First Aid Present

Lifestyle Modification এবং প্রাকৃতিক খাদ্য, পানীয়, শাকসবজি, গাছ, ডালপালা, ফল, মসলা, পাতা ও ফুল ইত্যাদির দ্বারা প্রাথমিক চিকিৎসা।

ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ: চিকিৎসকরা যা বলছেন

বাংলাদেশসহ বিশ্বে প্রতি সাত সেকেন্ডে একজন মানুষ ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

যে সব পরিবারের বাবা-মা বা দাদা-দাদী, নানা-নানীর ডায়াবেটিস হয়ে থাকে, তাদের পরবর্তী প্রজন্মের সদস্যদেরও এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।

জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান (নিপোর্ট)-এর একটি জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে মোট ডায়াবেটিস আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা এক কোটি ১০ লাখ। এদের মধ্যে ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের সংখ্যা ২৬ লাখ আর ৩৫ বছরের বেশি বয়সীদের সংখ্যা ৮৪ লাখ।

হাঁটাচলা, খাবার অভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তনসহ কিছু নিয়মকানুন মানলে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস রোগ ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব।

কী করলে ঠেকানো যায়:

বাংলাদেশের ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি ড. এ কে আজাদ খান বলছেন, ''ডায়াবেটিস প্রধানত টাইপ-১ ও টাইপ-২, এই দুইভাবে আমরা ভাগ করি। আমাদের দেশে ৯৫ শতাংশ রোগী টাইপ-২ ধরনের।''

''টাইপ-১ হচ্ছে যাদের শরীরে একেবারেই ইনসুলিন তৈরি হয় না। তাদের ইনসুলিন বা পুরোপুরি ওষুধের ওপর নির্ভর করতে হয়। সেজন্য সবসময় চিকিৎসকের পরামর্শে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।''

''তবে টাইপ-২ ধরনের ক্ষেত্রে আগাম সতর্কতা অবলম্বন করে রাখলে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস ঠেকিয়ে রাখা বা বিলম্বিত করা সম্ভব।''

এজন্য তিনি বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন।

কারোর একবার ডায়াবেটিস হলে সারা জীবন এর রেশ টানতে হয়। তাই ডায়াবেটিস প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। আশার কথা হলো, ডায়াবেটিস অনেকাংশেই প্রতিরোধযোগ্য। এ জন্য কিছু করণীয় হলো :

১. প্রতিদিন এক ঘণ্টা হাঁটুন:

ড. আজাদ খান বলছেন, নগর জীবনে আমাদের শারীরিক পরিশ্রম এবং হাঁটার প্রবণতা অনেক কমে গেছে। কম্পিউটার বা মোবাইলে কাজ করতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। কিন্তু যাদের পিতা-মাতা বা পরিবারের সদস্যদের ডায়াবেটিস আছে, তাদের জেনেটিক্যালি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ফলে তারা যদি আক্রান্ত হওয়ার আগে থেকেই নিয়মিত হাঁটাচলা ও শারীরিক পরিশ্রম করতে শুরু করেন, তাহলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়া থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবেন।

তিনি বলছেন, এজন্য প্রতিদিন নিয়ম করে অন্তত একঘণ্টা হাঁটতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। খেলাধুলা বাড়ানো যেতে পারে।

ঢাকার একজন বাসিন্দা উম্মে কুলসুমের বাবা-মায়ের ডায়াবেটিস শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই তিনিও তার মায়ের সঙ্গে নিয়মিত হাঁটেন। তার অপর দুই বোনের পরবর্তীতে ডায়াবেটিস শনাক্ত হলেও তার এখনো এই রোগটি হয়নি।

২. জীবনধারা পাল্টে দিন:

রিফাইন করা চিনি এড়িয়ে চলতে হবে।
চিকিৎসকরা বলছেন, যাদের পরিবার বা বাবা-মায়ের ডায়াবেটিস হওয়ার ইতিহাস রয়েছে, তাদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার আগেই জীবনযাপনের ধরন পাল্টানো উচিত।

ড. এ কে আজাদ খান বলছেন, যেসব পরিবারের বাবা-মা বা দাদা-দাদী, নানা-নানীর ডায়াবেটিস হয়ে থাকে, তাদের পরবর্তী প্রজন্মের সদস্যদেরও এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।

যাদের হৃদরোগ রয়েছে, রক্তে কোলেস্টেরল বেশি, উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, তাদেরও এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

যেসব শিশুর ওজন বেশি, যাদের বাবা-মা, ভাই-বোন, দাদা-দাদী, নানা-নানী বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের ডায়াবেটিস রয়েছে, যাদের মায়ের গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হয়েছিল, সেই সব শিশুর ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ফলে তাদের উচিত আক্রান্ত হওয়ার আগে থেকেই জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা।

এই পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে নিয়মিত সময়ে খাবার খাওয়া, নিয়ম মেনে সকালে ঘুম থেকে ওঠা এবং রাতে ঘুমাতে যাওয়া, যানবাহন ব্যবহার কমিয়ে হাঁটাচলা বাড়ানো, মিষ্টি জাতীয়, ফাস্টফুড ও তৈলাক্ত খাবার পরিহার করা ইত্যাদি।

অন্যান্য নগরায়ণ ও পরিবর্তিত জীবনধারণের কারণে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে জীবনযাপনের ধরন পাল্টাতে হবে। একান্ত হয়ে গেলে পরামর্শ নিন।

৩. ধূমপান ও মদ্যপান ছেড়ে দিন:

শুধুমাত্র ডায়াবেটিস নয়, আরও অনেক রোগের কারণ হতে পারে ধূমপান ও মদ পানের অভ্যাস।

চিকিৎসকরা বলছেন, ডায়াবেটিস রোগ ঠেকাতে যেসব খারাপ অভ্যাস সবার আগে বাদ দিতে হবে, তার মধ্যে রয়েছে ধূমপান ও মদ্যপানের অভ্যাস। কারণ এগুলো ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বাড়িয়ে দেয়।

৪. মিষ্টি পরিহার করুন:

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি ড. এ কে আজাদ খান বলছেন, স্থূলতা বা অতিরিক্ত মুটিয়ে যাওয়ার কারণেও ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

সাধারণ মিষ্টিজাতীয় খাবার, ফাস্টফুড, কোমল পানীয়, ভারী খাবার স্থূলতার ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়। ফলে শরীরের ওজনের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে, যাতে কোনভাবেই অতিরিক্ত ওজন বা মুটিয়ে যাওয়া না হয়।

বিশেষজ্ঞরা এজন্য মিষ্টি, ফাস্টফুড, পোলাও, বিরিয়ানি, রেড মিটের মতো ভারী খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন।

প্রক্রিয়াজাত খাবার ও পানীয় এড়িয়ে চলতে হবে। মসৃন শাদা আটার রুটির পরিবর্তে খেতে হবে ভুষিওয়ালা আটার রুটি। এটাই প্রথম ধাপ।

এড়িয়ে চলতে হবে হোয়াইট পাস্তা, প্যাস্ট্রি, ফিজি ড্রিংক, চিনি জাতীয় পানীয়, মিষ্টি ইত্যাদি।

আর স্বাস্থ্যকর খাবারের মধ্যে রয়েছে শাক সবজি, ফল, বিন্স এবং মোটা দানার খাদ্য শস্য।

স্বাস্থ্যকর তেল, বাদাম খাওয়াও ভালো। ওমেগা থ্রি তেল আছে যেসব মাছে সেগুলো বেশি খেতে হবে। যেমন সারডিন, স্যামন এবং ম্যাকেরেল।

এক বেলা পেট ভরে না খেয়ে পরিমাণে অল্প অল্প করে বিরতি দিয়ে খাওয়া দরকার।

এছাড়া প্রতি সপ্তাহেই নিয়মিত ওজন মাপতে হবে। শরীরের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ পুষ্টি ও খাবার নিশ্চিত করার জন্য পুষ্টিবিদের সঙ্গে পরামর্শ করে খাবারের তালিকা তৈরি করে সেটা অনুসরণ করা উচিত।

ফলে একদিকে যেমন স্বাস্থ্য ঠিক থাকবে, তেমনি ওজনও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

