Fat বা স্নেহপদার্থ বা চর্বি। (Fat_পর্ব-১)
স্নেহপদার্থ:
স্নেহ পদার্থ (Fat) বলতে সেই সমস্ত যৌগের শ্রেণীকে বোঝায় যারা সাধারণত জৈব দ্রাবকে দ্রবণীয় কিন্তু পানিতে অদ্রবণীয়। রাসায়নিক গঠন বিবেচনা করলে, স্নেহ পদার্থ হল গ্লিসারল ও ফ্যাটি অ্যাসিডসমূহের ট্রাই-এস্টার। স্বাভাবিক তাপমাত্রায় স্নেহ পদার্থ আণবিক কাঠামো ও উপাদানের উপর নির্ভর করে কঠিন বা তরল আকারে থাকতে পারে। যেসমস্ত স্নেহ পদার্থ স্বাভাবিক তাপমাত্রায় তরল অবস্থায় থাকে, তাদেরকে "তেল" বলা হয়। আর যেগুলি স্বাভাবিক তাপমাত্রায় কঠিন অবস্থায় থাকে সেগুলিকে চর্বি (fat) বলা হয়। আর লিপিড বলতে উভয়কেই বোঝায়। উল্লেখ্য, তেল বলতে আরও সাধারণভাবে পানির সাথে মিশে না এবং তৈলাক্ত অনুভূত হয়, এরকম যেকোন তরলকেই বোঝানো হতে পারে, যেমন - পেট্রোলিয়াম, হিটিং অয়েল, ইত্যাদি।
স্নেহ পদার্থ আসলে লিপিড জাতীয় পদার্থের একটি শ্রেণী। অন্য লিপিডগুলির সাথে স্নেহ পদার্থের রাসায়নিক গঠন ও ভৌত ধর্মে পার্থক্য আছে। লিপিড অণু জীবনের আণবিক কাঠামো ও বিপাক প্রক্রিয়ার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এগুলি পরভোজী জীবের (যাদের মধ্যে মানুষও অন্তর্গত) খাদ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।কার্বন, হাইড্রোজেন, এবং অক্সিজেন নিয়ে স্নেহপদার্থ বা ফ্যাট গঠিত হয়। স্নেহ পদার্থে অক্সিজেন অনুপাত শর্করার তুলনায় কম এবং শর্করার মত হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন ২:১ অনুপাতে থাকে না। ফ্যাট প্রকৃতপক্ষে অ্যাসিড এবং গ্লিসারলের সমন্বয়ে গঠিত এস্টার বিশেষ। প্রকৃতিতে প্রচুর খাদ্য হতে কম বেশি স্নেহ পদার্থ পাওয়া যায়। যেমন:
উদ্ভিজ্জ ফ্যাট বা স্নেহঃ
বাদাম, নারিকেল, সরষে, রেড়ী বীজ, তুলা বীজ ইত্যাদিতে উদ্ভিজ্জ ফ্যাট থাকে। বিভিন্ন প্রকার উদ্ভিজ্জ তেল যেমন; সরিষার তেল, তিলের তেল, তিসি তেল, সয়াবিন তেল, পাম, ভূট্টা, নারিকেল, সূর্যমুখী তেল হলো উদ্ভিজ্জ স্নেহ পদার্থের প্রধান উৎস। এছাড়াও জলপাই ও জলপাই তেল বা অলিভ ওয়ের, কাজু বাদাম, চীনা বাদাম, পেস্তা বাদাম, এবং এ সকল বাদামের তেলও স্নেহের প্রধান উৎস।
প্রানীজ ফ্যাট বা স্নেহঃ
কৃত্রিম মাখন, মাখন, ঘি, ননী ও প্রাণীজ চর্বি, পনির, ডিমের কুসুম, চর্বিযুক্ত মাংস, ইত্যাদিতে প্রানীজ ফ্যাট থাকে।
স্নেহ পদার্থ খাওয়ার পর এগুলি শরীরের ভেতরে ভেঙে লাইপেজে পরিণত হয়।
শ্রেণী বিভাগ:
Oil (তেল): সাধারণ উত্তাপে যে সমস্ত ফ্যাট তরল অবস্থায় থাকে, তাদের তেল হিসেবে জানি আমরা।
Simple fat (সরল ফ্যাট): যে সব ফ্যাট অন্য কোন উপাদানের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে না, তাদের সরল ফ্যাট বলে। যথা: ওয়াক্স বা মোম, ল্যানোলিন ইত্যাদি সরল ফ্যাটের উদাহরণ।
Compound fat (যৌগিক ফ্যাট): সরল ফ্যাট যখন অন্য কোন উপাদানের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তখন তাদের যৌগিক ফ্যাট বলে। যথা: ফসফোলিপিড, গ্লাইকোলিপিড, অ্যামাইনো-লিপিড ইত্যাদি।
Saturated fat (সম্পৃক্ত চর্বি): দীর্ঘ সময় ধরে এই ফ্যাট গ্রহণ করলে নানা রকম স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এই জাতীয় ক্ষতিসাধক চর্বি মূলতঃ প্রানীজ উৎস থেকে পাওয়া যায় যেমন- লাল মাংস, পূর্নমাত্রায় চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত দ্রব্যাদি ইত্যাদি। এই চর্বি রক্তের সামগ্রিক কোলেস্টেরলের মাত্রা ও নিম্নন-ঘনত্বের লাইপো আমিষের এর মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, ফলতঃ আপনার শরীরে হৃদ রোগ, রক্তনালীর রোগ, বহুমূত্র (ডায়াবেটিস), পিত্তপাথরী, স্ট্রোক ইত্যাদির সম্ভাবনা ভীষনভাবে বেড়ে যায়।
UnSaturated fat (অসম্পৃক্ত চর্বি):
এটিই একমাত্র উপকারী ফ্যাট। যা আমাদের দেহে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।
এই স্বাস্থ্যকর ফ্যাট দুই ধরনের হয়-
ক) মনো_আনসাচুরেটেড ফ্যাট এবং
খ) পলি_আনসাচুরেটেড ফ্যাট।
ক) মনো আনসাচুরেটেড ফ্যাট:
এই ফ্যাট ঘরের তাপমাত্রায় তরল থাকে। কিন্তু ঠান্ডা করলে জমাট বেধে যায়। সরিষার তেল দিয়ে ভর্তা খেতে আমদের কম বেশি সকলেরই ভালো লাগে।বিভিন্ন গবেষণা দ্বারা প্রমান হয়েছে যে মনোআনসাচুরেটেড ফ্যাট রক্তে ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ায় এবং হৃদরোগের সম্ভাবনা কমায়। শুধু সরিষার তেল নয় রয়েছে আরও অনেক মনোআনসাচুরেটেড ফ্যাট যেমন;
• বাদাম (চিনাবাদাম, কাঠবাদাম, পেস্তাবাদাম)
• ভেজিটেবেল তেল (বাদাম তেল, অলিভ তেল, সরিষার তেল)
• চিনাবাদাম ও কাঠবাদাম মাখন।
খ) পলি আনসাচুরেটেড ফ্যাট:
এই ধরনের ফ্যাটও রুম টেম্পারেচার এ তরল থাকে। উদ্ভিদ হতে প্রাপ্ত ফ্যাট সমূহ হল এধরনের ফ্যাটের মূল উৎস। মনোসাচুরেটেড ফ্যাটের মত পলিসাচুরেটেড ফ্যাট হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে পারে রক্তে কোলেসটেরলের পরিমান কমানর মাধ্যমে। বিভিন্ন প্রকার পলিআনসাচুরেটেড ফ্যাটের উদাহরণ দেয়া হলঃ
• বিভিন্ন প্রকার উদ্ভিদ তেল- সূর্যমুখী তেল, সরিষার তেল, নারকেল তেল
• বীচি – (সূর্যমুখীর বীচি, মিষ্টি কুমড়ার বীচি)
• নরম মারজারিন
Omega-3 এবং Omega-6 সিক্স আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিবারভুক্ত।
Omega-3 Omega-6 (অন্তিম চর্বি):
ওমেগা থ্রি ও ওমেগা সিক্স ফ্যাটি অ্যাসিড হল শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়ায় অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি অ্যাসিড। এই জাতীয় ফ্যাটি অ্যাসিডগুলি আমরা নিজেরা প্রস্তুত করতে পারি না। ফলতঃ খাদ্য থেকেই এগুলি আমাদের লাভ করতে হয়। ওমেগা থ্রি ও ওমেগা সিক্স ফ্যাটি অ্যাসিড উভয়ই পলি-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড (PUFA) তবে রাসায়নিক গঠনাবলির দিক দিয়ে এটি অন্যের থেকে আলাদা। ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডএর কয়েকটি উৎকৃষ্ট উৎস হল;
