ঘুম না আসলে কিছু নিয়ম মেনে চলুন
কেন ঘুম আসে না?
ভালো ঘুমের জন্য চাই যথাযথ প্রস্তুতি। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার নিয়ম মেনে চললে অনেক অসুখ থেকেই দূরে থাকা সম্ভব। ভালো ঘুমের জন্য বাদ দিতে হবে কিছু অভ্যাস। কারণ সেই অভ্যাসগুলোই ঘুম না আসার জন্য দায়ী।
আমরা যখন ঘুমাই, তখন শরীরে অদ্ভুত সব ঘটনার ঘনঘটা ঘটে—আমরা কখনো অনেক দূরে চলে যাই স্বপ্নের ভুবনে—কী আশ্চর্য সফলতার সঙ্গে শরীর তখন নিজের দেখভাল নিজেই করে!
ঘুম হয় নানা স্তরে। আমরা নেমে আসি অনেক সময় গভীর ঘুমের স্তরে, হঠাৎ আমরা যখন জেগে উঠি, এ যেন ঘুমের অতল থেকে ওপরে উঠে আসা, আবার আমরা অনেক সময় থাকি নিদ্রাও জাগরণের সীমান্তে।
অনেক সময় আমাদের ঘুম হয় না। জেগে জেগে কাটে রাত। চোখের পাতা এক হয় না। দুশ্চিন্তা, অফিসের কাজ, পরীক্ষা, বিয়ে সামনে... ভালো-মন্দ অনেক কারণেই তো কাটে নির্ঘুম রাত। সারা রাত বিছানায় এপাশ-ওপাশ।
বিজ্ঞানীরা বলেন, সুনিদ্রা যাতে হয়, এরও উপায় আছে। স্লিপ হাইজিন বা নিদ্রাবিধি। মন ও শরীরকে শান্ত, সতেজ ও সবল রাখে। আছে কিছু পরামর্শ, যেগুলো মানতে পারলে সুনিদ্রা হবে। কী করলে ঘুম আসবে?
> প্রথমে ঘুম না হওয়ার কারণ খুুঁজে বের করতে হবে। শারীরিক কোনো অসুস্থতা কিংবা মানসিক চাপ থেকে ঘুমের সমস্যা হলে সেই কারণটি দূর করতে হবে।
> ঘুমেতে যাওয়ার সবচাইতে পারফেক্ট সময় হল রাত ১০টা/১১টা থেকে রাত্রি ৩টা/৪টা পর্যন্ত। এর আগে এবং পরের ঘুমগুলি ভালো এবং গভীর ঘুম হবে না।
> ঘুম না এলে বিছানায় শুতে যাওয়া ঠিক নয়। ঘুম না এলে এমন কিছু করতে হয়, যাতে মন শিথিল হয়। পড়ুন একটি হালকা ধরনের বই, শুনতে পারেন নরম সুরের কিছু। এতে শরীর শিথিল হবে, মন যাবে অন্য কোথাও।
> ২০ মিনিট পর্যন্ত ঘুম আসছে না? তাহলে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়া ভালো। এমন কিছু খুঁজে নিতে হবে, যা করলে মন শিথিল হয়। বিরক্তি বা রেশ কেটে না গেলে ঘুমাতে যাবেন না।
> মোবাইল বা ল্যাপটপে স্ক্রল: ঘুমানোর আগে টিভি দেখা, লেখাপড়া, অফিসের কাজ করা, মোবাইল ফোনে কাজ অথবা কথা বলা—এসব কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। এই বদ অভ্যাসই আপনার ঘুমকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। এর ফলে স্ক্রিনের নীল আলো চোখের বারোটা তো বাজায়ই, সেইসঙ্গে ঘুমের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে। ডিজিটাল স্ক্রিন মস্তিষ্ক থেকে মেলাটোনিন নিঃসরণে বাধা দেয়। মেলাটোনিন আমাদের ঘুমাতে সাহায্য করে। এখন থেকে ঘুমের সময় সব রকম গ্যাজেট থেকে দূরে থাকুন। শোবার ঘরে মৃদু আলো, তাজা ফুল, সুঘ্রান রাখতে পারেন।
> ভয়ের কোনো সিনেমা বা কার্টুন: ঘুমাতে যাওয়ার আগে সিনেমা দেখার অভ্যাস থাকে অনেকের। থ্রিলার মুভি দেখা অনেকেরই পছন্দের কাজ। কিন্তু এ ধরনের সিনেমা দেখলে শরীরে অ্যাড্রিনালিনের নিঃসরণ হয়। এর ফলে দূরে পালায় ঘুম। তাই ঘুমাতে যাওয়ার আগে ভয়ের কোনো সিনেমা দেখা থেকে বিরত থাকুন।
