রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাই ভিটামিন D
ভিটামিন ডির প্রধান উৎস হচ্ছে সূর্য। কিন্তু আমরা কালো হয়ে যাওয়ার ভয় বা ঘাম–গরমের জন্য সব সময় সূর্যের আলো থেকে দূরে থাকি। তার ওপর আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষের গায়ের রং খুব একটা ফরসা নয়। যার জন্য সূর্যের আলোর সংস্পর্শে গেলেও শরীর ভিটামিন ডি তৈরি হতে দেরি হয়। এই শ্যামবর্ণ ত্বক আমাদের বিভিন্ন রকমের ত্বকের ক্যানসার থেকে বাঁচিয়ে দিলেও এটি ভিটামিন ডি তৈরিতে বাধা দিয়ে থাকে। এ জন্য এ দেশে ভিটামিন ডির ঘাটতির এক ‘মহামারি’ অনেক আগে থেকেই চলছে। এই ঘাটতি এড়াতে আমাদের প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ৩টার ভেতর হাত-পা-মুখ খুলে কিছু সময়ের জন্য হলেও রোদে যেতে হবে। এ ঘাটতি পূরণের জন্য চিকিৎসকেরা রোগীর বয়স, ওজন দেখে মুখে খাওয়ার বা ইনজেকশনে করে ভিটামিন ডি দিয়ে থাকেন। এ ছাড়া দেশীয় শাকসবজি ও ফলমূল খেতে হবে। কারণ, এসবে আছে অনেক ভিটামিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান।
‘ভিটামিন ডি শরীরের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শরীরের হাড় ও দাঁত সুস্থ রাখতে যে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের মেটাবোলিজম দরকার হয়, সেখানে ভিটামিন ডি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।’
দেহে ভিটামিন ডি প্রবেশের ক্ষেত্রে খান আবুল কালাম আজাদ বলেন, ভিটামিন ডি মূলত আল্ট্রাভায়োলেট রে, অর্থাৎ সূর্যালোকে থাকে এবং চামড়ার ওপরের ভাগ থেকে শরীরে প্রবেশ করে। কোনো কারণে ব্যক্তি সূর্যের আলোর সংস্পর্শে না এলে ভিটামিন ডির অভাব হয়ে থাকে। এর বাইরে জেনেটিক এবং অঙ্গের সমস্যার কারণেও হতে পারে। যেমন লিভার ও কিডনি সুস্থ না থাকলে ভিটামিন ডি ডেফিসিয়েন্সি হতে পারে।
দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভিটামিন ডির প্রভাব সম্পর্কে ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, ‘কোভিড–১৯–এর প্রভাব শুরু হওয়ার পরে ভিটামিন ডি নিয়ে আলোচনা বেড়েছে। আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুই ধরনের। জন্মগতভাবে এই ক্ষমতা মানুষ নিয়ে আসে। এটি এর মধ্যে একটি। অন্যটি জীবাণুঘটিত রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতা। ভিটামিন ডির ঘাটতি থাকলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ইমিউনিটি ভালো হলে কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কম। এ জন্য করোনার সময়ের প্রথম থেকেই চিকিৎসক বয়স্ক এবং অন্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের লো ডোজ ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। কারণ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এর ওপরে নির্ভর করে।’
আমাদের দেশে ৮০ শতাংশ মানুষের দেহে ভিটামিন ডির অভাব। দৈনন্দিন জীবনে বাইরের থেকে অভ্যন্তরে আমরা সময় বেশি কাটাচ্ছি। সূর্যালোকের সংস্পর্শে আসছি না। বেলা ১১টা থেকে ১টা সূর্যালোকের সংস্পর্শে থাকলে দেহ পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিন ডি গ্রহণের সুযোগ পায়।
আমাদের দেশে ৮০ শতাংশ মানুষের দেহে ভিটামিন ডির অভাব। দৈনন্দিন জীবনে বাইরের থেকে অভ্যন্তরে আমরা সময় বেশি কাটাচ্ছি। সূর্যালোকের সংস্পর্শে আসছি না। বেলা ১১টা থেকে ১টা সূর্যালোকের সংস্পর্শে থাকলে দেহ পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিন ডি গ্রহণের সুযোগ পায়।
গবেষণায় জানা যায়, আমাদের দেশে ৮০ শতাংশ মানুষের দেহে ভিটামিন ডির অভাব। এ বিষয়ে তামান্না চৌধুরী বলেন, ‘দৈনন্দিন জীবনে বাইরের থেকে অভ্যন্তরে আমরা সময় বেশি কাটাচ্ছি। সূর্যালোকের সংস্পর্শে আসছি না। বেলা ১১টা থেকে ১টা সূর্যালোকের সংস্পর্শে থাকলে দেহ পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিন ডি গ্রহণের সুযোগ পায়। কিন্তু কাজের চাপে অনেকেই সময় পান না। এর বাইরে অনেকেই ইমব্যালেন্স ডায়েট করে থাকেন। এর ফলে কিডনির ওপরে চাপ তৈরি হয়। ওজন কমানোর উদ্দেশ্যে কার্ব কম এবং প্রোটিন বেশি এই রীতিতে ডায়েট করার কারণে, কিডনিতে চাপ তৈরি হয়। এর ফলে রোগী কিডনির সমস্যায় আক্রান্ত হন এবং দেহ কম ভিটামিন ডি গ্রহণে অভ্যস্ত হয়। এ ছাড়া আর একটি কারণ হচ্ছে অনেকেই ডাক্তারের পরামর্শের বাইরে নিউট্রিশন গ্রহণ করে থাকেন। যেমন নিজের মতো করে অনেকেই ক্যালসিয়াম গ্রহণ করে।
দেহে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি না থাকলে ক্যালসিয়াম শরীরে নেতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। চতুর্থ কারণ হিসেবে আমি ওবিসিটির কথা বলব। এর ফলে দেহের ইমিউন সিস্টেম নাজুক হয়ে যায়। ভিটামিন ডির ঘাটতিও হয়। এর ফলে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। খাবার থেকে মানবদেহ ৩০ শতাংশ ভিটামিন ডি গ্রহণ করে, কিন্তু বর্তমানে ডায়েটসচেতন অনেকেই কোলেস্টরেলসমৃদ্ধ খাবার পুরোপুরি ত্যাগ করেন। কিন্তু সূর্যালোকের সংস্পর্শে চামড়ার নিচের কোলেস্টরেল থেকেই শরীর ভিটামিন ডি গ্রহণ করে থাকে। আর আমাদের দেশের বাজারে স্নেহজাতীয় খাবারের দাম বেশি। তাই ডিমের কুসুম, তেল, ঘি, সামুদ্রিক মাছ থেকে ভিটামিন ডি পাওয়া যায়, কিন্তু এ ধরনের খাবারের মূল্য বেশি হওয়ার কারণে সবাই এ ধরনের খাবার নিয়মিত গ্রহণ করতে পারেন না।’
তামান্না চৌধুরী জানান কীভাবে দেহ ভিটামিন ডি পেতে পারে। তিনি বলেন, ‘সপ্তাহে তিন দিন ১৫ থেকে ২০ মিনিট সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত সূর্যালোকের সংস্পর্শে থাকলে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার ইউনিট ভিটামিন ডি দেহ গ্রহণ করে।’
শরীরে ভিটামিন ডির ঘাটতি বুঝতে পারার বিষয়ে অধ্যাপক খান আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘মনে রাখতে হবে, ভিটামিন ডির অভাব প্রথমেই বোঝা যায় না। আক্রান্ত ব্যক্তিরা দুর্বল হয়ে পড়েন, কাজে আগ্রহ কমে যায়, ক্লান্তি এবং বিষণ্নতা দেখা দেয়, চুল পড়ে যায়, মাংসপেশিতে ব্যথা হয়। বয়স্কদের চামড়ার নিচে কোলেস্টেরল কমে যায়, তাঁরা দ্রুতই ভিটামিন ডির ঘাটতিতে আক্রান্ত হন। আর ত্বকে মেলানিন বেশি থাকলে আল্ট্রা ভায়োলেট ঢুকতে পারে না, এ ক্ষেত্রেও ভিটামিন ডির ঘাটতি হয়। আবার সব সময় দেহ অতিরিক্ত আবৃত থাকলেও ভিটামিন ডি শরীরের সংস্পর্শে আসতে পারে না। এর বাইরে দীর্ঘদিন মৃগী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরেও ভিটামিন ডির অভাব হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
দর্শকের সরাসরি প্রশ্নের উত্তরে ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, ‘ভিটামিন ডি যথেষ্ট পরিমাণ গ্রহণ করলে কি করোনার আশঙ্কা কমবে—এ কথাটি এখনো গবেষণায় প্রমাণিত না হলেও আমি মনে করি ভিটামিন ডির সঙ্গে যেহেতু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে, তাই এ ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা এই ভিটামিন ডি পালন করে।’
‘অতিরিক্ত ভিটামিন ডি শরীরে নেতিবাচক প্রভাব দ্রুত তৈরি করে কি?’ প্রশ্নের উত্তরে শাহজাদা সেলিম বলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষের জন্য দেহে ভিটামিন ডির পরিমাণ ত্রিশের কম হলে সমস্যা তৈরি হতে পারে। নিজে থেকে পরীক্ষা করানোর সেভাবে দরকার নেই। শারীরিক সমস্যা অনুভূত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে তবেই পরীক্ষা করতে হবে।’
তামান্না চৌধুরী বলেন, ‘দেহে ভিটামিন ডি পর্যাপ্ত পরিমাণ রাখতে হলে ব্যালেন্স ডায়েটে থাকতে হবে। আমাদের নিত্যদিনের খাবারে পরিবর্তন আনতে হবে। আমরা স্নেহজাতীয় খাবার গ্রহণের মাধ্যমে ভিটামিন ডি পাব। খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে সময়ের দিকেও নজর রাখতে হবে। খাবারে তেলের ব্যবহারের দিকে নজর রাখতে হবে। সকালের খাবার ৮টা থেকে ৮টা ৩০ মিনিটের মধ্যে শেষ করে বেলা ১১টার দিকে একটি ফল খেতে পারেন এবং ডিনার যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি গ্রহণ করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ডায়াবেটিস আক্রান্তদের ক্ষেত্রে সচেতনতা আবশ্যক। সূর্যালোকের সংস্পর্শে থাকার বিষয়টি মাথায় রেখে তাদের রুটিন করতে হবে।’
খাবারে ভিটামিন ডির উৎস সম্পর্কে খান আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘খাবারের তালিকায় ভিটামিন ডি নিয়মিত রাখতে হবে এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন করে সূর্যালোকের সংস্পর্শে আসতে হবে। দরকারে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।’
তথ্যসূত্র:
- অধ্যাপক খাঁন আবুল কালাম আজাদ, অধ্যক্ষ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল,
- ডা. শাহজাদা সেলিম, সহযোগী অধ্যাপক এন্ডোক্রাইনোলজী এন্ড মেটাবলিজম ডিপার্টমেন্ট, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়,
- তামান্না চৌধুরী, প্রিন্সিপাল ডায়টিশিয়ান, ডায়টেটিকস ডিপার্টমেন্ট, এভারকেয়ার হাসপাতাল ঢাকা, প্রথম আলো।
- Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই