রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে কিছু পদ্ধতি
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করুন:
মহামারি করোনার প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। প্রতিদিনই এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা এবং মৃতের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। আমাদের দেশের পরিস্থিতিও এর ব্যতিক্রম নয়।
এ অবস্থায় আমাদের উচিত প্রতিরোধের দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়া এবং এ জন্য রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো। করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর কিছু কার্যকর উপায় নিচে আলোচনা করা হলো।
প্রত্যেক মানুষের দেহে যথেষ্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকা জরুরি। সামান্য ফ্লু-তে আক্রান্ত হয়ে যদি বিছানায় পড়ে যান, তবে আপনার ইমিউন সিস্টেমকে আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন এমনই কিছু প্রাকৃতিক পদ্ধতি। এর মাধ্যমে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে-
![]() |
| সৃষ্টিকর্তার প্রতি আত্মসমর্পন করুন, মনকে শান্ত রাখুন, রোগব্যাধি থেকে মুক্ত থাকুন। |
মাঝে মাঝে মস্তিষ্ককে বিরতি দিন:
রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে মাঝে মাঝে মস্তিষ্ককে বিরতি দিন। পর্যাপ্ত ঘুমাতে পারেন মস্তিষ্ককে শান্ত রাখতে। তবে হতে হবে ভালো ঘুম। অর্থাৎ ঘুমের মধ্যে কেউ বিরক্ত করলে চলবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেল্ডন কোহেন এক গবেষণায় দেখতে পান, যারা রাতের সাত ঘণ্টার নিচে ঘুমান, তাদের ঠান্ডা জাতীয় রোগ বেশি হয়। তাই তিনি সাত ঘণ্টার উপরে ঘুমানোর পরামর্শ দেন।
কাজের চাপও কমাতে হবে: কাজের চাপ কমিয়ে বিরতি দিতে হবে মস্তিষ্ককে। অধ্যাপক শেল্ডন কোহেন আরো একটি গবেষণায় দেখতে পান, যারা সবচেয়ে বেশি কাজের চাপের মধ্যে থাকেন; তাদের মধ্যে বেশি দেখা যায় ঠান্ডা জাতীয় রোগের লক্ষণ। এই প্রভাবের একটি কারণ হলো স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাটির কিছু অংশকে দমিয়ে রাখে। তাই তিনি চাপ মুক্ত থাকতে আহ্বান জানিয়েছেন।
২. শরীরচর্চা বা নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়াম: শরীরকে সুস্থ রাখতে এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে শরীরচর্চা অপরিহার্য। বিশেষ করে বর্তমান পরিস্থিতিতে যখন আমরা সবাই ঘরে অবস্থান করছি। প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট এবং বাচ্চাদের অন্তর ১ ঘণ্টা শরীরচর্চা করা উচিত। ঘরে থেকে আপনি যা করতে পারেন হাঁটাহাটি, সাইক্লিং, ইয়োগা, ওয়েট শিফ্টিং, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা, এমনকি নফল নামাজ পরাও আপনার শরীর চর্চার উপায় হতে পারে।
শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে শারীরিক পরিশ্রমের সম্পর্ক আছে। একজন মানুষ যখন শারীরিক পরিশ্রম করে তখন শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাজ করে। শরীরের মাংসপেশি এবং হৃদযন্ত্র অনেক কার্যকরী হয়। একই সঙ্গে শরীরের রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায়। ফলে শরীরের দূরতম প্রান্ত পর্যন্ত অক্সিজেন পৌঁছবে। তখন শরীরের কোষগুলোতে শক্তি উৎপাদন শুরু হবে। সুতরাং প্রতিদিন শারীরিক পরিশ্রমের সাথে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির সম্পর্ক আছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আপ্পালাচিয়ান স্টেট ইউনিভার্সিটির হিউমান পারফরমেন্স ল্যাবরেটরির এক্সারসাইজ ফিজিওলজিস্ট ডেভিড নিয়মান বলেন, যারা নিয়মিত অনুশীলন বা ব্যায়াম করেন তাদের মৌসুমী সর্দি এবং ফ্লুর মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। যারা নিয়মিত ২০ মিনিট শারীরিক পরিশ্রম যেমন, হাঁটা, সাইক্লিং বা শারীরিক পরিশ্রম করেন তারা খুব কমই অসুস্থ হবেন।
দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ব্যায়ামের কোনো বিকল্প নেই। শারীরিক পরিশ্রম দেহের কোষগুলো সচল রাখে। তাছাড়া ব্যায়াম মনও ভালো রাখে। ঘরে বসে আপনি যোগ ব্যায়াম করেতে পারেন। তাছাড়া ঘরের কাজ করুন এবং হাঁটুন।
ব্যায়ামে অভ্যাস না থাকলেও সপ্তাহে অন্তত দুই-তিন দিন শরীরচর্চা করুন। ইয়োগা ক্লাসও দারুণ উপকার দেবে। ব্যায়ামের ফলে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এতে ফুসফুস থেকে ব্যাকটেরিয়া দূর হয়। রক্তের শ্বেতকণিতা সুষ্ঠুভাবে প্রবাহিত হয়। এতে এরা সহজে রোগ চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধে কাজ শুরু করে দেয়।
রোজ শরীরচর্চা করুন। এটা শুধু মন এবং শরীরকেই ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে না, শরীরকে রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার উপযুক্ত হিসেবে গড়ে তোলে। এ সময় ঘরেই হালকা যোগব্যায়াম ও খোলা ছাদে জগিং করতে পারেন। এতে রক্ত সঞ্চালন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।
৩. ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার করা: বিশেষ করে ধূমপান, সরাসরি আপনার শ্বাসতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যেহেতু করোনা ভাইরাস শ্বাসতন্ত্রের রোগ, এতে সংক্রমের আশঙ্কা বেড়ে যায়। তাই ধূমপান পুরোপুরি বাদ দিন ও Respiratory Exercise করুন। মদ্যপান পুরোপুরি পরিহার করুন।
৪. ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা: শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা অটুট রাখতে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার বিকল্প নেই। খাবার পরিমিত খান ও শরীরিকভাবে সচল থাকুন।
৫. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা: আমরা যদি করোনা ভাইরাস রোগের সংক্রমণ থেকে নিজেদের বাঁচাতে চাই নিজের ও আশপাশের পরিবেশের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। নির্দিষ্ট সময় পর পর হাত সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। ব্যবহার্য জিনিপত্র জীবাণুনাশক পদার্থ দিয়ে পরিষ্কার করে নিন। দরজার হাতল, সুইচ, লিফ্টের বাটন জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার রাখুন ও মাস্ক ব্যবহার করুন।
পরিষ্কার ও দূরত্ব-
করোনা থেকে বাঁচতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। সেক্ষেত্রে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা সব থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাও উচিত। কারণ এটি একটি ছোঁয়াচে ভাইরাস। তাছাড়া বার বার হাত ধোয়া, হাঁচি বা কাশির সময় মুখ ঢেকে রাখাও জরুরি। এতে দেহে কোনো জিবাণু প্রবেশ করতে পারবে না। সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে।
৬. নিয়মিত ঘুমান : রাত তিনটা পর্যন্ত অতি প্রিয় অনুষ্ঠানটি দেখতে মন চায়। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, রাত জাগলে ধীরে ধীরে দেহের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। খুব সহজেই রোগ-জীবাণু সংক্রমণ করে দেহে। তাই রাতের ঘুমকে কোনো অবস্থাতেই বাদ দেওয়া যাবে না।
ঘুম: অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। প্রতিদিন অন্তত ৮ ঘণ্টা করে ঘুমনোর চেষ্টা করুন। পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশ্রাম আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে খুবই জরুরি।
৭. খাদ্যভ্যাস: সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। প্রচুর শাকসবজি ও ফলমূল খান। ফলের রসের পরিবর্তে গোটা ফল চিবিয়ে খেলে ভালো। এতে পুষ্টি সাথে ফাইবারও পাওয়া যাবে। পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করুন, ৮ থেকে ১০ গ্লাস। ফাস্টফুড, তেল-চর্বি ও মসলা জাতীয় খাবার যতটুকু সম্ভব পরিহার করুন।
ভিটামিনস ও মিনারেল: রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে খাদ্যাভ্যাস অবশ্যই সঠিক হওয়া চাই। ভিটামিন সি আছে এমন খাবার পরিমাণ মতো খেতে হবে। তাছাড়া শাক সবজি, কালোজিরা, বিভিন্ন ফলের রস ইত্যাদি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে বেশ সহায়ক।
৮. মন ভালো রাখা:
বর্তমান পরিস্থিতিতে মন ভালো রাখা একটু কষ্টকর। তবুও চেষ্টা করুন বিভিন্ন উপায়ে মন ভালো রাখতে। কারণ মন খারাপ থাকলে তা শরীরেও প্রভাব ফেলে। ফলে রোগ প্রতিরোধে বাধা পায়। তাই তিলাওয়াত শুনে, পছন্দের কাজ করে কিংবা ফোনে প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলে ইত্যাদি কাজের মাধ্যমে মন ভালো রাখুন।
৯. রুটিনমাফিক জীবন:
রুটিন মেনে জীবন কাটাতে না পারলেও রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। অনিয়মিত জীবনযাপন রোগ প্রতিরোধে বাধা দেয়। তাই খাওয়া, ঘুম, কাজ সবকিছুই নিয়মমাফিক করা জরুরি। তবেই শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
১০. সূর্যের রশ্মি নিন : এ আলোতে আছে ভিটামিন ডি। ইমিউন সিস্টেমের সুপারচার্জার হিসাবে কাজ করে ভিটামিন ডি। তবে এর জন্যে খুব বেশি সূর্যরশ্মিতে বসে থাকার প্রয়োজন নেই। সকাল 10 টা থেকে বিকেল তিনটার মধ্যে 15 থেকে 30 মিনিট শরীর অথবা হাত পা উন্মুক্ত রেখে সূর্যের আলো মাখিয়ে নিন।
১১. হাসুন : হাসি বহু সমস্যার মহৌষধ। ২০০৭ সালের এক গবেষণায় বলা হয়, রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা বৃদ্ধিতে হাসি বেশ কাজের বলে প্রমাণিত হয়েছে। হাসিতে মানসিক চাপ দূর হয়। ঘুমও ভালো হয়। উৎফুল্লতা চলে আসে মনে। তবে যেখানে সেখানে অট্টহাসি দিবেন না, মুচকি হাসি হাসুন, ভদ্রতা বজায় রাখুন এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করুন।
১২. পোষা প্রাণী:
বাড়িতে পোষা প্রাণী মন খুশি রাখতে ভূমিকা রাখে। মানসিক চাপ থেকেই মুক্তি পাওয়ার পাশাপাশি যারা একা বসবাস করেন, তাদের ভালো সঙ্গী হিসেবে থাকতে পারে পোষা প্রাণী।
তথ্যসূত্র:
- বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের বিভাগীয় প্রধান, ড. শারমিন ইয়াসমিন,
- ডাক্তার আফরিন সুলতানা, কনসালটেন্ট, হলি ফ্যামেলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল,
- ডা. আফরিন সুলতানা, বিডি প্রতিদিন।
- বিবিসি বাংলা> সময় টিভি
- হাফিংটন পোস্ট>কালের কণ্ঠ।
- যুগান্তর।
- Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই