পানি বা নিরাপদ পানির উৎস
জল- এটি সরাসরি পুষ্টি উপাদান না হলেও দেহে পানির সমতা রক্ষা করে এবং কোষের গুণাবলী নিয়ন্ত্রণ করে, এবং কোষ অঙ্গাণু সমূহকে ধারণ এবং কোষের সমতা রক্ষা করে।
পানি খাদ্যের একটি উপাদান। মানবদেহের জন্য পানি অপরিহার্য। দেহের গঠন এবং অভ্যন্তরীণ কাজ জল ছাড়া চলতে পারে না। আমাদের দৈহিক ওজনের ৬০-৭০% পানি। আমাদের রক্ত মাংস, স্নায়ু, দাঁত, হাড় ইত্যাদি প্রতিটি অঙ্গ গঠনের জন্য পানি প্রয়োজন। দেহকোষ গঠন ও কোষের যাবতীয় শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াগুলো পানি ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
আমরা ভূ-পৃষ্ঠের পানি, চা, দুধ, কফি, শরবত, ফলমূল, শাকসবজি, ডাব ও ড্রিংস; সহ বিভিন্ন উৎস থেকে পানি পেয়ে থাকি।
| জল বা পানির তিনটি অবস্থা: তরল, কঠিন (বরফ), এবং বাতাসে মিশ্রিত (অদৃশ্য) জলীয় বাষ্প। মেঘ হল জলীয় বাষ্প সম্পৃক্ত বাতাসে ঘনীভূত পানিবিন্দুর সমষ্টি। |
উদ্ভিদ দেহে জলের প্রয়োজনীয়তা: (Importance of Water in Plant body)
১৷ জল সজীব কোষে প্রোটপ্লাজমের উপাদান।
২৷ উদ্ভিদ দেহে বাষ্পমোচন, সালোকসংশ্লেষ, শ্বসন, রেচন প্রভৃতি ক্রিয়ায় জলের বিশেষ প্রয়োজন।
৩৷ জল ছাড়া উদ্ভিদ দেহে সংবহন ক্রিয়া সংগঠিত হয় না।
৪৷ জীবের অঙ্কুরোদ গমের জন্য জলের প্রয়োজনীয়তা আছে।
প্রাণীদেহে জলের প্রয়োজনীয়তা:
১৷ জল প্রাণী কোষের প্রোটপ্লাজমের প্রধান উপাদান।
২৷ জলের সাহায্যে প্রাণীদেহে খাদ্যের পরিপাক হয়।
৩৷ জল রক্ত ও লসিকার আবশ্যকীয় উপাদান।
৪৷ রেচন দ্রব্য বর্জনেও জলের বিশেষ ভূমিকা আছে।
৫। জীবজগতে পানির প্রভাব অপরিসীম ৷ পানি ছাড়া পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব থাকতো না ৷ এছাড়াও মানুষের অপরিহার্য প্রয়োজনীয় পদার্থ হল পানি ৷ একজন মানুষ পানি ছাড়া গড়ে মাত্র তিন দিন বেচে থাকতে পারে ৷
জল খাদ্য নয় কেন?
জলের কোন তাপন মূল্য নেই বলে জলকে খাদ্য বলা হয় না।
জলের অস্তিত্বই মূলত প্রাণীর অস্তিত্ব:
পানি বা জল (অন্যান্য নাম: বারি, সলিল, নীর, অম্বর) হলো একটি অজৈব, স্বচ্ছ, স্বাদহীন, গন্ধহীন এবং প্রায় বর্ণহীন এক রাসায়নিক পদার্থ, যা পৃথিবীর বারিমণ্ডলের ও যে কোন জীব-কোষ বা উদ্ভিদ-কোষের একটি প্রধান উপাদান। যদিও পানি কোন প্রাণী বা উদ্ভিদকে কোন রকমের শক্তির বা জৈব পরিপোষকের যোগান দেয় না, তবু এখনও পর্যন্ত আমরা যা জানি, তাতে সমস্ত ধরনের প্রাণের বেঁচে থাকার জন্য পানি অপরিহার্য। এই জন্য মহাকাশ বিজ্ঞানীরা বহির্বিশ্বে প্রাণের অস্তিত্ব খোঁজার আগে প্রথমে সেখানে পানির অস্তিত্ব খোঁজেন। কারণ, এখনও মোটামুটিভাবে মনে করা হয় যে, পানি যদি না থাকে, তাহলে সেখানে প্রাণ থাকতে পারে না।
প্রশ্ন: পানিচক্র বলতে কী বোঝ? চারটি বাক্যে পানিচক্র ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: যে প্রাক্রিয়ায় পানি বিভিন্ন অবস্থায় পরিবর্তিত হয়ে ভূপৃষ্ঠ ও বায়ুমণ্ডলের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে তা-ই পানিচক্র।
সাগর ও নদীর পানি বাষ্পীভূত হয়ে জলীয় বাষ্পে পরিণত হয়। বাষ্পীভূত পানি ওপরে উঠে ঠান্ডা ও ঘনীভূত হয়ে পানির বিন্দুতে পরিণত হয়। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পানির বিন্দু একত্র হয়ে মেঘের সৃষ্টি করে। এই মেঘের পানিকণা বড় হয়ে বৃষ্টিপাত হিসেবে আবার ভূপৃষ্ঠে ফিরে আসে।
কোথায় কোন অবস্থায় পানির বিদ্যমানতা?
জল বা পানির রাসায়নিক সংকেত হল H2O। ইউপ্যাক (IUPAC) নিয়ম অনুযায়ী পানির রাসায়নিক নাম ডাইহাইড্রোজেন মনোঅক্সাইড। অর্থাৎ জল বা পানির একেকটি অণু একটি অক্সিজেন পরমাণু এবং দু'টি হাইড্রোজেন পরমাণুর সমযোজী বন্ধনে গঠিত। এই H2O যৌগটির একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হল -
অপেক্ষাকৃত অল্প তাপমাত্রার পরিসরের মধ্যে এর তিনটি বিভিন্ন অবস্থা— কঠিন, তরল ও বায়বীয় পরিলক্ষিত হয়। এক বায়ুমণ্ডলীয় চাপে ০°–১০০° সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে H2O তরল অবস্থায় থাকে— এই তরল H2O-কেই আমরা পানি বা জল বলি। ০° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় জল বা পানি জমে কঠিন বরফে পরিণত হয় এবং ১০০° সেলসিয়াসে জল বায়বীয় অবস্থা জলীয় বাষ্পে পরিণত হয়। এই জন্য ০° সেলসিয়াসকে বলা হয় জল বা পানির গলনাঙ্ক এবং ১০০° সেলসিয়াসকে বলা হয় জল বা পানির স্ফুটনাঙ্ক। গলনাঙ্ক ও স্ফুটনাঙ্কের এই মান (যথাক্রমে, ০° ও ১০০° সেলসিয়াস) এক বায়ুমণ্ডলীয় চাপেই পরিলক্ষিত হয়।
বলা বাহুল্য, বায়ু-চাপের পরিবর্তনের সংগে সমস্ত পদার্থের গলনাঙ্ক ও স্ফুটনাঙ্কের মানের পরিবর্তন হয়। জলীয় বাষ্প ঊর্ধ বায়ুমণ্ডলে ঠাণ্ডা হয়ে যখন সূক্ষ্ম জল-কণা ও বরফ-কণায় রুপান্তরিত হয়, তখন তাকে আমরা বলি মেঘ। যখন জল-কণাগুলি আকারে বৃদ্ধি পেয়ে পৃথিবীর ওপর নেমে আসে, তখন তাকে বলি বৃষ্টি। যখন বরফ-কণাগুলি আকারে বৃদ্ধি পেয়ে পৃথিবীর ওপর নেমে আসে, তখন তাকে বলি তুষারপাত।
| কৃষি জমিতে পানির সেচ। |
ভূপৃষ্ঠের ৭০.৯% অংশ জুড়ে পানির অস্তিত্ব রয়েছে এবং পৃথিবীর প্রায় সমস্ত জীবের জীবনধারণের জন্যই পানি একটি অত্যাবশ্যক পদার্থ। পৃথিবীতে প্রাপ্ত পানির ৯৬.৫% পাওয়া যায় মহাসাগরে, ১.৭% ভূগর্ভে, ১.৭% হিমশৈল ও তুষার হিসেবে, একটি ক্ষুদ্র অংশ অন্যান্য বড় জলাশয়ে এবং ০.০০১% বায়ুমণ্ডলে অবস্থিত মেঘ, জলীয় বাষ্প হিসেবে ও বৃষ্টিপাত, তুষারপাত, ইত্যাদিরূপে। পৃথিবীর পানির মাত্র ২.৫% হল বিশুদ্ধ পানি এবং বাকি ৯৮.৮% হল ভূগর্ভস্থ পানি ও বরফ। বিশুদ্ধ পানির ০.৩%-এরও কম অংশ পাওয়া যায় নদীতে, হ্রদে ও বায়ুমণ্ডলে এবং তার চেয়েও ন্যূনতর অংশ পাওয়া যায় বিভিন্ন জীবের শরীর ও উৎপাদিত পণ্যে। পৃথিবীতে পানি প্রতিনিয়তই বাষ্পীভবন, ঘনীভবন, বাষ্পত্যাগ, ইত্যাদি বিশিষ্ট পানিচক্র মাধ্যমে ঘূর্ণমান। বাষ্পীভবন ও বাষ্পত্যাগের কারণেই পৃথিবীতে বৃষ্টিপাত, তুষারপাত ইত্যাদি ঘটে।
পানির মুখ্য ও ভৌত রাসায়নিক ধর্ম:
- একফোঁটা পানির আঘাতে পানিতে কৈশিকীয় তরঙ্গ তৈরী হয় এবং সাময়িকভাবে ফোয়ারার মত ছিটকে ওপরের দিকে উঠে যায়।
- পদার্থের তিনটি অবস্থাতেই পৃথিবীতে পানির অস্তিত্ব বিদ্যমান। পানিীয় বাষ্প ও মেঘ হিসেবে আকাশে, সমুদ্রের পানি হিসেবে মহাসাগরে, হিমশৈল হিসেবে মেরু অঞ্চলের মহাসাগরে, হিমবাহ ও নদী হিসেবে পর্বতে এবং ভূগর্ভে পানির অস্তিত্ব পাওয়া যায়।
- দৃশ্যমান তড়িচ্চুম্বকীয় বর্ণালীতে স্বচ্ছ হওয়ায় পানিতে সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে, যা জলজ উদ্ভিদের জীবনধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও অতিবেগুনী এবং অবলোহিত রশ্মিসমূহের প্রায় সম্পূর্ণ অংশই পানিতে শোষিত হয়।
- স্বাভাবিক চাপ ও তাপমাত্রায় পানি তরল পদার্থ। পানি স্বাদ ও গন্ধহীন। পানি ও বরফের নিজস্ব বর্ণ সামান্য নীল হলেও, কম পরিমাণে উপস্থিত থাকলে উভয়ই বর্ণহীন মনে হয়। পানিীয় বাষ্পও বর্ণহীন, ফলে অদৃশ্য।
- পানির নিজস্ব দ্বিমেরু ভ্রামক থাকায় পানি প্রায় সব তড়িৎযোজী পদার্থকে দ্রবীভূত করতে পারে। এছাড়াও বহু সমযোজী পদার্থও পানিতে দ্রবীভূত হওয়ায় পানি রাসায়নিক পরীক্ষাগারে খুব ভালো দ্রাবক হিসেবে কাজ করে। একারণে পানিকে কখনো কখনো সর্বজনীন দ্রাবক বলা হয়ে থাকে। পানিতে দ্রবীভুত হয় এরকম কিছু পদার্থ হলঃ লবণ, চিনি, অম্ল, ক্ষারক, বেশ কিছু গ্যাস বিশেষত- অক্সিজেন, কার্বন ডাইঅক্সাইড ইত্যাদি। এছাড়াও কিছু পদার্থ আছে যারা বিশেষ করে পানিতে দ্রবীভূত হয়না; যেমন- তেল, গ্রিজ ইত্যাদি।
তথ্যসূত্র:
- প্রথম আলো।
- উইকিপিডিয়া।
- 7rongs.com
- book9.wordpress.com
- bengalstudents.com
- Edited: Natural_Healing.
কোন মন্তব্য নেই