First Aid Present

Lifestyle Modification এবং প্রাকৃতিক খাদ্য, পানীয়, শাকসবজি, গাছ, ডালপালা, ফল, মসলা, পাতা ও ফুল ইত্যাদির দ্বারা প্রাথমিক চিকিৎসা।

পরিমিত ঘুম না হলে, যে রোগ গুলি হতে পারে

রাতে কিছুতেই ঘুম আসছে না? এ দিকে দিনের বেলায় ক্লান্তি, ঘুম ঘুম ভাব আর অস্বাভাবিক জড়তায় কিছুতেই কাজ করতে পারছেন না! নিজেকে সজাগ রাখতে কাপের পর কাপ চা-কফি খাচ্ছেন? কিন্তু তাতেও লাভ হচ্ছে না মোটেই? এ রকম অবস্থা দিনের পর দিন চলতে থাকলে দেরি না করে চিকিত্সকের পরামর্শ নিন। কারণ অনিদ্রার সমস্যা শরীরের আরও অনেক অসুখের ঝুঁকি অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়।

ঘুম মূলত আমাদের শরীরের ক্ষয়ক্ষতি পূরণ ও শক্তি সঞ্চয়ের একটি পন্থা। কিন্তু নিয়মিতভাবে ঘুম কম হলে শরীরে নানা রোগব্যাধি বাসা বাঁধে এবং শরীর গতি হারিয়ে ফেলে। অকালে বৃদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিও অনেকটা বাড়িয়ে দেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাবার ছাড়াও মানুষ ২ সপ্তাহ বেঁচে থাকতে পারে, কিন্তু ঘুম ছাড়া ১০ দিনের বেশি বাঁচা সম্ভব নয়। প্রয়োজনের তুলনায় ঘুম বেশি বা কম হলেই তা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। বেশি ঘুমানো, কম ঘুমানো, অনিদ্রা, ঘুম পাতলা হওয়া- ঘুম নিয়ে এই সব নানা জটিলতার কারণে আমরা আক্রান্ত হই এমন সব মারাত্মক রোগ-ব্যধিতে যেগুলো সম্পর্কে আমরা অনেকেই জানি না। এবার দেখে নেওয়া যাক ঘুম সংক্রান্ত জটিলতার কারণে আমাদের শরীরে কী কী রোগ-ব্যধি বাসা বাঁধতে পারে।

ডিমেনশিয়ার কারণে শুধু মানসিক সমস্যাই নয়, হৃদরোগও হতে পারে
উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা বৃদ্ধি করে:

দিনে পর্যাপ্ত ঘুম না হলে বা কম হলে বাড়তে পারে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা। চিকিত্সকদের মতে আমরা না ঘুমালে আমাদের শরীরের ‘লিভিং অরগানিজম’গুলো ঠিক মতো কাজ করতে পারে না। নষ্ট হতে পারে শরীরের হরমোনের ভারসাম্য। বাড়তে পারে উচ্চ রক্তচাপ, হাইপার টেনশনের মতো সমস্যা।

হার্টের সমস্যা বৃদ্ধি করে:

আমরা যখন ঘুমাই তখন আমাদের হৃদপিণ্ড এবং রক্তনালী কিছুটা হলেও বিশ্রাম পায়। কিন্তু ঘুম না হলে বা কম হলে প্রতিনিয়ত কার্ডিওভ্যস্কুলার সমস্যা বাড়তে থাকে। এর ফলে হার্টের সমস্যা বাড়তে থাকে।

ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়:

দীর্ঘদিন রাতে না ঘুমানো বা কম ঘুমানোর ফলে শরীরে ইনসুলিন উৎপাদন ব্যাহত হয়। যার ফলে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে থাকে।

শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে:

যখন আমরা ঘুমাই, তখন আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ‘লিভিং অরগানিজম’ কাজ করতে থাকে। কিন্তু আমরা না ঘুমালে এই ‘লিভিং অরগানিজম’গুলো কাজ করতে পারে না। ফলে ক্রমশ আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকে।

মানসিক স্বাস্থ্য নষ্ট হয়:

মস্তিষ্কে ওরেক্সিন নামের একটি নিউরোট্রান্সমিটার আছে যা মস্তিষ্ককে সচল রাখতে সহায়তা করে। প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ওরেক্সিন উৎপাদনের গতি মন্থর হয়ে যায়। মস্তিষ্কের কর্ম ক্ষমতা কমতে থাকে। মস্তিষ্ক পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশ্রাম না পেলে অতিরিক্ত বিষণ্ণতা, হ্যালুসিনেশনের, স্মৃতিভ্রংশের মতো একাধিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। দিনে দিনে নিজের বিচার বিশ্লেষণ করার ক্ষমতাও লোপ পেতে পারে।

