First Aid Present

Lifestyle Modification এবং প্রাকৃতিক খাদ্য, পানীয়, শাকসবজি, গাছ, ডালপালা, ফল, মসলা, পাতা ও ফুল ইত্যাদির দ্বারা প্রাথমিক চিকিৎসা।

কখন কোন খাদ্য কতটুকু খাবেন? রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাই খাদ্যের সুষম বন্টন কিভাবে? (সুষম_খাদ্য-পর্ব-২)

মানুষ কীভাবে সুস্থ থাকতে পারে এবং কোন উপায়ে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারে, সেটি নিয়ে নানামুখী গবেষণা হয়েছে বিশ্বজুড়ে।

এক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাস এবং জীবন-যাপনের পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করছেন চিকিৎসকরা।

মানুষ সচরাচর যে ধরণের খাবার খায়, সেগুলো হচ্ছে - শর্করা, প্রোটিন এবং ফ্যাট বা চর্বি জাতীয় খাবার। এ ধরণের খাবার শরীরের জন্য অবশ্যই প্রয়োজন। মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নির্ভর করে ভিটামিন এবং মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট-এর উপর।



চিকিৎসক এবং পুষ্টিবিজ্ঞানীরা বলছেন, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী না হলে অল্প অসুস্থতাতেও মানুষ খুব সহজে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং রোগের আক্রমণও জোরালো হয়।

একটি আদর্শ ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস:

আজকাল খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কিত কথা উঠলেই যে পরামর্শটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় তা হলো, ‘কম খান’ বা ‘চর্বি জাতীয় খাবার কমান’। কিন্তু শুধু আমি না আরো অনেকেই এই জাতীয় পরামর্শে কনভিন্সড না। আমাদের বেশিরভাগই হয়তো সাংঘর্ষিক পুষ্টি এবং খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কিত পরামর্শ শুনে কিছুটা হতবিহ্বলও বটে।

কিন্তু আমার মনে হয়েছে না দেহকে কোনো খাদ্য থেকে বঞ্চিত করাটা পুরোপুরি সঠিক সমাধান নয় বরং খাবার খাওয়ায় ভারসাম্য স্থাপনই আসল সমাধান। স্বাস্থ্যকর জীবন-যাপনের জন্য সঠিক ধরন এবং সঠিক পরিমাণের খাবার খাওয়াটাই জরুরি।

ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস কেমন হতে পারে? এমন খাদ্যাভ্যাস যার মাধ্যমে আপনি আপনার দেহকে তার প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করতে পারবেন। এর মধ্যে রয়েছে বড় পুষ্টি উপাদান যেমন, প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেটস, এবং ফ্যাট। এবং ছোট পুষ্টিউপাদান যেমন, ভিটামিন এবং খনিজ উপাদান। প্রতিটি উপাদানই আমাদের দেহের ভিন্ন ভিন্ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভুমিকা পালন করে। এই পুষ্টি উপাদানগুলো আসে প্রধান পাঁচটি খাদ্যগোষ্ঠী থেকে- ফল ও সবজি, শস্য এবং ডাল, মাংস এবং দুধ এবং চর্বি ও তেল। কিন্তু প্রতিদিন কী পরিমাণে খেতে হবে এই খাবারগুলো? প্রোটিন এবং কার্বোহাইড্রেটস খাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় কখন এবং কী পরিমাণে খেতে হবে?

এক:- কার্বোহাইড্রেটস আমাদের খাবারের ৭০-৮০% ক্যালোরি আসে শস্য ও ডাল জাতীয় খাদ্যে থাকা কার্বোহাইড্রেটস থেকে। অথচ কার্বোহাইড্রেটস থেকে আমাদের চাহিদার ৫০% ক্যালোরি আসা উচিত। কিন্তু সমস্যা হলো আমরা পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেটস গ্রহণ করি বেশি। যেমন রুটি, বিস্কিট, সাদা চাল এবং আটা-ময়দা এসব বেশি খাই। কিন্তু এসব ছাড়াও কার্বোহাইড্রেটের আরো স্বাস্থ্যকর উৎস আছে। যেমন, পূর্ণ শস্য- লাল চাল, ভুট্টা এবং যব আরো বেশি স্বাস্থ্যকর কার্বোহাড্রেটের উৎস।

এসবে রয়েছে প্রচুর খাদ্য আঁশ। আঁশ ছাড়া খাবার অসম্পুর্ণ থেকে যায়। কারণ এটি খাবার হজমে সহায়তা করে। কিন্তু খুব কম মানুষই যথেষ্ট পরিমাণে আঁশজাতীয় খাবার খায়।

বেশিরভাগ ফল, সবজি এবং পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবারই রক্তে হঠাৎ করে সুগারের হার বাড়িয়ে দেয় না। বরং তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক। সুতরাং প্রতি ৩০ গ্রাম শস্যজাতীয় খাবারের সঙ্গে ১০০ গ্রাম সবজি খাওয়া উচিত।

সকালের নাশতায় খাদ্য শস্য বা কলা অথবা ভালো কোনো কার্বোহাইড্রেটের উৎস থাকতে হবে। যাতে দুপুরের খাবার পর্যন্ত আপনার দেহ সক্রিয় থাকে।

কার্বোহাইড্রেট একেবারে বাদ না দিয়ে বরং পরিমাণ এবং গুনগত মানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে। সরল কার্বোহাইড্রেট যেমন, গ্লুকোজ এবং ফ্রুকটোজের উৎসগুলো হলো- ফল, সবজি এবং মধু; সুক্রোজের উৎস চিনি আর ল্যাকটোজের উৎস দুধ।

আর জটিল পলিস্যাকারাইড এবং শ্বেতসার পাওয়া যায় চাল ও গম জাতীয় শস্য, ভুট্টা, ডাল এবং মুলজাতীয় সবজিতে। এবং গ্লাইকোজেন পাওয়া যায় পশু খাদ্যে।

প্রতিদিন একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কতটুকু ক্যালোরি গ্রহণ উচিৎ: পুরুষ: ২৩২০ কিলোক্যালরি/প্রতিদিন নারী: ১৯০০ কিলোক্যালরি/প্রতিদিন

দুই:- প্রোটিন প্রতিদিনের খাবারের ৩০-৩৫% হওয়া উচিত প্রোটিন। ডাল, দুধ, পাতাবহুল সবুজ সবজি, ডিম, সাদা মাংস বা উদ্ভিজ্য উৎস থেকে আসতে পারে এই প্রোটিন। আমাদের দেহকোষ, চুল, ত্বক এবং সফট টিস্যুর কোষগুলোর প্রধান উপাদান প্রোটিন। আর তাছাড়া প্রোটিন হজমে বেশি ক্যালোরি খরচ হয়। নারীদের তুলনায় পুরুষদের বেশি দরকার হয় প্রোটিন।

আমাদের প্রতিবেলা খাবারেই প্রোটিন থাকা জরুরি। ডাল, কটেজ পনির, আটা-ময়দা বা ৩০ গ্রাম ডাল হতে পারে আমাদের এই প্রোটিনের উৎস। আমাদের দেশের মানুষেরা প্রয়োজনের তুলনায় প্রোটিন অনেক কম খায়। কারণ আমাদের দেশে ধান-চালই বেশি হয়।

প্রতিদিন একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের কতটুকু প্রোটিন দরকার: পুরুষ: ৬০ গ্রাম/প্রতিদিন নারী: ৫৫ গ্রাম/প্রতিদিন

তিন:- ফ্যাট বা চর্বি: এটি শক্তি সরবাহ করে, ভিটামিন সংরক্ষণ করে এবং হরমোন সংশ্লেষণ করে। একজন মানুষের প্রতিদিনের খাবারে পাঁচ ভাগের একভাগ বা ২০% ফ্যাপট বা চর্বি থাকা উচিত। এই ফ্যাট তিন ধরনের- পলিআনস্যাচুরেটেড, মনোস্যাচুরেটেড এবং ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড। প্রতিদিনের রান্নায় যে ভেজিটেবল তেল ব্যবহার করি আমরা তা আমাদের খাদ্যের দৃশ্যমান প্রধান উৎস। এর জন্য নানা ধরনের তেল ব্যবহার করা যায়। আপনি চাইলে মাখন, ঘি, অলিভ অয়েল, সরিষার তেল, সয়াবিন, তিলের তেল এবং এমনকি বাদাম তেলও খেতে পারেন। আর পরিশোধিত তেলের চেয়ে বরং ঘানিতে ভাঙ্গানো অপরিশোধিত তেলই বেশি ভালো।

