সুস্বাস্থ্যের জন্য ক্যালরি গ্রহণ এবং বর্জন! কিভাবে?
ক্যালরি গ্রহণ:
শরীরের আকার-আকৃতি কিংবা ওজন সঠিকভাবে বজায় রাখার জন্য আমাদের প্রতিনিয়ত ক্যালরি গ্রহণের মাত্রাকে স্বাস্থ্যকর রাখা উচিত। তবে আপনার খাবারের সঙ্গে কত ক্যালরি গ্রহণ করা উচিত তার মাত্রা নির্ভর করবে বয়সের ওপর। আপনার বয়স যদি হয় অল্প তাহলে যে মাত্রায় ক্যালরি গ্রহণ করতে হবে, বয়স বাড়লে সে পরিমাণ ক্যালরি গ্রহণ করতে হবে না। এক প্রতিবেদনে বিষয়টি জানিয়েছে ইন্ডিপেনডেন্ট। সাধারণ নিয়মে প্রতিদিন নারীদের দুই হাজার ক্যালরি এবং পুরুষদের আড়াই হাজার ক্যালরি গ্রহণ করার বিষয়টি জানা যায়। এটি বহুদিন ধরেই প্রচলিত একটি নিয়ম। কিন্তু এ নিয়মই শেষ কথা নয়। কারণ গবেষকরা সম্প্রতি জানিয়েছেন, এ মাত্রা বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিসংখ্যানবিদ নাথান ইয়াও বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করে আপনার দেহের জন্য ক্যালরির সঠিক মাত্রা কত হওয়া উচিত, তা অনুসন্ধান করেন। এতে তিনি জানান, বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে একজনের ক্যালরি গ্রহণের আদর্শ মাত্রা কমবেশি হতে পারে। কোনো ব্যক্তির জীবনযাপন যদি কর্মঠ হয় তাহলে তার ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা স্বভাবতই বেশি হবে। কারণ পরিশ্রমের মাধ্যমে তার দেহের ক্যালরি ক্ষয় হয়ে যাবে। এছাড়া রয়েছে বয়স ও অন্যান্য বিষয়ের প্রভাব।
নারীদের ক্ষেত্রে জীবনযাপনের ওপর নির্ভর করে ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা ব্যাপকভাবে তারতম্য হয়। এমনকি তাদের বয়স যখন ২০ থেকে ৩০ থাকবে তখন ২৪০০ পর্যন্ত ক্যালরি প্রয়োজন হতে পারে। পরবর্তীতে তার চাহিদা কমে যায়। পুরুষ পুরুষের ক্ষেত্রে এ মাত্রা কিছুটা ভিন্ন। শারীরিক গঠনের কারণেই পুরুষের ক্যালরির চাহিদার মাত্রা বেশি হয়। ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী কিছুটা কর্মবিমুখ পুরুষের ক্ষেত্রে এ চাহিদা থাকে ২৪০০ ক্যালরি। ৬০ বছর বয়সে তা ২০০০-এ পৌঁছাতে পারে। তবে যে পুরুষেরা কর্মঠ জীবনযাপন করেন তাদের ২০ বছর বয়সে দৈনিক তিন হাজার ক্যালরি প্রয়োজন হয়। তবে ৬০ বছর বয়সে তা ২৬০০তে নেমে যেতে পারে। ক্যালরি নিয়ন্ত্রণই শেষ কথা নয় পুষ্টিবিদরা জানান, দেহের ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য শুধু ক্যালরি নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দিলেই চলবে না। এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো হয় নিয়মিত শারীরিক অনুশীলন করা ও সুষম ডায়েট করা। এছাড়া প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতে হবে কিংবা পানিযুক্ত খাবার খেতে হবে।
প্রশ্ন: পানিতে কি ক্যালরি আছে?
