মাস্ক কি? এটি কিভাবে ব্যবহার করবেন?
করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রাথমিকভাবে শ্বাস-জলীয়কণার মাধ্যমে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে ছড়ায়। এ ভাইরাস চোখ, নাক বা মুখের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে। কাজেই করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধ কিছুটা আমাদের হাতেই রয়েছে।
এক্ষেত্রে ব্যক্তিগত দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে পারি, অন্যকেও নিরাপদ রাখতে পারি। জনস্বাস্থ্যবিধিগুলো খুব সহজ, আপনি যখনই বাড়ির বাইরে কোনো জায়গায় যাবেন, তখনই মাস্ক ব্যবহার করুন; ঘনঘন সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোন অথবা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন (কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড)। বাড়ির বাইরে সবার কাছ থেকে কমপক্ষে ৬ ফুট শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করুন।
সমস্যা হচ্ছে, এ ভাইরাস প্রতিরোধে জনসচেতনতার অভাব রয়েছে। ‘ল্যানসেটে’ মেডিকেল গবেষণা নিবন্ধে প্রকাশিত বিশ্লেষণসহ আরও অনেক গবেষণায় প্রতীয়মান, অন্যান্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার সঙ্গে মাস্কের ব্যবহার করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে সহায়তা করে। তাই জনসমাগম স্থলে প্রত্যেককে মাস্ক ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, মার্কিন সিডিসি)।
মুখে মাস্ক কেন পরতে হবে?
কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান উপায় হলো শ্বাসনালী থেকে বেরিয়ে আসা ক্ষুদ্র জলকণা (ড্রপলেট), যা মানুষ কথা বলা, গান গাওয়া, কাশি বা হাঁচি দেওয়ার সময় বেরিয়ে আসে। যদিও গবেষণা চলমান রয়েছে, তবে আমরা এখন জানি যে, ভাইরাস এমন মানুষের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে যাদের মধ্যে আক্রান্ত হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। এর অর্থ হচ্ছে, কিছু মানুষ সংক্রমিত হতে পারে, এমনকি কোনো ধরনের উপলব্ধি ছাড়াই।
এটি কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব বেশি – এমন স্থানগুলোতে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার অন্যতম কারণ। তবে জনাকীর্ণ স্থানগুলোতে অন্যদের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখা সবসময় সম্ভব নয়, যে কারণে এই ধরনের পরিস্থিতিতে সবাইকে সুরক্ষিত থাকার জন্য কাপড়ের তৈরি মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়।
তবে মনে রাখবেন, কেবল একটি মাস্ক কোভিড-১৯ এর বিস্তারকে আটকাবে না – আমাদের সবাইকেই শারীরিক দূরত্ব মেনে চলা এবং ঘন ঘন হাত ধোয়ার চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। একসঙ্গে এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা কোভিড-১৯ কে পরাহত করতে পারি।
আমরা কি ধরনের মাস্ক ব্যবহার করব? এবং কেন?
