেওয়া হয়। স্টেরয়েড শুনে ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। কারণ, স্টেরয়েড এমন অল্প মাত্রায় দেওয়া হয় যা শুধু ফুসফুসে পৌঁছোয়, ফলে তেমন কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় না। যখন হৃদ্যন্ত্রের রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা কমে যায় তখন ফুসফুসে রক্ত জমে গিয়ে ফুসফুসকে অনমনীয় করে তোলে। তখন শ্বাস নেওয়ার জন্য বেশি শক্তি লাগে। আর হাঁপানি হলে ফুসফুসে হাওয়া ঢোকা–বেরোনোর পাইপ (ব্রঙ্কিওল) সরু হয়ে যায় বলে শ্বাসকষ্ট হয়। ফুসফুসের হাঁপানি হল একটি বিশেষ ধরনের শ্বাসকষ্ট। সাধারণত হঠাৎ করে তা শুরু হয় এবং এই শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়ার পর বুকের ভেতরে বাঁশির মতো শব্দ হয় এবং সঙ্গে কাশি ও বুকের ভেতর শ্বাস বন্ধ ভাব অনুভূত হয়। সব শ্বাসকষ্টই হাঁপানি নয়। ফুসফুসের হাঁপানি হল একটি বিশেষ ধরনের শ্বাসকষ্ট। সাধারণত হঠাৎ করে তা শুরু হয় এবং এই শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়ার পর বুকের ভেতরে বাঁশির মতো শব্দ হয় এবং সঙ্গে কাশি ও বুকের ভেতর শ্বাস বন্ধ ভাব অনুভূত হয়। এত গেল ফুসফুসের হাঁপানির কথা। হৃদযন্ত্র অকেজো হয়ে পড়লেও তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। কার্ডিয়াক হাঁপানি বা এবং ফুসফুসের হাঁপানি ছাড়াও কিডনির বৈকল্যের জন্যও শ্বাসকষ্ট হতে পারে। যাকে অনেক চিকিৎসক রেনাল অ্যাজমা বলে থাকেন।
আর সিওপিডি মূলত মধ্যবয়স্কদের ক্ষেত্রে হয়। ধূমপান হল মূলত এই রোগের কারণ। এ ছাড়াও বায়ু দূষণের সংস্পর্শেও এই রোগ হয়। এই রোগের বাড়াবাড়ি হলে রোগী মারাত্মক ধরনের শ্বাসকষ্টে ভুগতে থাকেন।
* ক্রনিক ব্রংকাইটিসের কথা অনেকেই জানেন। এই রোগের বিভিন্ন কারণের মধ্যে অতিরিক্ত ধূমপান, ধুলো এবং ধোঁয়ার দূষণ ও কোনও কোনও ক্ষেত্রে বংশগত কারণ রয়েছে। বাহ্যিকভাবে ক্রনিক ব্রংকাইটিস রোগটির সঙ্গে ফুসফুসের হাঁপানির অনেক মিল রয়েছে, যদিও দুটি রোগ সম্পূর্ণ ভিন্ন জাতের এবং ভিন্ন প্রকৃতির। এই রোগে শ্বাসকষ্ট দিন দিন বাড়তেই থাকে। এবং অনেক রোগী আছেন যাঁরা নিজেকে হাঁপানি রোগী মনে করে থাকেন। তাঁরা জানেন না যে, তাঁদের শ্বাসকষ্টের কারণ আসলে হাঁপানি বা ফুসফুসজনিত সমস্যায় নয়।
* হঠাৎ করে শ্বাসনালিতে কোনও পদার্থ ঢুকে গেলেও শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে যায়। এটি অবশ্য শিশুদের বেলায় বেশি হয়ে থাকে। অনেকে শিল্প-কারখানায় কাজ করতে করতে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হন। বিশেষ বিশেষ জিনিস উৎপাদনের সময় এত বেশি ক্ষতিকর ধোঁয়া বা উপাদান ছড়ায় যার থেকে শ্বাসকষ্ট হয়। যক্ষ্মা থেকেও রোগী শ্বাসকষ্টে ভুগতে থাকেন। যক্ষ্মার ওষুধ খাওয়ার পর সেরে গেলেও শ্বাসকষ্ট লেগেই থাকে। ফুসফুসের ক্যানসার বা যে কোনও ধরনের টিউমারে শ্বাসকষ্ট হতে পারে।
