গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কি? কোন খাবারের গ্লাইসেমিক ইন্ডেক্স কত?
ওষুধমুক্ত জীবনের জন্য গ্লাইসেমিক সূচক জানা জরুরি:
গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (Glysemic index) কি?
গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (Glysemic index) বা (GI) হচ্ছে কার্বোহাইড্রেট যুক্ত খাবার খাওয়ার পর রক্তে চিনি বা শর্করা বা গ্লুকোজের মাত্রা কি পরিমান বাড়তে পারে তার একটি সংখ্যার পরিমাপ। কিছু কিছু খাদ্য আছে যা রক্তে শর্করার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় কিছু খাদ্য আছে তেমন প্রভাব পড়ে না। এটি মূলত সংখ্যা দ্বারা প্রকাশিত বা তুলনা বা পরিমাপ করা হয়। এমনও কিছু খাদ্য আছে যাদের কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ সমান কিন্তু তাদের প্রভাব ভিন্ন ভিন্ন, তাই গ্লাইসেমিক ইনডেক্স ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। যেসব খাদ্যের জিআই (GI) এর মান যত কম সেসব খাদ্যের রক্তে গ্লুকোজ বানানোর ক্ষমতা ততোই কম। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের উচিত জিআই এর মান দেখে খাদ্যের প্ল্যান করা। যাদের (ডায়াবেটিস রোগীদের) শরীরের রক্তে চিনির মাত্রা বেশি থাকে মানে যাদের শরীরে Blood Sugar এর মাত্রা বেশি, তাদের কার্বোহাইড্রেট কম খেতে বলা হয় । কিন্তু কার্বোহাইড্রট তো খেতেই হবে । ।
তাহলে কোন কার্বোহাইড্রট কেন খাবো?
প্রতেক দিনের ক্যালরির প্রায় ৪৫ থেকে ৬৫ ভাগ আসা উচিত কার্বোহাইড্রেট থেকে । কার্বোহাইড্রেট থেকে আমরা এনার্জি বা ক্যালোরি পাই যা আমাদের কোষের শক্তি, দৈহিক তেজ, কর্মক্ষমতা,তাপ উত্পাদন ও চর্বি গঠন বাড়াতে সাহায্য করে । এই জাতীয় খাবারই আমাদের দেহ গঠন এবং দেহ সংরক্ষণের প্রধান উপাদান । প্রতি ১ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট আমাদের ৪.১ ক্যালোরি দেয় । যখন আমরা কার্বোহাইড্রেট যুক্ত খাবার খাই ,আমাদের শরীর কার্বোহাইড্রেট থেকে চিনি ও শ্বেতসার ভেঙ্গে শর্করা বা Glucose তৈরী করে যেটা রক্তের সাথে মিশে যায় আর তন্তু শরীর থেকে বাইরে বেড়িয়ে যায় হজম না হয়ে ।
বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা গেছে, যেসব কার্বোহাইড্রেটের মধ্যে গ্লায়সেমিক ইনডেক্স বা Glycemic Index বেশি থাকে, সেইসব কার্বোহাইড্রেট রক্তে তাড়াতাড়ি মিশে গিয়ে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয় মানে তাড়াতাড়ি শরীরে Blood Sugar এর মাত্রা বেড়ে যায়। আর যেসব কার্বোহাইড্রেটের মধ্যে গ্লায়সেমিক ইনডেক্স বা Glycemic Index কম বা মাঝারি থাকে তারা রক্তে তাড়াতাড়ি মিশে গিয়ে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়াতে পারে না। তাই যাদের শরীরে Blood Sugar সাধারনের থেকে বেশি থাকে তাদের যেসব কার্বোহাইড্রেটের মধ্যে গ্লায়সেমিক ইনডেক্স বা Glycemic Index বেশি থাকে, তা কম খাওয়া ভাল। আর একটা কাজও করা যেতে পারে – গ্লায়সেমিক ইনডেক্স বেশি কার্বোহাইড্রেট আর গ্লায়সেমিক ইনডেক্স কম কার্বোহাইড্রেট একসাথে মিশিয়ে খেলে তাতে গ্লায়সেমিক লোড কম হবে ।কিন্তু কারও শরীরে যদি হঠাৎ করে Blood Sugar কমে যায়, তাহলে তাড়াতাড়ি High Glycemic Index যুক্ত খাবার খাওয়ানোই ভাল।
![]() |
| যে খাবারের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স যত বেশি, তা শরীরের জন্য তত খারাপ। |
ডায়াবেটিস রোগে যাঁরা ভুগছেন এবং যাঁদের রক্তে চিনির মাত্রা বেশি থাকে, তাঁদের কার্বোহাইড্রেট কম খেতে বলা হয়। কিন্তু কার্বোহাইড্রেট আমাদের প্রধান খাদ্য উপাদান, তাই কার্বোহাইড্রেট খেতেই হবে। আর কার্বোহাইড্রেট সুগারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, কোলাজেনের কারণে রক্তের চিনি কোষে পৌঁছায় না। যখন আমরা কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার খাই, আমাদের শরীর কার্বোহাইড্রেট থেকে চিনি ও শ্বেতসার ভেঙে শর্করা বা গ্লুকোজ তৈরি করে, যা রক্তের সঙ্গে মিশে যায়।
আমরা প্রতিদিন যে খাবার খাই, তা ইনডেক্স মেনে খেলে ডায়াবেটিস রোগীদেরও সুগার লেভেল বাড়বে না। শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট–জাতীয় খাবার খেলেও সেটা হবে না। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এই ইনডেক্স মেনে চলতে পারলে ওষুধমুক্ত থাকা সম্ভব বলে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের অভিমত।
ডায়াবেটিসকে বলা হয় লাইফস্টাইল ডিজিজ। লাইফস্টাইল পরিবর্তন করে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা যায় বলে বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়ে থাকেন। বিশেষ করে টাইপ টু ডায়াবেটিসে খাদ্য ও লাইফস্টাইল পরিবর্তন করে ওষুধমুক্ত জীবন যাপন করা সম্ভব। এই লাইফস্টাইল পরিবর্তন করতে যে জ্ঞান জরুরি, তা হচ্ছে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স সম্পর্কে জানা। আমরা যে খাবার গ্রহণ করি, তার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বলে একটি সূচক আছে; যার ইনডেক্স যত বেশি থাকে, তা ততই শরীরের জন্য খারাপ।
আমরা প্রতিদিন যে খাবার খাই, তা ইনডেক্স মেনে খেলে ডায়াবেটিস রোগীদেরও সুগার লেভেল বাড়বে না। শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট–জাতীয় খাবার খেলেও সেটা হবে না। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এই ইনডেক্স মেনে চলতে পারলে ওষুধমুক্ত থাকা সম্ভব বলে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের অভিমত।
![]() |
| প্রতিদিনের ক্যালরির প্রায় ৪৫–৬৫ ভাগ আসা উচিত কার্বোহাইড্রেট থেকে। |
গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের প্রকারভেদ:
সাধারণভাবে, কোনো খাবার যত বেশি প্রক্রিয়াজাত হয়, তত বেশি তার জিআই হয় এবং কোনো খাবারে ফাইবার বা ফ্যাট বেশি থাকলে জিআই কম হয়।
গ্লাইসেমিক ইনডেক্স তিন প্রকারের হয়—নিম্ন, সহনীয় ও উচ্চ। গ্লাইসেমিক ইনডেক্স, এটি আপনার রক্তে শর্করার উত্থানকে কতটা তাৎপর্যপূর্ণ করে, তার ওপর ভিত্তি করে একটি খাদ্যকে একটি সংখ্যা বা স্কোর দেয়। খাঁটি গ্লুকোজকে (চিনি) ১০০-এর মান দেওয়া হয়, এমন খাবারগুলো শূন্য থেকে ১০০ স্কেলে র্যাঙ্ক করা হয়। কোনো খাবারের গ্লাইসেমিক সূচক যত কম হয়, সেই খাবার খেয়ে ধীরে ধীরে রক্তে শর্করার উত্থান ঘটে। সাধারণভাবে, কোনো খাবার যত বেশি প্রক্রিয়াজাত হয়, তত বেশি তার জিআই হয় এবং কোনো খাবারে ফাইবার বা ফ্যাট বেশি থাকলে জিআই কম হয়।
এবার জানতে হবে কোন কার্বোহাইড্রেটের মধ্যে গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের মাত্রা কতটা আছে। নিচে অনেকগুলো কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবারের মধ্যে গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের মাত্রা কত তা দেওয়া হলো।
জিআই/গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের মাত্রা ধরা হয় নিম্ন ৫৫-এর নিচে, সহনীয় ৫৬ থেকে ৬৯, উচ্চ ৭০ থেকে ওপরে:
সাদা ময়দার রুটি ৭৫-৭৭
লাল গমের আটার রুটি ৫৩-৫৫
ময়দার পরোটা ৭৭-৮০
ঘরে বানানো লাল আটার চাপাতি ৫২-৫৬
সাদা চালের ভাত ৭৩-৭৭
লাল চালের ভাত ৬৮-৬৯
বার্লিতে মাত্র ২৮ (যা খুবই নিরাপদ)
মিষ্টি ভুট্টা ৫২-৫৭
চালের নুডলস ৫৩-৬০
কর্নফ্লেক্স ৮১-৮৭
বিস্কুট ৬৯-৭১
ওটস ৫৫-৫৭
ইনস্ট্যান্ট ওটস ৭৯-৮২
ফল-
আপেল ৩৬-৩৮
কমলা ৪৩-৪৬
কলা ৫১-৫৪
আনারস ৫৯-৬৭
আম ৫৬-৫৯
তরমুজ ৭৬-৮০
খেজুর ৪২-৪৬
![]() |
| তবে ফলের জুস করলে ইনডেক্স বেড়ে যায়। |
সবজি-
আলু ৮৭-৯১
গাজর ৩৯-৪৩
মিষ্টি আলু ৬৩-৬৯
মিষ্টিকুমড়া ৬৪-৭১
কাঁচকলা ৫৫-৬১
মিক্সড ভেজিটেবল সুপ ৪৮-৫৩ (টেস্টিং সল্ট ছাড়া)
দুগ্ধজাত খাদ্য-
পূর্ণ ননীযুক্ত দুধ ৩৯-৪২
ননীমুক্ত দুধ ৩৭-৪১
আইসক্রিম ৫১/৫৪
দই ৪১/৪৩
সয়ামিল্ক ৩৪/৩৮
অন্যান্য-
ডার্ক চকলেট ৪০-৪৩
পপকর্ন ৬৫-৭০
পটেটো চিপস ৫৬-৫৯
রাইস ক্র্যাকার্স ৮৭/৮৯
সফট ড্রিংকস ৫৯-৬২
সাধারণ চিনি ১০৩-১০৬
মধু ৬১-৬৪
এই তালিকা ধরে খাওয়ার ক্ষেত্রে ইনডেক্স মেনে চলা যায় তাহলে ডায়াবেটিস রোগীদের সুগার লেভেল আস্তে আস্তে কমতে থাকবে এবং হয়তো একসময় ইনসুলিনের প্রয়োজন না–ও হতে পারে। তাই কম ইনডেক্সের খাবার গ্রহণের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া উচিত।
তথ্যসূত্র:
- খাদ্য, পথ্য ও আকুপ্রেসার বিশেষজ্ঞ, প্রথম আলো।
- ফার্ম বাংলা।
- Edited: Natural_Healing.



কোন মন্তব্য নেই