স্ক্যাবিস বা খোশ পাঁচড়া থেকে মুক্ত থাকবেন যেভাবে?
স্ক্যাবিস এক প্রকার চর্মজনিত রোগ যা খুব সহজেই স্কিনের এ রোগটি 'সারকোপটিস স্ক্যাবি' নামক মাইট বা জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হয়। এর প্রধান লক্ষণ হল শরীরে চুলকানি ও গুটি গুটি র্যাশ ওঠা। স্পর্শের মাধ্যমে সাধারণত এ রোগ হয়। তাছাড়া রোগীর ব্যবহৃত কাপড় গামছা, বিছানার চাদর ও বালিশ ব্যবহার করলে এ রোগ হতে পারে। বিশেষ করে শিশুরা এতে ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হয়ে থাকে ৷ প্রথমবার সংক্রমণে একজন ব্যক্তির সাধারণত দুই থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে উপসর্গ দেখা দেয়। দ্বিতীয় সংক্রমণের লক্ষণগুলি ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই শুরু হতে পারে। এই উপসর্গগুলি শরীরের বেশিরভাগ অংশে, যেমন-কব্জি, আঙ্গুলের ভিতর বা কোমরের আশেপাশে উপস্থিত হতে পারে। রাতের বেলা চুলকানির তীব্রতা আরও বাড়ে।
![]() |
| স্ক্যাবিস। |
উপসর্গ:
খুব সহজেই স্কিনের স্ক্যাবিস রোগটি সারকোপটিস স্ক্যাবি নামক মাইট দ্বারা সংক্রমিত হয়। এ ক্ষুদ্র পরজীবী জীবাণুটি ত্বকের অগভীরে ডিম পাড়ে এবং বারোজ তৈরি করে। জীবাণু দ্বারা আক্রমণের ২ থেকে ৬ সপ্তাহের মধ্যে উপসর্গ দেখা দেয়।
যেমন-এর প্রধান লক্ষণ হল শরীরে চুলকানি ও গুটি গুটি র্যাশ ওঠা। ভীষণ ও তীব্র চুলকানি হয়, তীব্র চুলকানি যা বিকেলের দিকে শুরু হয় এবং রাতে আরও তীব্র আকার ধারণ করে এবং অসহনীয় পর্যায়ে চলে যায়। এমনকি চুলকানির কারণে রাতে ঘুম ভাঙতে পারে। সারা শরীরেই স্ক্যাবিস হতে পারে। তবে হাত, হাতের আঙুলের ফাঁকে, কনুই, বগল, কবজি, নাভি ও নাভির চার দিকে ছোট ছোট দানা বা গুটি দেখা দেয়। তবে এ গুটিগুলো মুখ, মাথা বাদে সমস্ত শরীরে দেখা দিতে পারে। লজ্জাস্থান, আঙুলের ফাঁকে দেখা দিতে পারে, স্তন, পশ্চাদ্দেশ ইত্যাদি জায়গায় বেশি হয়। শিশুর মাথা–মুখেও হতে পারে। চুলকাতে চুলকাতে অনেকে ত্বক ছিঁড়ে ফেলেন, রক্ত বের করে ফেলেন। এতে ঘা বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণও হতে পারে। স্ক্যাবিস শিশু, কিশোর, বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবারই হতে পারে।
![]() |
| পায়ের স্ক্যাবিস। |
![]() |
| বাহুর স্ক্যাবিস। |
![]() |
| আঙ্গুলের স্ক্যাবিস |
![]() |
| হাতের স্ক্যাবিস। |
- শরীরের গুপ্তস্থানে,
- আঁটসাট পোশাকের নিচে,
- দুই আঙুলের ফাঁকে বা নখের নিচে,
- কনুই বা কবজির ওপরে,
- নিতম্ব বা কোমরের নিচে,
- স্তন বৃন্তের চারদিকে,
- পুংলিঙ্গের ওপরে,
- ঘড়ি, চুড়ি বা আংটির নিচে মথটি লুকিয়ে থাকতে পারে,
- শিশুদের ক্ষেত্রে হাত ও পায়ের তালু, মাথাসহ শরীরের যেকোনো জায়গায় হতে পারে।
স্ক্যাবিস একটি বিরক্তিকর ও বিব্রতকর এবং খুবই পরিচিত সমস্যা। বাংলায় একে বলা হয় খুজলি বা খোসপাঁচড়া। এর সঙ্গে শীতের বা বাতাসের আর্দ্রতার সরাসরি কোনো সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তারপরও দেখা গেছে, শীত এলেই এ সমস্যা ব্যাপক আকারে বাড়ে। বিশেষ করে, শিশুরা এতে ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হয়।
ঘনিষ্ঠ স্পর্শের মানুষের মধ্যে স্ক্যাবিস ছড়ায়। অর্থাৎ স্ক্যাবিসের জন্য তারা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ যারা অন্যদের সাথে শারীরিক স্পর্শে আসে যেমন, শিশু, শিশুদের মা, যৌনকার্য সক্ষম পরিণত নর-নারী, ছেলেমেয়ে, বন্ধু-বান্ধব অথবা পরিবারের অন্য যেকোনো সদস্য স্ক্যাবিসের উৎস হতে পারে। ঘনবসতিপূর্ণ জায়গা যেমন শিশু সদন, এতিমখানা, জেলখানা, ছাত্র-ছাত্রীর আবাসিক মেছগুলোতে, হাসপাতাল ইত্যাদিতে স্ক্যাবিস সহজে ছড়াতে পারে। যাদের মধ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব রয়েছে এবং যারা একই বিছানা, পরিধেয় বস্ত্র ভাগাভাগি করে ব্যবহার করে তাদের মধ্যে এ রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যায়। এক বিছানায় একত্রে অনেকেই গাদাগাদি করে ঘুমালে, এক তোয়ালে বা বালিশ–চাদর ব্যবহার করলে একজন থেকে আরেকজনে ছড়ায় এ রোগ। এ ছাড়া অনেক শিশু বিদ্যালয় থেকেও স্ক্যাবিসে আক্রান্ত হয়।
স্ক্যাবিস আসলে একটি সংক্রামক রোগ। ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া নয়, এটি একধরনের কীটের কারণে হয়। এই কীটের নাম স্ক্যাবিয়াই সারকপটিস স্ক্যারিবাই। এটি ত্বকের মধ্যে বাসা বাঁধে, ডিম পাড়ে।
তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত দেশে এর প্রকোপ বেশি। কারণ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও অপরিচ্ছন্নতার কারণে এ রোগগুলো বেশি হয়ে থাকে। আক্রান্ত ব্যক্তির তোয়ালে, বালিশ ও বিছানার চাদর দ্বারা এ রোগটি সংক্রমিত হয় বলে ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক মেছগুলোতে এ রোগটির প্রাদুর্ভাব বেশি।
![]() |
| মানুষের দেহে চুলকানি আক্রান্ত হওয়ার কিছু সাধারন জায়গা। |
সাধারণ কিছু হাইজিন বা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে এ ধরনের বিরক্তিকর রোগ এড়ানো সম্ভব। আবার একটু অবহেলার কারণে কিডনি ও হৃদযন্ত্রের জটিলতাসহ বিভিন্ন ধরনের জটিলতা দেখা দেয়। পরিবারের সদস্যদের তোয়ালে, জামাকাপড় আলাদা থাকা উচিত। এ ছাড়া একজনের বিছানার চাদর, বালিশ অন্যের ব্যবহার করা উচিত নয়। জামাকাপড় ও নিয়মিত ব্যবহার্য জিনিস নিয়মিত সাবান দিয়ে ধুয়ে কড়া রোদে শুকালে বা ভালো করে ইস্তিরি করলে নিরাপদ থাকবেন। খোসপাঁচড়া হলে অনেকে ভালো করে সাবান মাখেন, কেউ জীবাণুনাশক দিয়ে গোসল করেন। এতে চুলকানি আরও বাড়ে। কাজেই আক্রান্ত জায়গায় সাবান, জীবাণুনাশক ইত্যাদি না লাগানোই উচিত। এ ছাড়া চুলকানি বাড়ে এমন অ্যালার্জি জাতীয় খাবারও এড়ানো উচিত।
স্ক্যাবিসের চিকিৎসায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পারমিথ্রিন ক্রিম বা বেনজাইল বেনজোয়েট লোশন ইত্যাদি সঠিক নিয়মে ব্যবহার করতে হবে। এগুলো লোশন ও ক্রিম হিসেবে পাওয়া যায়, যা পা থেকে গলা পর্যন্ত মেখে ৮-১০ ঘণ্টা রাখতে হয়। তাই চিকিৎসকরা রাতে শোবার আগে এ ওষুধগুলো ব্যবহার করতে বলে থাকেন। তবে পরিস্থিতি বেশি খারাপ হলে বা ঘা হয়ে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হলে অ্যান্টিবায়োটিক লাগতে পারে। চুলকানি কমাতে অ্যান্টিহিস্টামিন খাওয়া যাবে। তবে ইনফ্যাকটেড স্ক্যাবিসের ক্ষেত্রে এন্টি-বায়োটিক সেবন করার প্রয়োজন হতে পারে এবং পরে স্ক্যাবিসের চিকিৎসা নিতে হবে। পারমিথ্রিন ক্রিমের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ত্বক সাময়িক জ্বালা-পোড়া করতে পারে। আবার স্ক্যাবিস দ্বারা আক্রান্ত হলে চর্ম বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
স্ক্যাবিস চিকিৎসায় আইভারমেক্টিন নামক মুখে খাবার ওষুধ পাওয়া যায়, যা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে সেবন করা উচিত। শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের এ ওষুধ দেয়া হয় না।
ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে আসেন এমন সবারই একসঙ্গে চিকিৎসা নিতে হবে। চিকিৎসা নেওয়ার পর সব কাপড়চোপড়, চাদর, তোয়ালে, বালিশ, গরম সাবান–পানি দিয়ে ধুয়ে কড়া রোদে শুকাতে হবে। কড়া রোদ না পেলে কাপড় শুকানোর পর ইস্তিরি করে নিতে হবে। সম্ভব হলে বিছানার তোষক–গদিও রোদে দিন।
আইভারমেক্টিন-একবার ব্যবহার করলেই আইভারমেক্টিন স্ক্যাবিস দূর করতে বেশ কার্যকর। শক্ত হয়ে যাওয়া স্ক্যাবিসের চিকিৎসায় এটিই সর্বোত্তম চিকিৎসা। ছয় বছরের কম বাচ্চাদের জন্য এটা ব্যবহার করা নিষেধ।পুরোপুরি নিরাময়:
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে, নিয়মিত সাবান দিয়ে গোসল করতে হবে, স্ক্যাবিস আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক স্পর্শ থেকে দূরে থাকতে হবে, স্ক্যাবিস আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত পোশাক বা বিছানা ব্যবহার না করা। সম্পূর্ণরূপে স্ক্যাবিস নিরাময় করতে হলে আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত পোশাক, বিছানার চাদর সবকিছু গরম পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে এবং ভালোভাবে রোদে শুকাতে হবে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাই স্ক্যাবিস রোধের মোক্ষম উপায়। প্রতি বছর বিশ্বের জনসংখ্যার ১-১০ ভাগ লোক স্ক্যাবিসে আক্রান্ত হয়। তাই বলে স্ক্যাবিস কোনো হুমকি নয়। এ রোগের উপসর্গ দেখা মাত্রই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সহজেই স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে মুক্ত থাকতে পারেন।
তথ্যসূত্র:
- ডা. রাশেদ মোহাম্মদ খান, অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল,
- ডার্মাটোলজিস্ট, ডা. তাওহীদা রহমান,
- সমকাল।
- উইকিপিডিয়া।
- ডা. এ এস এম বখতিয়ার কামাল, সহকারী অধ্যাপক (চর্ম ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ) ঢাকা মেডিকেল কলেজ, প্রথম আলো।
- ডা: মুহাম্মদ জিয়াউল হায়দার, সহকারী রেজিস্ট্রার, মেডিসিন বিভাগ, মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল, বগুড়া, ফোন : ০১৭১২০৪০০৯৬.
- Edited: Natural_Healing.







কোন মন্তব্য নেই