> শোবার ঘর হবে শান্ত, অন্ধকার কিন্তু শীতল। শব্দহীন, স্নিগ্ধ ও নিরিবিলি পরিবেশ, আরামদায়ক ও পরিপাটি বিছানা-বালিশ, প্রথমে হালকা আলো জ্বেলে শোয়ার পরিবেশ তৈরি করুন এরপর নিভিয়ে দিন। যেন গুহার মধ্যে শয়ন। বাদুড়ের মতো ঘুম। বাদুড় ঘুমায় ১৬ ঘণ্টা। গুহার সাপ শীতলতায় থাকে বলেই এত নিদ্রা।
> চেষ্টা করবেন একই সময়ে শুয়ে পড়তে। আবার একই সময়ে ঘুম থেকে উঠে পড়বেন। ছুটির দিনগুলোতেও এই নিয়ম মেনে চলবেন।
> ঘুমানোর আগে হালকা গরম পানিতে গোসল করলে সতেজ লাগবে।
> দিনের বেলা না ঘুমানোই ভালো। ঘুমালেও বিকেল তিনটার পর ২০ মিনিটের বেশি ঘুমাবেন না।
> জীবনযাপনের সব ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে চললে দেখবেন ঘুম চলে আসছে।
> দুপুরে খাবারের পর থেকে ক্যাফেইন-জাতীয় ও পানীয় নয়। অর্থাৎ চা-কফি, চকলেট নয়।
> ধূমপান ও অ্যালকোহল বাদ দিতে হবে।
> খিদেপেটে শুতে যাবেন না, আবার ভরপেটেও যাবেন না শুতে।
> নিয়মিত ব্যায়ামে ঘুম আনে। দিনে আধঘণ্টা ব্যায়াম যথেষ্ট। দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা। শুতে যাওয়ার আগে আগে ব্যায়াম নয়। ব্যায়াম দিনের প্রথম দিকে বা বিকেলে।
> দিনে যত পারেন দিনের আলো লাগাবেন শরীরে, আলো যেন ঢোকে বাসগৃহে, অফিসঘরে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
ঘুমের বড়ি সেবন ঠিক নয়৷ তবে চিকিৎসকের পরামর্শে বিশেষ ক্ষেত্রে হতে পারে। এসবের পরও ঘুমের সমস্যা থাকে। কেবলই কি বিনিদ্র রজনী? হয়তো তা নয়। ঘুমিয়ে পড়তে যা সমস্যা। অনেকে ঘুমিয়ে পড়েন ঠিকই, কিন্তু মাঝরাতে ঘুম ভাঙে। বিচ্ছিরি অবস্থা, আবার ঘুমিয়ে পড়তে কষ্ট। অনেকের রাতে ঘুম হলেও ঘুম ভাঙে খুব ভোরে। আবার অনেকের রাতে ঘুমের সমস্যা নেই, কিন্তু ঘুম থেকে উঠলে মনে হয় না বিশ্রাম হয়েছে।
মাঝেমধ্যে ঘুম হলো না রাতে, নিদ্রাবিধি মেনে দেখুন। ঘুমের সমস্যা যদি হয় দীর্ঘদিনের সমস্যা, সপ্তাহে তিন-চার দিন অনিদ্রা, চলছে এ রকম তিন সপ্তাহের বেশি, দুই মাস হয়ে গেল অথচ না ঘুমানোর তেমন কোনো কারণ নেই। দিনে ঘুম ঘুম ভাব, কাজে মন বসে না, মেজাজ খিটখিটে হয়।
ক্লান্তি তো আছেই সঙ্গী হিসেবে। এমন ক্রনিক অনিদ্রার জন্য প্রয়োজন পেশাদারি পরামর্শ। চাই চিকিৎসকের সাহায্য। ঘুমের ঘাটতি হলে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা খর্ব হয়, বেড়ে যায় ডায়াবেটিস-হৃদ্রোগ হওয়ার প্রবণতা। ঘুমের সমস্যার সঙ্গে জড়িত বেশ কিছু সমস্যা থাকে। যেমন ঋতুবন্ধ, বিষণ্নতা। খুব ভোরে জেগে ওঠা বিষণ্নতার একটি লক্ষণও বটে। অন্যগুলো হলো রেস্টলেস লেপস সিনড্রোম আর স্লিপ অ্যাপনিয়া। স্লিপ অ্যাপনিয়া হলে বোবায় ধরে, মাঝেমধ্যেই শ্বাসরোধ হয়। কেউ কেউ ঘুমের মধ্যে হাঁটেন অজান্তে, এরও চিকিৎসা চাই। এমন হলে নির্ঘুম কয়েকটি রাত নয়, এ হলো অনিদ্রা রোগ। তখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া প্রয়োজন। ভয়ের কারণ নেই, চিকিৎসা হলে অনিদ্রা ও নিদ্রাবৈকল্য—সবই ভালো হয়।
তথ্যসূত্র:
- অধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী, লেখক: পরিচালক, ল্যাবরেটরি সার্ভিসেস, বারডেম, প্রথম আলো।
- আনন্দবাজার।
- সময় টিভি।
- মানবকণ্ঠ।
- Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই