মাসল বিল্ডিং এবং ওজন কিভাবে বাড়াবেন?
প্রতিটি মানুষের আদর্শ ওজন থাকা জরুরি। অতিরিক্ত ওজন যেমন ভালো নয়, স্বাভাবিকের চেয়ে কম ওজন থাকাও ঠিক নয়। ওজন বাড়াতে স্বাভাবিকের চেয়ে কম ওজনের ব্যক্তিদের প্রয়োজন পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং সঠিক জীবনযাপন পদ্ধতি।
ওজনস্বল্পতা কেন হয়, প্রতিকার পেতে কী করবেন?
শরীরের কাঠামো ধরে রাখার জন্য সঠিক ওজন থাকা চাই। ওজন হঠাৎ কমে গেলে কিংবা আন্ডারওয়েট থাকলে রোগারোগা দেখা যায়। অনেকে শত চেষ্টা করেও ওজন বাড়াতে পারেন না। আবার অনেকে না চাইলেও ওজন বেড়ে যায়। পরিমিত খাদ্যগ্রহণ ও সঠিক জীবনাচারে ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে।
![]() |
| বিশেষজ্ঞরা বলেছেন পরিমিত অর্গানিক খাবার এবং ব্যায়াম করার মাধ্যমে সঠিক ওজন বৃদ্ধি করা যায়। |
| ওজন বাড়াতে স্বাভাবিকের চেয়ে কম ওজনের ব্যক্তিদের প্রয়োজন পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং সঠিক জীবনযাপন পদ্ধতি। |
ওজন বাড়াতে হলে প্রথমেই জানতে হবে আপনার ওজন কম হওয়ার কারণ। এর কয়েকটি কারণ হতে পারে যেমন-
১. দৈহিক চাহিদার তুলনায় কম খাদ্য খেলে এবং সেইসঙ্গে খুব বেশি কাজ করলে।
২. রোগ আক্রান্ত থাকলে।
৩. থাইরয়েড গ্রন্থির অসামঞ্জস্যতা।
৪. উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, অতিরিক্ত চিন্তা আহারে অরুচি তৈরি করতে পারে।
৫. দুর্বল খাদ্য অর্থাৎ কম ক্যালোরির খাবার নির্বাচন।
৬. নিদ্রাহীনতা, অনিয়মিত খাদ্য গ্রহণ, পুষ্টিহীনতা।
৭. খাওয়ার ব্যাপারে অনীহা বা খুঁতখুঁত স্বভাব।
৮. বংশগত, ইত্যাদি।
আরও অনেক কারণ আছে, কারণে কম ওজন দেখা যায়। তাই আগে বের করতে হবে আপনার ওজন কেন কম? তারপর জানতে হবে আপনার ওজন স্বাভাবিক ওজন থেকে কত কম। এজন্য আপনি অবশ্যই একজন দক্ষ পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে আপনার বিএমআই অনুযায়ী কত ক্যালোরির খাবার ও কোন খাবারগুলো খাবেন তা নিশ্চিত করে নেবেন। কেননা আপনি খাবার খাচ্ছেন; কিন্তু নিয়ম মেনে চলছেন না, এমনটি হলে শরীরের ওজন বৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব নয়। তাই পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়ম করে খাবার তালিকা অনুসরণ করে খাবার খেলে, তা ওজন বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
