First Aid Present

Lifestyle Modification এবং প্রাকৃতিক খাদ্য, পানীয়, শাকসবজি, গাছ, ডালপালা, ফল, মসলা, পাতা ও ফুল ইত্যাদির দ্বারা প্রাথমিক চিকিৎসা।

কানের ব্যথা এবং বন্ধভাব দূর করতে যা করবেন

হাঁচি-সর্দি, কাশি, গলাব্যথা, ঠান্ডা লাগা থেকে অনেক সময় কানে তালা লাগার ঘটনা ঘটে। অনেকেই কানে তালা লাগার বিষয়টিকে হালকাভাবে নিয়ে থাকেন; কিন্তু এটি মোটেও তা নয়। কানে তালা লাগার এ অবস্থা দ্রুত মধ্যকর্ণে অর্থাৎ কানের পর্দার ভেতরের দিকে প্রদাহ বা ইনফেকশন সৃষ্টি করতে পারে। কানে তালা মানে কান বন্ধ হয়ে থাকা, কিছু না শোনা। যদিও বিষয়টি ওষুধের মাধ্যমে কমে যায়; তবে কানের এই সমস্যা একেবারে হালকা নয়। কানের পর্দা আমাদের কানকে বহিঃকর্ণে ও মধ্যকর্ণে বিভক্ত করে। এই রোগে কানের পর্দার ভেতরের দিকে প্রদাহ হতে পারে, যাকে সংক্ষেপে বলে O.M.E। মধ্যকর্ণের প্রদাহ বিভিন্ন রূপ নিয়ে প্রকাশ পেতে পারে। কখনও মধ্যকর্ণে সামান্য তরল পদার্থের উপস্থিতি, কখনও মধ্যকর্ণে পুঁজ সৃষ্টি, আবার মধ্যকর্ণে পুঁজ হয়ে কানের পর্দা হয়ে সেই পুঁজ কান দিয়ে বেরিয়ে আসার মাধ্যমেও এই রোগের প্রকাশ ঘটতে পারে।

মধ্যকর্ণে পানি জমা হয়ে প্রদাহ হলে সর্দি-কাশির সঙ্গে হঠাৎ কান বন্ধ হয়ে যায়। অনেকে একে কানে তালি দেওয়া বলে অভিহিত করেন, তখন হঠাৎ কানে বেশ ব্যথা মনে হয়।

কেন কানে তালা লাগে/বন্ধ হয়ে যায়?

অডিটরি টিউব যা নাকের সঙ্গে গলা ও কানের সংযোগ স্থাপন করে। এই টিউব মধ্যকর্ণ ও আবহাওয়ার বায়ুচাপের ভারসাম্য রক্ষা করে।

কোনো কারণে এই টিউব বন্ধ হয়ে গেলে/ঠিকমতো কাজ না করলে মধ্যকর্ণে পানি জমে প্রদাহ হতে পারে। সাধারণত হাঁচি, সর্দি, কাশি বা ঠান্ডা লাগার কারণে কানের সঙ্গে নাক এবং গলার মধ্যে যোগাযোগ রক্ষাকারী টিউবটি আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে সাময়িক বন্ধ থাকে। ফলে মধ্যকর্ণের সঙ্গে বাইরের পরিবেশের যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটে। শ্বাসনালির ওপরের অংশে জীবাণু সংক্রমণ বা প্রদাহ আপনার কানের সমস্যার কারণ হতে পারে। এ জন্য সর্দি ও সাইনোসাইটিস জটিল হওয়ার আগেই চিকিৎসা নিন। না হলে মধ্যকর্ণে প্রদাহ হয়ে ফুলে গিয়ে পানি জমতে পারে। 

কাদের এ সমস্যা হতে পারে?

সাধারণত স্কুলগামী বাচ্চাদের এই সমস্যা বেশি দেখা গেলেও যে কোনো বয়সের যে কেউ আক্রান্ত হতে পারেন। যেসব বাচ্চার নাক ডাকার অভ্যাস আছে, তাদের মধ্যকর্ণে পানি জমা হতে পারে। এ রোগের উল্লেখযোগ্য কারণগুলোর (Risk Factor) মধ্যে রয়েছে :

১. ঘন ঘন ঊর্ধ্বশ্বাসনালির সংক্রমণ (URTI) ; যেমন : সর্দি-কাশি-নাক বন্ধ।

২. প্রায়ই অ্যালার্জিজনিত নাকের প্রদাহ/অ্যালার্জিক রাইনাইটিস;

৩. ক্রনিক টনসিলের ইনফেকশন;

৪. শিশুদের ক্ষেত্রে নাকের পেছনে এডিনয়েড নামক লসিকাগ্রন্থি বড় হয়ে যাওয়া;

৫. নাকের হাড় বাঁকা/ক্রনিক সাইনোসাইটিসের সমস্যা;

৬. ভাইরাল ইনফেকশন।

৭. এ ছাড়া নাকের পেছনে ন্যাসোফ্যারিংস (Nasopharynx) নামক স্থানে কোনো টিউমার হলে।

লক্ষণ কী/রোগী কী কী কষ্ট অনুভব করে?

* মধ্যকর্ণে পানি জমা হয়ে প্রদাহ হলে সর্দি-কাশির সঙ্গে হঠাৎ কান বন্ধ হয়ে যায়। অনেকে একে কানে তালি দেওয়া বলে অভিহিত করেন।

* হঠাৎ কানে বেশ ব্যথা মনে হয়।

* কানের মধ্যে ফড়ফড় করে এবং ভোঁ ভোঁ শব্দ হয় (Tinnitus)। 

* কানে কম শোনা যায়।

* ইনফেকশন বেশি তীব্র হলে কানের পর্দা ফুটো হয়ে কান বেয়ে রক্ত মিশ্রিত পানির মতো পড়ে কিংবা পুঁজ পড়ে। 

এ রকম সমস্যা দেখা দিলে জটিলতার আগেই একজন নাক-কান-গলা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিতে পারেন বর্তমানে কানের পর্দার অবস্থা কী রকম, পর্দা কি ফুটো হয়েছে, না হয়নি।

এ ধরনের রোগে চিকিৎসক কান পরীক্ষার মাধ্যমে সাধারণত অ্যান্টি-হিস্টামিন; বয়স উপযোগী নাকের ড্রপ; প্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করে থাকেন। ব্যথা কমাতে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খেতে পারেন। আর যদি আপনি চুইংগাম খেতে পছন্দ করেন, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শমতে চুইংগাম মুখে নিয়ে চিবাতে থাকুন আয়েশ করে। এটি চিকিৎসার অংশ হিসেবে কানের বন্ধভাব দূর করার খুব দ্রুত এবং সহজতর পদ্ধতি।

ওষুধের চিকিৎসার পরেও যদি ১২ সপ্তাহে সমস্যার সমাধান না হয়, তবে নাক-কান-গলা সার্জনরা একটি ছোট অপারেশনের মাধ্যমে কানের পর্দা ফুটো করে তরল পদার্থ বের করে থাকেন। যার নাম মাইরিংগোটমি (Myringotomy)। সুতরাং এ ধরনের সমস্যাকে অবহেলা করবেন না

কানের ব্যথা কারণ ও প্রতিকার:

কানে ব্যথার কারণ: নানান কারণে কানে ব্যথা হতে পারে। বিভিন্ন কারণে ব্যথার স্থায়িত্ব বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। নিচে কানে ব্যথার খুব পরিচিত কিছু ধরন ও সেসবের সম্ভাব্য কারণগুলোর একটা তালিকা দেওয়া হলো—

