কেন মহিলাদের পুরুষদের তুলনায় বেশি আয়রন প্রয়োজন?
দেশীয় মহিলাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় শারীরিক সমস্যা অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা। ভারতের প্রায় সিংহ ভাগ মহিলাই এই সমস্যায় ভোগেন। অপুষ্টিকর খাবার, মাতৃত্ব যেমন এর কারণ, তেমনই এর অন্যতম বড় কারণ মহিলাদের শরীরে আয়রনের প্রয়োজনীয়তা। শারীরিক গঠনগত কারণেই পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের বেশি আয়রন প্রয়োজন। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের শরীরে আয়রনের ঘাটতি থেকে যায়।
নিউট্রিশনিস্ট রূপালি দত্ত জানাচ্ছেন, পুরুষ বা মহিলা, সকলের জন্যই আয়রন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের যেখানে প্রতি দিন ৮ মিলিগ্রাম আয়রনের প্রয়োজন, সেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মহিলার শরীরে প্রতি দিন আয়রনের প্রয়োজন ১৮ মিলিগ্রাম। যা প্রেগন্যান্সির সময় গিয়ে দাঁড়ায় ২৭ মিলিগ্রামে। গর্ভাবস্থায় প্লাসেন্টার গঠনের জন্য আয়রন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। শুধু মায়ের জন্য নয়, শিশুর বৃদ্ধির জন্যও আয়রন জরুরি। মায়ের শরীর থেকে শিশু যে আয়রন পায়, তা জন্মের পর ৬ মাস পর্যন্ত শিশুর বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
মহিলাদের শরীরে আয়রনের প্রয়োজনীয়তার অন্যতম বড় কারণ মেনস্ট্রুয়েশন বা ঋতুচক্র। প্রতি মাসে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণ রক্তক্ষরণ হয়। যার ফলে শরীর আয়রনের ঘাটতি হয়। যা পূরণ করতে আয়রন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত।আয়রনের অভাব:
শরীরে আয়রনের অভাব হলে রক্তে অক্সিজেনের অভাব হয়। যার ফলে অ্যানিমিয়া হতে পারে। অতিরিক্ত ক্লান্তি অ্যানিমিয়ার প্রাথমিক লক্ষণ। তাই ডায়েটে পর্যাপ্ত পরিমাণ আয়রন সমৃদ্ধ খাবার রাখুন। যেমন সবুজ শাক-সব্জি, ডিম, ড্রাই ফ্রুট, বাদাম, ডাল, বিনস, বীজ জাতীয় খাবার, গোটা শস্য, মাছ।
একজন পুরুষের তুলনায় একজন নারীর খাবারের তালিকায় লৌহ বা আয়রনের পরিমাণ অনেক বেশি থাকা উচিত। কেননা, মাসিকের সঙ্গে প্রতি মাসে তাঁদের বেশ খানিকটা লৌহ হারাতে হয়, আর গর্ভাবস্থায় তো আরও বেশি। ১৯ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারীদের প্রতিদিন প্রায় ১৮ মিলিগ্রাম আয়রন খাওয়া উচিত, আর গর্ভকালীন দরকার প্রতিদিন অন্তত ২৫ মিলিগ্রাম। তবে পুরুষদের প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ মিলিগ্রাম আয়রন গ্রহণ করলেই চলে। তাহলে জেনে নিন আয়রনের এই চাহিদা পূরণের জন্য মেয়েদের কী ধরনের খাবার নিয়মিত খেতে হবে—
* গরু-খাসির কলিজায় প্রচুর পরিমাণে আয়রন আছে। ছোট এক টুকরোতেই থাকে ৫ মিলিগ্রামের মতো। গরুর মাংসেও পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়রন রয়েছে (ছোট এক টুকরোতে ২-৩ মিলিগ্রাম)। তবে মনে রাখবেন, এসব খাবারে চর্বিও বেশি পরিমাণে থাকে। তাই একটু হিসাব করে না খেলে রক্তে ও শরীরে চর্বি জমবে। তাই মাসে দু-একবার খেতে পারেন।
* ডিমের কুসুমে আয়রনের পরিমাণ অনেক। প্রতিদিন একটি ডিম খাওয়া মেয়েদের জন্য ভালো।
* যাঁরা শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান, তাঁরা ছোলা খেয়ে আয়রনের চাহিদা পূরণ করতে পারেন। এক কাপ রান্না বা সেদ্ধ ছোলাতে প্রায় ৫ মিলিগ্রাম আয়রন আছে। সেই সঙ্গে আছে প্রোটিন। এই রকম উচ্চ মানের আয়রন পাবেন শিমের বিচিতেও। এক কাপ সেদ্ধ শিমের বিচিতে প্রায় ৫ থেকে ৭ মিলিগ্রাম আয়রন থাকে। ছোলা বা শিমের বিচি সবুজ সালাদের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া আরও ভালো। কারণ, সালাদের ভিটামিন ‘সি’ আয়রন শোষণে সাহায্য করে।
* রান্না করা এক কাপ ডালে ৬ মিলিগ্রাম আয়রন পেয়ে যাবেন। লেবু দিয়ে খেলে ভিটামিন ‘সি’ যুক্ত হবে। প্রতিদিন এই খাবারটি অবশ্যই খাবেন।
* সবুজ পাতাওয়ালা যেকোনো শাকে আয়রন আছে। যেমন পালংশাকে এক কাপ পরিমাণে আছে প্রায় ৬ মিলিগ্রাম আয়রন। সঙ্গে পাবেন প্রোটিন, ভিটামিন ‘এ’ এবং ‘ই’ ও ক্যালসিয়াম। শাকপাতা খাওয়ার অভ্যাস করুন। আয়রন আছে মাশরুমেও।
* ফলমূলের মধ্যে কলা, জলপাই এবং শুকনো ফলে (যেমন কিশমিশ) উচ্চমাত্রার আয়রন থাকে।
দীর্ঘদিন আয়রনের ঘাটতিতে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হয়:
আয়রন রক্তে হিমোগ্লোবিনের মূল উপাদান গঠন করে। শরীরের আয়রনের পরিমাণ কমে গেলে রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া দেখা দেয়। অধিক রক্তশূন্যতার জন্য রক্ত নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। মহিলাদের পিরিয়ডে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও গর্ভবতী মায়েদের রক্তশূন্যতার সমস্যা বেশি থাকলেও নারী-পুরুষ ভেদে সকলের আয়রন ঘাটতি হতে পারে।
আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তশূন্যতার সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো ক্লান্তি। কারণ তখন শরীর পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়রনের অভাবে হিমোগ্লোবিন তৈরি করতে পারে না। পর্যাপ্ত হিমোগ্লোবিন ছাড়া পর্যাপ্ত পরিমাণ অক্সিজেন টিস্যু এবং পেশিতে পৌঁছায় না। শরীর ক্লান্তবোধ করে।
শরীরে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কম হলে ত্বক ফ্যাকাশে দেখায়। এমন সমস্যায় অনেকের মুখ, মাড়ি, ঠোঁট, নিচের চোখের পাতা এবং নখও ফ্যাকাশে দেখায়।
দীর্ঘদিন এ সমস্যার চিকিৎসা করা না হলে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ, হৃদরোগজনিত জটিলতা দেখা দিতে পারে। শরীরে আয়রনের ঘাটতি হলে হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়। সময়মতো চিকিৎসা করানো না হলে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ারও ঝুঁকি বাড়ে।
ত্বক-চুলের ক্ষতি রক্তে হিমোগ্লোবিনের অভাবে কোষগুলোতে অক্সিজেন সরবরাহ কম হয়। ত্বক, চুল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়, চুল পড়া এবং নখ ভেঙে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
তথ্যসূত্র:
- ডা. মৌসুমী মরিয়ম সুলতানা, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতাল, মিরপুর, ঢাকা, প্রথম আলো।
- নিউট্রিশনিস্ট রূপালি দত্ত, আনন্দবাজার।
- Edited: Natural_Healing.
কোন মন্তব্য নেই