First Aid Present

Lifestyle Modification এবং প্রাকৃতিক খাদ্য, পানীয়, শাকসবজি, গাছ, ডালপালা, ফল, মসলা, পাতা ও ফুল ইত্যাদির দ্বারা প্রাথমিক চিকিৎসা।

মানসিক চাপ কমানোর কৌশলগত কিছু উপায়

মানসিক চাপ এমন একটা সমস্যা, যা থেকে চটজলদি রেহাই পাওয়া মুশকিল! বিভিন্ন কারণে আমরা অনেকেই দিনের বেশির ভাগ সময় মানসিক চাপের মধ্যে কাটাই যার প্রভাব পড়ে আমাদের শরীরের ওপরেও। মানসিক চাপ থেকে দেখা দিতে পারে উচ্চরক্তচাপ, অনিদ্রা, হজমের সমস্যা এমনকি স্নায়ুর সমস্যাও।

মানসিক চাপ সম্পর্কিত ডাক্তার জাহাঙ্গীর কবীর এর ভিডিও দেখতে এখানে ক্লিক করুন-...

তাই সুস্থ থাকতে সবচেয়ে আগে আমাদের উদ্বেগ বা মানসিক চাপ দূর করা উচিত। উদ্বেগ বা মানসিক চাপ কি চাইলেই দূর করা যায়? নিশ্চয়ই যায়। যেসব কারণে এই মানসিক চাপ তৈরি হয় তার মধ্যে রয়েছ-আমাদের বাস্তবতাকে মানতে না পারা, ক্লান্তিকর কাজ, ত্রুটিপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস, দূষণ এবং আলস্য। আর এসব কারণে সৃষ্ট মানসিক চাপে পড়ে এক-একজন করে ফেলছেন এক-এক রকম আচরণ।

*প্রথমত জানতে হবে মানসিক চাপের কারণে যেসব লক্ষণ দেখা দেয় তাৎক্ষণিকভাবে সেগুলো আমাদের প্রতিরক্ষার জন্য, আমাদের নিরাপত্তার জন্য তৈরি হয় এবং এটি প্রাকৃতিক ও শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। এতে ঘাবড়ে গেলেই বিপদ। তাই মানসিক চাপ তাৎক্ষণিক মোকাবেলা করার মনোবল রাখতে হবে। কেউ দীর্ঘদিন মানসিক চাপে থাকলে যেসব লক্ষণ দেখা দেয়, সেগুলো শনাক্ত করতে হবে এবং সেগুলোর ক্ষতিকারক প্রভাব কমানোর জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে।

* দ্বিতীয়ত যেসব সমস্যার কারণে মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে যেসব সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করতে হবে। সেক্ষেত্রে তাড়াহুড়া না করে ধীরস্থির হয়ে, বিচক্ষণতার সঙ্গে সমস্যার সমাধান করতে হবে। প্রয়োজনে প্রফেশনাল কারও সহায়তা নেয়া যেতে পারে।

কোনো কিছু নিয়ে বেশি মানসিক চাপ নেওয়া যাবে না। মানসিক চাপ থেকে শারিরীক অসুস্থতা হতে পারে।

মানসিক হতাশায় অফিস-পরিবার—দুই জগতেই আমরা বাধিয়ে ফেলি ভজকট।

হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ-এর তথ্যমতে, কর্মক্ষেত্রে তাঁরাই সফল হন যাঁরা ব্যক্তিগত জীবনের চাপ আর অফিসের চাপ আলাদা করে মানিয়ে নেন। বাড়ির চিন্তা কর্মক্ষেত্রে মাথায় নিলে কাজে যেমন ব্যাঘাত ঘটে, তেমনি অফিসের কাজের চাপ বাড়িতে করলে পারিবারিক জীবনে দুশ্চিন্তা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। ব্যক্তিগত জীবন আর অফিসজীবনের চাপ মোকাবিলার জন্য আমেরিকায় নিয়মিত অফিসের কর্মীদের মানসিক চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেয় বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়েকআপ বাংলাদেশের পরামর্শক রুবিনা খান চাকরির মানসিক চাপ সামলানোকে একজন কর্মীর ব্যক্তিত্বের স্বকীয়তা হিসেবে মনে করেন। তিনি বলেন, ‘চাকরি আর ব্যক্তিজীবনের বিভিন্ন চাপকে আলাদা করেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত প্রত্যেক মানুষের। চাকরি আর ব্যক্তিগত জীবনের চাপ মিলিয়ে ফেললে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। শুধু তা-ই নয়, মানসিক চাপের কারণে হতাশায় জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে।’ 

মানসিক চাপ থেকে মুক্ত থাকতে হলে শরীরের পাশাপাশি মনের যত্নও নিতে হবে।  এমন কিছু টেকনিক আছে, যা অবলম্বন করলে উদ্বেগ, মানসিক চাপ নিমিষেই কেটে যেতে পারে। আসুন সেগুলো সম্পর্কে জেনে নেই-

  • রুটিন মেনে চলা: খাওয়া, ঘুম, বিশ্রাম, কাজ সব যেন রুটিন মেনে হয়। রাতের বেলা ঘুমাতে হবে আর দিনে কাজ করতে হবে। যদি এর উল্টোটা হয়ে যায় তবে মস্তিষ্কের ‘বায়োলজিক্যাল ক্লক’ এলোমেলো হয়ে যায়, যা মানসিক চাপের উদ্রেক করতে পারে।
  • সময়ের সদ্ব্যবহার: সঠিকভাবে সময়ের সদ্ব্যবহার করুন। অযথা সময় নষ্ট করলে দিন শেষে মানসিক চাপ বাড়বে।
  • মনকে শান্ত করার বিশেষ জায়গা: কাজের ফাঁকে কিছুক্ষণের নীরবতা মাঝে মাঝে শরীর ও মনকে এতটাই শান্ত করতে পারে যে মানসিক চাপ বা স্ট্রেসের বিরুদ্ধে তা ঠিক যেন ওষুধের মতো কাজ করে৷ তাই বাড়ির কোথাও একটি খালি ঘরে দিনে ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় কাটাতে পারেন৷ যারা বড় শহরে থাকেন, তারা চলে যান কোনো মিউজিয়ামে বা লাইব্রেরিতে৷ আর শরীর ও মনকে শান্ত করতে পারে মসজিদ, মন্দির বা গির্জার মতো ধর্মীয় স্থানগুলোও৷ নিয়মিত প্রার্থনা ও দোয়া-দরুদ ধর্মপ্রাণ মানুষের মনোবল বাড়ায়, মনে শান্তি আনে।

  • সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন: যাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু থাকে, প্রয়োজনে পাশে থাকার সঙ্গী থাকে, পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় থাকে তাদের ওপর মানসিক চাপের নেতিবাচক প্রভাব খুব পরিলক্ষিত হয় না। কারণ তাদের অক্সিটোসিন হরমোন বেশি নিঃসরণ হয়, যা উদ্বেগ কমায় এবং মনকে শান্ত রাখে। তাই সুস্থ থাকতে হলে প্রকৃত বন্ধুর সংখ্যা বাড়াতে হবে, পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে হবে। যদি ঘনিষ্ঠ কারও সঙ্গে সমস্যা তৈরি হয় এবং তা মানসিক চাপের কারণ হয় তাহলে সেই সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাতে চেষ্টা করতে হবে।
  • বাস্তবতাকে মেনে নেয়া: আমরা অনেকেই হয়তো যেভাবে জীবনকে পরিচালিত করতে চাই, জীবনে যতটা সফল হতে চাই তা হতে পারি না। সেক্ষেত্রে বাস্তবতাকে মেনে নেয়ার মতো দৃষ্টিভঙ্গি রাখতে হবে, অন্যকে এবং নিজেকে ক্ষমা করার জন্য গুণাবলী অর্জন করতে হবে। জীবনের যে কোনো অবস্থায় নিজেকে ভালোবাসতে হবে। নিজের প্রতি যত্নশীল হতে হবে। হয়তো খুব কাছের কারো বিপর্যয়, মৃত্যু বা চলে যাওয়া আপনাকে বিপর্যস্ত করেছে। এতে দুঃখিত হলেও বিষয়টি নিয়ে ভাবা বন্ধ করুন। অতীত ফিরিয়ে আনা অসম্ভব। তাই মেনে নিন।
  • কোনো বিষয়ে অযথা কিংবা অযৌক্তিক দুশ্চিন্তা করবেন না। সমস্যার সমাধান দুশ্চিন্তা দিয়ে নয়, বুদ্ধি দিয়ে করুন।
  • ব্যায়াম: মানসিক চাপ কমানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো নিয়মিত ব্যায়াম (নির্দিষ্ট সময়ে, নিয়মিত ৪৫ মিনিট বিভিন্ন প্রকার শরীরচর্চা যেমন- হাঁটা, সাঁতার কাটা, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা, সাইকেল চালানো ইত্যাদি) করা। কারণ, ব্যায়ামের ফলে দেহের স্ট্রেস হরমোন (যেমন—কর্টিসল) কমে যাবে। এর ফলে, শরীরে (মস্তিষ্ক থেকে) অ্যান্ডোর্ফিন নামের রাসায়নিক উপাদান (হরমোন) নিঃসৃত হবে, যা মানসিকতাকে চাঙা করবে, কাজ করার শক্তি যোগাবে। এটি প্রাকৃতিক ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করবে। কেবল তাই নয়, নিয়মিত ব্যায়ামে ভালো ঘুম হবে, যা মানসিক চাপ ও দুঃশ্চিন্তা কমাবে।
  • পর্যাপ্ত ঘুম: ঘুম, অবসাদ ও ক্লান্তি দূর করতে টনিকের মতো কাজ করে। মানসিক চাপ কমাতে পর্যাপ্ত ঘুম অপরিহার্য। নিয়মিত, পর্যাপ্ত ঘুম শরীর এবং মনের ক্লান্তি দূর করে, শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াগুলোকে সচল রাখতে সহায়তা করে।
  • গভীর শ্বাসপ্রশ্বাস: ব্রিদিং রিলাক্সেশন বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করতে হবে। শরীর প্রশান্ত করতে এটি অত্যন্ত কার্যকরী পদ্ধতি। নাক দিয়ে বুক ভরে শ্বাস নিয়ে কিছুক্ষণ ধরে রেখে মুখ দিয়ে ধীরে ধীরে ছাড়তে হবে। এ প্রক্রিয়া চলাকালীন সম্পূর্ণ মনোযোগ শ্বাস-প্রশ্বাসের গতিবিধির ওপর প্রদান করতে হবে। ১০ মিনিট করে দৈনিক ৩/৪ বার এই ব্যায়ামটি করতে হবে। এতে মন শান্ত হবে, মানসিক চাপ কমবে। 
  • কাজের ফাঁকে বিশ্রাম: বাড়তি কাজ মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। তাই কাজের ফাঁকে বিরতি নিন, এ সময় ইতিবাচক কিছু করার চেষ্টা করুন। শরীর এবং মন দু’টোরই মাঝে মাঝে ভালোভাবে বিশ্রামের প্রয়োজন হয়৷ বিশেষ করে যাঁরা সারাদিন কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করেন, তাঁদের মানসিক চাপে রক্তে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়৷ এক্ষেত্রে কাজের ফাঁকে খানিকক্ষণ মুক্ত বাতাসে হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করলে আবার বেশ তরতাজা বা ফ্রেশ হয়ে কর্মস্থলে ফেরা যায়৷ মাঝেমধ্যে কাজের বিরতিতে কোথাও থেকে ঘুরে আসুন। কর্মবিরতি উপভোগ করুন পরিবারের সঙ্গে। এতে মন প্রফুল্ল থাকে আর কাজেও।
  • একসঙ্গে অনেক কাজ নয়: সব কাজ সাজিয়ে নিয়ে তালিকা অনুযায়ী ধাপে ধাপে কাজ করুন। একসঙ্গে অনেক কাজ শুরু করবেন না। প্রয়োজনে কাজ ভাগাভাগি করে গ্রুপ আকারে কাজ শেষ করুন।
  • অসম্ভব প্রতিশ্রুতি নয়: চক্ষুলজ্জার কারণে প্রতিশ্রুতি দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। আপনার জন্য যা কষ্টকর এমন কিছু প্রতিশ্রুতি সব সময় দেবেন না। শালীনভাবে ‘না’ বলতে শিখুন।
  • সবুজ প্রকৃতি সুস্থ রাখে: নেদারল্যান্ডের গবেষকরা খুঁজে বের করেছেন যে, সবুজ রং মানুষের নার্ভকে একদিকে যেমন শান্ত রাখে তেমনি আনন্দিতও করে৷ কারণ সমীক্ষায় জানা যায়, যাঁরা শহরের কেন্দ্রস্থলে বসবাস করেন তাঁদের চেয়ে যাঁদের বাড়িতে বাগান আছে বা সবুজে ঘেরা বাগানের কাছাকাছি বসবাস করেন, তাঁরা মানসিকভাবে সুস্থ থাকেন৷ তাই সবুজ কোন জায়গায় গিয়ে ঘাঁসের উপরে খালিপায়ে হাটতে পারেন।
  • অন্যান্য কাজ: বই পড়ে, তিলাওয়াত শুনে, বাগান করে বা অন্য কোনো শখের কাজ করে  কেউ কেউ মানসিক চাপমুক্ত হতে পারেন। হাসি-খুশি, প্রাণবন্ত থাকার চেষ্টায় বিভিন্ন কাজ করতে পারেন। প্রাণবন্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে। কৃত্রিম হাসিও মানুষকে চাপমুক্ত করতে সহায়ক।
  • মানসিক চাপ বাড়ে এমন বিষয় পরিত্যাগ: পারিবারিক দ্বন্দ্ব, কলহ, মাদকের নেশা, অনিয়ন্ত্রিত রাগ, অহেতুক হিংসা-কুটিলতা, অন্যায্য শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নিজের মত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, পেশাজীবনে অনৈতিকতার চর্চা ইত্যাদি মনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে; এগুলো এড়িয়ে চলুন।

কোন পদ্ধতি কতটা কার্যকর হবে তা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে।

তথ্যসূত্র: 

  • বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়েকআপ বাংলাদেশের পরামর্শক রুবিনা খান, 
  • হেলথ জার্নাল> বাংলাদেশ প্রতিদিন।
  • কালের কণ্ঠ।
  • যুগান্তর।
  • প্রথম আলো।
  • সময় টিভি।
  • ডয়চে ভেলে।
  • Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই

Popular Post

Blogger দ্বারা পরিচালিত.