First Aid Present

Lifestyle Modification এবং প্রাকৃতিক খাদ্য, পানীয়, শাকসবজি, গাছ, ডালপালা, ফল, মসলা, পাতা ও ফুল ইত্যাদির দ্বারা প্রাথমিক চিকিৎসা।

রক্তস্বল্পতা রোধে যে খাবারগুলো খাবেন

রক্তে লোহিত কণিকা বা হিমোগ্লোবিন কম থাকাকে রক্তস্বল্পতা বলা হয়। অ্যানিমিয়া বা রক্তশূন্যতা খুব সাধারণ একটি রোগ। মহিলা এবং বাচ্চাদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা দিলেও এটি সব বয়সী মানুষেরই হতে পারে। রক্তে অবস্থিত লোহিত কণিকা নামক এক ধরনের কণিকা থাকে যার পরিমাণ রক্তের উপাদানে সিংহভাগ হওয়ায় রক্ত লোহিত বা লাল রং ধারণ করে। লোহিত কণিকার মধ্যে হিমোগ্লোবিন নামক পদার্থের জন্য এই কণিকার রং লাল হয়। হিমোগ্লোবিন অক্সিজেনের বাহক হিসেবে কাজ করে। হিমোগ্লোবিনের মাধ্যমে বাতাসে বিদ্যমান অক্সিজেন ফুসফুস হয়ে রক্তপ্রবাহের দ্বারা শরীরের প্রতিটি কোষে পৌঁছে যায়। স্বাভাবিক অবস্থায় রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ ১৪-১৬ গ্রাম/ডি এল থাকে। যদি কোনো কারণে রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে কমে যায় তবে এই হিমোগ্লোবিনের ঘাটতিকে রক্তশূন্যতা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। হৃৎপিণ্ড রক্ত পাম্প করে সারা শরীরে রক্ত সঞ্চালন করে থাকে। ফলে শরীরে প্রয়োজনীয় পরিমাণ অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত হয়ে থাকে। যদি রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ স্বাভাবিক মাত্রার অর্ধেকে নেমে আসে তবে একই পরিমাণ অক্সিজেন সরবরাহের জন্য হার্টকে দ্বিগুণ পরিমাণ রক্ত পাম্প করতে হয়। সুতরাং এটা খুবই স্পষ্ট যে, রক্তশূন্যতার ফলে হার্ট বা হৃৎপিণ্ডের কাজের চাপ আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। যদি রক্তশূন্যতার মাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে তবে আনুপাতিক হারে হার্টের কর্মতৎপরতাও ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং ধীরে ধীরে হার্টের মধ্যকার বিভিন্ন গঠনগত এবং পদ্ধতিগত পরিবর্তন সাধিত হতে থাকে। এ ধরনের পরিবর্তনের মাধ্যমে হার্ট প্রয়োজনীয় পরিমাণ অক্সিজেন সরবরাহে সচেষ্ট হয়ে থাকে। তবে একটা নির্দিষ্ট অবস্থার পরে হার্ট প্রয়োজনীয় পরিমাণ রক্ত (অক্সিজেন) সরবরাহে ব্যর্থ হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এ ধরনের ব্যর্থতাকে হার্ট ফেইলুর বলা হয়।

রক্তশূন্যতার কারণ এবং লক্ষণ:

কারণ : 

শরীর থেকে রক্তক্ষরণ- যেমন, অতিমাত্রায় ঋতুস্রাব হওয়া, পাইলস থেকে প্রচুর রক্তপাত হওয়া, অনেক দিন যাবৎ আলসারজনিত রোগে ভোগা, বাত বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি ব্যথার জন্য ব্যথা নিরাময়ের ওষুধ নিয়মিত সেবন করা অথবা শ্বাসকষ্ট বা হাঁপানির সমস্যার জন্য প্রায় সময়ই স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ সেবন করা। 

রক্ত উৎপাদন কমে যাওয়া- যেমন, অপুষ্টি, রক্ত রোগ বিশেষ করে ব্লাড ক্যান্সার, কিডনির অসুস্থতা, ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য কেমোথেরাপি অথবা রেডিওথেরাপির মতো চিকিৎসা গ্রহণ করা, ডায়াবেটিস, বৃহদান্তের প্রদাহ, শরীরে আয়রনের ঘাটতি, ভিটামিন বি ১২-এর ঘাটতি, ধূমপান ইত্যাদি।

রক্তশূন্যতার লক্ষণ ব্যক্তিভেদে বিভিন্ন রকম হয়। কয়েকটি লক্ষণে এ রোগ নির্ণয় করা যায়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, অবসন্নতা, ক্লান্তিভাব, বমি, ঘাম হওয়া, মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, ছোট শ্বাস, বেশি ঠান্ডা অনুভব করা ইত্যাদি রক্তশূন্যতার লক্ষণ হতে পারে।

কিছু খাবার আছে যা প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় রাখলে রক্ত স্বল্পতা দূর করা সম্ভব হবে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো : 

