রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে জিংক এর ভূমিকা
সুস্থ থাকার জন্য শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হলে একজন মানুষ খুব সহজেই যেকোনো রোগে আক্রান্ত হতে পারে। করোনা মহামারির এই সময়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর গুরুত্ব খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছি।
![]() |
| জিংক, ভিটামিন সি, বি, এবং ডি ইত্যাদি ভিটামিন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। |
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আমাদের জীবনযাপনের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের খাবার আর তার ভেতরে বিদ্যমান পুষ্টি উপাদানের একটি বিরাট ভূমিকা আছে। চিকিৎসকেরা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য যে খাদ্য উপাদানের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেন, সেটি হলো জিঙ্ক। এটি শরীরে অল্প পরিমাণে লাগে। তাই বলে একে মোটেও হেলাফেলা করা যাবে না। প্রত্যেকেরই উচিত রক্তে জিঙ্কের স্বাভাবিক মাত্রা যাতে বজায় থাকে, সেদিকে বিশেষ নজর রাখা।
এরপরই আসে ভিটামিন ডি-এর কথা। ভিটামিন ডির প্রধান উৎস হচ্ছে সূর্য। কিন্তু আমরা কালো হয়ে যাওয়ার ভয় বা ঘাম–গরমের জন্য সব সময় সূর্যের আলো থেকে দূরে থাকি। তার ওপর আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষের গায়ের রং খুব একটা ফরসা নয়। যার জন্য সূর্যের আলোর সংস্পর্শে গেলেও শরীর ভিটামিন ডি তৈরি হতে দেরি হয়। এই শ্যামবর্ণ ত্বক আমাদের বিভিন্ন রকমের ত্বকের ক্যানসার থেকে বাঁচিয়ে দিলেও এটি ভিটামিন ডি তৈরিতে বাধা দিয়ে থাকে। এ জন্য এ দেশে ভিটামিন ডির ঘাটতির এক ‘মহামারি’ অনেক আগে থেকেই চলছে। এই ঘাটতি এড়াতে আমাদের প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ৩টার ভেতর হাত-পা-মুখ খুলে কিছু সময়ের জন্য হলেও রোদে যেতে হবে। এ ঘাটতি পূরণের জন্য চিকিৎসকেরা রোগীর বয়স, ওজন দেখে মুখে খাওয়ার বা ইনজেকশনে করে ভিটামিন ডি দিয়ে থাকেন। এ ছাড়া দেশীয় শাকসবজি ও ফলমূল খেতে হবে। কারণ, এসবে আছে অনেক ভিটামিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান।
অনুষ্ঠানে আরও জানা গেল, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুই ধরনের হয়ে থাকে। জন্মগতভাবে পাওয়া এবং বিভিন্নভাবে অর্জিত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। এই সময়ে দেখা যাচ্ছে, অনেকে ইচ্ছামতো জিঙ্ক বা ভিটামিন ডি ট্যাবলেট খেয়ে নিয়ে ভাবছেন যে তিনি করোনা মোকাবিলা করতে পারবেন। আসলে ব্যাপারটা মোটেও ঠিক না। আমাদের সবারই জন্মগতভাবে পাওয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে, আর বাকিটা আমরা ছোটবেলা থেকে কোন পরিবেশে মানুষ হয়েছি, কী রকম পুষ্টিকর খাবার খেয়েছি, তার ওপর নির্ভর করে। কাজেই হঠাৎ করে কোনো একটা কিছু বেশি পরিমাণ গ্রহণ করলে যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যাবে, ধারণাটা একদমই ভুল।
আমরা জানি যে করোনাভাইরাস ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায়। ফুসফুসের মধ্যে টাইটোনিমোসাইড বা টি সেলে ভাইরাস বংশবিস্তারের জন্য উপযুক্ত স্থান। যখন শরীরে কোনো ভাইরাস ঢোকে, তখন প্রথমে আমাদের শরীরে থাকা বিভিন্ন কোষ সক্রিয় হয়ে ওঠে। আর এই কোষগুলোই ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। যাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকে, তাদের কোষ সক্রিয়তাও বেশি থাকে। আবার অনেক সময় ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করতে শরীর প্রচুর পরিমাণে কোষ ছাড়তে থাকে। এই অবস্থাকে শরীরে সাইটোকাইন স্ট্রম বলে। ফলে, শরীর আরও অসুস্থ হয়ে যায়। তখনই রোগীকে আইসিইউতে নিতে হয়। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর প্রধান কার্যকর উপাদান হচ্ছে জিঙ্ক। এ ব্যাপারে আমরা খুবই উদাসীন। চিকিৎসকেরা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের বিরতি দিয়ে দিয়ে জিঙ্ক ট্যাবলেট খেতে প্রেস্ক্রাইব করে থাকেন। সে জন্য তারা আগে শরীরে জিঙ্কের ঘাটতি কতটুকু এবং ব্যক্তির ওজন ও উচ্চতা অনুযায়ী ওষুধের মাত্রা নির্ধারণ করেন।
