First Aid Present

Lifestyle Modification এবং প্রাকৃতিক খাদ্য, পানীয়, শাকসবজি, গাছ, ডালপালা, ফল, মসলা, পাতা ও ফুল ইত্যাদির দ্বারা প্রাথমিক চিকিৎসা।

শিশুদের রক্তশূন্যতার কারণ ও প্রতিকার!

অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা। শিশুর শরীরে আরবিসি বা লোহিতকণিকার সংখ্যা কমে যায়। এই লোহিতকণিকা ব্রেনে এবং শিশুর সারা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে অক্সিজেন সরবরাহ করে। অস্থিমজ্জায় নতুন নতুন লোহিতকণিকা উৎপন্ন হয় এবং তা রক্তপ্রবাহ স্রোতে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তাদের আয়ুষ্কাল হবে ১২০ দিনের।

শিশুর বয়স ও লিঙ্গ অনুযায়ী স্বাভাবিক মানের নিচে থাকে, তবে সে রক্তস্বল্পতায় ভুগছে বলা হয়। এক বছর বয়স থেকে বয়ঃসন্ধিকাল পর্যন্ত সাধারণভাবে শিশুর হিমোগ্লোবিন ১১ গ্রাম বা ডেসিলিটারের নিচে থাকা রক্তস্বল্পতার নির্দেশ করে।

এ বিষয়ে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের অধ্যাপক আল-আমিন মৃধা বলেন, ‘আমাদের দেশের শিশুরা সাধারণত আয়রন ঘাটতিজনিত রক্তশূন্যতায় বেশি ভোগে। শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য যে অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়, তা সাধারণত হিমোগ্লোবিনের মাধ্যমে সঞ্চালিত হয়। তাই শিশুর দৈহিক ও মানসিক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে রক্তস্বল্পতা একটি বড় প্রভাব ফেলে। নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা দিলেও এটি সব বয়সী মানুষেরই হতে পারে।’

১০০ বক্র কৃমি শিশু থেকে প্রতিদিন ৩০ সিসি রক্ত চুষে খায়।
জন্মের পরপরই শিশুকে মায়ের দুধ দিতে হবে, বুকের দুধে আয়রনের মাত্রা ধরে রাখতে মাকেও আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে।
শিশু রক্তাল্পতায় ভোগে প্রধানত তিন কারণে-

১) প্রয়োজনমাফিক আরবিসি উৎপন্ন না হয়ে থাকলে:

* নবজাতক শিশু উচ্চমাত্রার হিমোগ্লোবিন ও লোহিতকণিকা নিয়ে ভূমিষ্ঠ হয়। তবে দুই মাস বয়সে এসে তা নিচু মাত্রায় চলে আসে। এরপর সিগন্যাল পেয়ে বেশি আরবিসি উৎপাদনের প্রক্রিয়া চলে। এই সময়ের নির্দোষ অ্যানিমিয়া ক্ষতিকর নয়। কোনো ওষুধের চিকিৎসা লাগে না, শুধু মায়ের দুধপানই যথেষ্ট।

* দেহে যখন সুস্থ আরবিসি তৈরি হয় না, তখনও এ সংকট সৃষ্টি হয়; যেমন- আয়রন বা অন্যান্য উপাদানের ঘাটতিজনিত কারণে। দুই বছরের কম বয়সী শিশু এবং বয়ঃসন্ধিকালে শিশু অ্যানিমিয়ার প্রধানত আয়রন ঘাটতিজনিত কারণে হয়ে থাকে। বিশেষ করে কন্যাশিশুর যখন মাসিক শুরু হয়।

* ফলিক এসিড ও বি-১২ ভিটামিনের অভাবে অ্যানিমিয়া হয়। শিশু বয়সের আন্ত্রিক অসুখ সিলিয়াক ডিজিজে ভোগা রোগী এ অবস্থায় পতিত হয়।

* অস্থিমজ্জা যখন রক্তকণিকা তৈরি করতে পারে না, রক্তাল্পতার লক্ষণ নিয়ে সূচিত হয়। এ এক ভয়াবহ অসুখ। এর নাম অ্যাপ্লাসটিক অ্যানিমিয়া। ক্রাইসিস নিয়েও প্রকাশ পেতে পারে। ফ্যানকোনি ও টিইসি- এগুলোও এর অন্য রূপ।

* দীর্ঘমেয়াদি অসুখে ভোগা শিশু রক্তস্বল্পতায় পড়ে। ক্রোনিক কিডনি, হাইপোথাইরয়ডিজম, এডিসনস ডিজিজ, পিটুইটারি গ্রন্থির সমস্যা, যেখানে আরবিসি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় হরমোন মেলে না, এই অসুবিধা নিয়ে আসে। সিসা পয়জনিংয়ের শিকার হলে শিশু রক্তশূন্যতায় ভোগে। হিমোগ্লোবিনের আয়রন অংশজাত হিম তৈরিতে বিষাক্ত সিসা বাধা দেয়।

২) লোহিতকণিকা যদি ভেঙ্গে যায়:

অন্য নাম হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়া। নানাবিধ কারণে উৎপন্ন হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যে লোহিতকণিকা নষ্ট হয়ে যায়।

* ইনফেকশন, ড্রাগস, সর্প দংশন, বার্ন।

* ক্রোনিক লিভার ডিজিজ। মা বা বাচ্চার ব্লাড গ্রুপে গরমিল আর এইচ রক্ত গ্রুপের প্রতিক্রিয়াজনিত।

* সিকেল সেল অ্যানিমিয়া, থ্যালাসেমিয়া, জি সিক্স পিডির অভাব।

* উচ্চ রক্তচাপ, প্লীহা স্ফীতি।

৩) রক্তপাতজনিত কারণে:

* ইনজুরি, বেশি রক্তস্রাব, পাকস্থলী-আন্ত্রিক রক্তপাত।

* কৃমির সংক্রমণ, বিশেষ করে বক্র কৃমি।

* রক্তপাতজনিত অসুখ-হিমোফাইলিয়া।

রোগচিহ্ন:

* ফ্যাকাশে ভাব ত্বকে, ঠোঁটে, হাতে-পায়ের তালুতে।

* খিটখিটে মেজাজ, অতিশয় ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, বুক ধড়ফড় করা।

কারণ অনুযায়ী অন্যান্য লক্ষণ:

আয়রন ঘাটতিজনিত অ্যানিমিয়ায় শিশুর অমনোযোগিতা ও দৈহিক বাড়ন ঠিকমতো না হওয়া লক্ষণ নিয়ে আসতে পারে।

জন্ডিস কালো চা রঙের মূত্র, একটুতেই রক্তপাত সমস্যা প্রভৃতি।

যেসব শিশুর আয়রন ঘাটতির ঝুঁকি বেশি:

■ নির্ধারিত সময়ের আগে জন্মালে অথবা কম ওজন নিয়ে জন্মালে।

■ শিশুর জন্মের সময় মায়ের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে।

■ শিশুর নাড়ি জন্মের পর খুব দ্রুতই (৩০ সেকেন্ডের মধ্যে) কেটে ফেলা হলে।

■ মাতৃদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত শিশু। কারণ, মায়ের দুধের আয়রন গরুর বা অন্য দুধের আয়রনের তুলনায় ২-৩ গুণ বেশি রক্তে শোষিত হয়।

■ শিশুর বয়স ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার পরপরই বুকের দুধের পরিবর্তে নিয়মিতভাবে গরুর দুধ, ছাগলের দুধ, টিনের দুধ ইত্যাদি খাওয়ালে।

■ যাদের নিয়মিতভাবে আয়রনহীন খাবার যেমন সুজি, চালের গুঁড়া, বার্লি বা টিনজাত শিশু খাদ্য খাওয়ানো হয়।

■ যেসব শিশু দীর্ঘমেয়াদি ডায়রিয়ায় বা ক্রিমির সংক্রমণে ভোগে।

পরীক্ষা-নিরীক্ষা:

* সিবিসি, ব্লাড স্মিয়ার। ব্লাড আয়রন লেভেল।

* হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস-থ্যালাসেমিয়াতে।

* বোনম্যারো-অ্যাপ্লাসটিক অ্যানিমিয়া, লিউকেমিয়ায়।

করণীয়:

● জন্মের পরপরই শিশুকে মায়ের দুধ দিতে হবে। বুকের দুধে আয়রনের মাত্রা ধরে রাখতে মাকেও আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে।

● নির্ধারিত সময়ের আগে জন্ম নেওয়া ও কম ওজন নিয়ে জন্মানো শিশুর দেড় মাস বয়স থেকে অতিরিক্ত আয়রন দিতে হবে। এ ছাড়া যেসব শিশুর আয়রনের ঘাটতি রয়েছে, তাদেরও আয়রন দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই শিশু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

● শিশুর বয়স ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার পরও বুকের দুধ অব্যাহত রাখতে হবে। এর সঙ্গে তাকে বাড়িতে তৈরি আয়রনসমৃদ্ধ খাবার যেমন মাংস, লিভার, কিডনি, ডিমের কুসুম, মাছ, শাকসবজি, ডাল, বিনস, মটরশুঁটি, পাকা কলা, কাঁচা কলা, কচুর তরকারি, লালশাক, পালংশাক, মাশরুম, ব্রকলি ইত্যাদি ধীরে ধীরে খাওয়ানো শুরু করতে হবে।

● অনেকে মনে করেন, সন্তান প্রসবের ছয় মাস পর মায়ের দুধ কমে যায়। এ কারণে তাঁরা এ সময়ের পর শিশুকে গরুর বা টিনের দুধ দিতে চান। এ ভাবনাটা নিতান্তই ভুল।

চিকিৎসা:

* কারণ অনুযায়ী। আয়রন ঘাটতিজনিত কারণে চিকিৎসক আয়রনসংবলিত ওষুধ লিখে থাকবেন। শিশুর খাবারে আয়রনসমৃদ্ধ আইটেম রাখার পরামর্শ দিতে পারেন। বেশি দুধপান বা দুগ্ধজাত ফর্মুলার ওপর নির্ভরশীল শিশু ফ্যাকাশে হয়ে যায়। তাই তার পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে। ফলিক এসিড বা বি-১২ ভিটামিনের অভাব থাকলে তা দেয়া যেতে পারে।

* গ্রামাঞ্চলে শিশু বয়সে অ্যানিমিয়ার প্রধান কারণ ঘন ঘন কৃমির সংক্রমণ। ১০০ বক্র কৃমি শিশু থেকে প্রতিদিন ৩০ সিসি রক্ত চুষে খায়। সুতরাং, নির্দিষ্ট সময় অন্তর কৃমির ওষুধ খাওয়ানো।

শিশুদের রক্তস্বল্পতা নিয়ে এনটিভির প্রতিবেদন।

শেষ কথা:

রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া খুবই পরিচিত সমস্যা। নারী ও শিশুদের এ সমস্যা বেশি হয়। আয়রনের ঘাটতির কারণেই মূলত এমনটা হয়। তবে শুধু রক্তশূন্যতাই নয়, আয়রনের ঘাটতির কারণে শিশুর মানসিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়। একটি শিশুর পূর্ণাঙ্গ বিকাশ মানে বয়স অনুসারে শারীরিক বৃদ্ধির সঙ্গে মেধা, বুদ্ধি, আচার–আচরণ, কর্মদক্ষতা ইত্যাদির যথাযথ বিকাশও হতে হবে।

মেধা বা মননের এ বিকাশের প্রধান নির্ধারক হলো মস্তিষ্ক। শিশুর জীবনের প্রথম পাঁচ বছর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ সময়েই একজন মানুষের কর্মদীপ্ত মস্তিষ্কের ভিত গড়ে ওঠে। তাই বাড়ন্ত শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য দরকার উন্নতমানের পুষ্টি, বিশেষ করে আয়রন ও আয়োডিনসমৃদ্ধ খাবার। আয়রন রক্তের হিমোগ্লোবিন তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা রাখে। হিমোগ্লোবিনের মাধ্যমে মস্তিষ্কসহ শরীরের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন পৌঁছায় এবং কোষের জন্য নির্ধারিত কার্যক্রম গতিশীল রাখতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে রক্তের এ উপাদান কোষে তৈরি বিষাক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাসও শরীর থেকে বের করে দিতেও মুখ্য ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া মস্তিষ্কের কোষের ভেতরে নানাবিধ কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় এনজাইমের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এ আয়রন।

আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তশূন্যতায় ভোগা শিশু নানা স্নায়বিক ও আচরণগত জটিলতায় ভোগে। যেমন ক্ষুধামান্দ্য, মেধার বিকাশ, বুদ্ধিমত্তা ও মনঃসংযোগ বাধাগ্রস্ত হওয়া। আয়রনের ঘাটতি থাকলে হঠাৎ দমবন্ধ করা অনুভূতি হতে পারে, খিঁচুনির ঝুঁকি বাড়ে। শিশুরা খিটখিটে মেজাজের হয়, ঘুম কম হয়। অনেকে আবর্জনা যেমন দেয়ালের প্লাস্টার, জুতা, স্যান্ডেল বা ময়লা খায়।

তথ্যসূত্র:

  • অধ্যাপক ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী, বিভাগীয় প্রধান, শিশুরোগ বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, যুগান্তর।
  • অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা, বিভাগীয় প্রধান, শিশুরোগ বিভাগ, বারডেম হাসপাতাল, প্রথম আলো।
  • আনন্দবাজার।
  • Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই

Popular Post

Blogger দ্বারা পরিচালিত.