First Aid Present

Lifestyle Modification এবং প্রাকৃতিক খাদ্য, পানীয়, শাকসবজি, গাছ, ডালপালা, ফল, মসলা, পাতা ও ফুল ইত্যাদির দ্বারা প্রাথমিক চিকিৎসা।

শিশুর শ্বাসকষ্ট-নিউমোনিয়া নাকি ব্রঙ্কিউলাইটিস: কী করবেন?

সারাদেশে বইছে শীতের হিমেল হাওয়া। এতে রাজধানীতে জেঁকে বসেছে তীব্র শীত। এ সময় শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। মূলত নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা, কাশি, সর্দি অ্যাজমায় সিজনাল জ্বর বেশি দেখা দেয়। 

শিশুদের বেশি নিউমোনিয়া হওয়ার প্রবণতা থাকে। কারণ বাচ্চাদের ডিফেন্স মেকানিজম বড়দের তুলনায় দুর্বল হয়ে থাকে। তার ওপর শিশুরা স্কুলে অনেক বাচ্চাদের সঙ্গে মিশে, মাঠে খেলাধুলা করে তাই তাদের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কাছাকাছি আসার আশঙ্কাও বেশি। বড়রা যদি বাচ্চাদের সামনে ধূমপান করেন তা থেকেও বাচ্চারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

একটু সর্তক থাকলে এসব রোগ প্রতিকার পাওয়া যায়।

শ্বাসকষ্ট মানেই যে শুধুই জ্বর বা নিউমোনিয়া নয়, ব্রঙ্কিউলাইটিস 
বা অন্য কোন কারণেও হতে পারে। তাই শিশুর জ্বর বা শ্বাসকষ্ট হচ্ছে কি না, সে ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। 
শীতে শিশুদের কি কি রোগ দেখা দেয়?

ডা. মোহাম্মদ কামরুল হাসান সবুজ : শীত আসলে শিশুরা ভাইরাসজড়িত রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। এসময় শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা, কাশি, সর্দি এ্যাজমা ও সিজনাল জ্বর বেশি দেখা দেয়। এছাড়া অপুষ্টির শিকার ও কম ওজনের শিশুরাই বিভিন্ন রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। আর দরিদ্র পরিবারের শিশুরা সুষম খাদ্য এবং যত্নের অভাবে পুষ্টিহীনতায় ভোগে।

নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্ট জনিত রোগের লক্ষণগুলো কি কি? 

ডা. মোহাম্মদ কামরুল হাসান সবুজ : প্রথমে শিশুর হালকা জ্বর, কাশি অথবা শ্বাসকষ্ট দিয়ে শুরু হয়। বয়স অনুযায়ী শ্বাস দ্রুত নেয়। বা স্বাভাবিক শ্বাস নিতে পারে না। খাবারে রুচি থাকে না। বমি ভাব দেখা দেয়। বুকে বা পেটে ব্যথা দেখা দেয়। নি:শ্বাস নেওয়ার সময় শিশুর নাক ফুলে উঠবে। শ্বাসকষ্টের কারণে শিশুর খিঁচুনি হতে পারে। মুখ ও ঠোঁটের চারপাশ নীল হয়ে যেতে পারে এবং কাঁপুনি দিয়ে জ্বরও আসতে পারে।

নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্ট জনিত রোগ কিভাবে হয়?

ডা.মোহাম্মদ কামরুল হাসান সবুজ: এগুলো সংক্রামক রোগ। এ রোগের জীবাণু রোগাক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে একটি শিশুর মাধ্যমে অন্য শিশুর মধ্যে ছড়ায়। আক্রান্ত শিশু ব্যবহৃত জিনিস ও পোশাকের মাধ্যমেও অন্য শিশুরা আক্রান্ত হতে পারে। এছাড়া কিছু সময় রক্তের সাহায্যেও ফুসফুসে সংক্রমিত হতে পারে।

নিউমোনিয়া শ্বাসকষ্ট জনিত রোগের প্রতিকার করণীয় কি ? 

ডা.মোহাম্মদ কামরুল হাসান সবুজ: শিশুদের অবস্থা নির্ভর করে চিকিৎসকরা চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। লক্ষ্য রাখতে হবে যে, শিশু স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিচ্ছে কি না। বেশি সমস্যা দেখা দিলে নিউমোনিয়া আক্রান্ত শিশুকে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে, চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে অক্সিজেন বা শিরাপথে এন্টিবায়োটিক প্রয়োগের প্রয়োজনও হতে পারে।

এই রোগ এড়াতে আমাদের এবং শিশুদের একটু বাড়তি সর্তক হতে হবে। ঘরের তৈরি খাবার ও বিশুদ্ধ পানি ব্যবহারে অত্যন্ত যত্নবান হতে হবে। শুধু শিশু না বড়দেরও পরিস্কার পরিচ্ছন থাকতে হবে। খাওয়ার আগে ও পরে সাবান দিয়ে হাত ভালোভাবে পরিস্কার করতে হবে। এমনকি নাক পরিস্কার করার পর অবশ্যই হাত ভালভাবে পরিস্কার করতে হবে।

খুব বেশি প্রয়োজন না হলে বাহিরে না যাওয়াই ভালো। কোনো শিশু অপরিণত বয়সে জন্ম নিলে অথবা স্বল্প ওজনের শিশুদের ব্যপারে অতিরিক্ত সতর্কতা জরুরি।

শিশু যাতে অপুষ্টির শিকার না হয়, সেজন্য শিশুর জন্মের প্রথম ৬ মাস পর্যন্ত শিশুকে শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়াতে হবে এবং ৬ মাস পূর্ণ হলে শিশুকে মায়ের দুধের পাশাপাশি বাড়িতে তৈরি খাবার খাওয়াতে হবে।

সাধারণত কোনো কোনো কারণে শিশুদের শ্বাসকষ্টের সমস্যা হতে পারে?

ডা. আহমেদ নাজমুল আনাম: এটা নির্ভর করছে বিভিন্ন বয়সের ওপরে। তবে সাধারণত এই সমস্যায় শিশু সর্দিকাশি নিয়ে আসে। ব্রঙ্কিওলাইটিস, নিউমোনিয়া, অ্যাজমা এ রকম কিছু কারণ নিয়েই মূলত আমাদের কাছে আসে। বাচ্চাদের শ্বাসকষ্ট নিয়ে আমাদের কাছে আসে। 

কী কারণে শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, সেটি বোঝার কি কোনো উপায় আছে?

ডা. আহমেদ নাজমুল আনাম: শীত গেল, এখন বসন্তের শুরু, এখন আমাদের কাছে বেশি যেটা আসে, সেটি হলো ব্রঙ্কিওলাইটিস। এটি একটি ভাইরাসবাহিত রোগ। অনেকেই আসলে একে নিউমোনিয়া মনে করে। আসলে এটা নিউমোনিয়া নয়। ৮০ থেকে ৯০ ভাগ যেসব শ্বাসকষ্ট মা-বাবারা নিয়ে আসে, আমরা দেখি, এটি ব্রঙ্কিওলাইটিস। এটা বোঝার কিছু উপায় আছে। যেহেতু আমরা বলছি এটি ভাইরাস বাহিত রোগ, সুতরাং ভাইরাস দিয়ে আক্রান্ত হলে যে ধরনের লক্ষণগুলো খাকে— একটু নাক দিয়ে পানি ঝরা, খুকখুক করে কাশি, গায়ে হালকা হালকা জ্বর- এই ধরনের লক্ষণ প্রথমে প্রকাশ পায়। পরে যদি এটি আস্তে আস্তে গাঢ়ও হয়, তাহলে হয়তো পরে শ্বাস প্রশ্বাসের তীব্রতা অনুভূত হয়। 

আপনি যেটি বলছিলেন যে শ্বাসকষ্টের কারণে নিউমোনিয়াও হতে পারে, ব্রঙ্কিওলাইটিসও হতে পারে। শ্বাসকষ্টের ধরন দেখে কী বোঝার উপায় রয়েছে কোনটি ব্রঙ্কিওলাইটিসের জন্য শ্বাসকষ্ট, আর কোনটি নিউমোনিয়ার জন্য?

ডা. আহমেদ নাজমুল আনাম: সেটা তো আসলে নিশ্চিত করব আমরাই। তবে শ্বাসকষ্টের যে প্রাথমিক বিষয়, এর মধ্যে দ্রুত শ্বাস নেওয়া একটি। যদি দুই মাসের নিচের কোনো শিশু হয়, আমরা বলব যে ঘন ঘন শ্বাস নেয়, যদি ৬০ বারের বেশি একটি শিশু ঘন ঘন শ্বাস নেয়—তাহলে বুঝতে হবে তার অবশ্যই শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা হচ্ছে। দুই মাস থেকে এক বছরে বলব, ৫০ থেকে তার বেশি বার শ্বাস নেয়, আর যদি এক বছরের উপরের বাচ্চার ক্ষেত্রে ৪০ বারের উপরে শ্বাস নেয়, তাহলে আমরা বলব শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। 

আর এটি আরো তীব্র হবে যদি বুকের ভেতরের দুই খাঁজ বসে যায়, তাহলে আমরা বলব দ্রুত চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন। তখন অবশ্যই যোগাযোগ করতে হবে।  

এই জাতীয় সমস্যা হলে যখন শিশুটিকে নিয়ে মা-বাবারা আপনাদের কাছে আসেন তখন আপনাদের পরামর্শ কী থাকে?

ডা. আহমেদ নাজমুল আনাম: অধিকাংশ সময় দেখা যায়, বাচ্চাদের নাকগুলো বন্ধ থাকে, নাকগুলো আমরা পরিষ্কার করতে বলি, সেজন্য আমরা বাজারের বিভিন্ন ড্রপ ব্যবহার করি। 

তবে আমি বলব, এক চামচ কুসুম গরম পানিতে এক চিমটি লবণ দিয়ে সেটা যদি গুলে যায়, সেটা ড্রপার দিয়ে তুলে মা-বাবাকে শিশুর নাকে দিতে। নাক যদি খুলে যায়, শিশুরা দেখা যায় অনেক আরাম পাচ্ছে। আমরা হাইপার টনিক স্যালাইন তৈরি করব। এক চা চামচ কুসুম গরম পানিতে এক চিমটি লবণ দিয়ে এটি করতে হবে।

এরপর আমাদের কাছে যখন আসে, আমরা একটু অক্সিজেন দেই। আমরা একটু নাক পরিষ্কার করে দেই। মাথাকে একটু উঁচু করে রাখি। শুয়ে থাকলে বাচ্চাদের শ্বাসকষ্টটা বাড়ে এবং আমরা একটু নেবুলাইজ করে দেই। এই চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন নেই। যদি ব্রঙ্কিওলাইটিস হয়ে থাকে দেওয়ার দরকার নেই। যেহেতু এটি ভাইরাসের কারণে হচ্ছে এখানে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো প্রয়োজন নেই। 

বঙ্কিওলাইটিসের ক্ষেত্রে কখন বুঝবে শিশুটিকে হাসপাতালে নেওয়ার দরকার আছে?

