First Aid Present

Lifestyle Modification এবং প্রাকৃতিক খাদ্য, পানীয়, শাকসবজি, গাছ, ডালপালা, ফল, মসলা, পাতা ও ফুল ইত্যাদির দ্বারা প্রাথমিক চিকিৎসা।

Autoimmune Disease কি? এতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কিভাবে নষ্ট হয়? এখান থেকে পরিত্রাণের উপায় কি?

Autoimmune Disease (স্বতঃঅনাক্রম্য রোগ) এর প্রাথমিক ধারণ:

স্বতঃঅনাক্রম্য রোগ বা অটোইমিউন রোগ হচ্ছে এক প্রকার শারীরিক অবস্থা যা শরীরের একটি স্বাভাবিক অংশে অস্বাভাবিক অনাক্রম্য প্রতিক্রিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়।

এটি একটি Autoimmune Disorder, যার মানে শরীরের Immune System ভুলভাবে শরীরের নিজস্ব কোষের উপর আত্মঘাতী আক্রমণ করে।

আমাদের দেহের একটি Immune System (রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থাপনা) রয়েছে, যা বিশেষ (cells and organs) কোষ এবং অঙ্গগুলির একটি জটিল নেটওয়ার্ক যা জীবাণু এবং অন্যান্য (foreign invaders) বিদেশী আক্রমণকারীদের (ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, জীবাণু ইত্যাদি) থেকে শরীরকে রক্ষা করে। ইমিউন সিস্টেমের মূলে রয়েছে (self and nonself) নিজেকে এবং ননসেলের মধ্যে পার্থক্য বলার ক্ষমতা; অর্থাৎ আপনার নিজের বডিতে কি আছে এবং বাহির থেকে বডির ভিতরে কি ঢুকেছে সেটা অনুধাবন করার ক্ষমতা। মূলত অটোমেটিক ভাবে আমার বডিতে যা বিদ্যমান থাকে তা বডির জন্য উপকারী কিন্তু বডিতে যদি বাহিরের কিছু এসে আক্রমণ করে মূলত সেটাই আমাদের রোগ ব্যাধি আর অটোইমিউন ডিজিজ হচ্ছে কোনটা উপকারী জিনিস আর কোনটা বাহির থেকে এসে ক্ষতি করার চেষ্টা করতেছে এই পার্থক্যটা বুঝতে না পারা। তাই একটি ত্রুটি শরীরকে নিজের এবং ননসের মধ্যে পার্থক্য বলতে অক্ষম করতে পারে, যখন এটি ঘটে, তখন শরীর অটোঅ্যান্টিবডি তৈরি করে (AW-toh-AN-teye-bah-deez) যা ভুলবশত স্বাভাবিক কোষকে আক্রমণ করে। একই সময়ে, নিয়ন্ত্রক টি কোষ নামক বিশেষ কোষগুলি ইমিউন সিস্টেমকে লাইনে রাখার জন্য তাদের কাজ করতে ব্যর্থ হয় অর্থাৎ বডি তার নিজস্ব শক্তি দিয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, যার ফলাফল আপনার নিজের শরীরের উপর একটি বিপথগামী আক্রমণ এবং ছোট থেকে ব্যাপক ক্ষতির কারণ হয় যা আমরা অটোইমিউন রোগ হিসাবে জানি। শরীরের যে অংশগুলি প্রভাবিত হয় তা অটোইমিউন রোগের ধরণের উপর নির্ভর করে।

Autoimmune Disease পুরুষদের তুলনায় নারীদেরই বেশি আক্রমণ করে। এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৮০ প্রকারের স্বতঃঅনাক্রম্য রোগ সম্পর্কে জানা গেছে। শরীরের প্রায় সকল অংশই এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এই ধরনের রোগগুলোর সাধারণ উপসর্গের মধ্যে রয়েছে অল্প জ্বর এবং দুর্বল বোধ করা। প্রায় ক্ষেত্রেই উপসর্গগুলো আসে এবং চলে যায়।

অটোইমিউন ডিজ়িজ় কী? এই রোগে আক্রান্ত হলে কি সারা জীবনই চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে?

বেশ ক’দিন ধরেই খুব ক্লান্ত লাগছে দিয়ার। রোজই জ্বর আসছে। অ্যান্টিবায়োটিকস খেয়েও জ্বর কমছে না। চিকিৎসকের কাছে গিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করে জানা গেল, দিয়া একটি অটোইমিউন ডিজ়িজ়ে আক্রান্ত। অটোইমিউন ডিজ়িজ় কী? এই রোগে আক্রান্ত হলে কি সারা জীবনই চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে? চিকিৎসকদের মতে, ব্যক্তিবিশেষে এ রোগের ধরন যেমন আলাদা, তেমনই তার চিকিৎসা পদ্ধতিও। তবে আগে জানতে হবে, এই রোগ কেন হয়?

অটোইমিউন ডিজ়িজ় কী?

অটোইমিউন ডিজিজ হল শরীরের এমন এক অবস্থা, যখন কারোর শরীরের ইমিউন সিস্টেম (রোগ প্রতিরোধ তন্ত্র) তার নিজের শরীরকেই ভুল করে আক্রমণ করে। সাধারণত শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতার সমস্যা (Immune System Disorder) তখন হয়, যখন প্রতিরোধ ক্ষমতা খুব কম থাকে, অথবা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে যায়। প্রতিরোধ ক্ষমতা অতিরিক্ত সক্রিয় হলে তখন শরীর নিজেরই কোষ–কলাকে আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত করতে থাকে।

আমাদের শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা শরীরকে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাসের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে থাকে। শরীর বিজাতীয় কোনো ব্যাকটেরিয়া ভাইরাসের শিকার হলে শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতা সেই আক্রান্ত অঞ্চলে প্রতিরোধী ব্যাবস্থা শুরু করে দেয়।

অটোইমিউন ডিজিজের ক্ষেত্রে শরীরের বিভিন্ন অংশ যেমনঃ– অস্থিসংযোগ (joints), ত্বক, এগুলোকে বিজাতীয় বস্তু বলে ধরে নেয় এবং তখন অটোঅ্যান্টিবডি নামক একপ্রকার প্রোটিন নির্গত করে এবং সুস্থ কোষগুলোকে আক্রমণ করে।

মেডিসিনের ডা. অরুণাংশু তালুকদার কথায়, ‘‘আমাদের শরীর জন্মের পর থেকেই কোনটা সেল্ফ আর কোনটা নন-সেল্ফ সেই পার্থক্য বুঝতে শুরু করে। যখন শরীরে ফরেন প্রোটিন প্রবেশ করে, তখন শরীর সচেতন হয়ে যায়। ফলে সে অ্যান্টিবডি প্রস্তুত করে এবং সেই অ্যান্টিজেনকে আক্রমণ করে শরীরের অনাক্রম্যতা বাড়ায়। কিন্তু যখন শরীর কোনটা সেল্ফ ও কোনটা নন-সেল্ফ বুঝতে পারে না, তখন নিজের কোষকেই সে ফরেন প্রোটিন ভেবে আক্রমণ করে। একেই বলে অটোইমিউন ডিজ়িজ়।’’ এ ক্ষেত্রে রোগীর ইমিউন সিস্টেম রোগীর শরীরকেই আক্রমণ করে।

রিউমাটোলজিস্ট ডা. অভ্রজিৎ রায় বললেন, ‘‘জন্মের তিন বছর অবধি বাচ্চার ইমিউনিটিতে নিজের কোষের প্রতি একটা টলারেন্স তৈরি হয়। ফলে সে নিজের কোষের ক্ষতি করে না। কিন্তু তিন বছরের মধ্যে যদি তা ডেভলপ না করে, বড় হলে টি-সেল তখন বি-সেলকে উদ্দীপিত করে অটো-অ্যান্টিবডি তৈরি করার জন্য। 

এই অটো-অ্যান্টিবডি বা অটোইমিউন মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত শরীরের যে কোনও অংশে আক্রমণ করতে পারে। শরীর নিজের কোষের বিরুদ্ধে একটা প্রোটিন তৈরি করে নিজেরই ক্ষতি করা শুরু করে। 'লুপাস' রোগে এ রকম হতে দেখা যায়। সে ক্ষেত্রে শরীরের কোন অংশে তা আঘাত করছে, সেই অনুযায়ী রোগের ধরন ও চিকিৎসা পদ্ধতি পাল্টাতে থাকে। যেমন কিডনিতে আঘাত করলে যে চিকিৎসা হবে, মাথায় আঘাত করলে তা হবে না।’’ অটোইমিউন ডিজ়িজ় যেমন অনেক ধরনের হয়, তেমনই শরীরের কোন অংশে হচ্ছে তার উপরেও নির্ভর করে রোগের গুরুত্ব ও চিকিৎসা।

অটোইমিউন ডিজিজ প্রায়শই শনাক্ত করতে সমস্যা হয়, দেরি হয় এবং রোগটি কখনোই পুরোপুরি নিরাময় করা যায় না।
এর কারণ:

প্রতিটি মানুষের শরীরে প্রাকৃতিকভাবে রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা থাকে। যার কাজ হল শরীরের ক্ষতি করে এমন কিছু, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ইত্যাদি প্রবেশ করতে চাইলে তার সাথে লড়াই করে তাকে বাধা দেয়া।

ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা অ্যান্টিবডি নিঃসরণ করে, শরীরের শত্রুকে মোকাবেলা করে। কিন্তু কেউ অটোইমিউন ডিজিজে আক্রান্ত হলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভুল করতে থাকে। তার ফলে শত্রু কোষ এবং সুস্থ কোষের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করতে পারে না। তখন রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা উল্টো শরীরের সুস্থ কোষ এবং বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আক্রমণ করতে থাকে।

এ ধরনের রোগের কারণ সচারচর অজানা। তবে কোনো বিশেষ প্রকারের ভাইরাস (যেমন এপসটাইন ভাইরাস থেকে মাল্টিপল স্কলেরসিস) ও ব্যাকটেরিয়া বা কখনো কোনো বিশেষ ওষুধের প্রভাবে শরীরের এমন কিছু পরিবর্তন আনে যে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার পদ্ধতিকে নষ্ট করে ফেলে। কিছু স্বতঃঅনাক্রম্য রোগ, যেমন লুপাস রোগ পারিবারিক কারণে হতে পারে, আবার কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সংক্রমণ বা পরিবেশগত কারণেও এ ধরনের রোগের সৃষ্টি হতে পারে। কিছু জিন হতে পারে দায়ী, খুব বেশি রোদের মুখোমুখি হলে এটি হতে পারে, এবং তার সাথে বয়স, লিঙ্গ, ধূমপানের ইতিহাস, ওজন ইত্যাদি তো রয়েছেই।

কিছু সাধারণ রোগ যা স্বতঃঅনাক্রম্য রোগ হিসেবে বিবেচিত হয় তার মধ্যে রয়েছে সিলিয়াক রোগ, টাইপ ১ ডায়াবেটিস, গ্রেভস ডিজিজ, প্রদাহমূলক পেটের রোগ, মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস, সোরিয়াসিস, রিউম্যাটয়েট বাত, এবং সিস্টেমিক লাপাস এরিথেম্যাটোসাস। এ ধরনের রোগের ক্ষেত্রে রোগননির্ণয় করা কঠিন হতে পারে।

রোগের লক্ষণ কী?

শরীরের প্রায় সকল অংশই এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এই ধরনের রোগগুলোর সাধারণ উপসর্গের মধ্যে রয়েছে অল্প জ্বর এবং দুর্বল ও ক্লান্তি বোধ করা। প্রায় ক্ষেত্রেই উপসর্গগুলো আসে এবং চলে যায়।

জ্বর আসে, তা অ্যান্টিবায়োটিকসেও কমে না। আবার অনেকের গাঁটে-গাঁটে ব্যথা হয়, তখন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে এলে বিভিন্ন পরীক্ষা করে রোগনির্ণয় করা হয়। ব্লাড কালচার, ইউরিন কালচার, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গির পরীক্ষা করে কোনও ইনফেকশন পাওয়া না গেলে, তখন বিভিন্ন ধরনের রক্তপরীক্ষা যেমন রিউমাটয়েড ফ্যাক্টর, অ্যান্টি সিসিপি, অ্যান্টি নিউক্লিয়ার ফ্যাক্টর ইত্যাদি করতে দেওয়া হয়। ইনফেকশন বাদ দেওয়ার পরে ইমিউনোলজিক্যাল ডিজ়িজ়ের কথা ভাবা হয়। অনেক সময়ে মুখের লালা শুকিয়ে যায়। ড্রাই আইজ়ের সমস্যাও দেখা দিতে পারে। এছাড়াও;

  • অস্থিসংযোগ/গিঁটে ব্যথা,
  • গিঁট ফুলে যাওয়া,
  • ত্বকে র‍্যাশ বা ফুসকুঁড়ি,
  • ত্বক লালচে হয়ে যাওয়া,
  • অতিরিক্ত চুল পড়ে যাওয়া,
  • সবসময় ক্লান্তি বোধ করা,
  • খাবার রুচি চলে যাওয়া,
  • ওজন কমা,
  • রাতে শরীর ঘেমে যাওয়া,
  • তলপেটে ব্যথা,
  • হজমের সমস্যা,
  • বারবার জ্বর, বা হাল্কা জ্বর,
  • গ্রন্থি ফুলে যাওয়া,
  • মাংসপেশিতে যন্ত্রণা,
  • মনোযোগে সমস্যা,
  • হাত ও পায়ের পাতায় অসাড় ভাব, ইত্যাদি।
বিভিন্ন প্রকারের অটোইমিউন ডিজিজ (Types of Autoimmune Disease ):

অটোইমিউন ডিজ়িজ় ফুসফুস (Lung) থেকে শুরু করে (muscle) পেশিকেও আক্রমণ করতে পারে এই রোগ। মধ্যবয়স্ক মহিলাদের মধ্যে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ১৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে এই রোগের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। আবার রোগীর শরীরের উপরে নির্ভর করে রোগের প্রকোপ কতটা হবে। কারও ক্ষেত্রে অটোইমিউন ডিজ়িজ় খুব একটা কাবু করতে পারে না, অনেকের আবার সারা জীবনই অসুখ কখনও বাড়ে, কখনও কমে... এ ভাবে চলতে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে আবার হঠাৎ রোগ অনেকটা বেড়ে যায়। তাই অবশ্যই নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
 
টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিস : অগ্ন্যাশয় ইনসুলিন নামক হরমোনের উৎপাদন করে যা রক্তে শর্করার পরিমান নিয়ন্ত্রণ রাখতে সাহায্য করে। শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষকে আক্রমণ করে। রক্তে অতিরিক্ত শর্করা রক্তজালিকা, হৃদপিন্ড, কিডনি, চোখ এবং স্নায়ুর ক্ষতি করে।

অ্যালোপেশিয়া : আস্তে আস্তে চুল ঝরে যাওয়া একটি স্বাভাবিক নিয়ম আর অতিরিক্ত চুল পড়ে যাওয়া এই রোগের লক্ষণ। এ রোগে যত চুল গজায় আর যত চুল পড়ে যায় সেই অনুপাতের মধ্যে অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। যখন শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা চুলের ফলিক্লগুলি আক্রামণ করে, তাকে বলা হয় অ্যালোপেশিয়া অ্যারেটা। এটা এক ধরনের অটো ইমিউন ডিজিজ। কোনও কারণে শরীরের নিজস্ব ইমিউন সিস্টেম অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা মাথার হেয়ার ফলিকলদের ধ্বংস করে দেয়। 
এই রোগে অন্য কোনও রকম সমস্যা বা উপসর্গ তেমন নেই। মাথার তালু এবং মুখেই এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে। যে কোনও বয়সেই এই সমস্যা দেখা দিতে পারে, এমনই বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। ‘অ্যালোপেসিয়া এরিয়াটা’-এ আক্রান্ত হলে শরীরের একটি নির্দিষ্ট অংশের হেয়ার ফলিকল আক্রান্ত হয় এবং ওই অংশের চুল রাতারাতি ঝরে যায় বা হঠাৎ করেই মাথার যেখান সেখান থেকে চুল ‘গায়েব’ হয়ে যায় বা মাথার একটা অংশের চুল ঝরে গিয়ে গোলাকৃতির টাক পড়ে যায়। শুধু তাই নয়, ওই অংশে নতুন চুল গজানোর প্রক্রিয়াও বাধাপ্রাপ্ত হয় অ্যালোপেসিয়া এরিয়াটার প্রভাবে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, শ্বেতকণিকার আক্রমণে ওই বিশেষ অংশের হেয়ার ফলিকলের কার্যক্ষমতা সম্পূর্ণ রূপে নষ্ট হয়ে যায়। ‘অ্যালোপেসিয়া এরিয়াটা’-এ আক্রান্ত ব্যক্তির মাথা, দাড়ি, ভ্রু ইত্যাদি অংশের চুল আচমকাই প্রায় গোলাকৃতিতে ঝরে গিয়ে ফাঁকা হয়ে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা জানান, যারা থাইরয়েড বা ডায়াবেটিসের মতো অটো ইমিউন ডিজিজে আগে থেকেই আক্রান্ত, তাদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখার আশঙ্কা রয়েছে। তবে প্রথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু করলে এই রোগ নির্মূল করা সম্ভব। এছাড়া কখনও কখনও দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার প্রয়োজন হয় ‘অ্যালোপেসিয়া এরিয়াটা’-এ আক্রান্ত রোগীর। এক্ষেত্রে ওষুধ, ইনজেকশন বা আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মিকে কাজে লাগিয়ে এই রোগের চিকিৎসা করা হয়।

অ্যালোপেশিয়ায় আক্রান্ত হলে রোগী স্বাভাবিকই জীবন যাপন করে৷ শারীরিক অসুস্থতা, ঘুম কম, অস্বাস্থ্যকর খাওয়াদাওয়া, জল কম খাওয়া কিংবা অতিরিক্ত মানসিক চাপে এই রোগ হয় বলে ধারণা। কিছু ক্ষেত্রে বংশগত কারণেও হতে পারে।

মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস : এই রোগটি মায়ালিন পর্দা (নিউরনের আবরণ) কে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যার ফলে মস্তিষ্ক থেকে সুষুম্না কান্ডের মাধ্যমে সারা শরীরে এবং শরীর থেকে সুষুম্না কান্ডের মাধ্যমে মস্তিষ্কে অনুভূতি আদান-প্রদানের গতি মন্থর হয়ে যায়। এর ফলে অসারতা, দুর্বলতা, হাঁটতে না পারার মত সমস্যা দেখা যায়। ৫০% মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসে আক্রান্ত মানুষের রোগলক্ষন প্রকাশের ১৫ বছরের মধ্যে একা হাঁটতে পারার ক্ষমতা চলে যায়।

ইনফ্লামেটরি বাওয়েল ডিজিজ : এর ফলে অন্ত্রের দেওয়ালের আবরনে প্রদাহ দেখা দেয়। যার ফলে বারংবার ডায়েরিয়া, পেটে ব্যাথা, মলদ্বার থেকে রক্তপাত, বারংবার মলত্যাগের প্রবনতা, ওজন হ্রাস পাওয়া ইত্যাদি ঘটে থাকে।

হাসিমোটোস থাইরয়ডিটিস : শরীরের প্রতিরোধী ক্ষমতায় তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি থাইরয়েড গ্ল্যান্ড কে আক্রমণ করে এবং ধীরে ধীরে থাইরয়েড উৎপাদনকারী কোষগুলিকে ধ্বংস করতে থাকে। যার ফলে থাইরয়েড হরমোন প্রয়োজনের তুলনায় কম উৎপন্ন হয় ( hypothyroidism)। ক্লান্তি, কোষ্ঠকাঠিন্য, অস্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধি, শুষ্ক ত্বক ইত্যাদি লক্ষ্মণ শরীরে দেখা দেয়।

মায়াস্থেনিয়া গ্র‍্যাভিস : এই রোগের ক্ষেত্রে শরীরের মাংসপেশি ও তাকে নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয় (Neuromuscular disorder)। এই রোগের প্রধান লক্ষন হল রোগী যত শারীরিক ভাবে নিজেকে সচল করার চেষ্টা করে ততই দুর্বল হয়ে পড়ে। এই রোগের প্রধান চিকিৎসা হল মেসটিনন ( Mestinon) নামক ওষুধের প্রয়োগ।

ইমিউন থ্রম্বোসাইটোপেনিয়া বা আইটিপি : এই রোগে শরীরে এমন কিছু অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, যা রক্তের প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকার বিরুদ্ধে কাজ করে। প্লাটিলেট এক প্রকারের রক্তকোষ, যার কাজ হলো রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করা। সেই প্লাটিলেটকে ধ্বংস করতে থাকে, তখন প্লাটিলেটের সংখ্যা কমে যায়। কমতে কমতে একেবারে বিপত্সীমার নিচে চলে আসে।এই প্লাটিলেট কমে গিয়ে যখন একেবারে ২০ হাজারের নিচে নেমে যায়, তখন রক্তক্ষরণের আশঙ্কা দেখা দেয়। সাধারণ সুস্থ, স্বাভাবিক মানুষের রক্তে প্লাটিলেট থাকে দেড় লাখ থেকে চার লাখ। আইটিপিতে তা এক লাখের নিচে নেমে আসে। কমতে কমতে ১০ এমনকি ৫ হাজারেও নেমে আসতে পারে।
আইটিপি হলে প্লাটিলেট কমে গিয়ে ত্বক ও মিউকাস ঝিল্লির নিচে ছোট ছোট রক্তক্ষরণ হয়। তখন ত্বকের নিচে লাল লাল দাগ হয়। একে বলে ‘পারপুরা’। এ ছাড়া দাঁতের মাড়ি থেকে রক্তক্ষরণ, কালো পায়খানা বা মলের সঙ্গে রক্ত, মাসিকের সঙ্গে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, নাক থেকে রক্ত পড়া, প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে রক্তক্ষরণ ইত্যাদি অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণও উপসর্গ হতে পারে। খুব অল্প কিছু ক্ষেত্রে দেহের অভ্যন্তরেও রক্তক্ষরণ হয়ে থাকে যেমন মস্তিষ্কে বা পেটের ভেতর রক্তপাত হতে পারে। তবে এটা বিরল। 
যে ধরনগুলো সবচেয়ে বেশি দেখা যায়:
যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস স্কুল অফ মেডিসিন বলছে অটোইমিউন ডিজিজের ২০০ এর বেশি ধরন রয়েছে।
এর মধ্যে যে ধরনের অটোইমিউন ডিজিজে সবচাইতে বেশি মানুষ আক্রান্ত হন তার একটি হল-

''রিউমাটয়েড আর্থারাইটিস'' এই রোগে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা এমন এক অ্যান্টিবডির সৃষ্টি করে যা অস্থিসংযোগের আবরণের সাথে যুক্ত থাকে। প্রতিরোধী কোষগুলো তখন অস্থিসংযোগে আঘাত করে এবং সেখানে ফোলাভাব, ব্যথা, প্রদাহ ও যন্ত্রনা শুরু হয়। সঠিক চিকিৎসা না হলে রিউমাটয়েড আর্থারাইটিসের কারণে সারা জীবনের জন্য অস্থিসংযোগ/গিঁট বিকৃত ও বিকলাঙ্গ হয়ে যেতে পারে। এতে হাতের গিঁট সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়।
প্রধান কয়েকটি উপসর্গের একটি হচ্ছে গিঁটে ব্যথা।
''সোরিয়াসিস/সোরিয়াটিক আর্থারাইটিস'' সোরিয়াসিসের ফলে ত্বকের কোষের অস্বাভাবিক রকম বৃদ্ধি ঘটে। অতিরিক্ত কোষগুলি জড়ো হয়ে লাল হয়ে ফুলে যায় এবং ত্বকের উপরিভাগে রূপালী–সাদা আঁশের মতো তৈরি হয়, শরীরের ত্বকে ফুসকুড়ি দেখা দেয়, চুলকানি হয়। চামড়ার বিভিন্ন অংশ মোটা ও খসখসে হয়ে যায়। সোরিয়াসিসে আক্রান্ত ৩০% মানুষ তাদের অস্থি–সংযোগে ব্যাথা, ফোলা ও আড়ষ্টতা অনুভব করে। এই রোগটির নাম সোরিয়াটিক আর্থারাইটিস।
চামড়ার বিভিন্ন অংশ মোটা ও খসখসে হয়ে যেতে পারে।
লুপাস/সিস্টেমিক লুপাস এরিথেমাটোসাস (SLE) : লুপাসের উপসর্গগুলি হল, তিন মাসের বেশি সময় ধরে একাধিক অস্থি সন্ধি ফুলে থাকা, দীর্ঘমেয়াদি জ্বর, খিঁচুনি, অস্বাভাবিক বুকে ব্যথা, যা দীর্ঘশ্বাস নিলে বাড়ে। এই রোগে অস্থিসংযোগ/গিঁট, ত্বক, কিডনি, মস্তিষ্ক, হৃদপিন্ড, ফুসফুস, রক্ত কণিকাসহ সবই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অস্থিসংযোগে যন্ত্রণা, ক্লান্তি ইত্যাদি এর খুব সাধারন উপসর্গ। এটি খুবই গুরুতর।
এছাড়াও হাতের তালুতে, নাকে কানে, গলায় ঘা, লালচে প্রস্রাব, আঙুলের গোড়ার রঙ বদলে যাওয়ার মতো উপসর্গও দেখা যায় কোনও কোনও রোগীর ক্ষেত্রে। একটি কথা বলা আবশ্যক, লুপাস ছোঁয়াচে নয়। লুপাস রোগীরা অচ্ছুত নন। যৌন সংসর্গে কোনও বাধা নেই লুপাসের ক্ষেত্রে। কাজেই প্রয়োজন শুধু চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।

''ভাস্কুলাইটিস'' এই রোগের সময় শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা রক্তজালিকাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই রোগে শরীরের যে কোনো অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, ফলে এর লক্ষ্মণও বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে। প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কমিয়ে দেয় এমন কর্টিকোস্টেরয়েড ব্যবহারের মাধ্যমে এই রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। এটি 
রক্ত সঞ্চালনকারী ধমনি ও শিরাকে প্রদাহের মাধ্যমে সরু করে তোলে। ধমনি ও শিরা যেহেতু হৃদযন্ত্র, কিডনিসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে রক্ত সঞ্চালন করে তাই রক্ত পৌঁছাতে না পারলে এসব অঙ্গে গুরুতর ক্ষতি হতে পারে। ভাস্কুলাইটিস মাথা, ঘাড়, সাইনাস, নাক ও কানের রক্ত সঞ্চালন করে এমন শিরাও আক্রমণ করে।

''গ্রেভস ডিজিজ'' এই রোগে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা এমন অ্যান্টিবডি উৎপাদন করে যা থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে থাইরয়েড হরমোনের অতিরিক্ত উৎপাদন (hyperthyroidism) ঘটায়। এর লক্ষ্মণগুলি হলঃ– শরীরের ওজনের অস্বাভাবিক হ্রাস, চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসা, চোখ লাল হয়ে যায়, ব্যথা করে, দৃষ্টিশক্তি ব্যহত করে, হৃদপিণ্ডের গতি দ্রুত হয়ে যাওয়া, দুর্বলতা ইত্যাদি।
গ্রেভস ডিজিজে অনেকের চোখ বের হয়ে আসছে বলে মনে হয়।
নারীদের মাসিক অনিয়মিত হতে পারে।
পুরুষদের যৌন ক্ষমতা আক্রান্ত হতে পারে।
উদ্বেগ ও ঘুমের সমস্যা হতে পারে।

যে কারণে শনাক্ত করতে সমস্যা হয়:
অটোইমিউন ডিজিজ প্রায়শই শনাক্ত করতে সমস্যা হয়, এমনকি পশ্চিমা বিশ্বে যেখানে স্বাস্থ্য সেবা অনেক উন্নত সেখানেও। নানা ধরনের অটোইমিউন ডিজিজের উপসর্গ একইরকম। এই রোগের উপসর্গগুলো অনেকসময় বেশ হঠাৎ করে প্রকাশ পায়।

ডা. শামীম আহমেদ বলছেন, "ধরুন হার্ট বা কিডনির সমস্যা হলে নির্দিষ্ট কিছু উপসর্গ থাকে। কিন্তু বেশিরভাগ সময় অটোইমিউন ডিজিজ শনাক্ত করতে সমস্যা হয়, কারণ দেখা যায় এর নির্দিষ্ট কোন উপসর্গ থাকে না। অন্য অনেক শারীরিক সমস্যার সাথে এর উপসর্গ মিলে যায়। "ক্লান্তি, চুল পড়ে যাওয়া, পেটের সমস্যাকে অনেক সময় গুরুত্ব দেয়া হয় না। দেখা যায় অসংখ্যবার চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরও আসল রোগটি শনাক্ত হয়নি বা দেরি হয়েছে।"

তিনি বলছেন, বিশেষ করে বাংলাদেশে আরও সমস্যা, কারণ এখানে রিউমাটোলজিস্টের (ডাক্তারের) সংখ্যা অনেক কম। বাংলাদেশে মোট রিউমাটোলজিস্ট রয়েছেন মাত্র ৫২ জন। তার ভাষায়, "কিছু ধরন আছে যা নির্দিষ্ট অঙ্গ আক্রান্ত করে এবং যে অঙ্গ ধরে ওটাতেই থাকে। কিন্তু যে অটোইমিউন ডিজিজ শরীরের পুরো সিস্টেমকে আক্রান্ত করে সেটা শনাক্ত করা আরও সমস্যা"।

"এটা শরীরের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আক্রান্ত করতে পারে। দেখা যাবে আজকে লিভার ধরেছে, কিছুদিন পর হয়ত শরীরে রক্ত কমে গেছে, কিছুদিন পর দেখা যাবে গিঁটে ব্যথা, মাস কয়েক পর হয়ত তার কিডনি বা হার্টে সমস্যা হয়েছে। এই ধরনটা খুবই বিপজ্জনক।"
শরীরে যে কোন ধরনের 'ইনফেকশন' হলে তা এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে।

নারীরাই কেন বেশি আক্রান্ত হন?
গবেষণা বলছে, পুরুষদের তুলনায় নারীরা অটোইমিউন ডিজিজে অনেক বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকেন। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল বলছে, অটোইমিউন ডিজিজে আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই নারী। যার সঠিক কারণ এখনো নির্ণয় করা যায়নি। তবে ধারণা করা হয় এর সাথে সম্পর্ক রয়েছে নারীদের 'এক্স ক্রোমোজোম' এবং সেক্স হরমোনের, বিশেষ করে এস্ট্রোজেন হরমোন।

নারীদের হরমোনে পরিবর্তনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো যেমন বয়ঃসন্ধিকাল, গর্ভাবস্থা ও মেনোপজ বা রজঃনিবৃত্তি এই সময়গুলোতে নারীরা অটোইমিউন ডিজিজে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকেন। তাছাড়া নারীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং হরমোনে পরিবর্তন পুরুষদের চাইতে বেশি হয়ে। এসব কারণে নারীরা বেশি আক্রান্ত হন বলে মনে করা হয়।

চিকিৎসা হবে কী ভাবে?

কোনো একটিমাত্র পরীক্ষার মাধ্যমে অটোইমিউন ডিজিজ ধরা পড়ে না। বিভিন্ন প্রকারের পরীক্ষা ও রোগলক্ষন দেখে এই রোগকে শনাক্ত করা হয়।অটোইমিউন ডিজিজের রোগলক্ষন দেখা দিলেই ডাক্তাররা প্রথমেই সাধারণত Antinuclear antibody test (ANA) করে থাকেন। টেস্টের রিপোর্ট পজিটিভ আসলে বুঝতে হবে রোগী সম্ভবত অটোইমিউন ডিজিজে আক্রান্ত। তবে নির্দিষ্টভাবে শরীরের কোন অঙ্গ আক্রান্ত তা বোঝার জন্য আরও নানারকম পরীক্ষার প্রয়োজন হয়।

অটোইমিউন ডিজিজের চিকিৎসা দেন রিউমাটোলজি বিশেষজ্ঞ। মেডিসিন বিশেষজ্ঞরাও শনাক্তে সহায়তা করতে পারেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ইমিউনিটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে রোগীদের স্টেরয়েড দেওয়া হয়। কারণ স্টেরয়েড হল ইমিউনোসাপ্রেস্যান্ট। স্টেরয়েডের ডোজ়ও দু’ভাগে ভাগ করা হয়, লো-ডোজ় (১০ মিলিগ্রাম বা তার কম) ও হাই ডোজ় (৪০-৬০ মিলিগ্রাম) অথবা ইন্ট্রাভেনাস ডোজ় (১ গ্রাম) পর্যন্ত দেওয়া হয়। গাঁটে-গাঁটে ব্যথা কমাতে, শরীরের ক্লান্তি কমাতে, অটোইমিউন রেসপন্স কমাতে স্টেরয়েড ভাল কাজ দেয়। তবে স্টেরয়েড বাদ দিয়েও এ রোগের চিকিৎসা কিছু ক্ষেত্রে সম্ভব। ডা. অভ্রজিৎ রায়ের কথায়, ‘‘বেশি স্টেরয়েড না দিয়ে অ্যাজ়াথিয়োপ্রাইন, সাইক্লোস্পোরিন, হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন এই ধরনের ওষুধ দেওয়া হয় রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ও লুপাসে আক্রান্ত রোগীদের। আবার অনেক সময়ে কেমোথেরাপির প্রয়োজন পড়ে। অনেক রোগীর হাতের আঙুলে গ্যাংগ্রিন হয়ে যায়। তখন কেমোথেরাপি যেমন সাইক্লোফসফামাইডও ব্যবহার করা হয়।’’

কম ডোজ়ের স্টেরয়েড দিয়ে চিকিৎসা শুরু করে, দরকার মতো ডোজ় বাড়িয়ে আবার কমানো হয়। তবে প্রাণসংশয় দেখা দিলে হাই ডোজ়ের স্টেরয়েড দেওয়া হয়। নেফ্রাইটিস বা ব্রেন অ্যাটাকের মতো মেজর অর্গ্যান আক্রান্ত হলে হাই ডোজ় দেওয়ার কথা ভাবা হয়। পরে সেই ডোজ় ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা হয়।

দীর্ঘ দিন স্টেরয়েড কি নিরাপদ?

ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অস্টিয়োপোরোসিস ইত্যাদি অসুখ বাড়তে পারে। মনে রাখবেন, প্রত্যেকের শরীরেই কিন্তু ২৫ মিলিগ্রাম কর্টিজ়ল তৈরি হয় অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে। তাই স্টেরয়েড কিন্তু আমাদের শরীরেরই অংশ। স্টেরয়েড নেওয়ার কথা ভেবে আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই। তবে জেনারেল মেডিসিনের ডাক্তার সুবীরকুমার মণ্ডল বললেন, ‘‘এই রোগ নিয়ন্ত্রণে স্টেরয়েডের কার্যকারিতা রয়েছে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে সাবধানতা জরুরি। যেহেতু এটি ইমিউনোসাপ্রেস্যান্ট, তাই বেশি এক্সপোজ়ড হলে ইনফেকশনের আশঙ্কা বেড়ে যায়। ইউটিআই থেকে শুরু করে সব ধরনের ইনফেকশনের ভয় থাকে। তাই বাড়তি সতর্কতা জরুরি। স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে।’’

অটোইমিউন ডিজ়িজ় কি কমে?