বাইরের কোন সংক্রমণ থেকে কানের ভিতরে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া জন্মালে কানে ব্যথা হতে পারে, যেমন সাঁতার কাটা, ঠান্ডা লাগা, কানের পর্দা ফেটে যাওয়া, কোন ধরনের এলার্জি বা কানে ময়লা বা খৈল জমা হওয়া, দাঁত ও চোয়ালের সমস্যা থেকে দাঁতে ব্যাথা হতে পারে। তবে কার কোন কারনে ব্যাথা হচ্ছে এটা ডাক্তারের কাছ থেকে জেনে নেওয়াই ভালো।

কানে ব্যথার সাথে সম্ভাব্য কারণ:

দাঁতে ব্যথা অনুভুত হওয়া – 

  • শিশুদের দাঁত ওঠা
  • দাঁত ও দাঁতের মাড়িতে ইনফেকশনের জন্য ফোঁড়া হওয়া

শুনতে সমস্যা হওয়া – 

  • গ্লু ইয়ার বা কানে পানি জমা
  • কানে খইল বা ময়লা তৈরি হওয়া
  • কানের ভেতরে কিছু আটকে যাওয়া। যেমন: শিশু কোনো খেলনা, বাদাম অথবা মটরশুঁটি কানে ঢুকিয়ে ফেললে যদি তা আটকে যায়
  • কানের পর্দা ছিদ্র হওয়া

খাবার গিলার সময় ব্যথা অনুভুত হওয়া – 

  • গলা ব্যথা
  • টনসিলের ইনফেকশন
  • টনসিলের বিভিন্ন জটিলতা। যেমন: টনসিলের চারপাশে গুরুতর ইনফেকশন থেকে ফোঁড়া হওয়া

জ্বর আসা – 

  • কানের ইনফেকশন
  • সর্দি-কাশি ও ফ্লু

কানের ব্যথা কমানোর উপায়:

কানের ব্যথা কমাতে নিচে উল্লেখিত বিষয়গুলো মেনে চলুন—

  • বিশেষজ্ঞের পরামর্শ- গাড়ি বাস বা ট্রেনে যাতায়াতের সময় কান ও মাথা ঢেকে রাখবেন, বন্ধ করে দেবেন জানালা। কারণ দুই দিকের জানালা খোলা থাকলে ঠান্ডা বাতাস এবং ধুলোবালি কানে লাগে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা কানে ব্যথা বা সংক্রমনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। 
  • সাঁতার কাটার সময় অবশ্যই বাথক্যাপ করে নিবেন। কারণ গোসল বা সাঁতার কাটার সময় কানের ভিতর পানি ঢুকলে সংক্রমণ হতে পারে। তাই সাঁতার বা গোসলের পর কান মুছে হেয়ারড্রায়ার দিয়ে চুল শুকিয়ে নেওয়া ভালো। মনে রাখবেন কানে পানি ঢুকলে ইনফেকশন হয় সাধারণত গ্রীষ্মকালে। 
  • ব্যাথা সারাতে পিঁয়াজের পুটলি-পেঁয়াজে রয়েছে সংক্রমণ দমনকারী এক পদার্থ যা কানের ব্যথা বা সংক্রমণ রোধে কার্যকরী। কিভাবে করবেন? প্রথমে একটি বা দুটি পেয়াজ কেটে নিন, এরপর সেটা গরম করুন, লক্ষ্য রাখবেন যেন বেশি গরম না হয়। এরপর সেই গরম পেঁয়াজ একটা পরিস্কার কাপড়ে পুটলি বেঁধে নিন। সেই পুটলি যেখানে ব্যথা বা সংক্রমণ বা ফোলাভাব সেখানে আধঘন্টা ধরে থাকুন।
  • কানের ব্যথা সারাতে অলিভ অয়েল- কানে ব্যথা হলে গরম অলিভ অয়েলে ছোট্ট একটি পরিষ্কার কাপড় ভিজিয়ে কানের ঠিক পিছনের দিকে কয়েক মিনিট চাপ দিয়ে ধরে থাকুন। এতে অনেক আরাম বোধ করবেন এবং ব্যথাও কমে যাবে।
  • সাথে জ্বর থাকলে পেপারমিন্ট বা মেন্থল-কান ব্যথা সারাতে মেন্থলের ব্যবহার যুগ যুগ ধরে হয়ে আসছে। তবে কান ব্যথার সাথে যদি জ্বরও থাকে তবে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তাছাড়া ভেসজ ওষুধে যারা বিশ্বাসী নন তারা ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া তা ব্যবহার করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
  • নিজে নিজেই কান পরিষ্কার না করাই ভালো- অনেকেই নিজের কান পরিষ্কার করতে গিয়ে হিতে বিপরীত করে ফেলেন। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ হলো দিনে দুই থেকে তিন লিটার পানি পান করুন এতে কানের ত্বক বা পর্দার ভিতরে থাকা জীবাণুগুলো অটোমেটিক বের হয়ে চলে আসবে।
  • নরম কাপড় দিয়ে উষ্ণ অথবা ঠাণ্ডা সেক দিতে পারেন।
  • প্যারাসিটামল অথবা আইবুপ্রোফেন জাতীয় ব্যথানাশক ঔষধ খেতে পারেন।
  • উল্লেখ্য, যাদের বয়স ১৬ বছরের কম তাদের অ্যাসপিরিন জাতীয় ঔষধ সেবন করা উচিৎ নয়।

ব্যথা প্রতিকারে যা করবেন না—

  • কানে কিছু প্রবেশ করাবেন না। যেমন: কটন বাড জাতীয় বস্তু
  • ইয়ার ওয়াক্স বা কানের ময়লা বের করার চেষ্টা করবেন না
  • কানে পানি প্রবেশ করতে দেবেন না

যখন জরুরিভাবে ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন:

কানে ব্যথার সাথে সাথে যে সমস্যাগুলো দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিবেন—

  • ৩ দিনের বেশি সময় কানে ব্যথা থাকলে
  • বার বার কান ব্যথা হলে
  • ব্যথা বেড়ে গেলে এবং অবস্থার অবনতি হলে
  • অনেক জ্বর আসলে অথবা গা গরম লাগলে এবং কাঁপুনি হলে
  • কান ও কানের চারপাশ ফুলে গেলে
  • কান থেকে পানি কিংবা তরল পদার্থ বের হতে থাকলে
  • কানে শুনতে সমস্যা হলে অথবা শুনতে না পেলে
  • কানে কিছু আটকে গেলে
  • শিশুর বয়স ২ বছরের চেয়ে কম হলে এবং একইসাথে দুই কানে ব্যথা থাকলে

যেভাবে বুঝবেন আপনার শিশুর কানে ব্যথা হচ্ছে:

শিশু ও ছোটো বাচ্চাদের এক কানে অথবা একই সাথে দুই কানে ব্যথা হতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ইনফেকশনের জন্য ব্যথা হয়—যা অল্প কিছুদিনেই সেরে যায়। শিশুর কানে ব্যথা হচ্ছে কি না তা বোঝার কিছু উপায় হলো—

  • বাচ্চারা কান ঘষলে বা টানলে
  • আওয়াজে সাড়া না দিলে
  • শরীরের তাপমাত্রা ১০০.৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার বেশি হলে
  • খিটখিটে কিংবা খুব অস্থির হয়ে উঠলে
  • খাবার খেতে না চাইলে
  • শরীরের ভারসাম্য বা ব্যালেন্স হারিয়ে ফেললে।

তথ্যসূত্র:

  • নাক কান ও গলা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার মিশায়েল বনডর্ফেল, জার্মানি, ডয়চেভেলে।
  • ডা. মালিহা তাসনিম, মেডিকেল রিভিউ করেছেন ডা. ইমা ইসলাম, সহায় হেল্থ।
  • ডা. মো. আব্দুল হাফিজ শাফি, নাক-কান-গলা বিভাগ, বিএসএমএমইউ ( প্রেষণে), ঢাকা; এক্স সহকারী রেজিস্ট্রার, সিওমেক হাসপাতাল, সমকাল।
  • Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই

Popular Post

Blogger দ্বারা পরিচালিত.