মাছ-মাংস-ডিম বাদে কিসে (নিরামিষেও) প্রোটিন আছে?
মাংস খাওয়ার পরিমাণ আজকাল অনেকেই কমিয়ে দিচ্ছেন। শরীরের ওজন কমাতে এবং ক্ষতিকর চর্বি এড়াতে গরু-খাসির মাংস বা লাল মাংস কম খাওয়াই ভালো। প্রোটিনের উৎস হিসেবে মাছ উত্তম। কিন্তু কেবল মাছ দিয়ে কি প্রতিদিনের প্রোটিনের চাহিদা মেটে? তা ছাড়া প্রতিদিন মাছ খেতে ভালো না-ও লাগতে পারে।
পুষ্টিবিদেরা বলেন, প্রতিদিনের ক্যালরি চাহিদার অন্তত ২০ থেকে ৩০ শতাংশ প্রোটিন থেকে পূরণ করা উচিত। খাবারের এই উপাদান মানুষের মাংসপেশি গঠনে সাহায্য করে। শিশুদের শারীরিক বিকাশেও সাহায্য করে। প্রোটিন বা আমিষ মানেই মাছ-মাংস—এমন ধারণা অনেকেরই আছে। আসলে মাছ-মাংস-ডিম-দুধ বাদে অন্য উৎস থেকেও প্রোটিন পাওয়া যায়। এগুলো তো প্রাণিজ আমিষ। পাশাপাশি উদ্ভিজ্জ আমিষ খেতে হবে। যাঁরা মাছ-মাংস কম খান বা নিরামিষাশী, তাঁদের জন্য প্রোটিনের বিকল্প উৎস রয়েছে।
দুধ ও দুগ্ধজাত: দুধ সুষম খাদ্য। এসব খাবার দৈনিক প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করবে। এক কাপ (১০০ গ্রাম) গরুর দুধে প্রায় ৩.৪ গ্রাম প্রোটিন থাকে। এক কাপ (১০০ গ্রাম) পনিরে পাওয়া যায় প্রায় ২৩ গ্রাম প্রোটিন। একটি (একটু বড়) কাপ দুধে পাবেন প্রায় ৮ গ্রাম প্রোটিন। এক কাপ টক দইয়ে আরও বেশি ১৩ গ্রামের মতো। তাই যাঁরা মাংস কম খেতে চান, তাঁরা প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় দুধ ও দুধের তৈরি খাবার রাখবেন। আর প্রোটিনের উৎস হিসেবে ডেয়ারি প্রডাক্টে ভরসা রাখতে পারেন।
বিভিন্ন বাদাম: কাঠবাদাম বা আমন্ডে প্রোটিন পাওয়া যায় প্রচুর পরিমাণে। ২০টা আমন্ড বা কাঠবাদামে পাবেন প্রায় ৪ গ্রাম এবং একই পরিমাণ কাজুবাদাম থেকে ৬ গ্রাম প্রোটিন। এই খাবারে আরও পাবেন উপকারী চর্বি (ওমেগা ফ্যাট) এবং আঁশ। তবে বাদাম লবণ ছাড়া খাওয়া ভালো। বিকেলে হেলদি স্ন্যাকস হিসেবে রাখাই যায় এই ধরনের বাদাম। তা ছাড়া খাবারেও বাদাম বাটা বা পাউরুটিতে পিনাট বাটার স্প্রেড খেতে পারেন।
সয় প্রোটিন: সয় প্রোটিন জিএমও প্রডাক্ট। অর্থাৎ জেনেটিকালি মডিফায়েড। তাই সপ্তাহে এক দিন খেতে পারেন। কিন্তু প্রত্যেক দিন বেশি পরিমাণে সয় প্রোটিন গ্রহণ করা ঠিক নয়। এক কাপ সয়াবিনে ৮.৫ গ্রাম এবং আধ কাপ টোফুতে পাবেন ১০ গ্রাম প্রোটিন।
বিভিন্ন ডাল: বিভিন্ন ধরনের ডাল ও বীজ জাতীয় খাবারে প্রোটিন থাকে। এক কাপ ঘন সিদ্ধ ডালে প্রায় ১৬ থেকে ১৮ গ্রাম প্রোটিন থাকে। আধা কাপ রান্না ছোলায় পাওয়া যাবে ৭ গ্রাম প্রোটিন, আধা কাপ মসুর ডালে ৯ গ্রাম। শিমের বিচি, মটরশুঁটিও প্রোটিনের চমৎকার উৎস। সঙ্গে বাড়তি পাওনা এগুলোর মধ্যে আছে প্রচুর আঁশ, ভিটামিন বি ও আয়রন। তাই প্রত্যেক দিনের খাবারে ডাল রাখা জরুরি। তবে সব ধরনের ডালই পালটে পালটে খেলে লাভ বেশি।