কিছু অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্য সমস্যার কারণেও অনেক সময় শ্বাসকষ্ট হতে পারে। আবার অস্থায়ীভাবেও শ্বাসকষ্টে সমস্যা থাকতে পারে। অনেক সময় নাকে ধুলাবালি ঢোকার কারণেও মাঝেমধ্যে হালকা শ্বাসকষ্ট হতে পারে। এমনটি হলে খুব সহজে বাড়িতেই তা ম্যানেজ করা যেতে পারে। কিন্তু নিয়মিতভাবে শ্বাসকষ্টের সমস্যা হলে অথবা অনেক বেশি পরিমাণে সমস্যা হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
করণীয়:
* হাঁপানি থাকলে হাঁপানির চিকিৎসা করান।
* ধূমপান পরিহার করুন। পরোক্ষ ধূমপানও শ্বাসকষ্টের জন্য ক্ষতিকর।
* অ্যালার্জি থাকলে অ্যালার্জি সৃষ্টি করে এমন বস্তু (যেমন- ধুলাবালি) ও খাবার (যেমন- গরুর মাংস, ইলিশ মাছ, বাদাম ইত্যাদি) এড়িয়ে চলুন।
* শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
* ঘর গোছানোর সময় বা বাইরে গেলে ডাস্ট মাস্ক পরে বের হবেন।
* বেশি পশমওয়ালা পালিত পশু রাখবেন না।
* ঘরবাড়ি সব সময় পরিষ্কার এবং ধুলামুক্ত রাখুন।
* পুরোনো ধুলাবালি ঘরে থাকলে পরিষ্কার রাখবেন
*যাদের অ্যাডনয়েড সমস্যা আছে তাদের এক ধরণের নাসাল স্প্রে আছে যা ব্যবহার করলে সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়।
শ্বাসকষ্টের সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে কিছু ঘরোয়া টিপস—
- শ্বাসকষ্টের সমস্যা হলে সামনের দিকে ঝুঁকে বসতে হবে। এটি করলে শরীর রিলাক্স হয় এবং শ্বাস-প্রশ্বাস নিতেও সুবিধা হয়। এভাবে ঝুঁকে বসার ফলে ফুসফুস ও হার্টের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। তাই শ্বাসকষ্ট হলে এ পদ্ধতিটি অবলম্বন করতে হবে। এটি করার ক্ষেত্রে কোনো চেয়ারে বসে, পা মেঝের সমতলে রেখে সামনের দিকে ঝুঁকে থাকতে হবে এবং ঘাড় ও কাঁধের পেশিগুলোকে রিলাক্সে রাখতে হবে।
- পেটের পেশিকে ব্যবহার করে গভীরভাবে শ্বাস নিলে শ্বাসকষ্টের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে। কোনো সমতল জায়গায় শুয়ে থেকে পেটের ওপরে হাত রাখতে হবে এবং তার পর নাক দিয়ে গভীরভাবে শ্বাস নিতে হবে। এভাবে গভীর শ্বাস গ্রহণ করে কিছুক্ষণ ধরে রেখে শ্বাস ছাড়তে হবে। এতেই মিলবে শ্বাসকষ্টের সমস্যা থেকে মুক্তি।
- ব্রিদিং এক্সারসাইজের মধ্যে পার্সড লিপ ব্রিদিং হচ্ছে— অনেক সহজ ও কার্যকরী। উদ্বেগের কারণে কখনও শ্বাসকষ্ট হয়ে থাকলে এ পদ্ধতিটি অনেক বেশি কাজে আসে। এটি করতে প্রথমে ঘাড় ও কাঁধের পেশিগুলো রিলাক্স রাখতে হবে। এর পর ধীরে ধীরে নাকের মাধ্যমে শ্বাস গ্রহণ করে ২-৩ সেকেন্ড শ্বাস ধরে রাখতে হবে এবং এ সময় মুখ বন্ধ রাখতে হবে। তার পরে ঠোঁট হালকা খুলে শিস দেওয়ার মতন করে আস্তে আস্তে শ্বাস ছাড়তে হবে ৪-৫ সেকেন্ড ধরে। এভাবে মিলবে অনেকটা স্বস্তি। তাই নিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করুন।