ওজন বাড়ানোর জন্য খাবারের ক্ষেত্রে কিছু নীতিনির্ধারণ করা প্রয়োজন। যেমন- উচ্চ ক্যালরির, উচ্চ প্রোটিন, চর্বি এবং উচ্চ শর্করা জাতীয় খাবার গ্রহণ। একবারে বেশি খাওয়া কখনই ভালো না। তার থেকে একটু পরপর খাওয়া উচিত। যাদের ওজন কম তাদের খাবারের প্রতি অরুচি থাকে, তাই একবারে না খেয়ে বারেবারে খেতে হবে। আমাদের শরীরের ওজনের বড় একটা অংশ হল হাড়ের ওজন। অনেকে আছে প্রচুর খাওয়া সত্তে¡ও খুব শুকনো, কারণ তাদের মেটাবলিসম বেশি। সে ক্ষেত্রে প্রোটিন, শাকসবজি, ভিটামিন ও ক্যালসিয়াম জাতীয় খাবার বেশি খেতে হবে। তাই প্রতিদিন খাবার তালিকায় ১ গ্লাস খাঁটি দুধ ও ১টি ডিম খান।
১. অতিরিক্ত ক্যালরির খাবার গ্রহণ : শরীরে যে পরিমাণ ক্যালরি প্রতিদিন ক্ষয় হয়, তার চেয়ে ৫০০–৭০০ ক্যালরি খাবার বেশি খেতে হবে। ভাত, মাছ–মাংস, ডাল, বীজ, শাকসবজি, ফলমূল, ডিম, দুগ্ধজাতীয় খাবার নিয়মিত খেতে হবে। উচ্চ ক্যালরির খাবার হিসেবে কেউ যদি সকালে ২টি রুটি খেতে না চায় সে ১টি তেলে ভাজা পরোটা খেতে পারে। উচ্চ ক্যালরির কয়েকটি খাবার হল- হালুয়া, পুডিং, মিষ্টি, মাখন, জ্যাম, জেলি, কলা ইত্যাদি।
২. উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার গ্রহণ : ওজন বাড়াতে চাইলে অবশ্যই খাদ্যতালিকায় উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার রাখতে হবে। এ ধরনের কিছু খাবার হলো কাঠবাদাম, কাজুবাদাম, আখরোট, পেস্তাবাদাম, চিনাবাদাম, খেজুর, কিসমিস, আলুবোখারা, ননিযুক্ত দুধ, ফুলক্রিম দই, পনির, ক্রিম, মুরগির মাংস, গরুর মাংস, ভেড়ার মাংস, ছাগলের মাংস ও কলিজা, আলু, মিষ্টি আলু, চকলেট, কলা, আ্যভোকাডো, পিনাট, মাখন ইত্যাদি।
৩. দিনে পাঁচ–ছয়বার খাবার গ্রহণ : যাঁদের ওজন কম, তাঁদের তিন–চার ঘণ্টা পরপর খাবার খেতে হবে। দীর্ঘসময় পেট খালি রাখা চলবে না। পুষ্টিকর উচ্চ ক্যালরির খাবার যদি বারবার গ্রহণ করা হয় এবং প্রতিদিনের ক্যালরির চাহিদা যদি পূরণ করা যায়, সে ক্ষেত্রে দ্রুতই ওজন বাড়ানো সম্ভব।
৪. শর্করাজাতীয় খাবার : অনেকেই শর্করা একেবারে কম গ্রহণ করেন। এটা মোটেও ঠিক নয়। যাঁদের ওজন কম, তাঁদের অবশ্যই মোট ক্যালরির শতকরা ৫০-৬০ ভাগ শর্করা গ্রহণ করতে হবে। দিনে তিনবার প্রধান খাবার হিসেবে শর্করা গ্রহণ করতে হবে। এ ধরনের খাবারের মধ্যে আলু, আটা, চাল, পাস্তা, মিষ্টি ফল ইত্যাদি খাবারের তালিকায় রাখতে হবে।
৫. (Protein) আমিষযুক্ত খাবার গ্রহণ : ওজন বাড়াতে আমিষযুক্ত খাবার খাওয়া জরুরি। প্রতি কিলোগ্রাম ওজনের জন্য ১ গ্রাম প্রোটিন দরকার; কিন্তু যাদের ওজন কম তাদের শরীরের প্রতি কেজি ওজনের জন্য ১ দশমিক ৫ থেকে ২ দশমিক ২ গ্রাম আমিষ নিয়মিত গ্রহণ করতে হবে। ডিম, দুধ, মাছ, মাংস, ডাল, বীজজাতীয় খাবার আমিষের ভালো উৎস।
আমিষ কি এবং মাছ-মাংস ছাড়া আরও কিসে আমিষ বা প্রোটিন পাওয়া যায়?