দানাশস্য: ছোলা, রাজমা ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন থাকে। কিন্তু তা হজম করতেও বেশ সময় লাগে। তাই এই ধরনের খাবার ভাল ভাবে সিদ্ধ করে খেতে পারেন। ছোলা দিয়ে তৈরি হামাস জনপ্রিয় খাবার। এই ধরনের খাবার খেতে পারেন ব্রেডের সঙ্গে।
কিনোয়া: ভিগান ডায়েটে কিনোয়া খুব জরুরি। কারণ এতে প্রায় ১৮ ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিড পাওয়া যায়। অন্য কোনও সিরিয়ালে যা থাকে না।
সবুজ আনাজপাতি: অ্যাসপারাগাস, ব্রকোলি, পালং শাক, অ্যাভোকাডো ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন পাওয়া যায়। ১০০ গ্রাম ব্রকোলি, অ্যাসপারাগাস ও অ্যাভোকাডোয় ৩.৫ গ্রাম প্রোটিন পেতে পারেন।
মাশরুম: ১০০ গ্রাম মাশরুমে পাওয়া যায় প্রায় ৬.৭ গ্রাম প্রোটিন। মাশরুম নানা ভাবে রান্নাও করা যায়। ফলে নিরামিষ রান্নার স্বাদ বাড়াতেও মাশরুম ব্যবহার করতে পারেন।
মাইক্রোপ্রোটিন: এটি এক ধরনের ফাঙ্গাস বেসড প্রোটিন। আধ কাপ মাইক্রোপ্রোটিন থেকে প্রায় ১৩ গ্রাম প্রোটিন পাওয়া যায়। মাংসের বিকল্প হিসেবে এই প্রোটিন খাওয়া হয়। তবে মাইক্রোপ্রোটিন খাওয়ার আগে ডায়াটিশিয়ানের পরামর্শ নেওয়া অবশ্যই জরুরি।
প্রোটিনের বিশেষ উপকার:
প্রতিদিনের খাবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো প্রোটিন। শরীর ভালো রাখার পাশাপাশি শরীরের কোষ ও টিস্যুর গঠনে প্রোটিনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে একটি নির্দিষ্ট সময় মেনে প্রোটিন খেলে এর উপকারিতা বেশি পাওয়া যায়। প্রতিদিন একজন পূর্ণবয়স্ক সুস্থ মানুষের ওজনপ্রতি ১ গ্রাম করে প্রোটিন খাওয়া উচিত। ডায়াবেটিস রোগী থেকে শুরু করে ওজন নিয়ন্ত্রণ সব ক্ষেত্রে প্রোটিন খাওয়ার আলাদা সময় রয়েছে।
- ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রোটিন খেলে অনেকক্ষণ পেট ভরা থাকে। ফলে অনেকক্ষণ নতুন করে খাওয়ার ইচ্ছা তৈরি হয় না। কাজেই ওজন নিয়ন্ত্রণের ডায়েটে প্রোটিন থাকেই। সে ক্ষেত্রে সকালে প্রোটিন খাওয়ার চেষ্টা করুন। এটি সারা দিনের জন্য শরীরের বিপাকীয় হার বাড়াবে। আবার রাতে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ কমিয়ে প্রোটিন খান।
- পেশি তৈরি ও শক্তি বাড়ানোর জন্য যারা শরীরচর্চার মাধ্যমে যারা পেশি তৈরি ও পেশিশক্তি বাড়াতে চান তাদের ডায়েটে প্রোটিন রাখা জরুরি। কারণ মূলত প্রোটিন দিয়েই পেশি তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে সকালে শরীরচর্চা করার আগে অল্প প্রোটিন খান, আবার শরীরচর্চা করার আধঘণ্টা থেকে ১ ঘণ্টার মধ্যে প্রোটিন খান। রাতে শুতে যাওয়ার আগেও ডায়েটে প্রোটিন রাখুন।