হজমে সমস্যা সৃষ্টি করে:

প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে বাড়তে পারে হজমের সমস্যাও। আমরা না ঘুমালে আমাদের শরীরের পাচন ক্রিয়ায় সাহায্যকারী অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে খাবার হজমে সহায়ক পাচক রস উপযুক্ত মাত্রায় নিঃসরণে বাধা পায়। তাই হজমের নানা সমস্যা শুরু হয়।

স্লিপ প্যারালাইসিস:

এই রোগটিকে আমরা অনেকেই বলি ‘বোবায় ধরা’। ঘুমের সময় কোনও ভয়ের স্বপ্ন দেখে অদ্ভুত কিছু থেকে বাঁচার চেষ্টায় হাত-পা নাড়ানোর চেষ্টা করেন অনেকেই। কিন্তু কোনওভাবেই শরীরটাকে নাড়ানো যায় না। এই সমস্যায় কম বেশি সবাই পড়েছেন। কিন্তু কেউই বিষয়টিকে তেমন পাত্তা দেন না। কিন্তু এটিও আসলে একটি রোগ। অনিয়মিত ঘুমের সময়ের পরিবর্তন এবং অনিদ্রাজনিত কারণে এই রোগটি হয়।

এক্সপ্লোডিং হেড সিনড্রোম:

গভীর ঘুমের মধ্যে হঠাৎ অস্বাভাবিক জোরে কোনও শব্দে জেগে উঠেছেন কখনও? অনেকেরই এই ধরণের সমস্যা রয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ ভাবেন আসলেই কোথাও শব্দ হয়েছে। কিন্তু এটি একটি ঘুম সংক্রান্ত ব্যাধি। এর নাম ‘এক্সপ্লোডিং হেড সিনড্রোম’। যে শব্দটির কারণে ঘুম ভেঙ্গে যায় সেটি আর কোথাও নয়, রোগীর মাথার ভেতরেই হয়ে থাকে। খুব অদ্ভুত এই রোগটি বেশি ঘুমানোর কারণে হয়ে থাকে।

দুঃস্বপ্ন দেখা:

অনেকেই আছেন যারা ঘুমের মধ্যে প্রায়ই দুঃস্বপ্ন দেখেন। এটি যে এক ধরণের অসুখ তা জানেনই না অনেকেই! কিন্তু আসলেই ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখাও একটি ব্যাধি। মানসিক চাপ, অতিরিক্ত পরিশ্রম, অনিদ্রা বা না ঘুমানোর কারণে দুঃস্বপ্ন দেখেন অনেকেই।

প্যারাসমনিয়া:

প্যারাসমনিয়া এক প্রকার ঘুম সম্পর্কিত ব্যাধি, যা মানুষকে ঘুমের মধ্যে অস্বাভাবিক কাজ করতে বাধ্য করে। এই রোগের কারণে অনেক রকমের অপরাধ পর্যন্ত করে ফেলতে পারে মানুষ। আজ পর্যন্ত এই রোগের কারণ অনেক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। ঘুমের মধ্যে গাড়ি চালানো, অপরিচিত কারও বাড়িতে ঢুকে পড়া এমনকি হত্যার মতো গুরুতর অপরাধের সঙ্গেও অনেকে জড়িয়ে পড়েছেন প্যারাসমনিয়ার ফলে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ, অনিদ্রার, বিশ্রামের অনিয়ম মারাত্মক পর্যায়ে চলে গেলে এই ব্যাধি শরীরে বাসা বাঁধতে পারে।

মাথা ব্যথা ও মুড সুইং:

আমাদের শরীর ২৪ ঘণ্টার একটি ছন্দ বজায় রেখে চলে। আমাদের ঘুমের ধরনে হঠাৎ করে যেকোনো পরিবর্তন এই ছন্দকে ব্যাহত করতে পারে। আর এর ফলে মাথা ব্যথা, মেজাজ পরিবর্তনের মতো সমস্যা দেখা দেয়। কারো কারো ক্ষেত্রে মাইগ্রেনের সমস্যাকে আরো তীব্র করে তোলে।

চিন্তাশক্তিতে বাধা:

যথাযথ ঘুম বা বিশ্রাম নেওয়া আমাদের পরিষ্কারভাবে চিন্তা করতে, আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে আমাদের জন্য কোনো কিছুতে মনোনিবেশ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আস্তে আস্তে আমাদের সৃজনশীল ক্ষমতাও হ্রাস পায়।

ওজন বৃদ্ধি:

ঘুম কম হলে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করে যে হরমোন, তাতে পরিবর্তন আসে। আর ঘুমের ঘাটতি হলেই ফাস্ট ফুড, ফ্যাটি ফুড খাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। এর ফলে ওজন বৃদ্ধি পায়। 

স্লিপওয়াকিং:

ঘুমের এমন সমস্যা যাদের, এরা সত্যি সত্যি ঘুমের মধ্যে উঠে হাটতে থাকেন। নন রেম স্লিপের গভীর পর্যায়ে ঘটে এমন ঘটনা আর না জেগে উঠেও এরা করতে পারেন নানান কাজকর্ম। নিদ্রাকালে হাটেন যারা এরা কোনও প্রশ্ন করলে সাড়া দেননা, আর জেগে উঠলে এদের মনে থাকেনা, কি কর্ম তারা করেছেন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে। বাচ্চাদের মধ্যে সিস্নপ-ওয়ার্কিং বেশি, আবার বড় হলেও অনেকের তা থেকে যায়।

রাতের ঘুম যত কমছে, ততই বাড়ছে ডিমেনশিয়ার ভয়:

রাতে কম ঘুমোনো কৃতিত্বের নয়। বরং তা ডেকে আনতে পারে ডিমেনশিয়া! এক কালে কথায় কথায় বলা হত, জীবনের ৩ ভাগের ১ ভাগ ঘুমিয়ে কাটায় মানুষ। তা নিয়ে ভাল-মন্দ কথারও শেষ ছিল না। নিজের দিনটা বড় করে নেওয়া, সময়টা বেশি কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে করতে এমন হল যে, অধিকাংশের রোজের জীবনে ঘুমের গুরুত্ব প্রায় তলানিতে। সমস্যা এমনই আকার নিয়েছে যে, রাতে কম ঘুম হওয়াকে মহামারি বলতে বাধ্য হচ্ছেন চিকিৎসকেরা। কারণ এই ব্যবস্থা ডেকে আনছে নানা রকমের অসুস্থতা। এর থেকে শুধু ডিমেনশিয়াই নয়, মানসিক চাপ, হাটের্র অসুখ, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা— ভয় বাড়ছে সবেরই।

অনেকেরই মনে হয় কাজের চাপ বেশি না থাকলে, রাতে কম ঘুমোলেও অসুবিধে নেই। আসলে রাতে নিয়মিত কম ঘুম থেকে আসে এক অপূরণীয় ক্লান্তি। দিনেরবেলা কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিয়ে সে ক্লান্তি থেকে মোটেই নিস্তার পাওয়া সম্ভব নয়। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, এক রাতের কম ঘুমও রীতিমতো ক্ষতিকর। সেই ক্লান্তিই ধীরে ধীরে ডেকে আনতে পারে স্মৃতিশক্তি সংক্রান্ত সমস্যা। উল্টো দিকে, পর্যাপ্ত ঘুম যে কাউকে অনেক বেশি চনমনে রাখে, বাড়ে ততই কর্ম ক্ষমতাও। মনোরোগ চিকিৎসক অনিরুদ্ধ দেব এ বিষয়ে বলেন, ‘‘কম ঘুম হওয়া এখন দিন দিন মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। এর থেকে শুধু মানসিক সমস্যাই নয়, হৃদরোগও হতে পারে।’’ তাঁর বক্তব্য, মানুষের স্বাভাবিক নিয়ম হল দিনে জেগে কাজ করা এবং রাতে আট ঘণ্টা ঘুমোনো। সেই নিয়ম না মানতে পারার ফলেই দিন দিন জীবনধারা সংক্রান্ত নানা ধরনের অসুস্থতা বাড়ছে।

হৃদরোগ চিকিৎসক শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন, কম ঘুম থেকে হার্টের সমস্যা রীতিমতো গুরুতর। তিনি বলেন, ‘‘রাতে অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম না হলে রক্তচাপ বাড়ে। এস্কেমিক হাটের্রও সমস্যা হতে পারে।’’ ফলে রাত জেগে সিনেমা তো দূরের কথা, কাজটাও কম করলেই ভাল থাকবে শরীর।

তথ্যসূত্র:

  • মনোরোগ চিকিৎসক অনিরুদ্ধ দেব,
  • হৃদরোগ চিকিৎসক শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়,
  • আনন্দবাজার।
  • জি নিউজ।
  • একে।
  • কালের কণ্ঠ।
  • এএইচ -) ETV
  • Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই

Popular Post

Blogger দ্বারা পরিচালিত.