ডা. আহমেদ নাজমুল আনাম: আমরা বলব, ব্রঙ্কিওলাইটিসের রোগীর ভর্তি হওয়ারই প্রয়োজন নেই। ঘরোয়া কিছু পদ্ধতি মানতে হবে। সেটা হলো ঘন ঘন বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। একটু আর্দ্র যেই ঘর, অর্থাৎ যেখানে আলো বাতাস চলাচল করছে, সেখানে রাখতে হবে। আর যদি সম্ভব হয়, যদি নেবুলাইজেশন করার সুযোগ বাসায় থাকে তাহলে করে দেওয়া যেতে পারে। 

তবে আমরা যে বিষয়গুলোর কথা বললাম, তার শ্বাসকষ্ট যদি বেড়ে যায়, খুব ঘন ঘন শ্বাস নিতে থাকে, যদি বুকের দুই খাঁজ বসে যায় এবং শিশুর মুখের চারপাশ যদি নীল হয়ে যেতে থাকে; তাহলে খুব দ্রুত হাসপাতাল বা নিকটস্থ চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। 

সেক্ষেত্রে আপনাদের ব্যবস্থাপনা কী হবে?

ডা. আহমেদ নাজমুল আনাম: প্রথমে আমরা অক্সিজেন দেই এবং আমরা নেবুলাইজ করে দেই। আমরা দেখেছি মোটামুটি নেবুলাইজ করে দিলে, নাকটা পরিষ্কার করে দিলে শিশুদের অধিকাংশ ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়ে যায়।

মেডিকেশন হিসেবে ব্রঙ্কিওলাইটার বা সালবিউটামল দেই। তবে কোনো অ্যান্টিবায়োটিকের দরকার নেই। তবে পরামর্শ দরকার। মা- বাবাকে বোঝানো দরকার তার নিউমোনিয়া হয়নি। আপনি একটু ধৈর্য ধরুন। বুকের দুধ খাওয়ান। নাক পরিষ্কার করুন। 

একজন শিশু যখন বুকের দুধ খাচ্ছে, তার যখন শ্বাসকষ্ট হয় অনেক সময় দেখা যায় মায়েরা শিশুর এই খাবারটি বন্ধ করে দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আপনার কী মনে হয়?

ডা. আহমেদ নাজমুল আনাম: আমি বলব যে, এই রোগের মূল চিকিৎসা হলো ঘন ঘন বুকের দুধ খাওয়ানো। বরং ইতিহাসে দেখা গেছে সেসব বাচ্চা বুকের দুধ খায় না, তাদেরই এই ধরনের শ্বাসকষ্ট বা ব্রঙ্কিওলাইটিসের সমস্যা ঘন ঘন হয়। এসব বাচ্চাই বেশি ঝুঁকির ভেতর থাকে। সুতরাং বুকের দুধ খাওয়া জরুরি। ছয় মাস পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ খাওয়া নিশ্চিত করতে হবে। 

ব্রঙ্কিওলাইটিসের জন্য সাধারণত কোন কোন বয়সের বাচ্চারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে?

ডা. আহমেদ নাজমুল আনাম: দুই মাস থেকে দুই বছরের বাচ্চাকে আমরা ব্রঙ্কিওলাইটিসের ভেতর আনি। সাড়ে তিন বছরের বাচ্চা যখন আসবে তখন আমরা আর ব্রঙ্কিওলাইটিস ভাবব না। ভাইরাস দিয়ে আক্রান্তও হতে পারে, তবে তখন অনেকটাই ঝুঁকি কমে যায়। 

যদি সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করা হয় তখন জটিলতা কী হয়?

ডা. আহমেদ নাজমুল আনাম: ব্রঙ্কিওলাইটিস থেকে তার শ্বাসকষ্ট বেড়ে গিয়ে কার্ডিওলজিক্যাল অ্যাটাক পর্যন্ত হতে পারে। সুতরাং এই বিষয়ে খুবই সতর্ক থাকতে হবে। মাকে বিপজ্জনক চিহ্নগুলোর বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। তখন অবশ্যই নিকটস্থ চিকিৎসকের কাছে যোগাযোগ করতে হবে। 

চিকিৎসা যখন শেষ হয়ে যায় এরপর কী আর হওয়ার আশঙ্কা থাকে?

ডা. আহমেদ নাজমুল আনাম: সাধারণত এটি আর হয় না। একটি নিউমোনিয়া কিন্তু বার বার হতে পারে। ব্রঙ্কিওলাইটিস আমরা বলব আর সাধারণত হয় না এবং চিকিৎসায় পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়। সাধারণত সারতে দুই থেকে তিনদিন সময় লাগে। তবে কঠিন অবস্থাটি দুই থেকে তিনদিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। কাশিটা কিছুদিন থাকবে এটি নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। 

প্রতিরোধ কীভাবে করবে?

ডা. আহমেদ নাজমুল আনাম: প্রথমতো আমি বলব বুকের দুধ পান করাতে। যে বাচ্চা অপরিষ্কার ঘরে থাকছে তার এই রোগ হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যাবে। যেসব মা-বাবার ধূমপানের অভ্যাস রয়েছে, তাঁদের বাচ্চাদের এসব বিষয়ে বেশি আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে। 

তাই বুকের দুধ খাওয়ানো, যেসব ঘরে আলো-বাতাস আছে, শিশুকে সেই ঘরে রাখা, মা-বাবাকে ধূমপান মুক্ত থাকা— এগুলো রোগ প্রতিরোধ করবে। 

যদি জ্বর চলে আসে এই ক্ষেত্রে কী করবে?

ডা. আহমেদ নাজমুল আনাম: সেই ক্ষেত্রে আমরা প্যারাসিটামল দিতে বলব। চিকিৎসকের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে অ্যান্টিবায়োটিক দেব কি না। চিকিৎসকই বলে দেবেন বিষয়টি।

হাঁপানি কিভাবে নির্ণয় করবেন?

ডা. ইকবাল হাসান মাহমুদ: হাঁপানি আক্রান্ত বাচ্চা প্রধানত শ্বাসকষ্টে ভুগে থাকে। বারবার এ অসুখে আক্রান্ত হয় এবং বারবার সুনির্দিষ্ট চিকিৎসার সাহায্যে আবার কখনোবা নিজে নিজেই সেরে উঠে। অ্যালার্জিজনিত বা এটোপিক হাঁপানি শিশুর অল্প বয়সে হতে দেখা যায়। কোনো খাবার জিনিস কিংবা ওষুধে বাচ্চার অ্যালার্জি দেখা গেলে তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে রক্তে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের তৈরি ঘটে। এ সব পদার্থ পরে সংবেদনশীল শ্বাসনালিকে সংকুচিত করে। এ ধরনের হাঁপানিতে দেখা যায় মা-বাবা অথবা বাবার দিকে কারও মধ্যে হাঁপানি বা অ্যালার্জির বংশগত উপস্থিতি। (ক) হাঁপানি বা অ্যালার্জির পারিবারিক ইতিহাস। (খ) বাচ্চা বারবার শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভুগছে এবং শাঁ শাঁ শব্দ শোনা গেলে। (গ) সব সময় অথবা বারে বারে কাশি লেগে থাকলে। (ঘ) রাতে শোবার বেলায় বা ভোরের দিকে কাশি বা শ্বাসকষ্টের আওয়াজ। (ঙ) উপসর্গ দেখা দেওয়ার সূচনা হিসেবে কোনো ভাইরাস জ্বর, ব্যায়াম, মানসিক চাপ অথবা বিশেষ কোনো খাবার বা আবহাওয়া জড়িত আছে বলে মনে হলে। 

নিউমোনিয়া কাদের হয়?

ডা. জহুরুল হক সাগর: বাচ্চাদের এবং বড়দের সবারই নিউমোনিয়া হতে পারে। তবে ৫ বছরের কম বয়েসী বাচ্চাদের মধ্যেই এর প্রকোপ বেশি।

দেখা গেছে যেসব বাচ্চা অপুষ্ট হয়ে জন্ম নিয়েছে, ওজন কম, বুকের দুধ খায়নি। টিকা ঠিকমত নেয়নি, ঘন বসতিতে থাকে স্যাঁতসেতে ঘরে বাস করে, যে ঘরে বড়রা ধূমপান করে তাদের মধ্যে এর প্রকোপ বেশি হয়।

আবার কোন কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে যেমন: অপুষ্টি, হাম, নেফ্রটিক সিনড্রম, ক্যান্সার বা ক্যান্সার ওষুধ ও স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ ব্যবহারকারীদের মধ্যে নিউমোনিয়া হওয়ায় হার বেশি।

কোন টিকা নিলে নিউমোনিয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়?

ডা. জহুরুল হক সাগর: নিউমোকক্কাস, হেমোফাইলাস, স্টেফাইলোকক্কাস, ক্লেবসিয়েলা, টিবি ইত্যাদি জীবাণু দিয়ে এই রোগ হয়। টিবি, নিউমোনোকক্কাস এবং হেমোফাইলাসের টিকা সরকারিভাবে সারাদেশেই বিনামূল্যে বাচ্চাদের দেয়া হয়। হাম-রুবেলার টিকাও এখন বিনামূল্যে দেয়া হচ্ছে। তাই এই রোগগুলোর পরবর্তীতে হওয়া নিউমোনিয়ার প্রকোপও কম।

নিউমোনিয়া হলে কি হয়?

ডা. জহুরুল হক সাগর: শ্বাসে টেনে নেয়া বাতাস থেকে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন এবং শরীরের অপ্রয়োজনীয় কার্বন-ডাই-অক্সাইড বের করে দেয়াই হলো শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রধান কাজ। নিউমোনিয়া হলে শ্বাসনালীর শেষ প্রান্তে যেখানে এই বাতাসের আদান-প্রদান হয় সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এটা বাধাগ্রস্ত হয়। ফলাফল: অক্সিজেন পাওয়া থেকে শরীর বঞ্চিত এবং বিষাক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড শরীরে জমা হওয়া। যা দ্রুতই মস্তিষ্ক, হৃদপি-, কিডনি ইত্যাদিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে বাচ্চাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।

কখন বুঝবেন আপনার বাচ্চার নিউমোনিয়া হয়েছে?

ডা. জ0হুরুল হক সাগর: জীবাণু দিয়ে শ্বাসনালী আক্রান্ত হলেই শরীরে প্রতিরোধ হিসাবে কাশি এবং জ্বর তৈরি করে। ভাইরাসের কারণে হলে সর্দি বা চোখ দিয়ে পানি পড়ার মতো উপসর্গও থাকতে পারে। এরপর অক্সিজেন এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইডের এক্সচেঞ্জ বাড়াতে শ্বাসের গতি বাড়িয়ে দেয়। এই শ্বাসের গতি ২ মাসের কমে ৬০ বা এরচেয়ে বেশি ১ বছরের নিচে ৫০ বা তারচেয়ে বেশি এবং ৫ বছরের নিচে ৪০ বা তার চেয়ে বেশি হলে আমরা তাকে নিউমোনিয়ার কারণের দ্রুত শ্বাস হিসেবে ধরে নেই। শ্বাস নিতে গিয়ে বুকের খাঁচা দেবে গেলে তাকে আমরা মারাত্মক নিউমোনিয়া বলি। তবে শ্বাসের গতি বেড়ে গেলেই আমরা নিউমোনিয়া হয়েছে বলে ধরে নেই।

কখন বাচ্চাকে ডাক্তারের কাছে নিবেন?

ডা. জহুরুল হক সাগর: কাশি, জ্বরের সাথে বাচ্চার শ্বাসকষ্ট শুরু হলেই তাকে নিটকস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে বা অভিজ্ঞ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন।

তবে অপুষ্টিতে ভোগা রোগীদের কাশির সাথে জ্বর বা উল্টো শরীর ঠান্ডা হয়ে গেলেও ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে।

আবার ২ মাসের কম বয়সের রোগীদের নেতিয়ে যাওয়া, খিঁচুনি হওয়া, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা খেতে না পারার লক্ষণ থাকলেও ডাক্তারের নিকট নিয়ে যেতে হবে।

নিউমোনিয়া হলে কি পরীক্ষা করাবেন?

ডা. জহুরুল হক সাগর: লক্ষণ শুনে, দেখে এবং রোগীর শরীর, বুক পরীক্ষা করে নিউমোনিয়া শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করা হয়। তবে নিউমোনিয়ার ধরন জেনে চিকিৎসা দেয়ার জন্য অনেক সময়ই বুকের এক্সরে পরীক্ষা করা হয়। আবার রক্ত, কফ পরীক্ষা করেও জীবাণু নির্ণয় করা হয়।

চিকিৎসা করবেন কিভাবে?

কম মারাত্মক নিউমোনিয়ার বাচ্চাকে খোলা বাতাসে আরামে শ্বাস নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

বাচ্চার খাবার এবং শরীরের পানির পরিমাণ ঠিক রাখতে হবে।

জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ দিতে হবে।

আর অ্যামোক্সিসিলিন, কট্রিম অক্সাজল, সেফালোস্পোরিন জাতীয় এন্টিবায়োটিক ঠিক পরিমাণ মতো (ওজন দেখে) ৫-৭ দিন দিতে হবে।

নাক বন্ধ থাকলে নরমাল স্যালাইন (লবণ-পানির মিশ্রন) দিয়ে ভিজিয়ে তা খুলে দিতে হবে। আবার আলতো করে টেনেও তা বের করে আনা যাবে।

মারাত্মক নিউমোনিয়ায় রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দিতে হবে। প্রথমেই অক্সিজেন দিয়ে শ্বাসে সাহায্য করতে হবে।

এরপর পেটে নল দিয়ে বা শিরার মাধ্যমে পুষ্টির ব্যবস্থা করে দিতে হবে, যতক্ষণ বাচ্চা সহজে মুখে খেতে না পারবে।

এরপর প্রয়োজনীয় এন্টিবায়োটিকও শিরার মাধ্যমে দিতে হবে। তবে হাসপাতালে আসার আগে, স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে গেলে মাংসের মধ্যে ১ ডোজ এন্টিবায়োটিক সে দিয়ে দিবে।

কাশির জন্য দুশ্চিন্তা নয়:

ডা. জহুরুল হক সাগর: এ সময়ে কাশিতে বাচ্চাকে বুকের দুধ, গরম পানি, তুলশি পাতার রস, লেবুর রস, চা, কফি, মধু - বয়স অনুসারে দিতে হবে। তবে এই কাশি ১ থেকে ৩ সপ্তাহ পর্যন্ত সময়ে ধীরে ধীরে কমে যাবে। নতুন কোন এন্টিবায়োটিকের প্রয়োজন নেই।

তাই বলা যায়, নিউমোনিয়া প্রতিরোধ করতে এবং দ্রুত চিকিৎসা করতে হলে গণসচেতনতা বাড়াতে হবে। তবেই এই রোগ থেকে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব।

শিশুর শ্বাসকষ্ট কেন হয়?

শীতে বৃষ্টি কম হওয়ায় ধুলাবালি, গাড়ির ধোঁয়া আর আবর্জনা সব মিলে জীবাণুর পরিমাণ বেড়ে যায়। আপনার শিশু আক্রান্ত হতে পারে শ্বাসকষ্টজনিত অসুখে।

সাধারণত শর্দি-জ্বর হলে শিশুরা এই সমস্যায় ভুগে থাকে। আবার শীতকালে অনেক শিশুর শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।  

ফুসফুসে ভাইরাল ইনফেকশন হলেই শ্বাসকষ্ট হয়। ভাইরাস ফুসফুসের সারফেস লাইনিং নষ্ট করে দেওয়ায় মিউকোসাল ইমিউনিটি কমে যায়। এতে করে ব্যাকটেরিয়ার গ্রোথ হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। ফুসফুসের এ ভাইরাল ইনফেকশন এবং ব্যাকটেরিয়ার গ্রোথ থেকেই হতে পারে নিউমোনিয়া

ধোঁয়া, ধূলাবালি, পশুর লোম, পালক, ঘাস এবং ফুলের রেণু, কিছু খাবার বিশেষ করে আইসক্রিম এবং ঠান্ডাজাতীয় খাবার, হাঁপানির উৎপত্তি ঘটায়। এপিগ্লটাইটিস, ক্রুপ, শ্বাসনালীতে কিছু প্রবেশ করার কারণেও শিশুদের শ্বাসকষ্ট হতে পারে।

মায়ের বুকের দুধ:

জন্মের পরে থেকে ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়াতে হবে।যেসব শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো না হয় তারা বেশি শ্বাসকষ্টের সমস্যায় ভোগে। তাই শিশুকে অবশ্যই মায়ের দুধ খাওয়াতে হবে। 

গরম-ঠাণ্ডা:

অতিরিক্ত গরম-ঠাণ্ডা থেকে শিশুর শ্বাসকষ্টের সমস্যা হতে পারে। তাই অতিরিক্ত গরমে বা ঠাণ্ডায় যেন শিশুর গা ঘেমে ঠাণ্ডা লেগে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। 

ব্রংকিউলাইটিস:

ব্রংকিউলাইটিস শিশুদের ফুসফুসের ভাইরাসজনিত সংক্রমণ। এই সংক্রামণ ১ বছরের কম বয়সী শিশুরা বেশি আক্রান্ত হয়।মায়ের দুধ না খাওয়া,যেসব শিশু কম ওজন নিয়ে জন্মায়,তারা বেশি ব্রংকিউলাইটিসে আক্রান্ত হয়। ব্রংকিউলাইটিসের মাত্রা বেড়ে গেলে তা ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।তাই সচেতন হতে হবে। 

অ্যালার্জি:

অ্যাজমা বা হাঁপানি শিশুর শ্বাসনালির এক ধরনের অ্যালার্জি। বাবা-মায়ের থাকলে এই সমস্যা শিশুরও হতে পারে। শিশুর অ্যালার্জির সমস্যা বেশি হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

শিশুর শ্বাসকষ্টের লক্ষণ:

* ঘন ঘন শ্বাস নেবে এবং শ্বাস নেয়ার হাড় বেড়ে যাবে

* শ্বাসের সঙ্গে কোনো আওয়াজ হলে

* শ্বাস নেওয়ার সময় পেট ভেতরে ঢুকে গেলে

* বুকে ব্যথা হলে

* ঘন ঘন শুকনা কাশি

* অতিরিক্ত খিটখিটে মেজাজ

* বেশ কয়েক দিন টানা জ্বর

* ঘুমঘুম ভাব এগুলোর সঙ্গে যদি কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এবং নাকের মাথা, ঠোঁটের চারপাশে নীল হয়ে যায় তাহলে অবহেলা না করে চটজলদি একজন শিশু বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে।

প্রতিরোধ ও প্রতিকার : 

পরিবারে কারও এ্যাজমার হিস্ট্রি না থাকলেও প্রথম থেকেই কিছু প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে পারলে ভালো।

* জন্মের পর থেকে ছয় মাস পর্যন্ত বাচ্চাকে এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং করান অতি জরুরি। এতে বাচ্চার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়।

* ভ্যাকসিনেশন-সবগুলো ভ্যাকসিন যেন সঠিক সময়ে অবশ্যই দেয়া হয় সেদিকে খুব গুরুত্ব দিতে হবে।

* বাচ্চার ঘর যেন হয় আলো বাতাসে ভরপুর।

* প্রতিদিন বাচ্চা যেন রোদে কিছু সময় হলেও থাকতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সূর্যরশ্মি থেকে আমাদের শরীরে যে ভিটামিন তৈরি হয় তাও আমাদের রোগ প্রতিরোধ করে।

* বাচ্চাদের নিউট্রিশনাল ব্যালান্স জরুরি।

* পর্যাপ্ত পানীয় খাবার নিশ্চিত করতে হবে।

* বাসার কাজে সাহায্যের জন্য যারা আছেন তাদের দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। তাদেরও প্রপার হাইজিন মেইনটেইন করতে হবে।

* স্কুল থেকে এবং বিকালে খেলাধুলা করে বাচ্চারা বাসায় ফিরলে তাদের ঘামে ভেজা জামা-কাপড় পাল্টে দিয়ে হাত মুখ ধোয়ানোর অভ্যাস করতে হবে।

* বাইরে যাওয়ার সময় এবং ঘুমানোর সময় বাচ্চাদের শরীরে পর্যাপ্ত শীতের কাপড় যেন থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এতে করে রোগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশেই কমে যাবে।

*ধূমপান: ধূমপান সবার জন্য ক্ষতিকর। তবে এটি শিশুদের জন্য বেশি ক্ষতিকর। তাই শিশুর সামনে ধূমপান করা যাবে না। এছাড়া রান্নার চুলার ধোঁয়া, বাতাসে ধুলোবালি, ফুলের রেণু, কার্পেটের ধুলা থেকে শিশুকে দূরে রাখুন। 

*খাবার: শিশু মায়ের বুকের দুধ খায়। তাই কোনো খাবারে যদি এলার্জি থাকে তবে তা মা কখনোই খাবেন না। খাবারের ক্ষেত্রে সতর্ক হোন। 

*ইনহেলার ও নেবুলাইজার ব্যবহার: শিশুর শ্বাসকষ্টজনিত অসুখের চিকিৎসায় ইনহেলার ও নেবুলাইজার ব্যবহার করা হয়ে থাকে। অনেক অভিভাবকই শিশুকে ইনহেলার ব্যবহার করাতে ভয় পান। যদিও ইনহেলার ব্যবহারে ভয়ের কিছু নেই। 

*যেসব শিশুর অ্যালার্জি বা অ্যাজমাজনিত সমস্যা আছে, সেসব শিশুর ক্ষেত্রে ঘরবাড়ি যত দূর সম্ভব ধুলাবালিমুক্ত রাখতে হবে। ঘরে প্রপার ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে আর বাসায় সব সময় ইনহেলার বা নেবুলাইজারের ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং এগুলোর সঠিক প্রয়োগবিধি জেনে নিতে হবে। জ্বরের কারণেও শিশুর শ্বাসকষ্ট হতে পারে। এ ক্ষেত্রে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা খুবই জরুরি। স্পাউঞ্জিং বা প্যারাসিটামলের মাধ্যমে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেটি, সেটি নিউমোনিয়া। নিউমোনিয়ার কারণে শিশুর শ্বাসকষ্ট হয়। এ ক্ষেত্রে শিশুর জ্বর থাকতে পারে, তীব্র কাশি থাকতে পারে, শিশু ঘন ঘন শ্বাস নেবে। শিশুর ক্ষেত্রে মাথার তালু দেবে যেতে পারে, বুকের খাঁচা ভেতরে ঢুকে যেতে পারে; এসব ক্ষেত্রে দেরি না করে নিকটস্থ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। অথবা হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

অনেক সময় খেলার ছলে শিশুর শ্বাসকষ্ট হতে পারে। সে ক্ষেত্রে শ্বাসনালীতে খাবার বা খেলনা ঢুকে গিয়ে শিশুর তীব্র শ্বাসকষ্ট হতে পারে। সে ক্ষেত্রে দেরি করার কোনো সুযোগ নেই। নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে চিকিৎসা দিতে হবে।

ব্রঙ্কিউলাইটিস:

২০০০ ও ২০০১ সালে প্রাদুর্ভাব ঘটায় বাংলাদেশে ব্রঙ্কিউলাইটিস রোগটি সম্পর্কে প্রথম সচেতনতা তৈরি হয়। এর আগে শিশুদের সব শ্বাসকষ্টকে নিউমোনিয়া বলেই ধরে নেওয়া হতো।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুদের জ্বর-শ্বাসকষ্ট হলে নিউমোনিয়া হয়েছে ধরে নিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করা হয়, যা অপ্রয়োজনীয়। এই প্রবণতা বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিসট্যান্স বিকাশ লাভে বিশেষভাবে সহায়তা করেছে।

ব্রঙ্কিউলাইটিস রোগটি সঠিকভাবে নির্ণয় করে সুচিকিৎসা দিতে পারলে দেশে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ও অতিব্যবহার অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব।

আমাদের বুকের দুই পাশে দুটি ফুসফুস আছে, যার কাজ হলো শরীরের দূষিত কার্বন ডাই-অক্সাইড বের করে দিয়ে পরিবেশ থেকে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহ করা। ফুসফুসগুলো দেখতে ওল্টানো গাছের মতো। গাছ শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে যেমন পাতায় শেষ হয়, তেমনি ফুসফুসের পাতাগুলো আমাদের শরীরে এলভিওলাই হিসেবে পরিচিত। এলভিওলাইতে ব্যাকটেরিয়াজনিত প্রদাহ হলে আমরা ধরে নিই নিউমোনিয়া হয়েছে এবং পাতার বোঁটায় বা ব্রঙ্কিউলে যদি ভাইরাসের কারণে প্রদাহ হয়, তাকে বলে ব্রঙ্কিউলাইটিস। তাই এ দুইয়ের মধ্যে তফাত রয়েছে। রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস ব্রঙ্কিউলাইটিসের প্রধান কারণ।

রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শিশুদের শরীরে প্রবেশ করে এবং শ্বাসনালির ব্রঙ্কিউলসে প্রদাহ করে। তিনটি কারণে শ্বাসনালি সরু হয়ে যায়। ১. শ্বাসনালির দেয়ালে প্রদাহজনিত পানি জমা, ২. শ্বাসনালিতে অনেক শ্লেষ্মা উৎপাদন এবং ৩. প্রদাহের কারণে শ্বাসনালির মৃত কোষ ঝরে পড়া। শিশুর ফুসফুসে বাতাস আটকে যায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হয়।

কোন শিশুদের হয়ে থাকে?

এক বছরের কম, বিশেষ করে দুই থেকে ছয় মাস বয়সের শিশুরাই প্রধানত আক্রান্ত হয়। যেসব শিশু বুকের দুধ খেতে পারেনি, স্বল্প ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণকারী শিশুরা, ধূমপানকারী পরিবারের শিশুরা, জন্মগত হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত শিশুরা ব্রঙ্কিউলাইটিসে আক্রান্ত হলে অসুখটি দীর্ঘস্থায়ী হয়।

উপসর্গ ও লক্ষণ:

সামান্য জ্বর, নাক দিয়ে পানি পড়া, অস্থিরতা, কিছু খেতে না পারা, অবিরাম কান্না, গলা বসে যাওয়া, শিশুর হাসি থেমে যাওয়া, ঘন ঘন শ্বাস নেওয়া, শ্বাসকষ্ট হওয়া ইত্যাদি ব্রঙ্কিউলাইটিসের উপসর্গ।

শারীরিক পরীক্ষা করলে দ্রুত শ্বাস হার ৬০ থেকে ৭০ প্রতি মিনিটে বা এর বেশি পাওয়া যায়। বুকের পাঁজরের নিচের অংশ দেবে যায়। ঠোঁট বা হাত-পা নীল হয়ে যাওয়া, শিশুর নাকের কাছে কান পাতলে শ্বাস ফেলার সময় বাঁশির মতো আওয়াজ এর লক্ষণ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বুকে বাঁশির মতো শব্দ এবং অনেক সময় চুলের ঘর্ষণের শব্দ শোনা যায়।

এই শিশুরা তিন থেকে চার দিনের মধ্যেই সুস্থ হতে থাকে এবং শ্বাসকষ্ট সত্ত্বেও কাশতে থাকে এবং হাসতে থাকে।

রোগনির্ণয়:

ব্রঙ্কিউলাইটিস রোগ নির্ণয়ের জন্য রক্ত পরীক্ষা বা বুকের এক্স–রে করার প্রয়োজন নেই। তবে পরীক্ষা করলে বুকের এক্স-রেতে ফুসফুসে বাতাস আটকে থাকার আলামত পাওয়া যায়। ফুসফুস বেশ বড় এবং বেশি কালো দেখায়। তবে ফুসফুসে নিউমোনিয়া হওয়ার লক্ষণ যেমন কোনো অংশ সাদা হয়ে যাওয়ার কোনো চিহ্ন থাকে না। তুলার মতো সাদা সাদা অংশ থাকতে পারে, যা ভাইরাসজনিত নিউমোনিয়ার কারণে হতে পারে। রক্ত পরীক্ষায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে শ্বেতকণিকার মাত্রা স্বাভাবিক থাকে এবং ইএসআর, সিআরপি খুব বেশি বাড়ে না।

চিকিৎসা:

শিশু স্বাভাবিক থাকলে, খেতে পারলে, জ্বর বেশি না হলে এবং শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা না কমে গেলে বাড়িতে রেখে চিকিৎসা করতে হবে। মাথা উঁচু করে রাখতে হবে, বুকের দুধ বা অন্য স্বাভাবিক খাবার দিতে হবে এবং পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। যদি খেতে সমস্যা হয়, শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়, জ্বর বেড়ে যায়, তাহলে হাসপাতালে নিতে হবে।

হাসপাতালে চিকিৎসা:

পালস অক্সিমিটার যন্ত্রের সাহায্যে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা নিরূপণ করা যায়। রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা ৯০ থেকে ৯২ শতাংশের নিচে হলে শিশুকে অক্সিজেন দিতে হবে। রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা ৯৫ শতাংশের ওপরে রাখতে হবে।

খেতে না পারলে নাকে নল দিয়ে খাওয়াতে হবে অথবা শিরায় স্যালাইন দিতে হবে।

নেবুলাইজেশন দিয়ে চিকিৎসা করা বহুদিনের প্রচলিত চিকিৎসা। সলবিউটামল দিয়ে নেবুলাইজ করলে কিছুসংখ্যক শিশুর উপকার হয়, কিছুসংখ্যক শিশুর কোনো উপকার হয় না এবং কিছুসংখ্যক শিশুর জন্য ক্ষতিকারক। তবে উচ্চমাত্রার স্যালাইন দিয়ে নেবুলাইজ করলে বুকের শ্লেষ্মা তরল হয় এবং শিশুর শ্বাসকষ্ট কমাতে সাহায্য করে।

এসব চিকিৎসা সত্ত্বেও যদি শিশুর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়, তবে তাকে শিশু আইসিইউতে ভর্তি করাতে হবে।

অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন নেই:

ব্রঙ্কিউলাইটিস একটি ভাইরাসজনিত রোগ। তাই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কোনো দরকার নেই। তবে শিশু যদি বেশি অসুস্থ হয়, জ্বর বেশি থাকে, কম বয়সে (২ মাসের মধ্যে) বেশি ঝুঁকি থাকে, তবে চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

শিশু যদি খেতে পারে, শ্বাসকষ্ট কমে যায়, অক্সিজেনের প্রয়োজন না হয়, জ্বর না থাকে, শিশুকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। তিন থেকে পাঁচ দিনের মধ্যেই অনেক শিশু বাড়ি যেতে পারে।

যেসব শিশুর ঝুঁকি বেশি, যেমন বুকের দুধ খায়নি, সময়ের আগে জন্মগ্রহণ করেছে, রক্তস্বল্পতা থাকলে, জন্মগত হার্টে সমস্যা থাকলে সুস্থ হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।

অভিভাবকের জন্য বার্তা:

ব্রঙ্কিউলাইটিস ছোট্ট শিশুদের ফুসফুসের ভাইরাসজনিত অসুখ, এটি নিউমোনিয়া নয়। আক্রান্ত শিশুরা তিন থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে দ্রুত সুস্থ হয়, যদি ঝুঁকি না থাকে। কিন্তু কাশি থাকতে পারে ২১ দিন পর্যন্ত।

শ্বাসকষ্ট কমে গেলে ও অক্সিজেনের প্রয়োজন না হলে, খেতে পারলে হাসপাতালে থাকার দরকার নেই।

পরবর্তী সময়ে শিশুটি আবারও ব্রঙ্কিউলাইটিসে আক্রান্ত হতে পারে, এমনকি কিছুসংখ্যক শিশুর হাঁপানিও হতে পারে। বারবার শ্বাসকষ্ট হওয়া মানে নিউমোনিয়া নয়।

নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কিউলাইটিসের পার্থক্য:

উপসর্গ ও লক্ষণে কিছু মিল থাকলেও ব্রঙ্কিউলাইটিস ও নিউমোনিয়ার দুটি রোগের চিকিৎসা ও গতি–প্রকৃতি সম্পূর্ণ আলাদা।

নিউমোনিয়া যেকোনো বয়সে হতে পারে, কিন্তু ব্রঙ্কিউলাইটিস দুই বছর বয়সের পরে আর হয় না।

নিউমোনিয়া হলে শিশুর জ্বর বেশি হয়, শিশুকে বেশি অসুস্থ মনে হয়, ঘন ঘন দম নেওয়া, বুক দেবে যাওয়া এবং চিকিৎসাযন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া যায়। রক্ত পরীক্ষা করলে শ্বেতকণিকার মাত্রা বেড়ে যায়, ইএসআর এবং সিআরপিও অনেক বেশি হয়। বুকের এক্স-রে করলে বিভিন্ন স্থানে সুনির্দিষ্ট সাদা সাদা দাগ বা ফুসফুসের একটি অংশ একেবারে সাদা হয়ে যায়।

নিউমোনিয়া হলে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করতে হবে। অক্সিজেন দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে এবং শিরায় স্যালাইন দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

তথ্যসূত্র:

  • বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ কামরুল হাসান সবুজ, একুশে টিভি।
  • By লেখা, প্রথম আলো।
  • ডা. তানজিনা আল-মিজান, এবং 
  • ডা.মানিক কুমার তালুকদার, শিশু বিশেষজ্ঞ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়,  যুগান্তর।
  • ডা. সাজিয়া ফারাহ নাজির, এবং
  • ডা. আহমেদ নাজমুল আনাম, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিভাগের পরামর্শক, এনটিভি।
  • অধ্যাপক ডা. ইকবাল হাসান মাহমুদ, বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ, ইকবাল চেস্ট সেন্টার, মগবাজার ওয়্যারলেস, ঢাকা, বাংলাদেশ প্রতিদিন।
  • ডা. জহুরুল হক সাগর, নবজাতক, শিশু ও কিশোর রোগ বিশেষজ্ঞ, প্রাইম এইড হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার শনির আখড়া বাসষ্ট্যান্ড, ব্যাংক এশিয়া ভবন, ঢাকা, ইনকিলাব।
  • Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই

Popular Post

Blogger দ্বারা পরিচালিত.