প্যানিক অ্যাটাক! যেভাবে মোকাবেলা করবেন
শরীর এবং মন এই দুয়ে মিলে হয় মানুষ। তাই এদের একটির ওপর আরেকটির প্রভাব অপরিসীম। শরীর এবং মন এদের একটিকে আরেকটি নানাভাবে প্রভাবিত করে। মানসিক রোগগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রোগ বা ব্যধি হল Phobic anxiety disorder এবং এর আরেকটা রূপ হল Specific phobia. এ রোগের ক্ষেত্রে রোগীর প্রচণ্ড ভীতি তৈরি হয়, অবশ্যই অহেতুক ভীতি, কোনো বিশেষ বস্তু বা অবস্থার প্রতি। খুব বেশি ভীতির মধ্যে যখন রোগী বসবাস করে তখন মাঝে মাঝে তার মধ্যে Panic attack-এর মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। তবে অনেক সময় এই Phobia এবং Panic attack ঠিক ব্যধির পর্যায়ে না পড়ে সাময়িকভাবে কোনো অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি হতে পারে। এক্ষেত্রে সেই ব্যক্তির মধ্যে অতিরিক্ত উদ্বেগ, মানসিক চাপ এবং অস্থির আবেগ কাজ করে যা তার জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।
বর্তমান সময়ে আমরা একটা বিশেষ অবস্থার মধ্যে বসবাস করছি আর তা হল করোনাময় পৃথিবী, যা সব ক্ষেত্রে অহেতুক না হলেও অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের মধ্যে অযৌক্তিক চিন্তা ও ভীতির সঞ্চার করছে এবং আমরা অনেকেই Panic attacks অনুভব করছি। তবে যারা আগে থেকেই Anxiety disorder-এর patient তাদের ক্ষেত্রে এই Situation টা তাদের পূর্ববতী রোগের তীব্রতা অনেক বাড়িয়ে দেবে এবং সে ক্ষেত্রে অবশ্যই তাদের Psychiatric চিকিৎসার আওতায় আসতে হবে।এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, করোনা অবশ্যই মারাত্মক ক্ষতিকর একটি ভাইরাস যা আমাদের মৃত্যুর দিকেও নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কি এই ভয়ে ভীত হয়ে আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে ফেলব?
প্যানিক ডিসঅর্ডার বা প্যানিক এ্যাটাক কি?
আবার ফিরে আসছে দুঃসময়ের স্মৃতি। লকডাউন। কাজ না থাকা। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়দের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার ভয়ঙ্কর স্মৃতি। একটা প্রায় থমকে যাওয়া জীবন। এবং তারই সঙ্গে আসছে হঠাৎ হঠাৎ ভয়।
এক অনলাইন পোশাক বিপণির মানবসম্পদ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মৃণ্ময় বসু (নাম পরিবর্তিত)। ২০২০ সালে লকডাউনের সময় উত্তর কলকাতার বাসিন্দা মৃন্ময়ের তীব্র অর্থ সঙ্কট দেখা দেয়। কোম্পানি বন্ধ হয়নি ঠিকই, কিন্তু বেতন প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। কোম্পানির তরফে চাল কেনার খরচ হিসেবে হাজার দু’য়েক টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল মাসে। পরিবারের একমাত্র উপার্যনকারী মৃণ্ময়ের সেই দিনগুলির কথা মনে পড়লে এখনও আতঙ্ক হয়। তাঁর কথায়, ‘‘এখন কোম্পানি আবার আগের অবস্থায় ফিরেছে। কিন্তু আবার বাড়ছে করোনা। মনে পড়ছে গত বছরের কথা। মনে পড়লেই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। সব সময় যে মনে পড়ছে, তাও নয়। এমনিই শরীর খারাপ লাগছে।’’মনোবিদ অনুত্তমা বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, চিকিৎসার পরিভাষায় একে ‘প্যানিক অ্যাটাক’ বলা হয়। করোনার আতঙ্ক ফিরে আসার এই সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকেই। ‘‘বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকেরই এমন হচ্ছে। উদ্বেগ থেকে দম আটকে আসছে। শরীর খারাপ লাগছে। মনে হচ্ছে, কোনও সাহায্য ছাড়াই মারা যাব। শরীর খারাপ কেন লাগছে, তা নির্ণয় করতে যাওয়ার ভাবনা শরীরকে আরও খারাপ করে দিচ্ছে’’, বলছেন অনুত্তমা।
গত বছর লকডাউনের আগে পর্যন্ত দিল্লির এক ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন স্বর্ণাভ রায় (নাম পরিবর্তিত)। লকডাউনে চাকরি চলে যায়। উত্তর ২৪ পরগনায় নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন তিনি। শুরু করেন অ্যাপক্যাব চালাতে। প্রথম দিকে সেখানেও যাত্রী হত না। ‘‘এখন বাজার আগের চেয়ে ভাল হয়েছে। যাত্রী আসছেন। কিন্তু আবার করোনার জন্য সব বন্ধ হয়ে যাবে না তো? তা হলে বউ, ছেলে-মেয়েদের কী হবে? খাব কী?’’ সংশয় নিয়ে কথা বলতে বলতেই হাত কাঁপতে লাগল স্বর্ণাভর। গাড়ি থামিয়ে বললেন, ‘‘পিঠে আর কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা করছে। আগে এ রকম ছিল না। এখন হয়। কেন জানি না।’’ শুধু কি পেশা বদলে গাড়ি চালানোর জন্যই এই ব্যথা। সেটা যেমন হতে পারে, তেমনই মানসিক চাপের কারণেও পেশী এবং স্নায়ুর ব্যথা হতে পারে বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসক সঞ্জয় গর্গ।
‘‘হালে এক রোগী এসেছিলেন। কথা বলতে বলতেই অজ্ঞান হয়ে গেলেন। ‘প্যানিক অ্যাটাক’-এর পরিমাণ তীব্র ভাবে বেড়ে গিয়েছে, সেটা তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি’’, বলছেন সঞ্জয়।
যাঁদের এমন সমস্যা হচ্ছে, তাঁরা সব সময় হাতের কাছে এক জন চিকিৎসকের ফোন নম্বর রাখুন। কোনও সমস্যা হলে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন, তাঁর পরামর্শ নিন। নিজে নিজে রোগ নির্ণয় করতে যাবেন না। এমনই পরামর্শ অনুত্তমার। ‘‘টিকা এসে গেলেই সব সমস্যা কেটে যাবে, এমন একটা বিশ্বাস অনেকের হয়েছিল। দেখা গেল, সেটা সত্যি হল না। এই অতিমারির সঙ্গে আরও বহু দিন কাটাতে হবে, এমন ভাবনা থেকেই অনেকের মধ্যে ভয়টা জন্ম নিচ্ছে’’, বলছেন অনুত্তমা। কিন্তু তা বলে টিকা নেবেন না, এমন ভাবনা থেকে বিরত থাকতে বলছেন তিনি। ‘‘সংক্রমণ ঘটলেও বড় ক্ষতি বা চরম বিপদের আশঙ্কা অনেকটা কমিয়ে আনা যায় টিকা নিলে। এটা মনে রাখতেই হবে।’’ বলছেন অনুত্তমা।
মা মারা গিয়েছেন বছর পাঁচেক আগে। কোভিডে বাবাকে হারিয়েছেন দক্ষিণ কলকাতার চৈতালি ধর (নাম পরিবর্তিত)। ক্রমে সেই শোক কাটিয়ে উঠছিলেন। এখন করোনার বাড়বাড়ন্তে আবার উদ্বেগ বাড়ছে। ‘বাবাকে হারিয়েছেন। এ বার কি তাঁর নিজের পালা’? এমন প্রশ্ন সারাক্ষণ পাক খায় মনে। আর নজর রাখেন খবরে। মনে হয়, যে কোনও মুহূর্তে মারা যেতে পারেন।
প্যানিক অ্যাটাকের লক্ষণ গুলি কি কি?
প্যানিক অ্যাটাক এই কথাটির সঙ্গে অনেকেই পরিচিত। হঠাৎ প্রচণ্ড ভয় যখন জাঁকিয়ে বসে তখন শরীরে কিছু প্রভাব পড়ে। দ্রুত হৃদস্পন্দন, অতিরিক্ত ঘাম, হাত পা কাঁপা, বমি বমি ভাব, অসাড় হয়ে যাওয়া, বুকে ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা যায় এই হঠাৎ ভয়ের ফলে। একেই বলে প্যানিক অ্যাটাক। এ এমনই এক অসুখ, যা যখন তখন এসে জাঁকিয়ে বসতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার এর জন্য। তবে প্যানিক অ্যাটাকের সময়ে শান্ত হবেন কী ভাবে সেগুলি জেনে রাখা প্রয়োজন।
প্যানিক অ্যাটাক থেকে উত্তরণের কিছু উপায়:আমরা সবাই জানি কোনো বিষয় সম্পর্কে অজ্ঞতা যেমন সে বিষয় সম্পর্কে আমাদের মধ্যে অনেক অযৌক্তিক আধিভৌতিক ধ্যান-ধারণা এবং বিশ্বাস তৈরি করে তেমনি কোনো বিষয় সম্পর্কে আংশিক জ্ঞান ও অনেক মারাত্মক পরিণতি নিয়ে আসে।
আর একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারা, গতি-প্রকৃতি হচ্ছে যে কোনো পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করার মানসিকতা থাকা এবং মোকাবেলা করা। এসব ক্ষেত্রে অতি সচেতনতা, মাত্রাতিরিক্ত অস্থিরতা, অতিরিক্ত ভীতি আমাদের জীবনকে যেমন ব্যাহত করবে একই সঙ্গে অন্যদের জীবনযাত্রাকেও আমরা ব্যাহত করব। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে চধহরপ না হয়ে আসুন আমরা আমাদের কর্মপন্থা ঠিক করি।