নিয়ম মেনে চললে এই অসুখও নিয়ন্ত্রণে রেখে সুস্থ জীবনযাপন সম্ভব বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা। ডা. অভ্রজিৎ রায় বললেন, ‘‘অটোইমিউন ডিজ়িজ়ের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন অসুখ হল ভাসকুলাইটিস বা স্মল ব্লাড ভেসেল ডিজ়অর্ডার। যেহেতু শরীরের প্রত্যেক জায়গায় শিরা ও ধমনী রয়েছে, তাই এ রোগ ছড়ায় তাড়াতাড়ি। এই অসুখে মর্টালিটি রেটও হাই, প্রায় ১৫ শতাংশ। কিন্তু এ রোগেও এখন সারভাইভাল রেট বেড়েছে। ১৯৬০ সালে রোগনির্ণয়ের চার বছরের মধ্যে ৫০ শতাংশ রোগী মারা যেতেন। ২০১৮ সালে সেই সারভাইভাল রেট ৮৫ শতাংশ। এখন আরও বেড়েছে। এমন রোগীও আছেন, যাঁদের সন্তান হয়েছে ও সংসারজীবনও করছেন। উদাহরণস্বরূপ, লন্ডনের প্রফেসর ডেভিড আইসেনবার্গের পর্যবেক্ষণের উল্লেখ করতে হয়। তাঁর কাছে চিকিৎসাধীন লুপাস রোগীদের পর্যবেক্ষণ করে দেখা গিয়েছে যে, চিকিৎসা চলাকালীন অনেকেই একটা ভাল ফেজ় পায়, যখন এঁরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন। তখন খুব একটা ওষুধেরও দরকার পড়ে না। এমনকি এএনএ নেগেটিভ হয়ে যায় সে সময়ে।’’ বছর তিনেক পর্যন্ত এ রকম ভাল ফেজ় পেয়েছেন, এমন রোগীর উদাহরণও আছে। পরে মানসিক উদ্বেগ বা ভাইরাল ইনফেকশনের জন্য রোগ ফিরে আসতে পারে। কিন্তু চিকিৎসা চালু রাখলে রোগ নিয়ন্ত্রণে থাকে। তার সাথে জীবনশৈলীতে পরিবর্তনে—ব্যায়াম, যোগ ব্যায়াম, ওয়াটার অ্যারোবিকস, সাঁতার, হাঁটা, ধূমপান বর্জন ইত্যাদির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

প্রতিরোধের কোন ব্যবস্থা নেই?

এই রোগ একবার হলে কখনোই পুরোপুরি নিরাময় করা যায় না। ডা. শামীম আহমেদ বলছেন, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যকর জীবন যাপনের মাধ্যমে রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। সুস্থ জীবনাচরণ মেনে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি। সুষম খাবার বিশেষ করে আমিষ জাতীয় খাবার কিছুটা বেশি খেতে হবে, নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কোন ধরনের উপসর্গ হলেই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।

"কিন্তু দুঃখজনক হল এটা আগে থেকে প্রতিরোধের কোন ব্যবস্থা এখনো পর্যন্ত বিশ্বে আবিষ্কৃত হয়নি। রোগটা হয়ে গেলে আমরা চিকিৎসা দিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবো। কিন্তু আমার বংশে আছে, আমার যাতে রোগটা না হয় সেই ব্যবস্থা আমি করতে পারবো কি না, হলে চিকিৎসায় সেরে যাবে কি না, এই প্রশ্ন যদি করেন এর উত্তরটা হবে, না।"

অটোইমিউন ডিজ়িজ় হওয়া মানেই জীবন শেষ নয়। চিকিৎসকের কথা মেনে চললে রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। প্রয়োজন মনোবল ও ধৈর্য। এ রোগে সবচেয়ে বেশি দরকার ধৈর্য। এই অসুখ হলে সারা জীবন চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তবে চিকিৎসাবিদ্যা এখন এতটাই এগিয়েছে যে, অটোইমিউন ডিজ়িজ়ও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। চিকিৎসকদের মতে, হাল না ছেড়ে রোগের মোকাবিলা করার মনোবল রাখতে হবে।

তথ্যসূত্র:

  • ডা.শামীম আহমেদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রিউমাটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, বিবিসি বাংলা।
  • মেডিসিনের ডা. অরুণাংশু তালুকদার ও
  • রিউমাটোলজিস্ট ডা. অভ্রজিৎ রায়, এবং 
  • জেনারেল মেডিসিনের ডাক্তার সুবীরকুমার মণ্ডল, আনন্দবাজার।
  • ডা. শুভাগত চৌধুরী, প্রথম আলো।
  • ডা. গুলজার হোসেন, রক্তরোগ ও রক্ত ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, কালের কণ্ঠ।
  • উইকিপিডিয়া।
  • একুশে টিভি।
  • দৈনিক ইনকিলাব।
  • Ellen Goldmuntz, M.D., Ph.D., Medical Officer, Division of Allergy, Immunology, and Transplantation, National Institute of Allergy and Infectious Diseases, National Institutes of Health Bethesda, MD এবং 
  • Audrey S. Penn, M.D., National Institute of Neurological Disorders and Stroke, National Institutes of Health, Rockville, MD, womenshealth.gov USA
  • healthinside.in
  • somoynews.tv
  • Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই

Popular Post

Blogger দ্বারা পরিচালিত.