First Aid Present

Lifestyle Modification এবং প্রাকৃতিক খাদ্য, পানীয়, শাকসবজি, গাছ, ডালপালা, ফল, মসলা, পাতা ও ফুল ইত্যাদির দ্বারা প্রাথমিক চিকিৎসা।

মেনোপজ/ঋতুবন্ধ/মাসিক বন্ধ কি, এর কারণ এবং করনীয়?

মেনোপজ কী?

একজন নারী তাঁর জীবনচক্রের শৈশব, কৈশোর এবং পূর্ণ বিকশিত প্রজননক্ষম সময় পেরিয়ে একসময় মধ্য বয়সে উপনীত হন। প্রতিটি পর্যায়েই নারীর জীবনে হরমোনজনিত নানা রকম পরিবর্তন ঘটে। এ বয়সও ব্যতিক্রম নয়। একটা বয়সের পর নারী হরমোনগুলো নিম্নমুখী হতে থাকে, ডিম্বাণুর পরিস্ফুটন বন্ধ হয়ে যায় বলে আর মাসিক হয় না এবং সন্তানধারণের সক্ষমতা থাকে না—এ পরিবর্তনকালকেই বলা হয় ‘মেনোপজ’। অন্য কথায়- মাসিক বা ঋতুস্রাব নারী দেহের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। একটা নির্দিষ্ট বয়সের (৪৫ থেকে ৫৫ বছর) পর ঋতুচক্র স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। একেই মেনোপজ বলে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘মেনোপজ’ বলতে বোঝায় নারীর মাসিক ঋতুচক্র চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়া। মাসিক যদি একাধারে ১২ মাস বন্ধ থাকে, তখন সেই নারী মেনোপজে পৌঁছেছেন বলে ধরা হয়। এটি হয় যখন ডিম্বাশয় সম্পূর্ণরূপে ডিম্বাণু পরিস্ফুটন বন্ধ করে দেয়। ফল হিসেবে শরীরে নারী হরমোন ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন কমতে থাকে। 

মেনোপজ নারীর শরীরে প্রচুর পরিবর্তন নিয়ে আসে। সঠিক যত্ন না নিলে অনেক স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। প্রায় শতকরা ৩০ ভাগ ক্ষেত্রে এই সমস্যার অন্তরালে থাকতে পারে মরণব্যাধি ক্যানসার। উপসর্গ দেখা দিলে প্রথমে একজন গাইনি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত
ডিম্বাশয় নারীর একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থি। এখান থেকে যে হরমোন নিসৃত হয় তার কাজ মাসিক চক্র নিয়ন্ত্রণ করা। ডিম্বাশয়ের আরও একটি কাজ ডিম তৈরি করা। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ডিমের পরিমান কমে যায় তথা হরমোনের পরিমানও কমতে থাকে। একসময়ে পরিমান এতটাই কমে যায় যা মাসিক চক্র আর নিয়ন্ত্রন করতে পারেনা। মাসিক বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় নারীদেহে বিভিন্ন প্রজননের হরমোন কমে যায় এবং তার নানানরকমের প্রভাব পড়ে নারীদের শরীরে। এই সময়ে এক নাগাড়ে ১২ মাস মাসিক চক্র বন্ধ থাকলে এ অবস্থাকে মেনোপজ বলে। তাই মেনোপজ একটি প্রকৃতিগত বিষয়। এটি কোন রোগ নয়। 

মেনোপজ কখন হয়? 

আমরা জানি, প্রতিটি নারীর জন্ম হয় ডিম্বাশয় বা ওভারিসহ। ওভারিতে প্রায় এক মিলিয়ন ডিম্বাণু থাকে। ঋতুস্রাব শুরু করে দেহ থেকে একের পর এক ডিম্বাণু নির্গত হয়। বয়স ৩০ এর পর ডিম্বাণুর সংখ্যা কমে আর ৪০ এ এই হ্রাসের পরিমাণ বাড়ে। এতে গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমতে থাকে। মেনোপজ স্টেজ মানেই আপনার ওভারিতে ডিম্বাণু আর নেই। সেজন্যেই ডিম্বাশয়ে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন বা মহিলাদের সেক্স হরমোন তৈরি হচ্ছে না। বছরখানেক পিরিয়ড না হলে ধরে নিতে হবে ঋতুবন্ধ হয়েছে। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই শ্রেয়।

সাধারণত ৪৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সের মধ্যেই নারীদের মেনোপজ হয়ে থাকে। মেনোপজের গড় বয়স ৫০ বছর। ৪০ বছরের আগেও এ ঘটনা ঘটতে পারে, ৪০–এর আগে কারও মেনোপজ হলে তাকে বলা হয় ‘প্রিম্যাচিউরড মেনোপজ’। আবার ৫৫ বছরের পরে প্রতি মাসে মাসিক হওয়াটাও স্বাভাবিক নয়। 

আবার কোনো কারণে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কোনো নারীর যদি দুটো ওভারি অথবা জরায়ু ফেলে দেওয়া হয় কিংবা রোগের কারণে প্রিম্যাচিউর ওভারি ফেইলিউর হয়ে যায়, তাহলে সময়ের আগেই অর্থাৎ অল্প বয়সেই মেনোপজ হতে পারে।

বাংলাদেশ মেনোপজ সোসাইটির তথ্য মতে এদেশে নারীদের মনোপজের গড় বয়স ৫১ বছর।

মেনোপজ কেন হয়?

একজন মহিলা সাধারণত একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ ডিম্বাণু নিয়ে জন্ম গ্রহন করেন, যেগুলো তার জরায়ুতে সংরক্ষিত থাকে। জরায়ু মহিলাদের শরীরের ইসট্রোজেন এবং প্রজেসটেরন হরমোন তৈরি করে, যেটা প্রতিমাসের মাসিক এবং ওভাল্যুশনকে নিয়ন্ত্রন করে। যখন জরায়ু থেকে ডিম্বাণু নিঃসরণ বন্ধ হয়ে যায় এবং মাসিক বন্ধ হয়ে যায়, তখনই মেনোপজ হয়।

নারীদের শরীরে এ পরিবর্তন আসার পেছনে মূল কারণ ইস্ট্রোজেন নামের একটি হরমোন। এ হরমোন নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যচক্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নারীদের ওভারি বা ডিম্বাশয়ে প্রতি মাসে যে ডিম্ব তৈরি হয় এবং সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য নারীর শরীর যেভাবে প্রস্তুত হয়, তার পেছনেও রয়েছে এ হরমোনের ভূমিকা। কিন্তু বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে নারীর শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের উৎপাদন কমে যেতে থাকে। এ হরমোনই প্রজননের পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। তাই বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে নারীদের ডিম্বাশয়ে ডিম্বের পরিমাণও কমতে থাকে। ফলে কমতে থাকে মাসিকের পরিমাণও। এরই ধারাবাহিকতায় মেনোপজ হয়। অর্থাৎ সন্তান জন্ম দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।

মেনোপজ পিছিয়ে দেওয়ার জন্যে বর্তমানে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। তবে সচরাচর যাদের যৌনজীবন ভালো তাদের মেনোপজ দেরিতেই হয়ে থাকে। এছাড়াও খাদ্য তালিকায় রাখুন মাছ, ডাল, সবুজ তরি-তরকারি। বিশেষত অবসাদ কিংবা স্ট্রেসে কাবু হওয়া যাবে না। শরীর সুস্থ রাখতে পারলে মেনোপজ দেরিতে হবে।  

মেনোপজের ধাপ কয়টি? 