১. পালং শাক: পালং শাক রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে খুব উপকারী। পালং শাকে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন এ, বি৯, ই, সি, বিটা কারটিন, আঁশ এবং আয়রন রয়েছে। যা রক্ত তৈরি করে থাকে। আধা কাপ পালং শাক সিদ্ধতে ৩.২ মিলিগ্রাম আয়রন আছে যা মহিলাদের দেহে ২০% আয়রন পূরণ করে থাকে। নিয়মিত পালং শাক খেলে রক্তশূন্যতা প্রতিরোধ হয়। 

২. বিট: বিট আয়রন সমৃদ্ধ খাবার হওয়া খুব অল্প সময়ের মধ্যে এটি রক্ত স্বল্পতা দূর করে দেয়। এটি লোহিত রক্তকণিকা বৃদ্ধি করে। এবং দেহে অক্সিজেন সরবারহ সচল রাখে। 

৩. টমেটো: টমেটোতে ভিটামিন সি আছে যা অন্য খাবার থেকে আয়রন শুষে নেয়। টমেটো ভিটামিন সি-এর ভালো উৎস। এটি রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধেও সাহায্য করে। দেহের আয়রনকে শোষণ করতে ভিটামিন সি ভালো কাজ করে। এছাড়া টমেটোতে বিটা ক্যারটিন, ফাইবার, এবং ভিটামিন ই আছে। প্রতিদিন কমপক্ষে একটি টমেটো খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন বিশেষজ্ঞরা। তবে এর বেশি খেলে আরও ভালো হয়। প্রতিদিন দুই গ্লাস টমেটোর জুস খাওয়া রক্তশূন্যতা প্রতিরোধে সাহায্য করে।

৪. বেদানা/আনার ফল/ডালিম: ডালিমে প্রচুর পরিমাণ আয়রন এবং ভিটামিন সি সমৃদ্ধ একটি ফল হল ডালিম। এটি দেহে রক্ত প্রবাহ সচল রেখে দুর্বলতা, ক্লান্ত ভাব দূর করে থাকে। নিয়মিত ডালিম খেলে রক্তস্বল্পতা দূর হয়ে যায়। এমনকি প্রতিদিনের নাস্তায় এক গ্লাস ডালিমের রস খেতে পারেন। 

৫. চিনাবাদাম ও পিনাট বাটার: আয়রনের আরেকটি উৎস হল পিনাট বাটার। দুই টেবিল চামচ পিনাট বাটারে ০.৬ মিলিগ্রাম আয়রন পাওয়া যায়। আপানি যদি পিনাট বাটারের স্বাদ পছন্দ না করেন চিনাবাদাম খেতে পারেন। এটিও শরীরে আয়রন বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।

৬. সয়াবিন: সয়াবিনে রয়েছে উচ্চমাত্রায় আয়রন এবং ভিটামিন। এর মধ্যে থাকা সাইটিক এসিড রক্তস্বল্পতার সঙ্গে লড়াই করে। সয়াবিনের রয়েছে কম পরিমাণ চর্বি ও প্রোটিন। প্রোটিনও এনিমিয়া প্রতিরোধে উপকারী।

৭. লাল মাংস: লাল মাংসের মধ্যে রয়েছে আয়রন, ভিটামিন বি। যেমন : গরুর মাংস, খাসির মাংস। এই মাংস রক্তস্বল্পতা দূর করতে এবং শরীরের সব কোষে অক্সিজেন ভালোভাবে সরবরাহ করতে সাহায্য করে।

৮. ডিম: ডিমের মধ্যে রয়েছে প্রোটিন ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। রক্তস্বল্পতা কমিয়ে শরীরে রক্তের পরিমাণ বাড়াতে ডিম খুব উপকারী। ডিমের কুসুমের মধ্যে রয়েছে আয়রন। এটি শরীরে লোহিত রক্তের পরিমাণ বাড়ায়।

আরও কিছু খাবার যেমন, 

রক্তে হিমোগ্লোবিন বাড়ানোর জন্য কচু, কচু শাক, কচুর লতি, কলার থোড়ের ভর্তা, কবুতরের গোস্ত,ডালিম বা আনার, পাকা পেয়ারা, তরমুজ, শুকনা খেজুর ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে। 

রক্তে আয়রন বাড়ানোর জন্য, কচুশাক, ডাঁটাশাক, পালংশাক, শিম ও শিমের বিচি, কাঁচা কলা, কিসমিস, সামুদ্রিক মাছ, কলিজা, গিলা, গরু-খাসির মাংসে প্রচুর আয়রন থাকে। যা দেহের রক্ত স্বল্পতা রোধ করে।

খাবারে আয়রনের প্রকারভেদ:

আমরা খাবার থেকে দু’ধরনের আয়রন পেয়ে থাকি, যেমন- হিম-আয়রন এবং নন-হিম আয়রন। শরীরে এ দু’ধরনের আয়রন শোষণেও পার্থক্য রয়েছে।

প্রাণিজ খাবার যেমন- গরুর মাংস, মুরগির মাংস এবং মাছে হিম-আয়রন রয়েছে। সাধারণত হিম আয়রন নন-হিম আয়রন অপেক্ষা কম গ্রহণ করা হয়। কিন্তু হিম-আয়রন আমাদের শরীর খুব সহজে শোষণ করতে পারে।

উদ্ভিজ্জ উৎস থেকেই কেবল নন-হিম আয়রন পাওয়া যায়। খাবারে নন-হিম আয়রনের পরিমাণ হিম-আয়রণ অপেক্ষা বেশি থাকে। শরীর নন-হিম আয়রন ভালোভাবে শোষণ করতে পারে না।

কীভাবে আয়রনের শোষণ বৃদ্ধি করা যায়:

ভিটামিন-সি বা অ্যাসকরবিক এসিড আয়রন শোষণে সাহায্য করে।

সকালের নাস্তায় আয়রন সমৃদ্ধ শস্য জাতীয় খাবার খাওয়ার পর কমলার রস বা লেবু পানি গ্রহণে আয়রনের শোষণ বৃদ্ধি পায়। কিছু খাবার ও পানীয় আয়রন শোষণে বাধা সৃষ্টি করে।

টেনিন : চায়ে টেনিন নামক এক ধরনের যৌগ থাকে। টেনিন আমাদের শরীরে আয়রন শোষণের হার হ্রাস করে। তাই খাবার গ্রহণের পর চা পান না করলে ভালো।

ফাইটেট : খাদ্য শস্য, শিম এবং বাদামে ফাইটেট নামক এক ধরনের যৌগ থাকে। এই ফাইটেট সমৃদ্ধ খাবার অতিরিক্ত খাওয়া হলে তা লৌহ শোষণে বাধার সৃষ্টি করে।

চাহিদা : প্রতিদিনের আয়রনের চাহিদা বয়স, লিঙ্গ এবং শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়।

* মহিলাদের ক্ষেত্রে- (১৯-৫০ বছর) পরিমাণ-১৮ সম/ফধু

* পুরুষদের ক্ষেত্রে- (১৯-৫০ বছর) পরিমাণ-৮ সম/ফধু

* গর্ভবতী মহিলাদের ২৭ সম/ফধু যা চাহিদার ওপর ভিত্তি করে বৃদ্ধি পায়।

* যেসব মায়েরা বাচ্চাকে দুধ খাওয়াচ্ছেন তাদের ক্ষেত্রে ৯ সম/ফধু.

সাধারণত খাবারে পর্যাপ্ত আয়রন সমৃদ্ধ খাদ্য থাকলে আয়রনের দৈহিক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।

* শরীরে আয়রনের অভাব দেখা দিলে তখন যকৃতে সঞ্চিত লৌহ সেই অভাব পূরণে সাহায্য করে। যদি লৌহের সঞ্চয় নিঃশেষ হয়ে যায় তখন হিমোগ্লোবিন তৈরি হতে পারে না। একে আয়রনের অভাবজনিত রক্তস্বল্পতা বলে।

সাধারণত রক্তের সিরাম ফেরিটিন (serum ferritin) এবং হিমোগ্লোবিন পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তস্বল্পতা নিশ্চিত করা যায়।

কাদের ক্ষেত্রে এনিমিয়ার ঝুঁকি বেশি:

* সন্তান ধারণে সক্ষম মহিলাদের * গর্ভাবস্থায় * খাদ্য তালিকায় আয়রন সমৃদ্ধ খাবারের অভাব হলে * ঘন ঘন রক্ত দান করা * শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষত যারা অপরিণত অবস্থায় জন্ম গ্রহণ করে * পরিপাকতন্ত্রের রোগ

* বৃদ্ধ বয়সে * নিরামিষভোজীদের ক্ষেত্রে।

ভেজিটেরিয়ানদের (নিরামিষভোজী) মাঝে নন ভেজিটেরিয়ান অপেক্ষা অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।

করণীয় : খুব সহজেই রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ নির্ণয় করা যায়। কেউ ইচ্ছা করলে নিজেই কোনো ভালো প্যাথলজিক্যাল ল্যাব থেকে CBC (Complet Blood Count) অথবা TC, DC, Hb% অথবা Hb% টেস্টের মাধ্যমে তা জেনে নিতে পারেন।

তথ্যসূত্র:

  • ডা. এম শমশের আলী, সিনি. কনসালট্যান্ট (কার্ডিওলজি), ঢাকা মেডিকেল কলেজ, 
  • বিডি প্রতিদিন।
  • কালের কণ্ঠ।
  • প্রথম আলো।
  • উইকিপিডিয়া।
  • এনটিভি।
  • খানম উম্মে নাহার পুষ্টিবিদ, এমএইচ শমরিতা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ, ঢাকা, যুগান্তর।
  • Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই

Popular Post

Blogger দ্বারা পরিচালিত.