উত্তর: শরীর প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ক্যালরি পায় তিন ধরনের খাবার থেকে। তা হলো প্রোটিন, ফ্যাট এবং কার্বোহাইড্রেট। পানিতে এ তিনটির একটিও না থাকায় এতে কোনো ক্যালরি নেই। তবে পানির অসংখ্য উপকারিতা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যালরির ভয়ে বাকি সব খাদ্য ও পানীয় নিয়ে চিন্তা করতে হলেও নিশ্চিন্তে পানি খেতে পারেন। কারণ পানিতে কোনো ক্যালরি নেই।
কিন্তু ক্যালরি নেই মানে এই নয় যে পানি শরীরে শক্তি দেয় না।
পানি আসলে খাবার থেকে পাওয়া শক্তিকে ভেঙে শরীরের বিভিন্ন অংশ পৌঁছে দেয়।
এছাড়া ক্যালরি ঝরাতেও পানি ভূমিকা রাখে। এ কারণে দৈনিক আট গ্লাস পানি পানের পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
ক্যালরি বর্জন:
| ক্যালরি পোড়াতে করতে হবে ব্যায়াম। |
দৈনিক ৫০০ ক্যালরি কমাতে যে কয়টি নিয়ম আপনাকে মেনে চলতে হবে—
l- দেহের প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও খনিজ উপাদানের জন্য এক মুঠো বাদামই যথেষ্ট। এর বেশি যখনই খাবেন, তখন তা ক্যালরির পরিমাণ বাড়াবে। ফ্যাটযুক্ত মাত্র তিন মুঠো বাদামে রয়েছে প্রায় ৫২৫ ক্যালরি। তাই অতিরিক্ত বাদাম খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
l- ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় পাওয়া গেছে, টিভির সামনে খেতে বসলে আরও ২৮৮ পরিমাণ ক্যালরির খাবার বেশি খাওয়া যায়। বরং টেবিলে খাওয়াদাওয়া, টিভি সেটের সামনে ঘণ্টা খানেক হাঁটাহাঁটিতে দৈনিক ৫২৭ ক্যালরি থেকে রক্ষা পাবেন।
l- সালাদ স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী মনে হলেও বর্তমানে সালাদে যেসব উপাদান ব্যবহার করা হয়, তাতে অধিক ক্যালরি থাকে। ভাজা পেঁয়াজ, মাশরুম ও অন্য উপাদান মিলে এতে ৫০০-এর অধিক ক্যালরি থাকতে পারে।
l- গবেষকদের মতে, একটি ১২ ইঞ্চি প্লেটের বদলে ১০ ইঞ্চি প্লেটে খাবার খেলে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কম খাওয়া হয়, যা আপনাকে বিরত রাখতে পারে ৫০০ ক্যালরি শক্তি সঞ্চয় থেকে।
l- ডেজার্টজাতীয় খাবার থেকে বিরত থাকুন। পুরো দুধ কিংবা ক্রিম যুক্ত কফি, সিরাপ তৈরি করে ৬৪০ ক্যালরি। বরং বেছে নিতে পারেন ব্ল্যাক কফিকে।
l- বড় বাক্সে করে স্ন্যাকস খাবেন না। কেননা, নয় আউন্সের একটি পাত্রের স্ন্যাকসে থাকে ১ হাজার ২৬০ ক্যালরি।
l- খাওয়ার সময় আগে খেতে না বসে খাবার পরিবেশনের কাজটি নিজের দায়িত্বে তুলে নিন। এক কাপ পাস্তায় ২২০ ক্যালরি থাকে। কিন্তু রেস্টুরেন্টের ডিনারে বড় এক কাপ পাস্তায় থাকে ৪৮০-এর বেশি ক্যালরি। এমন তথ্য খুঁজে পেয়েছে নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়। তাই কম পাস্তা খান।
মাইন্ডলেস ইটিং-এর লেখক ব্রায়ান ওয়ানসিনকের মতে, একসঙ্গে সাত কিংবা তারও বেশিসংখ্যক অতিথির সঙ্গে খাবার খেলে অধিক খাওয়া হয়। খাবারে কম অতিথি রাখুন, তাহলে ৫০০-এর অধিক ক্যালরি থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন।
ওজন হ্রাস বিশেষজ্ঞ জেমস ও হিলের মতে, প্রতিবার খাওয়ার সময় ২৫ শতাংশ খাবার রেখে দিন। বরং মুখরোচক খাবারগুলো পরের বেলায় খাওয়া অপেক্ষায় থাকুন। সে ক্ষেত্রে আপনি দুই হাজার বা তার বেশি ক্যালরির খাবার খেলে ৫০০ ক্যালরি আর যুক্ত হচ্ছে না আপনার শরীরে।
l- ১২ আউন্সের সফট ড্রিংকসে ১৫০ থেকে ১৮০ ক্যালরি থাকে। তিন-চার দিনের আগে সফট ড্রিংকস খাবেন না। বরং তৃষ্ণায় পানি খান।
l- সকালবেলার নাশতা হিসেবে দুটি সেদ্ধ ডিম খান। দুপুরের খাবারে আগে কম ক্যালরির এক কাপ স্যুপ খান। এতে পেট পরিপূর্ণ থাকবে। যেটি আপনাকে বিরত রাখবে ৬৮৪ ক্যালরির খাবার খাওয়া থেকে।
l-বিভিন্ন সময় পপকর্ন নয়। অনুমোদিত বড় ধরনের এক প্যাকেট পপকর্নে থাকে হাজারো ক্যালরি। যদি পারেন নিজে তৈরি করে খান। তাতে থাকবে ৭০০-এর মতো ক্যালরি।
l-সোডা, গ্যাস ড্রিংকস ও চিনিযুক্ত পানীয় বা চা-এ প্রচুর চিনি ও ক্যালরি যুক্ত থাকে। যদি তিন-চার গ্লাস এসব গ্যাস ড্রিংকস ও চিনিযুক্ত পানীয় পান করা হয়, তাহলে ৫০০ ক্যালরি গ্রহণ করা হয়ে যায়। এসব ড্রিংকস ও পানীয় বাদ দিয়ে শুধু পানি, গ্রিন টি পান করুন।
l-খাবার সময় আপনার সামনে কয়টি ডিশ ও কী পরিমাণ ক্যালরির খাবার আছে দেখে নিন। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় পাওয়া গেছে, ঘুমের অনিয়মিত অভ্যাস স্ন্যাকস খাওয়ার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। যাঁরা মাত্র পাঁচ ঘণ্টা ঘুমান, তাঁরা সারা দিনের বাড়তি শক্তি পাওয়ার জন্য দিনের বিভিন্ন সময় টুকটাক অনেক কিছুই খান। তাই যথেষ্ট পরিমাণ ঘুমান এবং ১ হাজার ৮৭ ক্যালরি থেকে বাঁচুন।
l-অভুক্ত না থেকে এমন খাবার পেট ভরে খাওয়া যেতে পারে, যাতে প্রচুর পরিমাণে পানি ও আঁশ আছে। ফল, সবজি। যেমন শিমজাতীয় খাবার।
l- দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে দড়িঝাঁপ, পেটের ব্যায়াম করে বা জিমে গিয়ে ক্যালরি পোড়াতে হবে।
‘ক্যালরি-সমৃদ্ধ খাবার খেলে ওজন বাড়ে। আর অতিরিক্ত ওজন বেড়ে গেলে শরীরে দেখা দিতে পারে নানান সমস্যা।’ কথাটি রাজধানীর বারডেম জেনারেল হাসপাতালের পুষ্টি ও খাদ্যাভ্যাস বিশেষজ্ঞ শামসুন নাহারের। ওজন ঠিক রাখতে কোন খাবারে ক্যালরি কত তা জেনে খাবার খাওয়ার পরামর্শ এ পুষ্টিবিদের। ক্যালরি বেড়ে গেলে তা পুড়িয়ে শরীর সচল রাখা সম্ভব হবে বলে মত দেন তিনি।
তথ্যসূত্র:
- ওজন হ্রাস বিশেষজ্ঞ জেমস ও হিল, মাইন্ডলেস ইটিং-এর লেখক ব্রায়ান ওয়ানসিন, কালের কণ্ঠ।
- হেলথ ডট কম অবলম্বনে, গ্রন্থনা: এস এম নজিবুল্লাহ চৌধুরী, প্রথম আলো।
- টাইমস অব ইন্ডিয়া> সমকাল।
- Edited: Natural_Healing.
কোন মন্তব্য নেই