মেনোপজ এর তিনটি ধাপ রয়েছে। যথাক্রমেঃ পেরিমেনোপজ, মেনোপজ এবং পোষ্ট মেনোপজ। মেনোপজ শুরুর আগের কয়েক বছর সময়কে বলা হয় পেরিমেনোপজ। এইসময় আস্তে আস্তে মেনোপজ এর লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। অর্থাৎ মেনোপজ শুরুর দুই থেকে তিন বছর আগে থেকেই এই প্রক্রিয়াটি শুরু হয়ে যায়। আর মেনোপজ হচ্ছে এই প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকে এক বছর পর্যন্ত সময়কালকে অর্থাৎ মাসিক স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়াকে মেনোপজ এবং পরের ধাপকে পোস্ট মেনোপজ বলে। সবগুলো ধাপের সময় কাল ৩-৫ বছর হতে পারে। উপসর্গ গুলি সাধারণত ৪৫-৫৫ বছর বয়সের সময় হয়। উপসর্গ গুলি সবার সমান ভাবে হয়না। কারো কারো কোন উপসর্গ নাও হতে পারে। কষ্টের মাত্রাও একেকজনের একেকরকম।

এই সময় যে যে শারীরিক পরিবর্তন সেগুলো নিয়ে অনেকেই সমস্যায় পড়েন। যেটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু এগুলো ধামাচাপা দিয়ে না রেখে বরং কাছের মানুষ, প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া উচিত।

মেনোপজের লক্ষণ:

কেউ মেনোপজের উপসর্গে ভুগছে কিনা সেটি জানার জন্য রক্ত পরীক্ষা করা যেতে পারে। তবে, সবসময় যে পরীক্ষার ফল খুব নির্ভুল হবে এমন নয়। তবে, কোনও ডাক্তারের সাথে আলাপ করে একজন নারী যে সব লক্ষণগুলো তার শরীরে দেখছেন সেগুলো জানানো যেতে পারে।

মেনোপজের পর ইস্ট্রোজেন হরমোন শরীরে আর পুনরুৎপাদন হয় না। ফলে, মেনোপজের পর ইস্ট্রোজেন হরমোনের অভাব নিয়েই জীবনের বাকিটা সময় কাটাতে হয়।

কীভাবে বুঝবেন মেনোপজ হয়েছে?

যখন একজন নারীর কোনো অসুস্থতা অথবা ওষুধ ছাড়া একনাগাড়ে ১২ মাস মাসিক বন্ধ থাকে, তখন তিনি মেনোপজে পৌঁছেছেন বলে ধরা হয়। মেনোপজের আগে অনেক নারীর নানা কারণে মাসিক অনিয়মিত হতে পারে, কিছুদিন বন্ধ থাকা, দেরি করে হওয়া, অথবা ঘন ঘন মাসিক হওয়া, পরিমাণে বেশি বা কম হওয়া ইত্যাদি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে অন্য কোনো বিশেষ কারণ আছে কি না খতিয়ে দেখতে হয়।

ডিম্বাশয় থেকে নিঃসৃত নারী হরমোন ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন নারী দেহের সৌন্দর্য, নিয়মিত মাসিক ও সন্তান ধারণ, ত্বকের লাবণ্য ও কমনীয়তা, স্বাভাবিক যৌনজীবন ও যৌনচাহিদা, চুলের ঘনত্ব, হাড়ের ক্ষয়রোধ, হৃদ্‌যন্ত্রের সচলতা ও মনোদৈহিক কর্মক্ষমতা ধরে রাখে। মেনোপজের পর এ হরমোন কমে যাওয়ার কারণে শরীর ও মনে তার কিছু প্রভাব পড়তে থাকে।

এ কারণে মাসিক একাধারে এক বছর বন্ধ থাকার পাশাপাশি আরও কিছু উপসর্গ দেখ যায়—

  • প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া এবং মূত্রনালির সংক্রমণ (ইউটিআই)
  • ত্বক, মুখ এবং চোখ শুষ্ক হয়ে যাওয়া
  • কালশিটে বা কোমল স্তন
  • বুক ধড়ফড়ানি
  • পেশি ভর হ্রাস
  • হাড়ের ভর হ্রাস 

  • মুখ, ঘাড়, বুক এবং পিঠের ওপরের অংশে চুল বৃদ্ধি পাওয়া
  • প্রচণ্ড ঘাম ছুটে ঘুম ভাঙছে: আচমকা রাতে জেগে উঠলেন। চারদিন শুনশান। এদিকে ঘাড় থেকে শুরু করে সারা শরীর অঝোরে ঘামছে। প্রচণ্ড গরমে কান ও মাথা জ্বলছে। এটাও পেরিমেনোপজের লক্ষণ।
  • অনিয়মিত ঘুম: ঘুম ভেঙে যাওয়া বা ঠিকমতো না হওয়া বা ঘুমের সমস্যা হওয়া।
  • অনিয়মিত পিরিয়ড: মাসিক মাসের মধ্যে ২/৩ বার হতে পারে, ২/৩ মাস পরপর হতে পারে, পরিমানে অল্প/বেশি হতে পারে, আগের চেয়ে বেশি দিন থাকতে পারে। অনিয়মিত পিরিয়ড কথাটিকে একটু বিস্তৃতভাবেই বিচার করতে হবে। কারও মাসে একাধিকবার ব্লিডিং আবার কারও ব্লিডিং কম হওয়া মানেই অনিয়মিত পিরিয়ড। অনেকের ক্ষেত্রে টানা তিন-চার মাস ব্লিডিং বন্ধ থাকে। আবার টানা ১২ মাস পিরিয়ড না হলে মেনোপজ শুরু হয়েছে ধরে নেওয়া যায়। তবে এত দ্রুত সিদ্ধান্তে আসার আগে যারা বিবাহিত তাদের প্রেগন্যান্সি টেস্ট করিয়ে নেওয়া উচিত। 
  • হট ফ্ল্যাশ: মেনোপজ এর সময় যে জিনিসটা সকলকে খুব ভোগায় তা হলো হট ফ্ল্যাশ (Hot Flash)। বাইরের কোনও উৎস ছাড়াই হঠাৎ করে ভীষণ গরম লাগা। সেটা খুব ঠাণ্ডার দিনেও হতে পারে। এর সময়কাল কয়েক সেকেন্ড থেকে শুরু করে মিনিট দশেক পর্যন্ত হতে পারে। এক্ষেত্রে সঙ্গে সঙ্গে ঠাণ্ডা পানি খেতে পারেন। একটু ঢিলে সুতির কাপড় পড়তে পারেন। এতে হট ফ্ল্যাশ হলেও স্বস্তিতে থাকবেন। কোন কারণ ছাড়াই  যেমন হঠাৎ গরম অনুভব করে লাল হয়ে যাওয়া, হার্ট বিট বেড়ে যাওয়া আবার হঠাৎ ঠাণ্ডা অনুভব‌ও করতে পারেন। 
  • চুল পড়া: মেনোপজ এর সময়ে হঠাৎ করে অনেক চুল পড়া শুরু হয়। এতে অনেকে খুব অস্বস্তিতে ভোগেন নিজেদের বাহ্যিক পরিবর্তনে। কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে যে চুল পড়াটা স্থায়ী কিছু না। মূলত ইসট্রোজেন এবং প্রজেসটেরন হরমোন এর উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে চুল পাতলা হওয়া শুরু হয়। এটা একেবারে থামানো সম্ভব না। তবে স্ট্রেস ফ্রি থাকা, নিয়মিত ব্যায়াম করা, পুষ্টিকর ডায়েট মেনে চলা, ভিটামিন সাপ্লিমেনট নেয়া ইত্যাদি চুল পড়ার হার অনেকটা কমিয়ে আনতে পারে।
  • যৌন মিলনে অনিহা: ইসট্রোজেন এবং প্রজেসটেরন হরমোন এর উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে শারীরিকভাবে যৌন মিলনের আগ্রহ অনেকটা কমে যায়। পাশাপাশি ইসট্রোজেন হরমোন কমে যাওয়ায় যোনিপথ অনেক বেশি শুষ্ক হয়ে থাকে, যে কারণে যৌন মিলন মহিলাদের জন্য কষ্টদায়ক হয়ে যায়। এই সমস্যা দূর করতে ঘরোয়া টোটকা বা এর ওর কথা না শুনে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়াই শ্রেয়।
  • যোনিপথে শুষ্কতা: পেরিমেনোপজ শুরু হলে অনেকেরই যোনিপথের আশপাশ শুষ্ক হতে শুরু করে। এতে অনেক সময় যৌনমিলনে অসুবিধা হয়। যদিও অনেকে এই সমস্যা সহজে টের পান না।
  • প্রজননতন্ত্রের সমস্যা: মূত্রথলির পেশির টান কমে যাওয়ার কারণে ঘন ঘন প্রস্রাব ও প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারার সমস্যা ভোগাতে পারে। অনেকে প্রস্রাব ধরে রাখতে পারে না, একটু হাঁচি কাশি দিলে প্রস্রাব পড়ে যায়। যোনিপথ শুকিয়ে যায়, জ্বালা-পোড়া হয়।
  • আবেগীয় পরিবর্তন: আবেগপ্রবণতা, ভুলে যাওয়া, অস্থিরতা, মন–মেজাজ খিটখিটে হওয়া, মাথাব্যথা, কোনো কিছুতে মন স্থির করতে না পারা, অবসাদগ্রস্ততা দেখা দিতে পারে।