চার:- ভিটামিন ও খনিজ পুষ্টি পরিপাকতন্ত্র, স্নায়ু এবং মাংসপেশির কার্যক্রম, হাড়ের স্বাস্থ্য এবং কোষ উৎপাদনে সহায়ক এই মাইক্রোনিয়েট্রিয়েন্টস বা ছোট পুষ্টি উপাদানগুলো।

খনিজ পুষ্টি অজৈব পুষ্টি উপাদান। ফলে উদ্ভিদ, মাংস এবং মাছ থেকে খনিজ খুব সহজেই দেহে প্রবেশ করে। ভিটামিন হলো ভঙ্গুর যৌগ উপাদান। বাদাম, তেলবীজ, ফল এবং সবুজ শাক-সবজি তেকে আসে ভিটামিন। ভিটামিন এ, ই, বি১২ এবং ডি হলো মানবদেহের জন্য সবচেয় জরুরি। এছাড়া ক্যালসিয়াম এবং আয়রনও দরকার।

সকাল দুপুর রাতে কোন কোন খাদ্য কিভাবে খাবেন?

সুস্থ থাকতে প্রতিদিন অন্তত ১০০ গ্রাম সবুজ শাক-সবজি এবং ১০০ গ্রাম ফল খাওয়া উচিত।

এছাড়া খনিজ পুষ্টির উৎস হিসেবে প্রতিদিন পানি খেতে হবে পর্যাপ্ত পরিমাণে। প্রতিদিন অন্তত ৬ থেকে ৮ গ্লাস পানি খাওয়া দরকার।

নারীদের বেশিরভাগই আয়রণের ঘাটতি ও রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত হন বলে গর্ভাবস্থায় তাদের পরিপূরক ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, ফলিক অ্যাসিড, আয়রন এবং বায়োটিন ডোজ নেওয়া উচিত নিয়মিতভাবে।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন কী পরিমাণ ক্যালসিয়াম গ্রহণ করা উচিত: (১০০ গ্রাম দুধ এবং দুগ্ধজাত পণ্য) পুরুষ: ৬০০ মিলিগ্রাম/প্রতিদিন নারী: ৬০০ মিলিগ্রাম/প্রতিদিন

একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন কী পরিমাণ আয়রণ গ্রহণ করা উচিত: পুরুষ: ১৭ মিলিগ্রাম/প্রতিদিন নারী: ২১ মিলিগ্রাম/প্রতিদিন

দেহকে সক্রিয় রাখার জন্য প্রতিদিন অন্তত তিন বেলা বড় খাবার খাওয়া উচিত। আর সকালের নাশতাতেই সবচেয়ে বেশি খাবার খাওয়া উচিত। অথচ আমরা সকালের নাশতাতেই সবচেয়ে কম খাই! আবার দুপুরের খাবারও আমরা তাড়াহুড়ো করে সেরে ফেলি। ফলে রাতের বেলায় গিয়ে সব খাবারের ভিড় জমে। অথচ রাতের বেলাতেই সবচেয়ে কম পরিমাণ খাবার খাওয়াটাই স্বাস্থ্যের জন্য উপকারি! কিন্তু সময় এসে গেছে পরিবর্তনের। আজই এই বদভ্যাসগুলো বদলে ফেলুন।

নাশতা সকালের নাশতায় অন্তত তিনটি জিনিস থাকা উচিত। ১. খাদ্য আঁশ বা কার্বোহাড্রেটস (পূর্ণ-শস্য রুটি, ওটমিল, সাদা ওট, হুইট ফ্লেকস), ২. প্রোটিন (ডিম, দই, দুধ এবং মঁজরি) এবং ২. ভিটামিন (কাজুবাদাম, আখরোট, অ্যাপ্রিকোট, এবং ফিগ)।

দুপুরের খাবার উচ্চ আঁশযুক্ত পূর্ণ খাদ্য শস্য যেমন লাল চালের ভাত, বার্লি বা জোয়ার (যব), শ্বেতসারবহুল কার্বোহাইড্রেটস এবং কটেজ পনির, ডাল, মুরগীর মাংস বা মাছের মতো প্রোটিনের ভালো কিছু উৎস। এর সঙ্গে যুক্ত করুন কিছু প্রোবায়োটিক যেমন দই বা ঘোল এবং আঁশের উৎস সবজির সালাদ।

রাতের খাবার রাতের খাবারটি যেন উচ্চ মাত্রায় তৃপ্তিদায়ক। রাতের খাবারে প্রচুর পরিমাণে সবুজ শাক-সবজি খান যাতে আপনার দেহের ভিটামিন এবং খনিজ পুষ্টি উপাদানের চাহিদা পূরণ হয়। রাতে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ কমিয়ে দিলেও একেবারে বাদ দিয়ে দেবেন না যেন। এর সঙ্গে কিছু স্বাস্থ্যকর চর্বির উৎসও যোগ করতে পারেন। যেমন. মাছ, বাদাম এবং বীজ তেল। এইসব উপাদান ব্যবহার করে রাতের বেলায় আপনার দেহ পুনরুজ্জীবন এবং মেরামতের কাজ সারতে পারবে। প্রধান তিন বেলা খাবারের মাঝে অন্তত এক বা দুই বেলা হালকা খাবার খেতে পারেন।

সঠিক সময়ে খাবার খান সুস্থ্য থাকার জন্য কখন খাবার খাচ্ছেন তা খেয়াল রাখাটাও গুরুত্বপূর্ণ। সকালে ঘুম থেকে ওঠার অন্তত আধা ঘন্টা পর নাশতা খান। নাশতার অন্তত তিন ঘন্টা পর দুপুরের খাবার খান। তেমনিভাবে দুপুরের খাবারের অন্তত তিন ঘন্টা পরে বিকালের হালকা খাবার ও চা খান। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত দুই ঘন্টা আগে রাতের খাবার খাওয়া উচিত। যাতে বিছানায় যাওয়ার আগেই হজমের কাজ শেষ করতে পারে আপনার দেহ।

দুগ্ধজাত খাবার:

দুগ্ধজাত খাবারগুলো বিজ্ঞানের ভাষায় প্রোবায়েটিকস হিসেবে পরিচিত। যেমন- দই, ঘোল, ছানা ইত্যাদি।

মানুষের পাকস্থলিতে যে আবরণ আছে, সেটার ভেতরে বেশ কিছু উপকারী জীবাণু কার্যকরী হয়।

বাংলাদেশের একজন চিকিৎসক হাসান শাহরিয়ার কল্লোল বলেন, পাকস্থলীতে যদি উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা কমে যায় তখন সেখানে ক্যান্সার বাসা বাঁধতে পারে।

দুগ্ধজাত খাবারগুলোর পাকস্থলীতে উপকারী জীবাণুকে বাঁচিয়ে রাখে। ভিটামিন ডি এর জন্য দিনের কিছুটা সময় শরীরে রোদ লাগাতে হবে। এটা খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনাচরণের সাথে সম্পৃক্ত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক নাজমা শাহীন বলেন, যার শরীরের গঠন ভালো এবং সেখানে কোন ঘাটতি থাকবে না, তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি হবে।

তিনি বলেন, যেমন শিশু জন্মের পর থেকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ালে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।

চা-কফি কতটা খাবেন?

অতিমাত্রায় চা-কফি পান করা শরীরের জন্য ভালো নয় বলে সতর্ক করে দিচ্ছেন চিকিৎসক মি: কল্লোল।

"ধরুন একজন ব্যক্তি যদি দিনে সাত কাপ চা খায়, এবং প্রতি কাপে এক চামচ চিনি থাকে তাহলে তিনি কিন্তু প্রতিদিন সাত চামচ চিনি খাচ্ছেন। এই সাত চামচ চিনি শরীরের জন্য ভয়াবহ।" বলছিলেন মি: কল্লোল।

চা-কফিতে এমন অনেক উপাদান থাকে যার কোনটি শরীরের জন্য ভালো এবং কোনটি শরীরের জন্য খারাপ।

ভাত বেশি খাবেন না:

একজন মানুষ প্রতিদিন যে পরিমাণ খাবার খাবেন, তার ৬০ শতাংশ হওয়া উচিত কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা।