৬. উচ্চ চর্বি : স্বাভাবিক সময় থেকে চর্বির পরিমাণ বাড়াতে হবে। মাখন, তেল, ঘি, মেয়োনেজ, দুধের সর ওজন বাড়াতে সাহায্য করে। তবে জাংক খাবার খাওয়া পরিহার করতে হবে।
৭. তরল : খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে পানি, শরবত, দুধ ইত্যাদি। তবে খাবার গ্রহণের আগে ও মাঝে পানি খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। প্রতিদিন ৮-১০ গ্লাস পানি পান করুন।
৮. প্রোবায়োটিকস খান : পেটে খাবার ভালোভাবে হজমের জন্য প্রয়োজন প্রচুর পরিমাণে উপকারী ব্যাকটেরিয়া। এ ক্ষেত্রে টক দই হতে পারে একটি ভালো সমাধান। প্রতিদিন খাবারের তালিকায় কিছুটা হলেও দই রাখুন।
৯. ব্যায়াম: পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। ওজন বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যায়াম ক্ষুধা বাড়াতে, খাবার ভালোমতো হজম করতেও সাহায্য করে।
১০. জীবনযাপন: ওজন বাড়াতে চাইলে জীবনযাপন পদ্ধতিও স্বাস্থ্যকর হতে হবে। গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকা চলবে না। প্রতিদিন আট ঘণ্টা ভালো ঘুম হতে হবে। দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে হবে।
* দিনে ৫-৭ বার পরিমাণমতো খাবার খান। এ ক্ষেত্রে প্রথমে খিদে বাড়াতে হবে, তার জন্য দরকার নিয়মিত ব্যায়াম। হালকা ব্যায়াম দিয়ে শুরু করতে হবে। এমন কিছু ব্যায়াম আছে যেগুলো শরীরের পেশি তৈরি করে ও ওজন বাড়ায় এবং ক্ষুধার উদ্রেকও সৃষ্টি করে। তাছাড়া আপনি যদি শুধু ক্যালরিযুক্ত খাবার খেয়েই যান আর কোনো ধরনের ব্যায়াম না করেন তাহলে আপনার শরীরের কিছু অংশে অতিরিক্ত মেদ দেখা দেবে। যেমন- তলপেটসহ অন্যান্য অংশে কিন্তু আপনার ওজন বাড়াতে খুব একটা সহায়ক ভূমিকা রাখবে না। এজন্য যতটা সম্ভব শারীরিক ব্যায়াম করুন। প্রয়োজনে সপ্তাহে কমপক্ষে ৫ দিন ৪০ মি. হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলুন। সবকিছুর জন্য দরকার নিজের ইচ্ছা এবং প্রচেষ্টা। তাই খাবার বুঝে-শুনে খান এবং সুস্থ থাকুন।
কিছু প্রয়োজনীয় পরামর্শ:
■ প্রতিদিন ৮-১০ গ্লাস পানি পান করতে হবে। তবে খাওয়ার আগে পানি পান করা যাবে না।
■ প্রোটিনযুক্ত খাবার আগে এবং শাকসবজি শেষে গ্রহণ করুন।
■ ঘুমানোর আগে একটা স্বাস্থ্যকর উচ্চ ক্যালরির স্ন্যাকস খাওয়ার চেষ্টা করুন।
■ ধূমপান বর্জন করতে হবে।
মাসল বিল্ডিং এবং ওজন বাড়ানোর সম্পর্কিত ডাক্তার জাহাঙ্গীর কবীর এবং সোহেল তাজ ভাইয়ের ভিডিও এখানে-...
তথ্যসূত্র:
- পুষ্টিবিদ সাজেদা কাশেম জ্যোতি, গণস্বাস্থ্য ডায়ালাইসিস সেন্টার, যুগান্তর।
- পুষ্টিবিদ, উম্মে সালমা তামান্না, প্রথম আলো।
- Dr.Jahangir Kabir, Lifestyle Modifier, Primary Care Physician, Trained in Asthma, COPD & Diabetes Trainer in icddr, B & EFH, UK joint Secretary at Bangladesh Primary Care Respiratory Society.
- ডাক্তার মুজিবুর রহমান এম. ডি কার্ডিয়লজিস্ট, ফাউন্ডার ভেন্টেজ ন্যাচারাল হেল্থ সেন্টার, থাইল্যান্ড।
- ডা. তাসনিম জারা, (চিকিৎসক, ইংল্যান্ড)।
- Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই