ডায়াবেটিকস কী? কেন হয়?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ডায়াবেটিস এখন একটি মহামারি রোগ।
ডায়াবেটিস শব্দটি আমাদের সবার কাছেই বেশ পরিচিত। এমন কোনো পরিবার খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে কোনো ডায়াবেটিসের রোগী নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ডায়াবেটিস এখন একটি মহামারি রোগ। এই রোগের অত্যধিক বিস্তারের কারণেই সম্প্রতি এমন ঘোষণা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
প্রশ্ন আসতেই পারে, ডায়াবেটিস কী?
ডায়াবেটিস একটি বিপাকজনিত রোগ। মানবদেহে যখন ইনসুলিন নামের হরমোনের ঘাটতি হয় অথবা ইনসুলিন কার্যকরভাবে শরীরে ব্যবহৃত হয় না কিংবা নিষ্ক্রিয় থাকে, তখন রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়। সেই গ্লুকোজ পরবর্তী সময়ে প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে যায়। এ অবস্থার নামই হলো ডায়াবেটিস, যাকে বাংলায় বলা হয় ‘বহুমূত্র’ রোগ।
প্রকারভেদ: ডায়াবেটিস প্রধানত দুই ধরনের, টাইপ-১ ও টাইপ-২। এ ছাড়া গর্ভাবস্থায় এক ধরনের ডায়াবেটিস হয়। সাধারণত ৩০ বছরের কম বয়সীদের টাইপ-১ ডায়াবেটিস দেখা যায়। এ ধরনের রোগীর দেহে ইনসুলিন একেবারেই তৈরি হয় না। তাই সারা জীবন ইনসুলিন নিতে হয়। এ ধরনের রোগীর সংখ্যা দেশে কম। বেশি রোগী হলো টাইপ-২ ডায়াবেটিসের (প্রায় ৯০-৯৫ শতাংশ)। এসব রোগীর দেহে ইনসুলিন নিষ্ক্রিয় বা ঘাটতি থাকে। ফলে অনেক সময় ইনসুলিন নিতে হয়। তবে কায়িক পরিশ্রম বা হাঁটাহাঁটি করলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে। অনেক সময় ইনসুলিনের প্রয়োজন হয় না। গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নারীদের অর্ধেকেরও বেশি পরবর্তী সময়ে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন।
ডায়াবেটিস কিভাবে ও কেন হয়?
আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন বলছে, ডায়াবেটিস এমনই একটি রোগ, যা কখনো সারে না। কিন্তু এই রোগকে সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
আইরিশ ইনডিপেনডেন্টের খবরে বলা হয়েছে, যখন আমরা কার্বোহাইড্রেট বা সাধারণ শর্করাজাতীয় খাবার খাই, তখন তা ভেঙে গ্লুকোজে পরিণত হয়। ইনসুলিন হচ্ছে একধরনের হরমোন। এর কাজ হলো এই গ্লুকোজকে মানুষের দেহের কোষগুলোয় পৌঁছে দেওয়া। এরপর সেই গ্লুকোজ ব্যবহার করে শরীরের কোষগুলো শক্তি উৎপাদন করে। সেই শক্তি দিয়েই রোজকারের কাজকর্ম করে মানুষ। সুতরাং যখন এই গ্লুকোজ শরীরের কোষে পৌঁছাবে না, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হবে।
যখন কারও ডায়াবেটিস হয়, তখন ওই মানুষের শরীরে ইনসুলিন হরমোনের নিঃসরণ কমে যায়। ফলে দেহের কোষে গ্লুকোজ পৌঁছাতে পারে না। এতে করে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যায়। সাধারণত প্রস্রাবের মাধ্যমে অতিরিক্ত গ্লুকোজ শরীর থেকে বের হয়ে যায়। এই কারণে ডায়াবেটিস রোগীর ঘন ঘন প্রস্রাব হয়। যখন প্রস্রাব বেশি হয়, তখন ডায়াবেটিসে ভোগা রোগী তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েন।
অন্যদিকে, ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়ার রোগীর শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণ গ্লুকোজ বের হয়ে যায়। এতে করে প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপাদন করতে পারে না দেহের কোষগুলো। ফলে রোগী দুর্বলতা অনুভব করেন। রোগী যদি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করেন, তবে তার রক্তনালি, স্নায়ু, কিডনি, চোখ ও হৃদ্যন্ত্রের সমস্যাসহ নানা ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।
ডায়াবেটিস হওয়ার পেছনে নানা কারণ থাকে। যেমন—
ডায়াবেটিস একটি নীরব ঘাতক। এতে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকেই। এটি এমনই এক রোগ যাকে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। তবে সচেতন থাকলে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কিন্তু এখনও অনেকের মাঝে সেভাবে সচেতনতা বাড়েনি। চিকিৎসকদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রা, মাত্রাছাড়া খাওয়াদাওয়ার ফলে বাড়ছে ডায়াবেটিসের সমস্যা। এছাড়া মানসিক চাপ ও অনিয়ম থেকেও অনেকের শরীরে বাসা বাঁধে এই রোগটি।
বংশগত : বিভিন্ন কারণে ডায়াবেটিস হতে পারে। এর মধ্যে বংশগত কারণ অন্যতম। বিশেষ করে মা-বাবা, খালা, ফুফু—এমন কারোর ডায়াবেটিস হলে তাঁদের বংশধরদের মধ্যে ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। তবে হবেই যে এমন কথা নয়।
শৃঙ্খলা মেনে না চলা : জীবনের নিয়ম-শৃঙ্খলা ঠিকমতো মেনে না চললে যে কারোর ডায়াবেটিস হতে পারে।
খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন : নগরায়ণের ফলে দিন দিন মানুষের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন হচ্ছে। ফাস্ট ফুড, জাংক ফুডের দিকে মানুষ বেশি ঝুঁকছে। এটি ডায়াবেটিস বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
কায়িক পরিশ্রম না করা : খেলাধুলার মাঠের অভাব, নিয়মিত ব্যায়াম না করা, শরীরের ওজন বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
যে সব লক্ষণ দেখলে সতর্ক হতে হবে:
ডায়াবেটিস একটি নীরব ঘাতক। এতে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকেই। এটি এমনই এক রোগ যাকে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। তবে সচেতন থাকলে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কিন্তু এখনও অনেকের মাঝে সেভাবে সচেতনতা বাড়েনি। চিকিৎসকদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রা, মাত্রাছাড়া খাওয়াদাওয়ার ফলে বাড়ছে ডায়াবেটিসের সমস্যা। এছাড়া মানসিক চাপ ও অনিয়ম থেকেও অনেকের শরীরে বাসা বাঁধে এই রোগটি।
তবে অনেক সময়ে ডায়াবেটিস রোগীরা বুঝে উঠতে পারেন না এই রোগটি কখন নিয়ন্ত্রণ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কিছু লক্ষণ আছে তাতে বোঝা যায় শরীরে সুগারের মাত্রা বাড়ছে। এবার সেই লক্ষণ সম্পর্কে জেনে নিন-
- ঘনঘন প্রস্রাব হওয়া: বার বার প্রস্রাব হওয়া কিন্তু ডায়াবেটিসের লক্ষণ। সুস্থ স্বাভাবিক যে কোনও মানুষ দিনে চার থেকে সাতবার বাথরুমে যান। কিন্তু ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে তা অনেক বেশি হয়। এর কারণ হল শরীর অতিরিক্ত গ্লুকোজ তৈরি করে, তা প্রস্রাবের মধ্যে দিয়েই বাইরে আসে। যে কারণে অল্প পানি খেলেও বারে বারে বাথরুমে যেতে হয়,
- অধিক পিপাসা লাগা এবং মুখ শুকিয়ে যাওয়া: ১০ মিনিট আগেও পানি খেলে যেন মনে হচ্ছে আবারও গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। মুখ আর গলার চারপাশ সবসময় শুকনো থাকছে। প্রয়োজনের থেকে বেশি পানি খেয়েও তৃষ্ণা মিটছে না। এরকম সমস্যা হলে একবার সুগার টেস্ট করিয়ে নিন,
- ক্লান্ত লাগা: ডায়াবেটিস বাড়লে শরীর অতিরিক্ত ক্লান্ত লাগে। থেকে থেকে ঘুম পায়। এছাড়াও কমে যায় পরিশ্রম ক্ষমতা। এমনকী পর্যাপ্ত ঘুমালেও মেটে না ঘুমের চাহিদা। ফলে তারা যেখানে-সেখানে ঘুমিয়ে পড়েন। তবে এই বিষয়টি অবহেলা করবেন না। পরিশ্রম করলে সবারই ক্লান্তি আসে, ঘুম পায়। কিন্তু শরীরে সুগারের মাত্রা বাড়লে এই ঘুম পাওয়া হল অন্যতম লক্ষণ। সব সময় মনে হবে ঘুম কম হচ্ছে,
- দুর্বল লাগা' ও ঘোর ঘোর ভাব আসা, অল্প পরিশ্রমেই দুর্বল হয়ে পড়া। এ জন্য অল্পতেই ক্লান্তি লাগলে সচেতন হওয়া উচিত। অন্য অনেক কারণে দুর্বলতা লাগতে পারে, তবে সেটি ডায়াবেটিসের কারণে কি না, তা নিশ্চিত হতে রক্তের শর্করা মাপুন,
- ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া: শরীর যখন খাবার হজম করায় তখন শক্তি উৎপন্ন করে। গ্লুকোজ ভেঙে সেই শক্তি আসে। কিন্তু ইনসুলিন যখন ঠিক মতো কাজ করে না তখন এই প্রক্রিয়া থাকে পুরোপুরি বন্ধ। ফলে রক্তে বাড়তে থাকে গ্লুকোজের মাত্রা। আর প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাবার খেলেও তখন মনে হয় পেট ভরেনি।
- সময়মতো খাওয়া-দাওয়া না হলে রক্তের শর্করা কমে হাইপো হওয়া,
- মিষ্টি জাতীয় জিনিসের প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যাওয়া,
- কোন কারণ ছাড়াই অনেক ওজন কমে যাওয়া, স্বল্প সময়ের মধ্যে বা হঠাৎ ওজন বেশ কমে যাওয়া বা অত্যধিক বেড়ে যাওয়া,
- শরীরে ক্ষত বা কাটাছেঁড়া হলেও দীর্ঘদিনেও সেটা না সারা: সামান্য কোনও ঘা যদি শুকাতে সময় লাগে তাহলে মনে রাখবেন আপনার রক্তে শর্করার পরিমাণ বেশি। সুগার থাকলেই যে কোনও কাটা থেকে রস গড়ায়। ওষুধ লাগালেও ক্ষত সহজে সারতে চায় না। কাটার জায়গা লাল হয়ে ফুলেও যায়। যদি দেখেন ১০ দিনেও কোনও কাটা শুকাচ্ছে না তাহলে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন অবিলম্বে,
- চামড়ায় শুষ্ক, খসখসে ও চুলকানি ভাব: মুখ আর ত্বক আগের থেকে খসখসে হয়ে যাচ্ছে। চামড়া সবসময় শুকনো থাকছে। এছাড়াও কোন কারণ ছাড়াই সবসময় গা চুলকাচ্ছে। মুখের ভেতর চুলকোনো, পায়ের পাতা জ্বালা করা এসবও কিন্তু ডায়াবেটিস বাড়ার লক্ষণ,
- বিরক্তি ও মেজাজ খিটখিটে হয়ে ওঠা,
- চোখে কম দেখতে শুরু করা: চশমা ছাড়াই সব দেখতে পেতেন। কিন্তু কয়েকদিন ধরে সমস্যা হচ্ছে। সব আবছা লাগছে। দৃষ্টিশক্তি পরিস্কার হচ্ছে না, এসবই কিন্তু সুগারের লক্ষণ। কারণ সুগার বাড়লে তার প্রথম প্রভাব পড়ে চোখে আর কিডনিতে। যে কারণে কোমর ব্যথা, পায়ে ব্যথা ইউরিনের সমস্যা আসে। সেই সঙ্গে চশমা ছাড়া দেখতেও অসুবিধা হয়। চোখ সবসময় জ্বালা করে,
- হাত-পা অথবা হাত-পায়ের কোনো আঙুল অবশ অনুভব হওয়া: পেশির টান, পায়ের তলায় ব্যথা ও জ্বালা সুগার বাড়লে এই সমস্যাও আসে। বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারা যায় না। চামড়া ফেটে যায়। সুগার খুব বেশি বাড়লে এই সমস্যা কিন্তু আসতে বাধ্য। এছাড়াও পায়ের চামড়া মোটা হয়ে যাওয়া (কড়া পড়ে যাওয়া) সুগারের লক্ষণ,
- ইউরিন ইনফেকশন: কোন কারণ ছাড়াই ইউরিন ইনফেকশন, জ্বর হচ্ছে? তাহলে ইউরিন ইনফেকশনের ওষুধের পাশাপাশি ডায়াবেটিস চেক করয়ে নিন। আপনার অজান্তেই হয়তো শরীরে সুগারের মাত্রা বেড়ে গিয়েছে। যে কারণে বার বার ইনফেকশন হচ্ছে, বাথরুমে সমস্যা হচ্ছে। এসব হলে একদম অবহেলা করবেন না। অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
তথ্যসূত্র:
- প্রথম আলো।
- অধ্যাপক ডা. মো. ফারুক পাঠান ইউনিটপ্রধান, এন্ডোক্রাইনোলজি অ্যান্ড ডায়াবেটোলজি বিভাগ বারডেম হাসপাতাল, কালের কণ্ঠ।
- এএইচ/এসএ/ >একুশে টিভি।
- Edited: Natural _Healing.

কোন মন্তব্য নেই