শীতল জলের মাছ যথা স্যালমন, সার্ডিন, কর্ড, ম্যাকরেল ও হেরিং। ইকোসাপেন্টাইনোইক অ্যাসিড(EPA) ও ডোকোসাহেক্সাইনোইক অ্যাসিড(DHA) (ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড) দেহে ভীষন ভাবে প্রয়োজন বিশেষতঃ বাচ্চাদের মস্তিষ্কএর উন্নতি সাধনের জন্য। আখরোট ও ফ্ল্যাক্স সীড এর মতো উদ্ভিজ উৎস থেকে ALA(ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড) পাওয়া যায় যা দেহে EPA ও DHA রূপান্তরিত হয়।
অপরদিকে ওমেগা সিক্স ফ্যাটি অ্যাসিডএর উৎস হল;
বীজ, বাদাম ও রিফাইন উদ্ভিজ্জ তেল।
স্বাভাবিক ভাবে, এই দুই প্রকার অত্যাবশ্যক ফ্যাটি অ্যাসিড থেকে প্রাপ্ত হরমোনগুলির প্রভাবও ভিন্ন। ওমেগা সিক্স ফ্যাটি অ্যাসিড থেকে প্রাপ্ত হরমোনগুলি ইনফ্লামেশন বৃদ্ধি করে এবং রক্ত জমাট বাধা, কোষ বিভাজন ও বিস্তার প্রক্রিয়াকে বাড়িয়ে দেয়। আবার ওমেগা থ্রি প্রাপ্তব্য হরমোনগুলি উপরিউক্ত প্রক্রিয়াগুলিকে কমিয়ে দেয়।
সুতরাং এই উভয় প্রকার বিরুদ্ধাচারী হরমোনগুলির ভারসাম্য বজায় থাকা একান্তই প্রয়োজন সুস্বাস্থ্যের জন্য।
দেহে প্রয়োজনীয় উপাদানের ভারসাম্যহীনতার কারণে শ্বাসকষ্ট, করোনারী হৃদরোগ, নানাবিধ ক্যান্সার, অটো-ইমিউনিটি ও স্নায়ুবৈকল্য জনিত রোগের হার বৃদ্ধি পায়। এই সকল রোগগুলি শরীরের প্রদাহজাত বলেই ধরা হয়। আবার স্থুলতা, মানসিক অবসাদ, ডিসলেক্সিয়া, হাইপার অ্যাক্টিভিটি ও এমনকি হিংসার প্রবণতা বৃদ্ধির জন্যও দায়ী ওমেগা থ্রি ও ওমেগা সিক্স ফ্যাটি অ্যাসিডএর ভারসাম্যহীনতা।
Trans fat (অতি চর্বি): এটি আরেকটি ক্ষতিকারক চর্বি যা স্বভাবিকভাবে আপনাআপনিই কিছু খাদ্যে অল্প পরিমানে উৎপন্ন হয়। কিন্তু অধিকাংশ অতি চর্বিই খাদ্যপক্রিয়াকরনের সময় (আংশিক হাইড্রোজিনেশন) তেল থেকে উৎপন্ন হয় যেমন-বাটার।
কার্যকারিতা:
প্রানিদেহের তাপ নিয়ন্ত্রণ ও তাপ শক্তি উৎপন্ন করা ফ্যাট জাতীয় খাদ্যের প্রধান কাজ। ফ্যাট মেদরুপে ভবিষ্যতের খাদ্যের উৎস হিসাবে সঞ্চিত থাকে। ফ্যাট ভিটামিনকে দ্রবীভূত রাখে এবং এদের শোষণে সাহায্য করে। ফ্যাট যকৃৎ থেকে পিওরস এবং অগ্ন্যাশয় থেকে অগ্ন্যাশয় রস নিঃসরণে সাহায্য করে। স্নেহপদার্থ মলাশয় ও পায়ু পিচ্ছিল করে মল নিঃসরণে সহায়তা করে। কোলেস্টেরল নামক ফ্যাট থেকে ভিটামিন-ডি, ইস্ট্রোজেন, টেস্টোস্টেরণ নামক হরমোন উৎপন্ন হয়। ১ গ্রাম অণু ফ্যাট দহন হলে ৯.৩ কেসিএল তাপ শক্তি উৎপন্ন হয়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোকের প্রত্যহ প্রায় ৫০ গ্রাম স্নেহপদার্থ প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র:
- Wikipedia.
- Pushisbarta.com
- 7rongs.com
- Edited: Natural_Healing.
কোন মন্তব্য নেই