  • ত্বকের পরিবর্তন: চুল পড়ে যাওয়া, ত্বক পাতলা হওয়া ও সজীব ভাব নষ্ট হওয়া, ত্বকের শুষ্কতা, মেছতা বা মেলাসমা–জাতীয় সমস্যা হতে পারে।
  • ত্বক ও চুলের শুষ্কতা: নিয়মিত ত্বক ও চুলের যত্ন নিচ্ছেন তবুও স্বাস্থ্যের উন্নতি নেই। বুঝে নিতে হবে স্ত্রী হরমোনে ঘাটতি আছে। এজন্যেই চুল হচ্ছে রুক্ষ্ম আর ত্বক হারাচ্ছে লাবণ্য। এক্ষেত্রে ব্যায়াম শুরু করুন। হয়তো তাতে স্ত্রী হরমোন বাড়বে না কিন্তু ব্যায়ামে ত্বক ও চুল ভালো থাকে।
  • মেজাজি হয়ে যাওয়া : এসময় শরীরে ইসট্রোজেন হরমোন এর ঘাটতি থাকে বলে সেরেটোনিন এবং ডোপামিন হরমোন এর ইমব্যালান্স দেখা দেয় শরীরে। যে কারণে ঘন ঘন মুড বদলাতে থাকে। এর আরও একটি কারণ হলো এসময়ের অন্যান্য শারীরিক পরিবর্তন। যেমন- ওজন বেড়ে যাওয়া, চুল পড়া, হট ফ্ল্যাশ। এগুলোর কারণে অনেকেই সারাক্ষণ স্ট্রেস এ ভোগেন যেটা থেকে তুচ্ছ কারণে খিটখিটে মেজাজ দেখা দেয়। তবে নিয়মিত ব্যায়াম, নিয়ম করে হাঁটা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্ট্রেস ফ্রি থাকতে পারলে এ সমস্যা অনেকটাই কমে যায়।
  • জয়েন্ট পেইন: শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ব্যথা, বিশেষ করে হাঁটু, কনুই, আঙ্গুল, পিঠ এইসময় থেকে শুরু হতে থাকে। তবে মেনোপজ ছাড়াও কারো যদি আথ্রাইটিস, লুপাস এবং বারসাইটিস এর সমস্যা থেকে থাকে তাহলে এই ধরনের ব্যথা বেশ খারাপ আকার ধারন করে। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো এগুলোর কোন স্থায়ী চিকিৎসা নেই। বিভিন্ন ধরনের থেরাপি, ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ, ওজন নিয়ন্ত্রন এই ব্যথার কিছুটা উপশম করে থাকে।

  • ওজন বৃদ্ধি: মেনোপজের সময়ে দ্রুত ওজন বৃদ্ধি একটা অন্যতম সমস্যা। এটার কারণে হাঁটু , কোমর এবং পিঠের ব্যথায় ভোগেন অনেকে। এই সময় যেহেতু ইসট্রোজেন এবং প্রজেসটেরন হরমোন হ্রাস পায় শরীরে তাই সন্তান উৎপাদন ক্ষমতাও কমতে থাকে। এই হরমোনের অভাবে ওজন নিয়ন্ত্রন করাও কষ্টকর হয়ে পরে আস্তে আস্তে। এছাড়া বয়সের এই ধাপে এসে পারিপার্শ্বিক অনেক কিছুই ওজন বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন, এসময় ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে চাকরি, পড়াশোনা বা বিয়ের কারণে দূরে চলে যায়। চাকরিজীবীদের পেনশনে চলে যাওয়ার সময় চলে আসে। এসব কারণে মনের অস্থিরতা বাড়ে। তাই চল্লিশের পর থেকেই পরিমিত খাবার এবং নিয়মিত ব্যায়াম করা খুব জরুরি। কেননা, এই ওজন বৃদ্ধির ফলে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং ক্যান্সারের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
  • অনিদ্রা: মেনোপজ এর সময়ে মহিলাদের আরেকটা সমস্যা হলো ঘুম না হওয়া বা ঘুম হলেও ঘুম থেকে ওঠার পরেও সারাদিন ঘুম ঘুম লাগা বা ক্লান্তি লাগা । অনেকের ক্ষেত্রেই দেখা যায় রাতে ঘুম থেকে উঠে বসে আছেন। যার কারণ হট ফ্ল্যাশ বা প্রচণ্ড ঘেমে যাওয়া। রাতে অনেক ঘেমে ঘুম থেকে জেগে ওঠতে পারেন। এগুলো ১-৫ মিনিট সময় থাকতে পারে। দিনে কয়েকবার হতে পারে /মাসে একবার অথবা কারোও নাও হতে পারে। কারো আবার অনেক দিন ধরে এ সমস্যাগুলো থাকতে পারে। আবার এই বয়সে অনেকে ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্ত চাপ বা অন্য কোন অসুখের কারণে ওষুধ শুরু করেন। এসব ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসেবেও অনিদ্রা হতে পারে। এক্ষেত্রে অনেকে ঘুমের ওষুধ খাওয়া শুরু করেন, যেটা একেবারেই ঠিক না। শুধু মাত্র ডাক্তারের পরামর্শেই ঘুমের ওষুধ খাবেন। ভালো ঘুম হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট ঘুমের সময়, উপযুক্ত ব্যায়াম, ক্যাফেইন গ্রহন কমিয়ে আনা এই কাজগুলো বেশ ভালো কাজ দেয়।
  • নাইট সোয়েট: রাতে অতিরিক্ত ঘাম এমনকি এসির মধ্যেও ঘামতে থাকা।
  • অন্যান্য: মেনোপজের পর হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়ার কারণে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ে। রক্তচাপ বা রক্তের চর্বি বাড়া, হৃদ্‌রোগ ধরা পড়ার মতো ঘটনা ঘটে।

প্রতিটি নারীর মেনোপজের অভিজ্ঞতা আলাদা। তবে এর লক্ষণগুলো গুরুতর হতে পারে যদি মেনোপজ হঠাৎ বা অল্প সময়ের মধ্যে ঘটে। ক্যান্সার, হিস্টেরেক্টমি (জরায়ু ফেলে দেওয়ার অপারেশন), ধূমপানের ইতিহাস ডিম্বাশয়ের জন্য ক্ষতিকর যার ফলে, লক্ষণগুলোর তীব্রতা এবং সময়কাল বৃদ্ধি করে। এটি কবে হবে তা বংশগতির ধারার ওপর খানিকটা নির্ভর করে। মেনোপজের সময় নারীর পরিবর্তনগুলো একেকজনের ক্ষেত্রে একেকরকম এবং সব লক্ষণ সবার প্রকাশ নাও পেতে পারে।

সময়ের আগেই মেনোপজ বা আর্লি মেনোপজ কী?

পিরিয়ড বন্ধ হওয়ার বয়সে পৌঁছানোর আগেই মেনোপজকে আর্লি মেনোপজ বা প্রি-ম্যাচিউর ওভারিয়ান ফেইলিয়র বা ইনসাফিশিয়েন্সি বলে। অর্থাৎ মেনোপজ চলে আসে আগেভাগেই।। সব নারীর জীবনে মেনোপজ বা ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া নিয়মমাফিক নাও আসতে পারে। সাধারণত ৪৫ বছর বয়সের আগে, আনুমানিক ৪০ বছরের দিকে আর্লি মেনোপজ হয়। আপনার ডিম্বাশয়ের ক্ষতি করে বা ইস্ট্রোজেন উৎপাদন বন্ধ করে এমন যে-কোনো কিছু প্রাথমিক মেনোপজের কারণ হতে পারে। 

কারণ:

এমন কিছু রোগ আছে, যেগুলো থাকলে অল্প বয়সে পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যায়। যেমন—জেনেটিক ডিজিজ-টার্নারস সিনড্রোম, অটোইমিউন ডিজিজ-লুপাস, থাইরয়েড, ইনফেকশন-মামস, টিবি, আয়াট্রজেনিক-কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, মেটাবলিক, পরিবেশগত-স্মোকিং, পেস্টিসাইড ইত্যাদি। অজানা কারণেও পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

আর্লি মেনোপজের লক্ষণগুলো কী কী?

–খুব বেশি পরিমাণে রক্ত যাওয়া

–পিরিয়ড ছাড়াই কাপড়ে ছোপ ছোপ রক্ত

–পিরিয়ড এক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হওয়া

–দুটি পিরিয়ডের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিরতি

এছাড়াও, মেনোপজের অন্যান্য সাধারণ লক্ষণ যেমন মেজাজ পরিবর্তন, যৌন আকাঙ্ক্ষায় পরিবর্তন, যোনিতে শুষ্কতা, ঘুমের সমস্যা, হঠাৎ গরম লাগা, রাতের ঘাম, প্রস্রাবের নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো আরো বেশ কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

উল্লেখিত উপসর্গ দেখা দিলে একজন গাইনি বিশেষজ্ঞ কনসাল্ট করলে এবং প্রয়োজনীয় টেস্ট করলে বুঝতে পারা যায়। সময়ের চেয়ে অসময়ের জ্বর ভোগায় বেশি। তেমনি সময়ের আগে মেনোপজ এলে স্বাভাবিক মেনোপজের চেয়ে বেশি ভুগতে হয়।

চিকিৎসা:

উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা। যে কারণে এমন হয়, সে কারণ খুঁজে বের করে চিকিৎসা করলে অনেক সময় ইমপ্রুভ হয়। তবে মেনোপজের উপসর্গ একবার চলে এলে সাধারণত ডাইভার্ট ব্যাক করে না। সে জন্য অসহনীয় উপসর্গ বেশি হলে, ওষুধে কাজ না হলে হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি লাগতে পারে। তবে সবার আগে জরুরি পর্যাপ্ত কাউন্সিলিং। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করা। হরমোন নিলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নেওয়া এবং নিয়মিত বিরতিতে ফলোআপে থাকা জরুরি।

আর্লি মেনোপজ অন্যান্য রোগের ঝুকি তৈরি করে কি?

স্বাভাবিক সময়ের দশ বছর আগে যদি মেনোপজ শুরু হয় তবে সেটি অবশ্যই চিন্তার বিষয়। এটি অকাল বন্ধ্যাত্বের কারণ হতে পারে।

এই প্রক্রিয়ায় যেহেতু ইস্ট্রোজেন হরমোনটি কমে যায়, ফলে শরীরে নানাবিধ সমস্যা দানা বাঁধে এবং সেগুলো বাড়তে থাকে। তার মধ্যে রয়েছে:

অপ্রয়োজনীয় কোলেস্টরল বেড়ে যাওয়া, হৃদরোগ, হাড় ক্ষয় এবং অস্টিওপরোসিস, বিষণ্ণতা, ডিমেনশিয়া, অকাল মৃত্যু।

এরকম নানা জটিলতা এড়াতে নারীর শরীর এবং বিশেষ করে আমাদের মায়েদের-মেয়েদের প্রজনন স্বাস্থ্যের প্রতি লক্ষ রাখা প্রয়োজন। 

মনে রাখবেন, মেনোপজের পর আপনি স্রেফ প্রজননক্ষমতা হারাবেন–তার মানে জীবনের গতি স্তব্ধ হয়ে যাওয়া নয় কিন্তু! তাই নিজের খেয়াল রাখুন, পেটে, কোমরে চর্বি জমতে দেবেন না, এতে অন্য নানা জটিলতা এড়ানো সম্ভব।

মেনোপজের পর মহিলাদের স্বাস্থ্যগত সমস্যা:

ক্যালসিয়ামের অভাবে শরীরে যে প্রভাব পড়ে: মেনোপজের সমস্যা কী? অনেক নারী জানেন না, অনেকে জানেনও। মেনোপজের সমস্যা নিয়ে যেসব নারী আসেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, তাঁরা আর্থিকভাবে স্বামী কিংবা সন্তানের ওপর নির্ভরশীল। মেনোপজ নারীদের রোগ, নারীদের সমস্যা, তবে সমাধান কিন্তু তাঁদের হাতে নয়। এ সময় নানাভাবে নারীকে সহযোগিতা করতে পারেন পুরুষ।

মেনোপজে যাওয়া নারীর হাড়ের ভেতর খনিজের ঘনত্ব কমে যাওয়া। বোন মিনারেল ডেনসিটির (হাড়ের মধ্যকার খনিজের ঘনত্ব) পরীক্ষা এক লাখ নারীর মধ্যে একজনও করার সুযোগ পান না। হাড়ের ভেতর ঘনত্ব কমে গেলে ভঙ্গুর হাড় সহজে ভেঙে যায়। মেনোপজের বিষয়ে স্বামী যদি না বোঝেন, সহযোগিতা না করেন, তাহলে কিন্তু ওই নারীর সুচিকিৎসা হবে না।

নারী কিংবা পুরুষের একটা নির্ধারিত বয়সের পর হাড় ভঙ্গুর হয়ে যায়। নির্দিষ্ট বয়সের পর শরীরে ক্যালসিয়াম কমে যেতে থাকে। বয়স যত বেশি হয়, হাড় তত ভঙ্গুর হয়। অর্থাৎ নারীর অস্টিওপোরোসিস হয়। হাড়ের ভেতর ঘনত্ব কমে যায়। হাড় অনেকটা মাকড়সার জালের মতো হয়ে যায়। এসব হাড় ভেঙে গেলে নানা জটিলতা তৈরি হয়। হাড়ের এই ক্ষয় সাধারণত নীরবে এবং ক্রমবর্ধমানভাবে ঘটতে থাকে।

বয়স বাড়তে থাকলে নারীদের হাড়জনিত দুটি সমস্যায় আক্রান্ত হতে হয়। একটি হলো অস্টিওআর্থ্রাইটিস, অর্থাৎ হাঁটুর আর্থ্রাইটিস, অন্যটি হলো অস্টিওপোরোসিস, অর্থাৎ এমন একটি অবস্থা, যখন হাড় ক্রমেই ভঙ্গুর হতে থাকে। প্রাথমিকভাবে এটি বেদনাহীন রোগ হলেও অস্টিওপোরোসিস হয় প্রধানত হাড়ে ক্যালসিয়াম ও খনিজ হ্রাস পেতে থাকলে। মেনোপজের পর দ্রুত হারে হাড়ের অভ্যন্তরীণ গহ্বরে ক্ষয় হতে থাকে। ৬০ বছর বয়সের পর একসময় তা জটিল অবস্থায় পৌঁছায়, অবশ্য তার আগেও হতে পারে।

মেনোপজের কারণে শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি দেখা দেয়। তাই এ সময় খাবারের ব্যাপারে বিশেষ নজর দিতে হবে। আর মাঝবয়সে সব ধরনের খাবারও খাওয়া যায় না। তাই নিয়ম করে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষের দৈনিক ৮০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম প্রয়োজন হয়। আবার পোস্ট মেনোপোজাল নারীদের ক্ষেত্রে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ মিলিগ্রাম। বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যতালিকায় সাধারণত যে খাবারগুলো থাকে, তা থেকে দৈনিক একজন মানুষ ৪২৭ থেকে ৫১২ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম পেতে পারেন। আর তাই ক্যালসিয়ামের দৈনিক যে চাহিদা, তা পূরণ করতে সাপ্লিমেন্টাল বা সম্পূরক ক্যালসিয়াম গ্রহণই সর্বোত্তম উপায়।

হরমোনের পরিবর্তনে শরীরে যে প্রভাব পড়ে: ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে ৪৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সে মেনোপজ হয়। এ হরমোনই এত দিন নারীর হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধ করে আসছিল। কাজেই মেনোপজের পর সেই সুরক্ষা আর থাকে না। নারীরা মুটিয়ে যেতে থাকেন, রক্তে চর্বি বাড়ে, বাড়ে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি। একই সঙ্গে শুরু হয় অস্টিওপোরোসিস বা হাড়ক্ষয়। হঠাৎ গরম লাগা, ঘাম হওয়া, বুক ধড়ফড় করা ও অনিদ্রা। কাজেই এ সময়টাতে জীবনাচরণ পদ্ধতি নিয়ে সচেতন হতে হবে।

মেনোপজের পর ত্বকের সমস্যা:

নারীদের মেনোপজের পর ত্বকে নানা ধরনের পরিবর্তন আসে। এ পরিবর্তনগুলোর বেশির ভাগই হয় হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণে। মেনোপজের পর মেয়েলি হরমোন ইস্ট্রোজেনের নিঃসরণ কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে ত্বকের ওপর। এ সময় ত্বকের নানা রকমের সমস্যা দেখা দিতে থাকে।

মেছতা: মেনোপজের পর মুখে কালো ছোপ বা মেছতার প্রকোপ বেড়ে যেতে পারে। অনেক সময় গালের দুপাশ ছাড়াও হাত, গলায় কালো ছোপ পড়ে। যাঁরা সূর্যের আলোয় বেশি যান, তাঁদের এটা বেশি হয়। এ সমস্যা থেকে বাঁচতে সূর্যের আলোয় বের হলে ছাতা ও সানগ্লাস ব্যবহার করবেন। ভালো মানের একটা সানস্ক্রিন লোশন ব্যবহার করবেন। সমস্যা বেশি মনে হলে একজন চর্ম বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারেন।

শুষ্ক ত্বক: মেনোপজের পর ত্বক অনেক শুষ্ক আর রুক্ষ হয়ে যেতে পারে। মুখ পরিষ্কার করার জন্য ময়েশ্চারযুক্ত সাবান বা ফেসওয়াশ ব্যবহার করবেন। গোসল করার পর পেট্রোলিয়াম জেলি বা গ্লিসারিনসমৃদ্ধ ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করবেন। পা ফাটা, ঠোঁট ফাটার মতো সমস্যাও এ সময় বেড়ে যায়। তাই প্রচুর পানি পান করতে হবে।

মুখে লোম: অ্যান্ড্রোজেনের প্রভাবে মুখে অবাঞ্ছিত লোম দেখা দেওয়া বিচিত্র নয়। এ জন্য বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নিন। হরমোন থেরাপি, মেডিকেটেড ক্রিম বা লেসার দিয়ে এর চিকিৎসা করা সম্ভব।

ত্বক পাতলা হয়ে যাওয়া: ত্বক পাতলা হয়ে যাওয়া আর অল্পতেই রক্ত জমা বা রক্তপাতও এ সময়ের একটি সমস্যা। রোদে গেলে সানস্ক্রিন ব্যবহার করবেন। এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন।

চুল পড়া: মেনোপজের পর হঠাৎ করেই বেড়ে যায় চুল পড়ার সমস্যা। অনেকের মাথার সামনের দিকে টাক পড়ার উপক্রম হয়। পুষ্টিকর, ভিটামিন ও মিনারেলযুক্ত সুষম খাবার গ্রহণ করুন। কোনো পুষ্টি উপাদানের অভাব থাকলে তা পূরণ করুন। বিশেষজ্ঞ পরামর্শে মিনোক্সিডিল বা অন্যান্য চিকিৎসা গ্রহণ করুন।

ত্বকে ভাঁজ: মেনোপজের পর ত্বক দ্রুত তার কোলাজেন হারায়। দেখা গেছে প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যে ত্বকের প্রায় ৩০ শতাংশ কোলাজেন নষ্ট হয়। তারপর প্রতিবছর ২ শতাংশ করে হারাতে থাকে। এতে ত্বক ঢিলা হয়ে পড়ে আর ভাঁজ পড়তে শুরু করে। বিশেষ করে কপালে, ঠোঁটের দুপাশে, নাকের পাশে ভাঁজ পড়ে। এ জন্য কিছু চিকিৎসা আছে, তবে তা বিশেষজ্ঞ পরামর্শে নেওয়া উচিত।