অনেকভাবেই আমরা পরিস্থিতি মোকাবেলার চেষ্টা করতে পারি এবং যে যার অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে পারি। যেমন-- আমাদের যাদের পক্ষে সম্ভব তাদের উচিত করোনা সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা এবং অন্যদের জানানো, অর্থাৎ ঝঃধনষব বা স্থিতিশীল সচেতনতা তৈরি করা।
- গুজবে কান দেবেন না, বিশেষত ভধপবনড়ড়শ দেখে কোনো জ্ঞানার্জন না করাই ভালো।
- ভিত না হয়ে সংশ্লিষ্ট ডাক্তার প্রচারমাধ্যমে প্রচলিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর, আইইডিসিআর এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট অর্গানাইজেশনের নির্দেশনামতো কাজ করুন। ইতিমধ্যেই নির্দেশনাগুলো প্রচারিত হচ্ছে।
* আমাদের মাথায় আসা চিন্তাগুলোকে আমরা মূলত দুভাগে ভাগ করতে পারি।
- i. কার্যকরী চিন্তা
- ii. অকার্যকরী চিন্তা
দুঃখজনক হলেও সত্যি দিনের মধ্যে বেশিরভাগ সময় আমরা অকার্যকরী চিন্তা করে কাটাই। যা আমাদের জীবনকে অতিষ্ট করে তোলে। মহামারি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে অতিরিক্ত ভীতি, দুশ্চিন্তা যা স্বাভাবিক জীবনকে ব্যাহত করে তা অবশ্যই একটি অকার্যকরী চিন্তা। মূলত প্রয়োজন হচ্ছে অবস্থা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া।
- করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে মানুষ এর কারণে মারা যায় না। আক্রান্তদের যথাযথ চিকিৎসা এবং সে যেন তা ছড়াতে না পারে তার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর প্রতিকার এবং প্রতিরোধ উভয়ই সম্ভব।
- প্যানিক অ্যাটাক’ থেকে বাঁচতে করোনার সংবাদ সরাসরি দেখা বা পড়া এড়িয়ে চলুন। মনোবিদের পরামর্শ নিন। মন ভাল রাখার থেরাপি করান। যাঁদের এই ‘প্যানিক অ্যাটাক’-এর ইতিহাস আছে, তাঁরা সাবধান থাকুন।
- মনে রাখবেন অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা চাপ, উদ্বেগ বরং মানুষের আরও নানাবিধ শারীরিক ও মানসিক ব্যাধি তৈরি করে।
- এখনই মারা যাব— এমন একটা উপসংহারে পৌঁছে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন। প্রচণ্ড উদ্বেগ হলে লম্বা শ্বাস নিন। আর ইন্টারনেট দেখে নিজের রোগ নির্ণয় আর চিকিৎসা করতে যাবেন না।’
- প্রথমেই নিজেকে শান্ত করতে জোরে জোরে শ্বাস প্রশ্বাস নেওয়া দরকার। এতে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যায়।
- যে মুহূর্তে এই ধরনের ভয় ধাওয়া করবে, তখনই নিজের যে কাজটা সবচেয়ে ভালো লাগে সেটাই করা উচিত।
- এক ধরনের থেরাপি হয়। 5-4-3-2-1 মেথড বলা হয় একে। পাঁচটি জিনিসের দিকে তাকিয়ে থাকুন। ৪ রকমের শব্দ শুনুন। তিন রকমের জিনিস স্পর্শ করুন। ২ রকমের গন্ধ অনুভব করুন এবং কোনও একটি জিনিসের স্বাদ নিন। সব কটা খুব ধীরে ধীরে করুন।
- দিনে কিছু সময় নিয়মিত মেডিটেশন করুন। এতে উপকার পাবেন।
- নিয়মিত শরীরচর্চা করুন। শরীরচর্চা মানসিক স্ট্রেস কমাতে অনেকটাই সাহায্য করে।
- যাঁর সঙ্গে কথা বলে আরাম পান তাঁর সঙ্গেই কথা বলুন। চারপাশে এমন কিছু মানুষ থাকেই যাঁদের কথা বলার কোনও মাপকাঠি নেই। ভালো না লাগলে তাদের এড়িয়ে চলুন।
- একটি চেয়ারে সোজা হয়ে বসুন। পায়ের পাতা মাটিতে চেপে রাখুন। এভাবে পাঁচ মিনিট বসুন।
- নিজেকে ভালো করে হাইড্রেটেড রাখুন। জল খাওয়া বন্ধ করবেন না। তবে বেশি ক্যাফিন জাতীয় খাবার খাবেন না। প্যানিক অ্যাটাক কি? এটি হলে কি করবেন?
তথ্যসূত্র:
- ডা. আহসান উদ্দিন আহমেদ, সহকারী অধ্যাপক, ডিপার্টমেন্ট অব সাইকিয়াট্রি, শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা, যুগান্তর।
- মনোবিদ অনুত্তমা বন্দ্যোপাধ্যায়,
- চিকিৎসক সঞ্জয় গর্গ, আনন্দবাজার।
- নিউজ ১৮ বাংলা।
- বিবিসি বাংলা।
- Edited: Natural_Healing.
.png)
.jpeg)
.jpeg)

কোন মন্তব্য নেই