এ ছাড়া যারা একেবারে খেতে পারে না বা মুখে রুচি নেই, তাদের জিঙ্ক ওষুধ দেওয়া হয়। জিঙ্ক মুখের রুচি বাড়াতে সাহায্য করে। ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণে জিঙ্ক বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ট্যাবলেটের পাশাপাশি আমরা পেতে পারি মাংস, গরুর কলিজা, দুধ, ডিমজাতীয় খাবারে।
শরীরে যদি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী না থাকে, তাহলে আমাদের প্রচুর পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে এবং অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। কারণ, একজন চিকিৎসকই বিভিন্ন রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বুঝতে পারেন কার শরীরে কিসের কতটুকু ঘাটতি আছে এবং সেভাবে ওষুধ ও খাবার গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
মহামারি করোনাভাইরাস কিভাবে প্রতিরোধ করা যায় এ নিয়ে সবার মধ্যে বাড়ছে সচেতনতা। কিন্তু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বারবার বলছেন, ব্যক্তিগত সচেতনতা গড়ে তোলার পাশাপাশি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়াতে হবে। এ জন্য তারা পরামর্শ দিচ্ছেন, ভিটামিন সি’র পাশাপাশি জিঙ্কযুক্ত খাদ্য গ্রহণের। কেননা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জোরদার করতে জিঙ্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাদের মতে, খাদ্যতালিকায় জিঙ্কযুক্ত খাবার কম থাকলে, কোষের কার্যকারিতা কমে গিয়ে প্রোটিন তৈরিতে ব্যাঘাত ঘটায়। তাই নিয়মিত খাবারের তালিকায় অবশ্যই জিঙ্কযুক্ত খাবার রাখা জরুরি।
জেনে নিন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে কোন কোন জিঙ্ক সমৃদ্ধ খাবারগুলি খাওয়া প্রয়োজন-
জিংক: ফ্লু বা সর্দি-কাশি উপসর্গে জিংকের বেশ উপকারিতা রয়েছে। জিংক-সমৃদ্ধ খাবারগুলো হচ্ছে আদা, রসুন, ডাল, বিন্স, বাদাম, সামুদ্রিক মাছ ইদ্যাদি। বাজারে লজেন্স আকারে জিংক সাপ্লিমেন্ট খেতে পারেন ২-৩ ঘণ্টা পর পর।
দুগ্ধজাত খাবার : পনির, দই বা দুধের মতো দুগ্ধজাত খাবারে প্রচুর পুষ্টি উপাদান এবং জিংক রয়েছে। দেহ এই জিঙ্ক সহজে শোষণ করতে পারে। এই খাদ্যগুলো প্রোটিন, ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন ডি যা দাঁত হাড় এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারি। ২৫০ গ্রাম লো-ফ্যাট ইয়োগার্ট এবং ২ দশমিক ৩৮ মিলিগ্রাম লো-ফ্যাট দুধ খেলে ১ দশমিক ০২ মিলিগ্রাম জিঙ্ক শরীরে ঢুকবে।
কাজু বাদাম : রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে সুস্থ থাকতে রোজ খান বাদাম। ২৮ গ্রাম কাজু বাদামে জিঙ্কের পরিমাণ থাকে ১.৬ মিলিগ্রাম। শুধু কাজু নয়, খেতে পারেন আমন্ড ও অন্যান্য বাদাম। এগুলিতে থাকা ভিটামিন কে, ভিটামিন এ ফ্যাট এবং কোলেস্টেরলের মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।
বাদাম ও কুমড়ার বীজ :
২৮ গ্রাম কাজুবাদাম আর কুমড়া বীজে যথাক্রমে ১ দশমিক ৬ মিলিগ্রাম ও ২ দশমিক ২ মিলিগ্রাম জিঙ্ক আছে। আমন্ড, অন্যান্য বাদাম ও বীজে প্রচুর জিঙ্ক থাকে। তাই এগুলো রাখতে পারেন খাদ্য তালিকায়।
ডার্ক চকোলেট : ডার্ক চকোলেটে থাকা জিঙ্ক ও ফ্ল্যাভনয়েড, ইমিউনিটি পাওয়ারকে বৃদ্ধি করতে খুবই কার্যকর। তাই রোজ এক টুকরো বা ১০০ গ্রাম ডার্ক চকোলেট গ্রহণ করুন। ১০০ গ্রাম ডার্ক চকোলেটে জিঙ্কের পরিমাণ থাকে ৩.৩ মিলিগ্রাম।
বীজ জাতীয় শস্য : ছোলা, মটরশুঁটি, বিভিন্ন ডাল, বিন, গম ইত্যাদি জিঙ্কের ভালো উৎস। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এগুলি রোজ খান।
মাংস : জিঙ্কের একটি প্রধান উৎস হল যেকোনও ধরনের মাংস। ১০০ গ্রাম খাসির মাংসে জিঙ্ক থাকে ৮.৫ মিলিগ্রাম এবং ৮৫ গ্রাম মুরগির মাংসে জিঙ্ক থাকে ২.৪ মিলিগ্রাম। এছাড়াও রয়েছে ভিটামিন বি-১২।
গরুর মাংসে চর্বির পরিমাণ বেশি থাকায় হৃদরোগ, কোলেস্টেরল, প্রেশার, সুগার বা ওবেসিটির সমস্যায় যারা আছেন, তারা গরুর মাংসের বদলে মুরগির মাংস খেতে পারেন। তবে গ্রাম বা উন্মুক্ত অঞ্চলের গরু যেটাকে আমরা অর্গানিক গরু বলে থাকি, সেই গরুর ১০০ গ্রাম মাংসে ৪.৮ মিলিগ্রাম জিঙ্ক থাকে। এছাড়াও গরুর মাংসে প্রোটিন, আয়রন, বি ভিটামিনসহ গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির এক দুর্দান্ত উৎস। তাই সপ্তাহে একদিন মাংস খেতে পারেন। তবে বেশি পরিমাণ খাবেন না, কারণ মাংসে কোলেস্টেরল এবং ফ্যাটের পরিমাণ বেশি থাকে।
সবজি:
এমনিতেই শরীরের জন্য বেশ উপকারী সবুজ শাকসবজি। এর মধ্যে পালংশাক, ব্রোকলি ও রসুনে প্রচুর জিঙ্কের রয়েছে। তাই এগুলো খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন।
ওটস্ : অনেকেই ব্রেকফাস্টের খাবার হিসেবে ওটস্ খান। এটি জিঙ্কের একটি অত্যন্ত ভালো উৎস। ইমিউনিটি পাওয়ার বৃদ্ধি করতে তাই এবার ডায়েটে যুক্ত করুন ওটস্। পাশাপাশি এটি ফাইবার, বিটা-গ্লুকান, ভিটামিন বি-৬ সমৃদ্ধ, যা কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
ওটসে রয়েছে প্রচুর ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, জিঙ্ক, কপার, ম্যাঙ্গানিজ, থিয়ামিন, ভিটামিন ইত্যাদি যা অন্যান্য শস্যজাতীয় খাবারের তুলনায় বেশি। প্রাকৃতিকভাবে ফ্যাটের পরিমাণ কম থাকে ওটসে। তাছাড়া উপকারি ফ্যাটি অ্যাসিড, মানে মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাটও রয়েছে। ওটসের বেটা-গ্লুকোন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি সিস্টেমকে বৃদ্ধি করে। শরীরে ব্যাক্টেরিয়া জনিত ইনফেকশন প্রতিরোধেও সাহায্য করে ওটস।
খোলসযুক্ত মাছ : জিঙ্কের সবচেয়ে ভালো উৎস হল খোলসযুক্ত মাছ বা শেলফিশ। শেলফিশ বলতে চিংড়ি, ঝিনুক এবং কাঁকড়ার মতো খোলসযুক্ত প্রাণীদের বোঝায়। পাশাপাশি, এগুলি কম ক্যালরিযুক্ত এবং ভিটামিন বি-১২ এ সমৃদ্ধ। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে এসব খাদ্য খুবই সহায়ক। এগুলির মাত্র ৫০ গ্রামে জিঙ্ক থাকে ৮.৫ মিলিগ্রাম।
মাশরুম : লো ক্যালোরি যুক্ত মাশরুমে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে জিঙ্ক। রোজকার ডায়েটে এই খাবারটি থাকলে শরীরে জিঙ্কের ঘাটতি পূরণ হতে পারে। ২১০ গ্রাম মাশরুমে ১.২ মিলিগ্রাম জিঙ্ক পাওয়া যায়। এছাড়াও রয়েছে আয়রন, ভিটামিন-এ ভিটামিন-সি এবং ভিটামিন ই।
নানা ধরনের ডাল :
৫০ গ্রাম মসুরের ডালে ২ দশমিক ৪ মিলিগ্রাম, ৯০ গ্রাম রাজমায় ২ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম, ৮০ গ্রাম ছোলায় ১ দশমিক ২৫ মিলিগ্রাম জিঙ্ক আছে। মুগ ডাল ও ছোলাও উপকারী। এগুলো নিয়মিত খেতে পারেন।
তথ্যসূত্র:
- ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালের ভাসকুলার সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. সাকলায়েন রাসেল,
- পুষ্টিবিদ রুবাইয়া পারভীন রীতি, প্রথম আলো।
- বিডি প্রতিদিন।
- একুশে টিভি।
- কালের কণ্ঠ।
- Edited: Natural_Healing.

যদি আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকে, তাহলে আপনি স্বাস্থ্য সমস্যা এড়াতে পারবেন, কিন্তু আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে তা সরাসরি আপনার স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে এবং রোগগুলি সহজেই আপনাকে ঘিরে ফেলতে পারে।
উত্তরমুছুন৮টি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির উপায়