নারীর বয়স যখন ৪০ এ:

মেনোপজের আগে-পরে অনেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা অনিয়মিত রক্তক্ষরণ সমস্যায় ভোগেন। অনেকেই একে স্বাভাবিক বলে ধরে নেন, অথবা সংকোচে মুখ খোলেন না। কিন্তু এটা হতে পারে জটিল কোনো রোগের পূর্ব লক্ষণ।

একজন নারী ৪৫ বছর পেরোনোর পরই ধীরে ধীরে মেনোপজের দিকে এগোতে থাকেন। সাধারণত ৫০ বছরের কাছাকাছি সময়ে মেনোপজ হয়ে থাকে। মেনোপজের আগে কয়েক মাস ধরে মাসিক কিছুটা অনিয়মিত হতে পারে। আবার জরায়ু ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের সময়ও এটা। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ জরায়ু ক্যানসার, থাইরয়েডের সমস্যা ও আরও কিছু জটিল রোগের পূর্ব লক্ষণ। তাই মেনোপজ হওয়ার আগের বয়সটাতে যেকোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

স্বাভাবিকের চেয়ে দীর্ঘদিন ধরে মাসিক হলে কিংবা মাসিকের সময় চাকা চাকা রক্ত গেলে এটিকেও আমলে নিতে হবে। এ সমস্যাগুলোকে অবহেলা করা যাবে না। এক বছর পর্যন্ত মাসিক বন্ধ থাকার পর, অর্থাৎ মেনোপজ হয়ে যাওয়ার পর যদি কারও আবার অল্প পরিমাণেও রক্তপাত হয়, সেটিকেও গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে এবং চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

মেনোপজের আগে বা পরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে একজন বয়স্ক নারী ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে যেতে থাকেন। দুর্বলতা, অল্পতেই হাঁপিয়ে ওঠা, মাথা ঘোরানো, বুক ধড়ফড় করাসহ নানা সমস্যা হতে পারে। মা, শাশুড়ি বা আপনজন হয়তো সংকোচে তাঁর মাসিক-সংক্রান্ত এসব সমস্যার কথা সবার কাছ থেকে আড়াল করে রাখছেন এবং বড় কোনো রোগকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। দ্বিধা ও সংকোচ কাটিয়ে উঠে সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার সাহায্য নিন।

মেনোপজের পর রক্তক্ষরণ:

মেনোপজ বা ঋতুচক্র স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার পর একজন নারীর আবারও রক্তক্ষরণ বা ঋতুস্রাব শুরু হলে তাকে বলে পোস্ট–মেনোপজাল ব্লিডিং। একে কিছুতেই অবহেলা করা চলবে না। কারণ, মেনোপজের পর আবারও রক্তক্ষরণ জরায়ু বা সারভিক্স ক্যানসারের অন্যতম উপসর্গ।

পোস্ট–মেনোপজাল ব্লিডিং কেন হতে পারে:

● মেনোপজের পর যাঁরা হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি নিয়ে থাকেন, তাঁদের মাসিকের মতো রক্তক্ষরণ হতে পারে। ইস্ট্রোজেন ট্যাবলেট খেলে মেনোপজের পরও রক্তপাত হয়। হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপির অনিয়মিত সেবন ও ব্যবহারের ফলেও রক্তপাত হয়।

● অ্যাট্রোফিক অ্যান্ডোমেট্রাইটিস ও অ্যাট্রোফিক ভ্যাজাইনাইটিস একটা কারণ। মাসিক বন্ধ হয়ে গেলে শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের পরিমাণ কমে যায়। তাই জরায়ুর বেশ কিছু পরিবর্তন হয়ে থাকে। এর ভেতরের অংশ বা অ্যান্ড্রোমেট্রিয়ামের পর্দা পাতলা হয়ে যায়। ফলে অল্পতেই আঘাতপ্রাপ্ত হয় ও রক্তক্ষরণ দেখা দেয়।

● অ্যান্ডমেট্রিয়াল বা সারভাইক্যাল পলিপ।

● ইস্ট্রোজেন উৎপন্নকারী ডিম্বাশয়ের টিউমার।

● জরায়ু নিচে নেমে যাওয়ার কারণে জরায়ুর মুখে ঘা হতে পারে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে জরায়ুকে তার অবস্থান ধরে রাখার জন্য পেসারি ব্যবহার করা হয়, যা দীর্ঘদিন থাকার কারণে আলসার ও রক্তক্ষরণ হতে পারে।

● নারীর প্রজননতন্ত্রের ক্যানসার যেমন সের্ভিক্যাল ক্যানসার, জরায়ুর ক্যানসার, ভ্যাজাইনাল ও ভালভার ক্যানসার, হরমোন উৎপাদন করে, এমন ওভারিয়ান ক্যানসার ইত্যাদি।

● টিবি, ট্রাইকোমোনাস ভ্যাজাইনাইটিসের কারণে রক্তক্ষরণ হতে পারে।

● যকৃতের সমস্যা অথবা রক্ত জমাট বাঁধে না, এমন কোনো রোগ।

● রোগী যদি রক্ত তরলীকরণের কোনো ওষুধ খান।

● অনেক সময় পায়ুপথের বা মূত্রনালি অথবা মূত্রথলি থেকে নির্গত রক্ত ভুলে যোনিপথের রক্ত বলে ভুল হতে পারে।

চিকিৎসক রোগের ইতিহাস, আল্ট্রাসনোগ্রামসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা–নিরীক্ষার মাধ্যমে পোস্ট–মেনোপজাল ব্লিডিংয়ের কারণ নির্ণয় করেন।

চিকিৎসা:

চিকিৎসা নির্ভর করে কী কারণে এই রক্তক্ষরণ হচ্ছে, তার ওপর। যেসব ক্ষেত্রে বারবার এই উপসর্গ দেখা দেয়, কিন্তু কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না, তেমন ক্ষেত্রে জরায়ু অপসারণের প্রয়োজন হতে পারে। অনেক সময় রোগী ভাবেন পুনরায় স্বাভাবিক মাসিক শুরু হয়েছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেন না। ফলে যখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন, তখন হয়তো অনেক দেরি হয়ে যায়। তাই প্রয়োজন সচেতনতা।

● পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে জটিল কিছু পাওয়া না গেলে, সাধারণত জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনার পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। যেমন অতিরিক্ত ওজন, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা ও নিয়মিত ব্যয়াম ইত্যাদি। পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনও জরুরি।

● হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি দেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে অন্তত ছয় মাস নিয়মিত ফলোআপে থাকতে হবে।

● ক্যানসারজনিত সমস্যায় অস্ত্রোপচার করে জরায়ু ফেলে দিতে হতে পারে। অনেক সময় আবার মাইক্রোসার্জারি করলেও চলে। অস্ত্রোপচারের পর রোগের ধরন বুঝে কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি ও কিছু ক্ষেত্রে দুটির সমন্বয়ে চিকিৎসা দিতে হয়।

প্রতিরোধ: বয়স ৪০ বছরের আগেই জীবনযাপন পদ্ধতি ও খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে। দৈনন্দিন ব্যস্ততার মধ্যেও নিজের জন্য কিছু সময় বের করতে হবে ও শরীরের প্রতি যত্নশীল হতে হবে। মেনোপজের পর রক্তক্ষরণকে কিছুতেই অবহেলা করা চলবে না। এ ধরনের সমস্যায় যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