৫. রক্তে চিনির মাত্রার ওপর নজর রাখুন:

বাংলাদেশের ডায়াবেটিক সমিতির মহাসচিব মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন বলছেন, যাদের ঝুঁকি রয়েছে, তাদের অবশ্যই বছরে একবার ডায়াবেটিস পরীক্ষা করাতে হবে।

এজন্য সবসময় হাসপাতালে যেতে হবে এমন নয়। এখন অনেক ফার্মেসিতে স্বল্পমূল্যে দ্রুত ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা যায়। সেখান ডায়াবেটিস শনাক্ত হলে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

যাদের শিশুর ঘনিষ্ঠ স্বজনদের ডায়াবেটিসের ইতিহাস রয়েছে, তাদেরকেও বছরে অন্তত একবার করে পরীক্ষা করাতে হবে।

সেই সঙ্গে বছরে অন্তত একবার লিপিড প্রোফাইল ও রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রাও পরীক্ষা করে দেখতে হবে।

৬. সঠিক ওজন বজায় রাখুন:

যেকোনোভাবেই হোক, ওজন নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। ডায়াবেটিসের অন্যতম একটি কারণ দেহের অতিরিক্ত ওজন। মনে রাখবেন, বয়স ও উচ্চতা অনুযায়ী ওজন যত বেশি হবে, ততই বাড়বে ডায়াবেটিসের বিপদ। বরং হালকা-পাতলা গড়নের মানুষ ডায়াবেটিসকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারবে।

৭. খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনুন:

পরিবর্তন আনুন দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে। চিনিজাতীয় খাবার, ফাস্ট ফুড, জাংক ফুড এড়িয়ে চলুন। স্বাস্থ্যকর সুষম খাবার খান। প্রয়োজনে পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন।

সকালের নাশতায় গুরুত্ব দিন ডায়াবেটিস এড়াতে হলে কখনোই বাদ দেওয়া চলবে না সকালের নাশতা। সকালে ঘুম থেকে ওঠার দু-তিন ঘণ্টার মধ্যেই সকালের নাশতা খেয়ে নেওয়া ভালো।

আঁশজাতীয় খাবার খান খাবারের তালিকায় যত বেশি সম্ভব ফাইবার বা আঁশজাতীয় খাবার রাখুন। যেমন—ফল, সবজি, বিনস, দানাজাতীয় শস্য, বাদাম ইত্যাদি। ফাইবার-জাতীয় খাবার বেশি খেলে তা শরীরে শর্করার শোষণ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে থাকে।

৮. নিয়মিত শরীরচর্চা করুন:

ডায়াবেটিস থেকে বাঁচতে হলে অবশ্যই নিয়মিত শরীরচর্চা করুন অথবা প্রতিদিন কায়িক পরিশ্রম করতে হবে। এতে ওজন যেমন নিয়ন্ত্রণে থাকে, তেমনি শরীরে ইনসুলিন সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়। ফলে ডায়াবেটিসের আশঙ্কা অনেকটাই কম থাকে। দেহকে সুস্থ রাখতে হলে প্রত্যহ ৩০ মিনিট ব্যায়াম করুন সপ্তাহে কমপক্ষে পাঁচ দিন।

যে সব লক্ষণ দেখলে সতর্ক হতে হবে:

  • ঘনঘন প্রস্রাব হওয়া,
  • অধিক পিপাসা লাগা এবং মুখ শুকিয়ে যাওয়া।
  • দুর্বল লাগা' ও ঘোর ঘোর ভাব আসা, অল্প পরিশ্রমেই দুর্বল হয়ে পড়া। এ জন্য অল্পতেই ক্লান্তি লাগলে সচেতন হওয়া উচিত। অন্য অনেক কারণে দুর্বলতা লাগতে পারে, তবে সেটি ডায়াবেটিসের কারণে কি না, তা নিশ্চিত হতে রক্তের শর্করা মাপুন।
  • ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া,
  • সময়মতো খাওয়া-দাওয়া না হলে রক্তের শর্করা কমে হাইপো হওয়া,
  • মিষ্টি জাতীয় জিনিসের প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যাওয়া,
  • কোন কারণ ছাড়াই অনেক ওজন কমে যাওয়া, স্বল্প সময়ের মধ্যে বা হঠাৎ ওজন বেশ কমে যাওয়া বা অত্যধিক বেড়ে যাওয়া।
  • শরীরে ক্ষত বা কাটাছেঁড়া হলেও দীর্ঘদিনেও সেটা না সারা,
  • চামড়ায় শুষ্ক, খসখসে ও চুলকানি ভাব,
  • বিরক্তি ও মেজাজ খিটখিটে হয়ে ওঠা,
  • চোখে কম দেখতে শুরু করা।
  • হাত-পা অথবা হাত-পায়ের কোনো আঙুল অবশ অনুভব হওয়া।
জটিলতা:
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যদক্ষতা হ্রাস পেয়ে হার্ট অ্যাটাক, কিডনি বিকল, চোখের সমস্যা বা অন্ধত্ববরণ, পায়ে পচন ধরা ইত্যাদি হতে পারে। তাই ডায়াবেটিস নিয়ে সচেতন হওয়া জরুরি।

কারণ :
ডায়াবেটিস হওয়ার পেছনে নানা কারণ থাকে। যেমন—
বংশগত : বিভিন্ন কারণে ডায়াবেটিস হতে পারে। এর মধ্যে বংশগত কারণ অন্যতম। বিশেষ করে মা-বাবা, খালা, ফুফু—এমন কারোর ডায়াবেটিস হলে তাঁদের বংশধরদের মধ্যে ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। তবে হবেই যে এমন কথা নয়।

শৃঙ্খলা মেনে না চলা : জীবনের নিয়ম-শৃঙ্খলা ঠিকমতো মেনে না চললে যে কারোর ডায়াবেটিস হতে পারে।

খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন : নগরায়ণের ফলে দিন দিন মানুষের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন হচ্ছে। ফাস্ট ফুড, জাংক ফুডের দিকে মানুষ বেশি ঝুঁকছে। এটি ডায়াবেটিস বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

কায়িক পরিশ্রম না করা : খেলাধুলার মাঠের অভাব, নিয়মিত ব্যায়াম না করা, শরীরের ওজন বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্ল্যাড সুগার টেস্ট : খালি পেটে ও খাবার দুই ঘণ্টা পর এই পরীক্ষা করালে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কত, তা জানা যায় বা ডায়াবেটিস আছে কি না, তা জানা যায়।

এইচবিএওয়ানসি : এই পরীক্ষায় গত তিন মাসের গড় সুগারের মাত্রা পাওয়া যায়।

অন্যান্য পরীক্ষা : এ ছাড়া কিছু ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা উচিত, যেমন—চোখের পরীক্ষা, সিরাম ক্রিয়েটিনিন, সিরাম ইলেকট্রোলাইটস, ইউরিন ফর মাইক্রো অ্যালবুমিন, ইউরিন আরএমই ইত্যাদি।

চিকিৎসা ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ। ওষুধ খেয়েও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা যায়। খাবার ওষুধে কাজ না হলে তখন ইনসুলিন নিতে হয়। এ জন্য হরমোন বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে থেকে বা পরামর্শ মেনে নিয়মিত ওষুধ বা ইনসুলিন নিতে পারেন। বাজারে এখন অত্যাধুনিক ইনসুলিন এবং তা প্রয়োগের জন্য পেন, নিডিল পাওয়া যায়। এসব যে কেউ সহজে ব্যবহার করতে পারে।

ডায়াবেটিস হলে করণীয়:
যাঁরা এরই মধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়েছেন, তাঁরা কিছু নিয়ম-কানুন মেনে চললে ডায়াবেটিস নিয়েও সুস্থভাবে জীবন যাপন করতে পারেন। যেমন—

১. চিকিৎসকের পরামর্শে চলুন যথাসম্ভব শর্করা নিয়ন্ত্রণ করুন। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে ব্লাড সুগারের স্বাভাবিক মাত্রা বজায় রাখুন।

২. ডায়াবেটিস চার্ট মানুন নিয়মিত ডায়াবেটিস চার্ট মেনে চলুন। দিনে চার থেকে পাঁচ-ছয়বার ব্লাড সুগার পরিমাপ করুন। শর্করা সুনিয়ন্ত্রিত থাকলে তিন-চার দিন পর পর অথবা কম নিয়ন্ত্রিত থাকলে এক দিন পর পর ব্লাড সুগার পরিমাপ করুন। খালি পেটে এবং খাবার খাওয়ার দু-তিন ঘণ্টা পর পর পরিমাপ করুন। 

৩. প্রত্যেক ডায়াবেটিস রোগীর উচিত একটি গ্লুকোমিটার কিনে ঘরে রাখা। আমার মতে, একজন ডায়াবেটিস রোগীর একটি সেলফোন কেনার চেয়ে গ্লুকোমিটার কেনা বেশি জরুরি। প্রয়োজনে সেলফোন বিক্রি করে হলেও গ্লুকোমিটার কিনে নিন।

৪. সুনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করুন প্রতিদিন একই সময় ঘুমানো, ঘুম থেকে ওঠা, নিয়ম মেনে ব্যায়াম অথবা কায়িক পরিশ্রম করুন। মনে রাখবেন, সুস্বাস্থ্য হচ্ছে সুন্দর জীবনের বনিয়াদ। স্বাস্থ্য ভালো থাকলে সব কিছুই ভালো চলে। এ জন্য ডায়াবেটিস হোক বা না হোক, স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন করুন। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপনের কোনো বিকল্প নেই।

৫. ডায়েট চার্ট মেনে চলুন রোগীর বয়স, উচ্চতা, বর্তমান ওজন ও প্রাত্যহিক পরিশ্রমের ধরন বুঝে নির্দিষ্ট খাদ্যতালিকা তৈরি করুন। এটি মেনে চলা খুব জরুরি। চিকিৎসকের দেওয়া রুটিনের একটু হেরফের হলে বরং অসুখটি বেড়ে যেতে পারে।

৬. বিশেষ করে প্রতিদিন তিন বেলা ভারী খাবারের মাঝখানে তিনবার হালকা খাবার খান। এটি খুব জরুরি। এ জন্য সকাল ১১টা, বিকেল ও রাতে ঘুমানোর আগে হালকা খাবার খান। খাবারের সময় ও পরিমাণ একই রাখুন। এতে শর্করা লেভেল ঠিক থাকবে।
শুভঙ্কর চৌধুরী জানালেন যে, এই বছর ডায়াবিটিস ডে-তে প্রত্যেকের কাছে চিকিৎসকদের আবেদন, আজ আলোর উৎসব দীপাবলিতে দয়া করে কেউ বাজি পুড়িয়ে আনন্দ করবেন না। কেন না কোভিড আক্রান্তদের জন্যে তো বটেই, যাঁরা এই অসুখ থেকে সেরে উঠেছেন এবং ফুসফুসের অসুখে ভুগছেন তাঁদের জন্য বাজির ধোঁয়াযুক্ত বাতাস বিষের মতো। তাই দয়া করে বাতাসকে আরও দূষিত করে তুলবেন না। কথা প্রসঙ্গে শুভঙ্কর চৌধুরী জানালেন যে, সমীক্ষায় জানা গেছে দূষিত বাতাসও ডায়াবিটিস ডেকে আনতে পারে। তাই পরিবেশ ভাল রাখতে আমাদের এ বিষয়ে সচেতন হওয়া উচিত। এ দেশে মৃত্যুর প্রথম ১০টি কারণের মধ্যে অন্যতম টাইপ টু ডায়াবিটিস। 
ডায়াবিটিসের মূলে কুঠারাঘাত করতে হবে নিজেদেরই:
এসএসকেএম হাসপাতালের এন্ডোক্রিনোলজি বিভাগের প্রধান এবং রিসার্চ সোসাইটি ফর দ্য স্টাডি অব ডায়াবিটিস ইন ইন্ডিয়া-র পশ্চিমবঙ্গ শাখার সেক্রেটারি, ডায়াবিটিস বিশেষজ্ঞ শুভঙ্কর জানালেন যে, ডায়াবিটিসের মোকাবিলায় নার্স বা সেবিকাদের ভূমিকার কথা সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তাই এই বছরের ডায়াবিটিস ডে-র থিম হিসেবে ‘ডায়াবিটিস— নার্সেস মেক দ্য ডিফারেন্স’— এই শপথবাক্যের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। ডায়াবিটিস কোভিডের অন্যতম কোমর্বিডিটির কারণ। তাই ডায়াবিটিস থাকলে কোভিড-১৯ ভাইরাস এড়িয়ে চলার ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ডায়াবিটিস সম্পর্কে কিছুটা সচেতনতা বেড়েছে, তাই সমস্যা হলে অনেকেই ব্লাড সুগার পরীক্ষা করিয়ে নিচ্ছেন। আবার রুটিন ব্লাড টেস্ট করাতে গিয়ে অনেকেরই রক্তে বাড়তি শর্করা ধরা পড়ছে। কিন্তু এখনও প্রচুর মানুষ এই মারাত্মক লাইফস্টাইল ডিজিজ নিয়ে বিন্দুমাত্র সচেতন নন।

টাইপ টু ডায়াবিটিসের নানা কারণের মধ্যে অন্যতম হল বেশি ওজন ও ২৭-এর বেশি বিএমআই, বললেন এন্ডোক্রিনোলজিস্ট সেমন্তী চক্রবর্তী। যদি ভুঁড়ি বেড়েই চলে, তা হলে টাইপ টু ডায়াবিটিসের ঝুঁকি বহু গুণ বেড়ে যায়। আমাদের দেশের মানুষজনের মধ্যে ভুঁড়ির প্রবণতা বেশি, তার সঙ্গে অতিরিক্ত ভাত ও ভাজাভুজি খাওয়ার ফলে অল্প বয়স থেকেই মেদ জমতে শুরু করে। ভাবছেন, শরীরে চর্বি জমার সঙ্গে রক্তের শর্করা বেড়ে যাওয়ার কী সম্পর্ক! আসলে ওজন বাড়লে ভুঁড়ি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পেটের অভ্যন্তরে লিভার ও প্যাংক্রিয়াসেও মেদ জমে যায়। এর ফলে এই সব অঙ্গের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে প্যাংক্রিয়াস থেকে ইনসুলিন নিঃসরণ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ইনসুলিনই যে আমাদের রক্তের শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্রিয় ভুমিকা নেয়, তা সকলেরই জানা। ইনসুলিন কমে গেলে ব্লাড সুগার বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। ইদানীং আমাদের দেশে বাচ্চাদের মধ্যেও খেলাধুলোর অভাবে ওজন বেড়ে যাবার সমস্যা বাড়ছে। তাই ২০ বছর বয়সি ছেলেমেয়েদের মধ্যেও টাইপ টু ডায়াবিটিসের হারও বাড়ছে।

সেমন্তী জানালেন যে, বাবা-মা অথবা দাদু-দিদিমা বা ঠাকুর্দা-ঠাকুমা সহ পরিবারে ডায়াবিটিসের ইতিহাস থাকলে রোগের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি। এক সমীক্ষায় জানা গেছে যে, মা, মামা ও দিদিমার টাইপ টু ডায়াবিটিস থাকলে সন্তানদের অসুখের ঝুঁকি ৫০ %। অন্য দিকে, শুধু মা অথবা বাবার কোনও এক জনের এই অসুখের ইতিহাস থাকলে পরবর্তী প্রজন্মের অসুখের সম্ভাবনা ৩২%। তবে বাবা ও মা দু’জনেরই কম বয়সে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি হলে সন্তানদের রোগের ঝুঁকি প্রায় ৭০%। তাই যাঁদের বংশে এই অসুখের ইতিহাস আছে, তাঁদের উচিত ওজন স্বাভাবিক রাখা ও নিয়মিত এক্সারসাইজ করা। আর কোনও সমস্যা থাকুক না থাকুক, বছরে এক বার অন্তত রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা দরকার।

সেমন্তীর মতে, ছোট থেকে নিয়ম করে গা ঘামিয়ে খেলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। অল ওয়ার্ক অ্যান্ড নো প্লে প্রকৃত অর্থেই একজন বাচ্চাকে ভাল করে তুলতে পারে। কেন না সপ্তাহে কমপক্ষে পাঁচদিন নিয়মিত এক ঘন্টা করে ছোটাছুটি করে খেললে একদিকে কার্ডিওরেসপিরেটরি ফিটনেস বাড়ে, অন্য দিকে মস্তিষ্কেও রক্তচলাচল বাড়ে বলে ক্ষিপ্রতা এবং বুদ্ধিও বাড়ে। খাওয়ার ব্যপারেও মায়েদের সচেতন হতে হবে। শিশু যখন শক্ত খাবার খেতে শুরু করে, তখন থেকেই তাদের পুষ্টিকর খাবারে অভ্যস্ত করতে হবে। কেক, বিস্কুট, ইনস্ট্যান্ট নুডলস সহ অন্যান্য ফাস্ট ফুডের অভ্যেস গড়ে তুলবেন না। পরিবর্তে টাটকা ফল, সবজি, রুটি সহ বাড়িতে তৈরি খাবার দেওয়া উচিত।
কোনও সমস্যা থাকুক না থাকুক, বছরে এক বার অন্তত রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা দরকার।
বংশে থাকুক বা না থাকুক, ওজন বাড়লে টাইপ টু ডায়াবিটিস, ব্লাড প্রেশার সহ মেটাবলিক সিনড্রোমের ঝুঁকি বাড়ে। পৃথিবী জুড়ে বাচ্চাদের মধ্যে ওবেসিটি বাড়ছে। তাই বেশ কিছু দেশের স্কুলে স্কুলে ওজন কমাতে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জাপানে ওভার ওয়েট বাচ্চাদের ক্লাস শুরু হওয়ার ৪৫ মিনিট আগে স্কুলে পৌঁছতে হয়। সেই সময়ে ওদের ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ করিয়ে তার পর ক্লাসে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। স্কটল্যান্ডের স্কুলে পিৎজা, বার্গার জাতীয় ফাস্ট ফুড টিফিনে নিয়ে গেলে আপেল, ন্যাসপাতি বা কলা দিয়ে রিপ্লেস করা হয়। ওজন ঠিক রাখতে সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে আর নিয়ম করে সপ্তাহে অন্তত পাঁচদিন মোট ১৫০ মিনিট হাঁটতে হবে। চিনি বা মিষ্টি, কর্নফ্লেক্স, ময়দার তৈরি খাবার সহ লো গ্লাইসিমিক ইন্ডেক্স-যুক্ত খাবার খেলে ডায়াবিটিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। সেমন্তীর বক্তব্য, যাঁরা ইতিমধ্যে ডায়াবিটিসে ভুগছেন তাঁদের উচিত একজন ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ মেনে রোজকার মেনু প্ল্যান করে নেওয়া। আসলে ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণের চাবি আমাদের নিজেদের হাতেই আছে। সতর্ক হতে হবে নিজেদেরই। ইচ্ছে করলে স্বাভাবিক খাবার খেয়ে নিয়ম করে এক্সারসাইজ করে ওজন ঠিক রাখলে ডায়াবিটিস সহ কোনও লাইফস্টাইল ডিজিজ আপনার নাগাল পাবে না।

তথ্যসূত্র:
  • বাংলাদেশের ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি ড. এ কে আজাদ খান, বিবিসি বাংলা।
  • অধ্যাপক ডা. মো. ফারুক পাঠান ইউনিটপ্রধান, এন্ডোক্রাইনোলজি অ্যান্ড ডায়াবেটোলজি বিভাগ বারডেম হাসপাতাল, কালের কণ্ঠ।
  • এসএসকেএম হাসপাতালের এন্ডোক্রিনোলজি বিভাগের প্রধান এবং রিসার্চ সোসাইটি ফর দ্য স্টাডি অব ডায়াবিটিস ইন ইন্ডিয়া-র পশ্চিমবঙ্গ শাখার সেক্রেটারি, ডায়াবিটিস বিশেষজ্ঞ শুভঙ্কর চৌধুরী, আনন্দবাজার।
  • Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই

Popular Post

Blogger দ্বারা পরিচালিত.