এন-৯৫ (কেএন-৯৫/এফএফআর-২) এগুলোকে মেডিকেল মাস্ক বলা হয়। মেডিকেল মাস্কের নমনীয় বেনডেবল প্রান্তটি উপরের দিকে, মাস্কের রঙিন দিকটি (হাইড্রোফোবিক পলিমার) সাধারণত সামনে থাকে এবং ভেতরে নরম শোষণকারী স্তর থাকে। এই তিন স্তরের মেডিকেল মাস্ক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কেমব্রিজ বিশ্বিবদ্যালয় হাসপাতালের এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের গবেষণার বরাত দিয়ে বিবিসি এক প্রতিবেদনে এ কথা জানিয়েছে যে,গবেষণায় বলা হয়েছে, এফএফপি-থ্রি নামে পরিচিত উন্নতমানের মাস্ক পরলে, তা ভাইরাস সংক্রমণ থেকে শতভাগ সুরক্ষা দিতে পারে। অপরদিকে হাসপাতালের কর্মীদের ব্যবহৃত সার্জিক্যাল মাস্কে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে।
আর জনগণের জন্য সার্জিক্যাল মাস্ক বা সাধারণ কাপড়ের মাস্ক পরিধান তাদের ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সহায়ক হবে। সার্জিক্যাল মাস্ক ব্যবহারের কিছু নিয়ম আছে, সার্জিক্যাল মাস্ক একবার ব্যবহার করে ফেলে দিতে হবে। সার্জিক্যাল মাস্কের দুই ধরনের অংশ আছে সাদা এবং রঙিন। সার্জিক্যাল মাস্কের ফিল্টার অর্থাৎ যে অংশ বাতাস পরিশোধন করে সে অংশ হলো সাদা অংশ।
হাসপাতাল কর্মীদের জন্য শুধুই সার্জিক্যাল মাস্ক পরা বিপদজনক।
যদি আপনি নিজে ভাইরাস কিংবা সর্দি-কাশি জ্বরে আক্রান্ত হন তাহলে রঙিন অংশ বাহিরে রাখুন, এতে আপনার শ্বাস-প্রশ্বাস ভেতর থেকে ফিল্টারিং হয়ে বাইরে বের হবে। আর যদি আপনি নিজে সুস্থ হন তাহলে সাদা অংশ বাইরে রাখুন, এতে বাইরের দূষিত বাতাস ফিল্টারিং হয়ে ভিতরে ঢুকবে। এভাবে সংক্রমণ এড়ানো সম্ভব হবে। তাই মনে রাখবেন, সুস্থ থাকলে সাদা অংশ বাইরে থাকবে আর অসুস্থ থাকলে রঙিন অংশ বাইরে থাকবে।
মেডিকেল মাস্ক: মহামারিজনিত কারণে বিশ্বব্যাপী মেডিকেল মাস্কের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। যদি আপনি ডাক্তার, নার্স, অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার, এরকম স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী কেউ হয়ে থাকেন তাহলে আপনাকে মেডিকেল মাক্স পড়তে হবে। যদি আপনি বা পরিবারের কোনো সদস্য কোভিড-১৯ এর কারণে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন (৬০ বছরের বেশি বয়সী বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যায় আক্রান্ত) কিংবা আপনি যদি কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত কারো পরিচর্যায় নিয়োজিত থাকেন, তবে সেক্ষেত্র মেডিকেল মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। আপনার যদি কোভিড-১৯ এর উপসর্গ থাকে তবে অন্যদের সুরক্ষার জন্য মেডিকেল মাস্ক পরা উচিত।
নন-মেডিকেল মাস্ক (কাপড়ের মাস্ক): আপনি এবং আপনার পরিবার যদি এমন কোনো জায়গায় বাস করেন যেখানে কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব বেশি এবং যদি কোভিড-১৯ এর কোনো উপসর্গ না থাকে, সেক্ষেত্রে নন-মেডিকেল মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়।
কোন ধরনের কাপড়ের মাস্ক সবচেয়ে ভালো? কাপড়ের মাস্ক বিভিন্ন ধরনের উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হয় এবং এগুলো চাইলে আপনি ঘরে বানাতে পারেন বা দোকান থেকে কিনতে পারেন। যদিও কাপড়ের মাস্কের ব্যবহার নিয়ে গবেষণা চলমান রয়েছে, তবে এগুলোর কার্যকারিতা নির্ভর করে এতে ব্যবহৃত কাপড়ের ধরন এবং কয় স্তরের কাপড় ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তিন স্তরের মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দেয় যেখানে:
- ভেতরের স্তরটি তৈরি হবে সুতি কাপড়ের মতো শোষণকারী উপকরণ দিয়ে।
- মাঝের স্তরে থাকবে পলিপ্রোপাইলিনের মতো বোনা নয় এমন উপকরণ।
- বাইরের স্তরটি তৈরি হবে পলিয়েস্টার বা পলিয়েস্টার মিশ্রণের মতো শোষণকারী নয় এমন উপকরণ দিয়ে।
আপনি মুখ ঢেকে রাখার জন্য যে ধরনের মাস্কই বেছে নেন না কেন, এটা এমন হতে হবে যাতে নাক, মুখ ও চিুবক ঢেকে রাখা যায় এবং রাবারের বন্ধনী বা গিট দিয়ে সুরক্ষিত থাকে।
মাস্ক এর ব্যবহার:
প্রত্যেকের জন্য মাস্ক তখনই প্রতিরোধমূলক হবে, যখন সবাই তা সঠিকভাবে ব্যবহার করবে এবং অন্যকে সঠিকভাবে ব্যবহারে উৎসাহিত করবে। মনে রাখতে হবে, মাস্ক পরার আগে সাবান পানি দিয়ে সঠিকভাবে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হবে। মাস্কটি সঠিকভাবে অপসারণের পর আবারও হাত ধুয়ে ফেলতে হবে।
মাস্ক পরার আগে ভালো করে দেখে নিন সেটা ক্ষতিগ্রস্ত বা নোংরা কি না। মাস্কটি মুখের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরতে হবে। মুখ, নাক ও চিবুক ঢেকে রাখতে হবে। পরার পর মাস্কটি সংক্রমিত বা দূষিত হাত দিয়ে স্পর্শ করবেন না। যদি স্পর্শ করতেই হয় তবে হাত পরিষ্কার করার পর স্পর্শ করবেন। মাস্কটি খোলার সময় কানের পেছনের স্ট্র্যাপ দিয়ে সরিয়ে ফেলুন। ব্যবহৃত কাপড়ের মাস্কটি ২০ মিনিট গরম সাবান-পানিতে ভিজিয়ে রাখার পর (অথবা ওয়াশিং মেশিনে) ধুয়ে ফেলুন। পরবর্তী সময়ে পরিষ্কার, শুকনো মাস্কটি পুনরায় ব্যবহার করুন। মাস্ক কখনোই নাকের নিচে বা চিবুকের নিচে পরা যাবে না।
নোংরা, স্যাঁতসেঁতে বা ভেজা মাস্ক পরা যাবে না। স্যাঁতসেঁতে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাস্কটি বদলে ফেলুন। প্রতি ৪-৬ ঘণ্টা পর পরিবর্তন করতে পারলে ভালো। দুই বছরের কম বয়সের শিশু এবং যাদের মাস্ক পরলে শ্বাসকার্যের সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, তাদের মাস্কমুক্ত থাকতে হবে। ইউনিসেফ বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী পাঁচ বছরের নিচে অথবা যেসব শিশুরা নিজে মাস্ক পড়তে এবং খুলতে পারে না এবং অন্য কোনো রোগের কারণে বয়স্কদের যদি মাস্ক পড়লে শ্বাস-প্রশ্বাসের অসুবিধা হয়, তাহলে তাদের মাস্ক না পড়াই ভালো। যদি তাদের মাস্ক পড়াতেই হয়, তাহলে মাস্কের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য তাদেরকে আপনার বা অন্য কোনো সেবাদানকারীর চোখের সামনে রেখে সরাসরি তত্ত্বাবধান করতে হবে।
শিশু এবং বয়স্কদের খেলাধুলা বা শারীরিক কার্যকলাপের সময় মাস্ক পরা উচিত নয়, যাতে এটি তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসে কোনো ধরনের সমস্যা তৈরি করতে না পারে। ঘাম মাস্ককে ভিজিয়ে ফেলতে পারে, যা নিঃশ্বাস নিতে অসুবিধা তৈরি করবে এবং জীবাণুর বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
মাস্ক পরার সময় লক্ষ্য রাখবেন,
- সব সময় সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়ার পর মাস্ক পরা শুরু করুন।
- মাস্কটি পরিষ্কার আছে কিনা তা নিশ্চিত করুন।
- এতে ছিদ্র বা গর্ত আছে কিনা তা পরীক্ষা করুন।
- মাস্কটি ময়লা বা নষ্ট হলে এটি পরবেন না।
- মাস্কটি এমনভাবে পরুন যাতে মুখ, নাক এবং চিবুক ভালোভাবে ঢেকে থাকে এবং পাশে কোনো ফাঁক না থাকে।
- মাস্ক পরা অবস্থায় স্বাচ্ছন্দ্যে নিঃশ্বাস নেওয়া যাচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত হোন।
মাস্ক পরিহিত অবস্থায় লক্ষ্য রাখবেন,
- মাস্কটি ময়লা হলে বা ভিজে গেলে তা বদলে ফেলুন।
- মাস্কটিকে টেনে নাক বা চিবুকের নিচে নামাবেন না বা এটি আপনার মাথায় পরবেন না। কার্যকারিতার জন্য মাস্কটি দিয়ে মুখ ও নাক পুরোপুরি ঢেকে রাখা উচিত।
- পরিহিত অবস্থায় মাস্কটি স্পর্শ করবেন না।
মাস্ক খোলার সময় লক্ষ্য রাখবেন,
- মাস্কটি খোলার আগে দুই হাত ধুয়ে নিন।
- ইলাস্টিক বন্ধনী বা গিটগুলো ধরে মাস্কটি খুলুন।
- মাস্কের সামনে অংশে স্পর্শ করা এড়িয়ে চলুন।
- মাস্ক খোলার পর আপনার দুই হাত ধুয়ে নিন।
- কাপড়ের মাস্ক প্রতিবার ব্যবহারের পরে ধুয়ে ফেলা এবং একটি পরিষ্কার ব্যাগে সংরক্ষণ করা উচিত।
- মেডিকেল মাস্কগুলো একবার ব্যবহার উপযোগী এবং ব্যবহারের পর এগুলো ঢাকনাযুক্ত ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দেয়া উচিত।
6 টি সাধারণ ভুল পরিহার করুন:
বাম থেকে ডানে:মাস্ক ব্যবহারের ভুল পদ্ধতি।
- টেনে নাকের নিচে নামাবেন না।
- থুতনি উন্মুক্ত রাখবেন না।
- টেনে থুতনির নিচে নামাবেন না।
- মাস্ক পরার সময় এটি স্পর্শ করবেন না।
- ঢিলাঢালা মাস্ক পরবেন না।
- ময়লা, নষ্ট বা ভেজা মাস্ক পরবেন না।
মাস্কটি সঠিকভাবে পরিধান আপনার সংক্রমিত হওয়া বা অপরকে সংক্রমিত করার ঝুঁকি হ্রাস করে। সঠিকভাবে মাস্ক পরিধান লক্ষণহীন, প্রাক-লক্ষণযুক্ত এবং লক্ষণযুক্ত রোগী থেকে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিও হ্রাস করে, যদি অন্যান্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়। আপনি এবং আপনার পরিবার যদি মাস্ক খুলে রাখার এবং দিনের বেলায় এগুলো পুনরায় ব্যবহার করার পরিকল্পনা করেন, তবে এগুলো সংরক্ষণের জন্য মুখবন্ধ করা যায় এমন পরিষ্কার ব্যাগ ব্যবহার করুন। আপনার পরিবারের প্রতিটি মাস্কের জন্য আলাদা ব্যাগ ব্যবহার করুন। মাস্কটি ব্যাগে রাখার সময় বা ব্যাগ থেকে বের করার সময় সম্ভাব্য দূষণ এড়াতে ইলাস্টিক বন্ধনী বা গিটগুলোতে ধরুন (মাস্কের পৃষ্ঠ স্পর্শ না করে)। এটি পরিধানের আগে আপনার হাত ধোয়ার কথা মনে রাখবেন।
তথ্যসূত্র:
- ডা. এম সেলিম উজ্জামান : প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ইমারজিং-রিইমারজিং ডিজিজেস, আইইডিসিআর, যুগান্তর।
- ইউনিসেফ।
- বিবিসি বাংলা।
- সময় টিভি।
- Edited: Natural_Healing.





কোন মন্তব্য নেই