যেসব বিষয়ে নজর রাখবেন:

মেনোপজের আগে থেকেই হাড়ক্ষয় শুরু হয়ে যায়। এ সময় দৈনিক প্রায় ১ হাজার ২০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম ও ৮০০ ইউনিট ভিটামিন ডির চাহিদা থাকে। তাই প্রতিদিন দুধ, দুগ্ধজাত খাবার, পনির, সয়াবিন, কাঁচা বাদাম, আখরোট, কাঁটাযুক্ত ছোট মাছ খাওয়ার চেষ্টা করুন। এ ছাড়া ম্যাগনেসিয়ামযুক্ত খাবার বিষণ্নতা, অস্থিরতা কমাতে সাহায্য করে।

সেলেনিয়াম হট ফ্লাশ কমায়। কলিজা, টুনা মাছ, টমেটো, পেঁয়াজ, ব্রকলি, রসুন ইত্যাদিতে সেলেনিয়াম আছে। সয়াসমৃদ্ধ খাবার ও বিনস হট ফ্লাশ কমাতে সাহায্য করে। অপরদিকে গরম ও মসলাদার খাবার, চা–কফি হট ফ্লাশ বাড়ায়। এ বয়সে অতিরিক্ত চুল পড়া ও ত্বকের লাবণ্যহীনতা কমাতে ভিটামিন ই-যুক্ত খাবার, যেমন সয়াবিন, বাদাম, অঙ্কুরিত সবজি, ডিম ইত্যাদি খাওয়া উচিত।

ওজন নিয়ন্ত্রণ: এ বয়সে অনেকেরই ওজন বেড়ে যায়। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে ক্যালরি মেপে সুষম স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে। ওজন নিয়ন্ত্রণ মেনোপজের উপসর্গ কমাতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত তেল, চর্বি, কোমল পানীয়, জাংক ফুড, লাল মাংস, মিষ্টিজাতীয় খাদ্য পরিহার করতে হবে।

বাড়তি লবণ খাওয়া যাবে না। দুধ, টক দই, সবুজ সবজি ও ফল, ছোট মাছ খাদ্যতালিকায় রাখতে হবে। ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি–সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। কারণ, মেনোপজের পর হাড়ক্ষয় বা অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বাড়ে। ধূমপান, মদ্যপান পরিহার করতে হবে।

ফিটনেস: ফিটনেস বাড়াতে প্রতিদিন ৩০-৪০ মিনিট হাঁটা, যোগব্যায়াম বা নিয়মিত শরীরচর্চা করা উচিত এ সময়। হাড়ক্ষয় ও হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমাতে ভারসাম্য রক্ষার ব্যায়াম (ব্যালান্সিং এক্সারসাইজ) করবেন। প্রতিদিন কিছু সময় রোদে কাটাবেন।

প্রফুল্ল থাকুন: আবেগীয় সমস্যা নিয়ন্ত্রণে সব সময় প্রফুল্ল থাকুন। মানসিক চাপ কমান। নিজেকে বিভিন্ন ধরনের কাজে নিযুক্ত রাখা ভালো। নিজেকে সময় দিন। সমাজসেবামূলক কাজ, বাগান করা, বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো, বই পড়া, গান শোনা ইত্যাদি করতে পারেন।

চিকিৎসা: মেনোপজের পর হাড়ক্ষয়ের ঝুঁকি কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি গ্রহণ করতে পারেন। এ সময় নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তের সুগার ও চর্বি ইত্যাদি পরীক্ষা করুন। কোনো সমস্যা ধরা পড়লে তার চিকিৎসা নিন। যাঁদের ডায়াবেটিস, রক্তচাপ, ডিসলিপিডেমিয়া আছে, তাঁরা এগুলো নিয়ন্ত্রণ করুন। হট ফ্লাশের সমস্যা অতিরিক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এ জন্য চিকিৎসা নিতে পারেন।

বয়স ৩৫ বছর পেরিয়ে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শে বছরে অন্তত একবার শরীরের সার্বিক পরীক্ষা করা উচিত। এর সঙ্গে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, রক্তচাপ, রক্তের সুগার, চর্বি ইত্যাদি সুনিয়ন্ত্রণ, চোখ, দাঁত ও ত্বকের যত্ন জরুরি। যেকোনো উপসর্গকে গুরুত্ব দিতে হবে। দেরিতে শনাক্ত হওয়ার কারণে আমাদের দেশে নারীদের অনেক রোগেরই চিকিৎসা বিলম্বিত হয়। মনে রাখতে হবে, লজ্জা বা আড়ষ্টতার কারণে কিছু আড়াল করলে নিজেরই বিপদ।

৩৫ থেকে ৪০ বছর বয়সের মধ্যে মেয়েদের যে চেকআপগুলো অবশ্যই দরকার-

১. প্যাপ টেস্ট: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এ সময় প্যাপ টেস্ট করানো উচিত। এই পরীক্ষায় জরায়ুমুখ বা সারভিক্সের যেকোনো পরিবর্তন আগেভাগেই শনাক্ত ধরা যায়।

২. হিমোগ্লোবিন টেস্ট: বাংলাদেশের নারীদের মধ্যে রক্তশূন্যতার হার প্রকট। তা ছাড়া মাঝবয়সে হঠাৎ দেখা দেওয়া রক্তশূন্যতা হতে পারে কোনো জটিল রোগের প্রাথমিক লক্ষণ।

৩. প্রস্রাব পরীক্ষা: প্রস্রাবে সুগার, অ্যালবুমিন ইত্যাদি যাচ্ছে কি না, পরীক্ষা করা দরকার। এই বয়সে প্রস্রাবে সুগার, অ্যালবুমিন যাওয়া বিভিন্ন রোগের পূর্বসংকেত।

৪. হরমোন পরীক্ষা: এ সময় রক্তের কিছু হরমোন পরীক্ষাও করা দরকার।

৫. রক্তের সুগার পরীক্ষা: সাধারণত এ বয়সে এসেই রক্তে সুগার বাড়ে, দেখা দেয় ডায়াবেটিস। কাজেই এ সময় চিকিৎসকের পরামর্শে রক্তের সুগার পরীক্ষা করা উচিত।

৬. শরীরে ভিটামিন ডি এবং ক্যালসিয়ামের পরীক্ষা: অস্টিওপরোসিস বা হাড়ক্ষয় রোগ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শরীরে বাসা বাঁধে ৩৫ থেকে ৪০ বছর বয়সে। কাজেই এ সময় ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়াম পরীক্ষা করলে অস্টিওপরোসিসের ঝুঁকি এড়ানো যায়।

৭. পুরো পেটের আলট্রাসাউন্ড করলে জানা যাবে পিত্তথলি, জরায়ু বা ডিম্বাশয়ে পাথর হয়েছে কি না। এই বয়সে এসে এই সমস্যারও ঝুঁকি বেড়ে যায়।

৮. স্তনের কিছু পরীক্ষা করাও জরুরি।

৯. ক্যানসারের পারিবারিক ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে এ-সংক্রান্ত কিছু পরীক্ষাও করা দরকার।

১০. রক্তের চর্বি বা লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা করা প্রয়োজন। রক্তে চর্বি বেড়ে গেলে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ে। কাজেই আগেভাগেই সতর্ক হতে হবে।

মেনোপজের সময় ব্যায়াম জরুরি:

মেনোপজের সময় নিয়মিত ব্যায়াম করা জরুরি, বিশেষত অ্যারোবিকস। নিয়মিত ব্যায়ামের ফলে অতিরিক্ত মেদ কমিয়ে আদর্শ ওজন বজায় রাখা সম্ভব। তা ছাড়া ‘স্ট্রেংথ ট্রেনিং (শক্তি বৃদ্ধির ব্যায়াম) এক্সারসাইজ’ মাসল লস (মাংসপেশি শুকিয়ে যাওয়া) ও অস্টিওপোরোসিস (হাড়ক্ষয়) প্রতিরোধ করে। ব্যায়ামের ফলে মাংশপেশি শক্তিশালী হয় ও মেটাবলিজম (বিপাক) বাড়ে। মেনোপজের পর নারীদের হৃদ্‌রোগ হওয়ার ও রক্তে চর্বি বাড়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। বেড়ে যায় অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকিও। নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে ফিটনেস বজায় রাখা সম্ভব।

সপ্তাহে ১৫০ মিনিট ব্যায়াম করতে হবে। প্রতিদিন ২০–২৫ মিনিট ব্যায়াম যথেষ্ট। যেমন হাঁটা, জগিং, সাইক্লিং, সাঁতার কাটা, ইনডোর সাইকেল বা ট্রেডমিল বা জুম্বাও হতে পারে ভালো ব্যায়াম।

স্ট্রেংথ ট্রেনিং: স্কোয়াটিং (হাঁটু ভাঁজ করে ওঠা–বসা), বাইসেপস কার্ল, ওয়েট লিফটিং, সাইক্লিং ও ব্যালেন্সিং বা ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ ব্যায়াম। যেমন এক পায়ে দাঁড়ানো, উঁচু–নিচু জায়গায় দৌড়ানো।

ইয়োগা: ইয়োগা ও স্ট্রেচিং দারুণ কার্যকর ব্যায়াম। যাঁরা নতুন শুরু করবেন, তাঁরা শুরুতে ১০ মিনিট করতে পারেন। ধীরে ধীরে সময় ও রিপিটেশন বাড়াতে হবে।

ওয়াটার অ্যারোবিকস: পানির মধ্যে ব্যায়াম খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পানি একধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে, যা মাংসপেশির সহনশীলতা ও ভারসাম্য রক্ষা করে। তাই সাঁতার কাটা, হাঁটা, সাইকেল করা, উল্টো সাঁতার কাটতে পারেন ২০–৩০ মিনিট।

কারও যদি শারীরিক সমস্যা হয়, তাহলে যেকোনো ব্যায়াম শুরুর আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

মেনোপজ মানে নতুন জীবন:

অনেকেই মনে করেন, মেনোপজ মানেই জীবনের সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া। কিন্তু আসলে তা নয়। মেনোপজের পর জীবনের নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করবেন আপনি। জীবনচক্রের এটি একটি স্বাভাবিক ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বর্তমান যুগে মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ায় জীবনের এক-তৃতীয়াংশ সময় পার করতে হয় এ মেনোপজের পরে। পরিণত বয়সে এসে একজন নারী এ সময় সমাজকে আরও অনেক কিছু দিতে পারেন। তাই এটিকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া এবং এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলা, জীবনাচরণে পরিবর্তন আনা, প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহার ও সেবনের মাধ্যমে জীবনের এ পর্যায়কে পূর্ণভাবে উপভোগ করুন।

সমাজের অধিকাংশ নারী যখন জীবনের এই পর্যায়টা অতিবাহিত করেন, তখন তাঁরা এ সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে কারও সঙ্গে কথা বলতে খুবই অনিরাপদ বোধ করেন। মেনোপজকে বৃদ্ধ হওয়ার লক্ষণ ভেবে তাঁদের স্বামীদের সঙ্গে পর্যন্ত বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করতে ভয় পান। অনেকে আবার নিরাপত্তাহীনতার কারণে তাঁদের মাসিক নিয়ে মিথ্যাও বলে থাকেন। তাঁদের ভয় হয়, মেনোপজের বিষয়টা স্বামীরা জানতে পারলে যদি তাঁদের নিয়ে চিন্তা করা বন্ধ করে দেন কিংবা তাঁদের আর ভালো না বাসেন। সমাজের এই মানসিকতা নারীর জীবনের খুব স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক এই প্রক্রিয়াকে একটা সামাজিক ট্যাবুতে পরিণত করছে।

একজন নারীর মধ্যে মেনোপজ নিয়ে অনেক ধরনের হতাশা দেখা দিতে পারে। এ সময়ে ওই নারীর প্রতি তাঁর নিজের যত্নশীল হতে হবে। পরিবারের সবারও বিশেষ করে জীবনসঙ্গীকে নিতে হবে বড় দায়িত্ব। নারীকে ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখতে হবে। তাঁর প্রয়োজনীয়তা বা গুরুত্ব যে একটুও কমেনি, এটি বোঝাতে হবে। প্রয়োজনে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। মেনোপজ মানেই নারীর জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়; বরং নতুন করে নিজেকে ভালোবাসুন, যত্ন নিন ও নিয়মিত ব্যায়াম করুন। মেনোপজ নারীজীবনের একটি স্বাভাবিক অধ্যায়। কোনো কোনো নারীর ক্ষেত্রে তেমন কোনো লক্ষণ পরিলক্ষিত হয় না। তবে বেশিরভাগ নারীর ক্ষেত্রে লক্ষণ থাকে।

তথ্যসূত্র:

  • ডা. ফারহানা তারান্নুম খান, সহকারী অধ্যাপক, গাইনিকোলজিক্যাল অনকোলজি বিভাগ, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মহাখালী, ঢাকা, 
  • ডা.শামীমা ইয়াসমিন, সহকারী রেজিস্ট্রার, স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগ, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা,
  • ডা. তাওফিকা হোসাইন, স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল,
  • অধ্যাপক মো. আসিফুজ্জামান, বিভাগীয় প্রধান, চর্ম ও যৌন বিভাগ, গ্রিনলাইফ মেডিকেল কলেজ,
  • অধ্যাপক ডা. সেলিনা আক্তার, স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, ইউনাইটেড হাসপাতাল, গুলশান, ঢাকা,
  • ইসরাত জাহান, পুষ্টিবিদ, সাজেদা হাসপাতাল,
  • উম্মে শায়লা রুমকি, ফিজিওথেরাপি পরামর্শক, পিটিআরসি, প্রথম আলো।
  • নাহিদা আহমেদ,  পুষ্টিবিদ, গুলশান ডায়াবেটিক কেয়ার, সমকাল।
  • ডা. ছাবিকুন নাহার, স্পেশাল ট্রেইন্ড ইন ইনফার্টিলিটি, স্ত্রী, প্রসূতি ও গাইনি রোগ বিশেষজ্ঞ এবং সার্জন, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, ঢাকা, কালের কণ্ঠ।
  • ডা. গুলশান আরা বেগম, প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান, গাইনি অ্যান্ড অবস বিভাগ, এনাম মেডিকেল কলেজ, যুগান্তর।
  • corona.gov.bd 
  • Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই

Popular Post

Blogger দ্বারা পরিচালিত.