মলাশয় বা কোলন ক্যান্সার (Bowel or colon cancer), লক্ষণ ও প্রতিকার!
বৃহদান্তের ক্যান্সারকে বলা হয় বাওয়েল বা কোলন ক্যান্সার (Bowel or colon cancer)। ক্ষুদ্রান্তের তুলনায় বৃহদান্ত্রের ক্যান্সারের হার অনেক বেশি। কোলন ক্যান্সার পুরুষদের এবং পশ্চিমা বিশ্বের নারী-পুরুষদের বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এজন্যই মূলত পুরুষদের কোলন ক্যান্সার বলা হয়েছে। কারণ এই রোগটাতে পুরুষরাই বেশি ভুগে থাকে। ৫০শের উপরে ব্যক্তিদের এই রোগের বেশি সম্ভাবনা থাকে।
| মলত্যাগের জন্য হাই কমোড ব্যবহার করাও কোলন ক্যান্সারের কারণ, কেননা এতে শতভাগ পায়খানা ক্লিয়ার হয় না। |
১. অন্ত্রের পলিপ (দীর্ঘস্থায়ী ক্ষেত্রে),
২. দীর্ঘস্থায়ী আলসারেটিভ কোলাইটিস রোগ,
৩. বংশগত কারণে জিনের পরিবর্তন হতে পারে যা পরবর্তী সময়ে কোলন ক্যান্সারকে ত্বরান্বিত করে। এছাড়া কারো রক্তের সম্পর্কের কোন আত্মীয়-পরিজন কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত থাকলে কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি বেড়ে যায়,
৪. অতিরিক্ত গরু বা ছাগলের মাংস খাওয়া, খাদ্যতালিকায় আঁশজাতীয় খাবারের অনুপস্থিতিতেও হয়ে থাকে,
৫. পরিবেশ ও জিনগত কারণে বৃহদন্ত্র ও মলাশয়ে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা পাঁচ ভাগ বৃদ্ধি পায়। এছাড়া খাদ্যাভ্যাস একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে ব্যায়াম ( বিশেষ করে পুরুষদের ক্ষেত্রে) এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা কমায়।
৬. ধূমপান ও মদ্যপান এই ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ায়। তবে স্থুলকায় ব্যক্তিদের রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
৭. মা, বাবা ও ভাই বোন- বৃহদন্ত্র ও মলাশয় ক্যান্সার হওয়ার পারিবারিক ইতিহাস রোগটির সম্ভাবনা বাড়ায়। বিশেষ করে মা, বাবা, ভাই কিংবা বোনের বৃহদন্ত্র ও মলাশয় ক্যান্সার হওয়ার ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি দ্বিগুণ বাড়ে। এছাড়া অন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগীদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
লক্ষণসমূহ:
প্রাথমিকভাবে কোলন ক্যান্সার নির্ণয় অত্যন্ত কঠিন। কেননা প্রথমদিকে রোগটির তেমন কোনো উপসর্গ বোঝা যায় না। কোলন বা মলাশয়ের কোন জায়গায় ক্যান্সার রয়েছে তার উপর ভিত্তি করে উপসর্গের বিভিন্নতা দেখা যায়।
১. তীব্র পেটব্যথা
২. ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য
৩. পেটের ভিতর থেকে খাবার উগড়ে আসা
৪. পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়া
৫. হঠাৎ ওজন হ্রাস
৬. রক্তশূন্যতা
৭. জন্ডিস
পায়খানার সঙ্গে রক্ত:
পায়খানার সঙ্গে রক্ত কিংবা পেটে ব্যথা নিয়ে অধিকাংশ রোগী প্রথম চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।
মলত্যাগের অভ্যাস পরিবর্তন (কখনও ডায়রিয়া, কখনও কষা), রক্তশূন্যতা (দূর্বলতা, শ্বাসকষ্ট) ইত্যাদি রোগটির প্রাথমিক লক্ষণ।
অতিরিক্ত ওজনশূন্যতা:
অতিরিক্ত ওজনশূন্যতা এই রোগের লক্ষণ। অতিরিক্ত ওজনশূন্যতা, পেটে চাকা, পেটে পানি, কাশির সঙ্গে রক্ত ইত্যাদি উপসর্গ নিয়ে রোগীরা চিকিৎসকের কাছে আসেন।
প্রতিরোধ:
১. নিয়মিত ভিটামিন, মিনারেলযুক্ত খাবার গ্রহণ করা
২. খাদ্য তালিকায় আঁশযুক্ত এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার রাখা
৩. মদ্যপান পরিহার করা
৪. ধূমপান পরিহার করা
৫. ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
৬. দৈনিক অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা
৭. রোগ নির্ণয়ের জন্য নিয়মিত স্ক্রিনিং বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো।
চিকিৎসা ও অপারেশন:
কোলন ক্যান্সারের চিকিৎসা এক-কথায় অপারেশন। অপারেশনের আগে বা পরে কেমোথেরাপি দেওয়া হয়। অপারেশনের সময় রেডিওথেরাপির ব্যবহার এখনও গবেষণাধীন। যে কোনো ক্যান্সারের চিকিৎসায় একটি শব্দ বিশ্বে বহুল প্রচলিত, তা হল (multidisciplinary approach), অর্থাৎ সার্জন, ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, সাইকোথেরাপিস্ট, প্যাথলজিস্ট, ক্যান্সার কেয়ার নার্সসহ সকলের মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন ক্যান্সারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ের জন্য।
একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন যে, ক্যান্সার কঠিন রোগ হলেও এর উপযুক্ত চিকিৎসা রয়েছে। রোগীদের সচেতনতা এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আপনার সচেতনতা রোগটিকে প্রাথমিক অবস্থায় নির্ণয়ে সাহায্য করবে।
একটি নতুন গবেষণা:-
বাঁধাকপি বা ব্রোকোলির মতো সবুজ রংয়ের পাতাওয়ালা কিছু সবজি পেটের জন্য ভালো, সেটা বহুদিন ধরেই প্রমাণিত।
কিন্তু এ সবজিগুলো শরীরে কী প্রভাব ফেলে, তার খুব বিস্তারিত ব্যাখ্যা এতদিন ছিলনা।
ব্রিটেনের একদল বিজ্ঞানী এখন বলছেন বলছেন, এসব সবজি পাকস্থলীতে গিয়ে যখন হজম হতে থাকে, সেসময় এগুলো থেকে ক্যান্সার প্রতিরোধী রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরিত হয়।
ফ্রান্সিস ক্রিক ইন্সটিটিউটের ঐ গবেষকরা বলছেন মলাশয়ের ক্যান্সার প্রতিরোধে বাঁধাকপি, ব্রোকোলি বা কেইল শাকের মত কিছু সবজি বাউয়েল বা মলাশয়ের ক্যান্সার ঠেকাতে পারে।
পরীক্ষাগারে ইঁদুরের ওপর গবেষণায় দেখা হয়েছে কীভাবে সবজি পাকস্থলী এবং অন্ত্রের ওপর পাতরা আবরণ তৈরি করে।
চামড়ার মতো অন্ত্রের আবরণও ক্রমাগত বদলাতে থাকে। প্রতি চার-পাঁচদিনের ব্যবধানে নতুন আবরণ তৈরি হয়। তবে এই প্রক্রিয়া বাঁধাগ্রস্ত হলে অন্ত্রে প্রদাহ, এমনকী ক্যান্সার হতে পারে।
নতুন এই গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, বাঁধাকপি বা ব্রোকোলির মত 'ক্রসিফেরাস' গোত্রের কিছু সবজি থেকে যে রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরিত হয়, তা এই আস্তরণ তৈরির প্রক্রিয়াকে বাধাহীন করতে সাহায্য করে।
রান্নাঘর থেকে ক্যান্সার প্রতিরোধ?
গবেষকরা দেখছেন খাবার চিবানোর সময় এই সবজিগুলো ইন্ডোল-থ্রি-কার্বিনোল নামে একটি রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করে।
গবেষক ড গিট্টা স্টকিঞ্জার বলেন, "নিশ্চিত করতে হবে এসব সবজি যেন বেশি রান্না না করা হয়, বেশি যেন গলে না যায়।"
ইন্ডোল-থ্রি পাকস্থলীর অ্যাসিডের সংস্পর্শে এসে কিছুটা বদলে যায়। তারপর অন্ত্রের শেষভাগে গিয়ে এটি স্টেমসেলের আচরণ বদলে দিতে পারে। এই স্টেম সেলই অন্ত্রের পাতলা আবরণ তৈরিতে সাহায্য করে, অন্ত্রের প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ করে।
গবেষণায় দেখা গেছে ইন্ডোল-থ্রি-কার্বিনোল সমৃদ্ধ সবজি ইঁদুরের পাকস্থলীতে ক্যান্সার প্রতিরোধ করছে।
ড স্টকিঞ্জার বলছেন, "এমনকী আমরা দেখেছি, ইঁদুরের পাকস্থলীতে যখন টিউমার তৈরি হচ্ছে, তখন এই সবজিগুলো সেই টিউমারের গ্রোথ থামিয়ে দিচ্ছে।"
ড স্টকিঞ্জার নিজে এখন মাংস কমিয়ে বেশি সবজি খাচ্ছেন।
"খাবার নিয়ে কিছুদিন পরপর আমাদের নানা পরামর্শ দেয়া হয়, অনেক সময় এগুলো বিভ্রান্তি তৈরি করে, যুক্তি ছাড়া আমাকে যদি কোনো কিছু খেতে বলা হয়, আমি তা গ্রহণ করবো না।"
ব্রিটিশ চ্যারিটি ক্যান্সার রিসার্চ ইউকে'র অধ্যাপক টিম কে বলেন, "এই গবেষণায় যেটা পাওয়া গেল তা হচ্ছে এসব সবজিতে শুধু যে বেশি ফাইবার বা আঁশ রয়েছে তাই নয়, এগুলো থেকে যে রাসায়নিক পদার্থ বের হয়, সেটা মলাশয়ের ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে পারে।"
তথ্যসূত্র:
- মানসুরা মারিয়ম মিলকি, এমবিবিএস (৫ম বর্ষ), স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, সময় টিভি।
- ব্রিটিশ চ্যারিটি ক্যান্সার রিসার্চ ইউকে'র অধ্যাপক টিম কে এবং ফ্রান্সিস ক্রিক ইন্সটিটিউটের গবেষক ড গিট্টা স্টকিঞ্জার, বিবিসি বাংলা।
- যুগান্তর।
- Edited: Natural_Healing.
কোন মন্তব্য নেই