এর পর ৩০ শতাংশ হতে হবে প্রোটিন এবং ৫ শতাংশের মতো থাকবে চর্বিজাতীয় খাবার।

মি: কল্লোল বলেন, "আমাদের দেশে দেখা যায়, শর্করা প্রচুর খাওয়া হচ্ছে কিন্তু সে পরিমাণে প্রোটিন গ্রহণ করা হয়না।"

তিনি বলেন, অতিরিক্ত ভাত বা শর্করা জাতীয় খাবার খেলে সেটি শরীরের ভেতরে ঢোকার পর ফ্যাট বা চর্বিতে রূপান্তর ঘটে।

অধ্যাপক নাজমা শাহীন বলেন, রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন ধরণের খাবার সুষমভাবে খেতে হবে।

"আপনি হয়তো মনে করছেন যে আপনি প্রচুর পরিমাণে তেল, চর্বি, ঘি বা মাখন জাতীয় খাবার খাচ্ছি না। তাহলে আমার শরীরে এতো চর্বি জমা হয় কীভাবে?"

খাদ্যের ভিতরে কি কি উপাদান আছে?

খাবার ছাড়া আমাদের জীবন ধারণ অসম্ভব। দৈনন্দিন কাজকর্ম ও চলাফেলা করার জন্য সবল, রোগমুক্ত ও সুস্থ শরীর প্রয়োজন। আর এই সুস্থ শরীর বজায় রাখতে খাবার প্রয়োজন। খাবার শরীর গঠন, বৃদ্ধি সাধন এবং ক্ষয়পূরণ করে; তাপশক্তি ও কর্মক্ষমতা বাড়ায়। এ ছাড়া রোগমুক্ত রাখতে সাহায্য করে। অসুস্থ শরীরকে আরোগ্য হতেও সাহায্য করে। তবে খাবারের রয়েছে অনেক শ্রেণিভাগ। আর দেহকে সুস্থ রাখতে কোন খাবার কতটুকু প্রয়োজন শরীরের জন্য সেটিও জানা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

খাদ্য উপাদানের শ্রেণীবিভাগ করলে আমরা এসব উপাদানকে ছয়টি ভাগে ভাগ করতে পারি। এগুলোও আবার বিভক্ত মুখ্য ও গৌন উপাদানে।

খাদ্যের মুখ্য উপাদান:

শ্বেতসার বা শর্করা:- (উৎস-চাল, গম, ভুট্টা, চিড়া, মুড়ি, চিনি, আলু, মূল জাতীয় খাদ্য)

আমিষ:- (উৎস-মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ডাল, সীমের বীচি, কাঁঠালের বীচি, বাদাম ইত্যাদি)

স্নেহ জাতীয় খাদ্য:- (উৎস্য-তেল, ঘি, মাখন, চর্বি ইত্যাদি)

খাদ্যের গৌন উপাদান:

খাদ্যপ্রাণ বা ভিটামিন (উৎস-রঙ্গিন শাক-সবজি, ফল, ডিম, দুধ, কলিজা ইত্যাদি)।

খনিজ উপাদান (উৎস-ছোট চিংড়ি, ছোট মাছের কাঁটা, ঢেঁড়স, কচুশাক ইত্যাদি)।

কোন খাদ্য উপাদান দৈনিক কতটুকু খাওয়া প্রয়োজন?

শ্বেতসার বা শর্করা : মোট প্রয়োজনীয় খাদ্য শক্তির শতকরা প্রায় ৫০-৬০ ভাগ শর্করা জাতীয় খাবার খাওয়া প্রয়োজন।

আমিষ : শরীরের প্রতি কেজি ওজনের জন্য ১ গ্রাম (পূর্ণ বয়স্কদের জন্য)। প্রতি কেজি শরীরের ওজনের জন্য ২-৩ গ্রাম (৪ বছরের শিশুর জন্য)। প্রতি কেজি শরীরের ওজনের জন্য ১.৭ গ্রাম (৪-১৮ বছরের বয়সের জন্য)। প্রতি কেজি শরীরের ওজনের জন্য ১.৫ গ্রাম (গর্ভবতী ও প্রসূতির জন্য)।

স্নেহ জাতীয় খাবার : প্রায় ৩৫-৪০ গ্রাম (পূর্ণ বয়স্কদের জন্য)। প্রতি কেজি শরীরের ওজনের জন্য দৈনিক ২-৩ গ্রাম (১ বছর পর্যন্ত শিশুর)

ভিটামিন (তেল বা চর্বিতে দ্রবণীয়):

- ভিটামিন-এ: প্রায় ৫০০০ আইইউ (প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য)। প্রায় ৬০০০ আইইউ (গর্ভবর্তী মায়ের জন্য )। প্রায় ২০০০-৪৫০০ আইইউ (১-১২ বছর বয়স পর্যন্ত)।

- ভিটামিন-ডি : ২.৫ মাইক্রোগ্রাম (প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষদের জন্য)। ১০ মাইক্রোগ্রাম (গর্ভবতী, প্রসূতি ও শিশুর জন্য)।

- ভিটামিন-ই : প্রায় ৫-১০ মিলিগ্রাম

ভিটামিন (পানিতে দ্রবণীয়) :

-ভিটামিন-সি : ২০ মিলিগ্রাম (শিশুর জন্য)। ৩০ মিলিগ্রাম (প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য)। ৫০ মিলিগ্রাম (গর্ভবতী ও প্রসূতীর জন্য)

-ভিটামিন-বি২ : ১.৪ মিলিগ্রাম (পুরুষদের জন্য)। ১.০ মিলিগ্রাম (মহিলার জন্য)। ১.১ মিলিগ্রাম (গর্ভবতীর জন্য)।

- নায়সিন : ১৮.২ মিলিগ্রাম(পুরুষদের জন্য)। ১৩.২ মিলিগ্রাম (মহিলার জন্য)। ১৫.১ মিলিগ্রাম (গর্ভবতীর জন্য)।

- ভিটামিন-বি১২ : ১.০ মাইক্রোগ্রাম (শিশুর জন্য)। ২.০ মাইক্রোগ্রাম (প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য)। ৩.০ মাইক্রোগ্রাম (গর্ভবতীর জন্য)।

খনিজ উপাদান:  

ক্যালসিয়াম : ৪৫০ মিলিগ্রাম (প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য)।

ফসফরাস : ৮০০ মিলিগ্রাম (প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য)

পটাশিয়াম : ২.৫ মিলিগ্রাম (প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য)

আয়রন : ৯ মিলিগ্রাম (প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য)

আয়োডিন : ১৫০ মাইক্রোগ্রাম প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য

পানি : প্রায় ২-২.৫ লিটার প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য।

সুষম খাদ্য কাকে বলে? কেন প্রয়োজন?

সারা বিশ্বের এখন স্লিম ফিগারের জয়জয়কার। মেদবিহীন ছিপছিপে আকর্ষণীয় দেহের গড়ন সবার প্রিয়। এই প্রত্যাশা পূরণ খুব একটা কঠিন কাজ নয়। পরিমিত সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং নিয়মিত শরীর চর্চার মাধ্যমে স্বাভাবিক ওজন আর সুস্থ শরীরের অধিকারী হওয়া সহজেই সম্ভব।

যে খাদ্যের মধ্যে মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় সব খাদ্য উপাদান পরিমাণমতো বর্তমান থাকে, তাকেই এক কথায় সুষম খাদ্য বলা হয়। অর্থাৎ মানবদেহের প্রয়োজনীয় ও পরিমাণমতো ছয়টি (শর্করা, আমিষ, স্নেহ জাতীয় পদার্থ, ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পানি) উপাদানযুক্ত খাবারকেই সুষম খাদ্য হিসেবে ধরা হয়। 

সুষম খাদ্য দেহের চাহিদা অনুযায়ী পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবারের জোগান দেয়। এ সুষম খাদ্যের মাধ্যমে দেহের ক্ষয়পূরণ, বুদ্ধিসাধন, শক্তি উৎপাদনসহ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জিত হয়ে থাকে। দেহ সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম রাখার জন্য পরিমিত সুষম খাদ্য দরকার। সুষম খাদ্য নির্বাচন এবং নিয়মিত আহার, উন্নত জীবনের পূর্বশর্ত। সুষম খাদ্য একজন মানুষের বিপাক ক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তাপশক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে নিচে একজন পূর্ণবয়স্ক স্বাভাবিক পরিশ্রমী ব্যক্তির স্থানীয় স্বল্পমূল্যের খাদ্য থেকে সুষম খাদ্যের তালিকা দেওয়া হলো।

খাদ্যশস্য (চাল, আটা, ময়দা সুজি) : ২৮৫ গ্রাম/ (২৬০ গ্রাম)

মসুর, মুগ, ছোলা, মটর, খেসারি : ১০০ গ্রাম / ৪০ গ্রাম

মিষ্টি কুমড়া, আলু : ২০০ গ্রাম / ১২০ গ্রাম

কচু, বিভিন্ন প্রকার সবুজ শাক-সবজি : ১০০ গ্রাম

কাজুবাদাম, পেস্তাবাদাম : ২০০ গ্রাম

অঙ্কুরিত বীজ : ৪০ গ্রাম

ভোজ্য তেল : ৫০ গ্রাম

চিনি/গুড় : ২০ গ্রাম

মৌসুমি ফল : ২৫০ গ্রাম

মাংস : ৫০ গ্রাম

দুধ : ২৫০ গ্রাম

টাটকা শাক : ১২০ গ্রাম

ডিম : ২০ গ্রাম

ওজন কমানোর ক্ষেত্রে দৈনিক কতটুকু ক্যালরি পোড়ানো উচিত?

ওজন কমাতে হলে একজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষের ও মহিলার ৫০০ ক্যালরি কম খেতে হবে। যেমন : একজন পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ যদি ২২০০ ক্যালরি খান (দৈনিক ক্যালরির চাহিদা অনুযায়ী) সেক্ষেত্রে ২২০০-৫০০ = ১৭০০ ক্যালরি খেতে হবে। একজন পূর্ণ বয়স্ক মহিলা যদি ১৭০০ ক্যালরি খান (দৈনিক ক্যালরির চাহিদা অনুযায়ী) সেক্ষেত্রে ১৭০০-৫০০ = ১২০০ ক্যালরি খেতে হবে। এই ৫০০ ক্যালরি কম খাওয়া হবে ব্যায়ামের ক্যালরি ও খাবারের ক্যালরি মিলিয়ে। এর কম খেলে মেটাবলিসম কমে যেতে পারে, শরীর দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ৫০০ গুণ ৭ = ৩৫০০ ক্যালরি কম খেলে ওজন কমবে সপ্তাহে এক পাউন্ড বা আধা কেজি। এই ৫০০ ক্যালরি কম খাওয়া হতে পারে প্রতিদিন ২৫০ ক্যালরি ব্যায়ামে বার্ন করা + প্রতিদিন ২৫০ ক্যালোরি কম খাওয়া। যেমন : একজন ব্যক্তি, যিনি প্রতিদিন ২২০০ ক্যালরি খান, তিনি যদি ব্যায়ামে ২৫০ ক্যালরি পোড়ান, তাহলে তিনি ওজন কমাতে ২৫০ ক্যালরি কম খাবেন। এটাই ওজন কমানোর সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর পথ। অনেকেই কম খাবার খান, তারা মনে করেন সে কম খাবার খেলে ওজন তাড়াতাড়ি কমবে।

এটা ভুল ধারণা বরং প্রতিদিন ৫০০ ক্যালরি কম খেলেই ওজন ঠিক মতো কমবে। একমাত্র অনেক বেশি ওজন যাদের তারা ওজন অনেক দ্রুত বা সপ্তাহে এক পাউন্ডের চেয়ে বেশি কমাতে (ডাক্তার/পুষ্টিবিদের পরামর্শ মতে) পারে। খাবার খাওয়া খুব না কমিয়ে বরং আপনার দৈনন্দিন কাজ কর্ম বা ব্যায়ামের পরিমাণ একটু বাড়াতে পারেন। এর মাধ্যমে আপনার যে ওজন কমবে,তা পরবর্তীকালে ধরে রাখতে পারবেন।

তথ্যসূত্র:

  • ফার্জানা খান শিমুল, চিফ ফিটনেস ট্রেইনার, পারসোনা হেলথ, এনটিভি।
  • চিকিৎসক হাসান শাহরিয়ার কল্লোল, বিবিসি বাংলা।
  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক নাজমা শাহীন, এনডিটিভি> কালের কণ্ঠ।
  • Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই

Popular Post

Blogger দ্বারা পরিচালিত.