- স্টিম ইনহেলার নেওয়ার কারণে অনেক সময় শ্বাসনালিতে ঘন শ্লেষ্মা জমতে পারে, যেটি শ্বাসকার্যে বাধার সৃষ্টি করে। এ ক্ষেত্রে স্টিম ইনহেলেশন বা গরম ভাপ নিলে শ্বাসনালিতে জমে থাকা ঘন শ্লেষ্মা তরলে পরিণত হয়। ফলে শ্বাসনালিতে কোনো বাধা না থাকায় শ্বাসকষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
- ব্ল্যাক কফিতে উপস্থিত ক্যাফেইন শ্বাসকষ্ট হ্রাস করতে অনেক উপকারী। এ ক্যাফেইনটি শ্বাসনালির পেশিগুলোকে রিলাক্স করতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, হাঁপানি রোগীদের শ্বাসকষ্টের সমস্যা দূর করতে ক্যাফেইন বিশেষভাবে ভূমিকা রাখে।
- আদাতে অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি গুণ রয়েছে, যেটি ফুসফুসের প্রদাহ হ্রাস করতে বিশেষভাবে সহায়তা করে। আদা চা অথবা হালকা গরম পানিতে আদা দিয়ে খেলে সেটি শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে। আদা শ্বাসনালীর প্রদাহ কমিয়ে অক্সিজেনের প্রবেশ স্বাভাবিক রাখে। আদা চা বা আদার রস ও মধু মিশিয়ে খেতে পারেন।
- হলুদে অনেক অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি গুণ রয়েছে। এটি শরীরকে সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করে। দুধের সঙ্গে হলুদ মিশিয়ে পান করলে সেটি শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা দূর করে। হলুদে কারকিউমিন থাকার কারণে সেটি অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া এবং হিস্টামিন নিঃসরণ বন্ধ করতেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এ গুণাবলিগুলো থাকার কারণে হলুদ শ্বাসকষ্ট সমস্যা দূর করতে অনেক উপকারী।
- সরষের তেল হালকা গরম করে বুকে-পিঠে, গলায় ভালো করে ম্যাসাজ করুন শ্বাসকষ্ট কমে যাবে।
- ধুলা-ময়লায় কিন্তু আপনার সমস্যা আরও বাড়ে। এজন্য ঘর-অফিসের ডেস্ক সবকিছু পরিষ্কার রাখুন। ঘরে কার্পেট থাকলে আজই সরিয়ে ফেলুন।
- পোষা জীব-জন্তুকে কোনোভাবেই শোবার ঘরে প্রবেশ করতে না দেয়াই ভালো।
- ধূমপান বন্ধ করতে হবে, ধূমপায়ী বন্ধুবান্ধবের থেকেও দূরে থাকার চেষ্টা করুন।
- শুতে যাওয়ার আগে আর ঘুম থেকে ওঠার পর গরম পানিতে সামান্য লবণ বা মেন্থল দিয়ে ভাপ নিন। শ্বাসনালী পুরো পরিষ্কার থাকবে।
- ধুলা ও করোনা থেকে বাঁচতে বাইরে যাওয়ার সময় অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করুন।
তথ্যসূত্র:
- বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ আজিজুর রহমান, ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক ও কনসালটেশন সেন্টার, যুগান্তর।
- স্বাস্থ্য বিষয়ক ওয়েবসাইট, বোল্ডস্কাই, ভারত।
- ডা. মো. সেরাজুল ইসলাম, সহকারী অধ্যাপক ও আবাসিক চিকিৎসক; জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মহাখালী, প্রথম আলো।
- ডা. মোহাম্মদ তৌফিক হাসান, টাঙ্গাইল বক্ষব্যাধি ক্লিনিকের পরামর্শক হিসেবে কর্মরত, এনটিভি।
- সময় টিভি।
- আনন্দবাজার।
- Edited: Natural_Healing.
কোন মন্তব্য নেই