- ডায়াবেটিসের জন্য ডায়েটে পর্যাপ্ত প্রোটিন থাকলে তা ডায়াবেটিসের আশঙ্কা কমে। যাদের ডায়াবেটিস রয়েছে, তাদের সব সময়ে সুষম খাবার খাওয়া জরুরি। প্রোটিনও সেই সুষম খাবারেরই অংশ। সারা দিনের খাবারে অল্প অল্প করে হলেও প্রোটিন রাখুন। এতে অতিরিক্ত খাওয়ার ইচ্ছাও কমবে। সেই সঙ্গে ইনস্যুলিনের মাত্রাও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
- গর্ভবতী নারীদের জন্য গর্ভাবস্থায় ডায়েটে প্রোটিন রাখা খুব দরকার। কারণ মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ভালো রাখা ও সন্তানের টিস্যুর গঠন ঠিকমতো হওয়ার পেছনে প্রোটিনের ভূমিকা রয়েছে। তাই সারা দিনে যতবার খাবেন, তার সঙ্গে একটু একটু করে প্রোটিন খান। এতে শরীরে পর্যাপ্ত প্রোটিনও পৌঁছাবে।
- ভালো ঘুমের জন্য রাতে ঠিকমতো ঘুম হয় না? রোজ রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে প্রোটিন খান। গবেষণা বলছে, প্রোটিন খাওয়ার সঙ্গে ভালো ঘুমের সম্পর্ক রয়েছে। রাতের খাবারে কার্বোহাইড্রেটের সঙ্গে অল্প প্রোটিনও খান, তা হলেই সমস্যা কমবে।
প্রোটিন কি শুধু মাংসপেশিই গঠন করে?
আমাদের মধ্যে অনেকেই মনে করেন যে, প্রোটিন শুধু মাত্র মাংসপেশীর গঠনে সাহায্য করে। তাহলে আসুন আসল সত্য জানা যাক।
আমাদের শরীর এটি অ্যামিনো অ্যাসিডে ভেঙে দেয় এবং পেশী পুনরুদ্ধার এবং পুনর্গঠনের জন্য এই অ্যামিনো অ্যাসিড কাজ করে। অ্যামিনো অ্যাসিড বিল্ডিং ব্লক কোষ হিসাবে কাজ করে।
কিন্তু প্রোটিন তার চেয়ে অনেক বেশি কাজ করে। প্রোটিন শুধু মাত্র মাংসপেশীর গঠনে সাহায্য করে- এই বিষয়টা আংশিক সত্য। কারণ প্রোটিন তিনটি প্রাথমিক খাদ্য গ্ৰুপের মধ্যে একটি। অ্যামিনো অ্যাসিড যে বিল্ডিং ব্লক কোষ হিসাবে কাজ করে, সেই কোষগুলিকে প্রসারিত করার জন্য প্রয়োজন প্রোটিনের।
কিন্তু এই প্রোটিন মাংসপেশীর উন্নয়নে কীভাবে সহায়তা করে ?
মাংসপেশী গঠন করা থেকে তার বিকাশ অবধি সাহায্য করে প্রোটিন। অন্যদিকে, এই গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটি আপনার শরীরের সমস্ত দৈনন্দিন কাজ এবং ব্যবহারের জন্য আবশ্যক। আপনার কতটা প্রোটিন খাওয়া উচিত বা করা উচিত নয় সে সম্পর্কে ধারণা এবং অনুমান ছাড়াও আপনার অন্য একটি কাজ রয়েছে। তা হল আপনি অন্যান্য যে সব পুষ্টিগুলি গ্রহণ করেন তার সাথে প্রোটিনের পরিমাণকে মিলিয়ে দেখা উচিত।
অনেক মানুষের ধারণা যে প্রোটিন শুধুই মাংসপেশীতে সাহায্য করে।
কিন্তু আসল বিষয়টি হল প্রোটিন পেশী বৃদ্ধি, মেরামত এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু এই কাজ ছাড়াও প্রোটিন হরমোন এবং এনজাইম উৎপাদন, ত্বক মেরামত, চুল, এবং নখের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তার সঙ্গে অ্যান্টিবডি বা ইমিউন সিস্টেম নির্মাণ, হরমোন, এবং সেলুলার কাঠামো তৈরিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল এই প্রোটিন। প্রোটিন হল সবচেয়ে সাধারণ ম্যাক্রোনিউট্রিয়েন্ট। এমনকি শক্তি সরবরাহ সহ অন্যান্য অনেক কাজ করে।
বেশি প্রোটিন গ্রহণ করলে মাংসপেশী গঠন হবে- এটাও মানুষের এক প্রকার ধারণা। সম্পূর্ণ না হলেও বিষয়টা আংশিক সত্য। মাংসপেশী গঠনের জন্য প্রোটিন খাওয়া দরকার কিন্তু সেটাও নির্দিষ্ট পরিমাণে এবং সঠিক প্রশিক্ষকের অধীনে। আপনার শরীরে যতটা পরিমাণ প্রোটিন দরকার শুধু সেই পরিমাণই প্রোটিন গ্রহণ করুন, অন্যথায় বিভিন্ন রোগেরও সৃষ্টি হতে পারে।
Protein Poisoning : আপনার শরীরে প্রোটিন কি বিষ হয়ে যাচ্ছে? এই লক্ষণ থাকলে এখনই সতর্কতা নিন:
আমাদের শরীরের জন্য প্রোটিন (Protein) অন্যতম গুরুত্বপূ্র্ণ ম্যাক্রোনিউট্রিয়েন্ট ৷ আমিষ ও নিরামিষ খাবারে প্রোটিনের উৎস একাধিক ৷ স্কিনটোন এবং চুল উজ্জ্বল করা, ওজন হ্রাস এবং হাড় মজবুত করার জন্য প্রোটিন প্রয়োজনীয় ৷ কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রোটিন শরীরে প্রবেশ করলে হিতে বিপরীত হয় ৷ উপকারের পরিবর্তে প্রভূত ক্ষতিসাধন হয় ৷ দেখা দেয় জটিল শারীরিক সমস্যা (Protein poisoning) ৷
পুষ্টিবিদরা মনে করেন, আমাদের প্রতি কেজি ওজনের জন্য এক গ্রাম প্রোটিন যথেষ্ট ৷ কার্বোহাইড্রেটস ও ফ্যাটের কম্বিনেশন ছাড়া এর থেকে বেশি প্রোটিন খাওয়া হলে দেখা দেবে ‘প্রোটিন পয়জনিং’-এর সমস্যা ৷ এই শারীরিক সমস্যার শিকার হলে কী করে বুঝবেন? কিছু উপসর্গ দেখা দিলেই সতর্ক হতে হবে ৷
- জলশূন্যতা: অতিরিক্ত প্রোটিন খাদ্যতালিকায় থাকলে কিডনির উপর চাপ পড়ে ৷ কারণ মূত্রের মধ্যে দিয়ে বেশিমাত্রায় প্রোটিন তখন বেরিয়ে যায় ৷ এর ফলে শরীরে ডিহাইড্রেশন বা জলশূন্যতা দেখা দেয় ৷ তাই ডায়েটে সব সময় বেশি করে ফলের রস ও অন্য জলীয় পদার্থ রাখতে বলা হয় ৷
- ওজন বৃদ্ধি: মাত্রাতিরিক্ত প্রোটিন খেলে ওজন কমানোর প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় ৷ উল্টে অপ্রয়োজনীয়, বাড়তি ওজন জমতে থাকে ৷ তাই ওজন বৃদ্ধি পেলে সেটা প্রোটিন পয়জনিং-এর লক্ষণও হতে পারে ৷
- নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ: সম্পূর্ণ প্রোটিন বেসড ডায়েটের আর এক নাম কেটোজেনিক ডায়েট (Ketogenic Diet) ৷ এতে কার্বোহাইড্রেটস থাকে না একদমই ৷ এই ডায়েটের ফলে শরীরের ফ্যাট ও কার্বস খরচ হয়ে যায় দ্রুত হারে ৷ ফলে নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ চলে আসে ৷
- মানসিক সমস্যা: ডায়েটে অতিরিক্ প্রোটিন থাকলে এবং কার্বোহাইড্রেটস না থাকলে শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি দেখা দেয় নানারকম মানসিক সমস্যাও ৷ উদ্বেগ, হতাশা, ঘন ঘন মুড পরিবর্তন, নেগেটিভ চিন্তা বেড়ে যাওয়া-সহ নানা মানসিক সমস্যা দেখা দেয় ৷
তথ্যসূত্র:
- পুষ্টিবিদ, আখতারুন নাহার, প্রথম আলো।
- ডায়াটিশিয়ান, প্রিয়া আগরওয়াল, আনন্দবাজার।
- কালের কণ্ঠ।
- নিউজ 18 বাংলা।
- বাংলাদেশ প্রতিদিন।
- Edited: Natural_Healing.
কোন মন্তব্য নেই