জিংক সমৃদ্ধ খাবার কেন খাবেন?
আমাদের শরীরে তিনশর বেশি এনজাইমের সঠিক পরিচালনের জন্য জিংক বা দস্তার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। প্রতিদিন আমাদের শরীরের জন্য ১৫ মিলিগ্রাম জিংকের প্রয়োজন হয়। জিংক শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় এক খনিজ উপাদান। শারীরবৃত্তীয় অনেক কার্যক্রম পরিচালনায় জিংকের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। এটি রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা জোরদার করে। জিংকের ঘাটতি তৈরি হলে নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। এটি ক্ষত নিরাময়েও সাহায্য করে। শিশুর শারীরিক বৃদ্ধিতেও রয়েছে জিংকের বিশেষ ভূমিকা। এ ছাড়া এটি অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে শরীরের জন্য ক্ষতিকর মুক্ত মৌলের বিরুদ্ধে লড়াই করে। ফলে ক্যানসারের ঝুঁকি কমে। জিংক শরীরের প্রায় ৩০০ ধরনের উৎসেচকের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান। এসব উৎসেচক শরীরের বিপাক, হজম, স্নায়বিক কার্যক্রমসহ অসংখ্য কার্য সম্পাদন করে। আমাদের স্বাদ ও ঘ্রাণের অনুভূতির জন্যও জিংক দরকারি একটি উপাদান। জিঙ্কের অভাবে কোষের কার্যকারিতা কমে, প্রোটিন তৈরিতে ব্যাঘাত ঘটে। আর এই মুহূর্তে যা সবচেয়ে বড় চিন্তার, কমজোর হয়ে যায় শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শিশুর ডায়রিয়ায় জিংক গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে। এটি সাধারণ সর্দি–জ্বরের সময়কালও কমায়। জিংকের অভাবে হাড়ক্ষয় আর স্নায়ুবৈকল্য হতে পারে। এ সমস্যাকে বলে পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি। জিংক পুরুষদের যৌন স্বাস্থ্যের জন্যও প্রয়োজনীয় এক উপাদান। কিন্তু শরীরের জন্য অত্যাবশ্যকীয় এই উপাদান শরীরে তৈরি হয় না। আবার তা শরীরে সঞ্চিতও থাকে না। কাজেই প্রতিদিনের খাবারে জিংকের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
জিংকের অভাবজনিত সমস্যা:
গর্ভকালীন জিংকের ঘাটতি জন্মগত ত্রুটি, কম ওজনের শিশু জন্ম দেওয়ার আশঙ্কা বাড়ায়; দেহের বৃদ্ধি রোধ, দৈহিক অপরিপক্বতা বা বামনত্ব হতে পারে; জিংকের অভাবে ডায়রিয়া বা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়া ছাড়াও কনজাংকটিভার প্রদাহ, পায়ে বা জিহ্বায় ক্ষত, মুখের চারপাশে ক্ষত, একজিমা, ব্রণ বা সোরিয়াসিসজাতীয় ত্বকের সমস্যা, ছত্রাকসহ বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণজনিত অসুস্থতা এবং শরীরের ক্ষত শুকাতে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়; এর অভাবে চুল পড়ে যায়, পুরুষের প্রজননক্ষমতাও কমে যায়; মানসিক দুর্বলতা, আচরণগত অস্বাভাবিকতা, অমনোযোগিতা, বিষণ্নতা, সিজোফ্রেনিয়া, ক্ষুধামান্দ্য দেখা দেয়।
শরীরে জিংকের অভাবের কারণ:
পুষ্টিহীনতা, ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগ, কিডনি সমস্যা, অতিরিক্ত মদ্যপান, লিভারের সমস্যা ইত্যাদি।
কী কী খাবারে জিংক থাকে?
গরু ও ভেড়ার মাংসে উচ্চমাত্রায় জিংক রয়েছে। জিংকের অন্যতম উৎস হলো সামুদ্রিক মাছ যেমন কাঁকড়া, ঝিনুক, চিংড়ি, এবং গরু-খাসির কলিজা, আটা-ময়দার রুটি, দুগ্ধজাত খাদ্য, শিমজাতীয় উদ্ভিদ, মসুর ডাল, চীনাবাদাম, মাশরুম, সয়াবিনে জিংক পাওয়া যায়। শাক–সবজিতে বিদ্যমান জিংক শরীর সহজে হজম করতে পারে না। সে জন্য নিরামিষভোজীদের অতিরিক্ত জিংক সরবরাহ করা প্রয়োজন। একজন পুরুষ ও নারীর দৈনিক যথাক্রমে ১১ ও ৮ মিলিগ্রাম জিংক প্রয়োজন। অন্তঃসত্ত্বা এবং সন্তানকে বুকের দুধ দেওয়া মায়েদের জিংকের চাহিদা আরও বেশি।
• মাংস জিংকের একটি দুর্দান্ত উৎস। বিশেষ করে লাল মাংস। গরুর মাংসের পাশাপাশি ভেড়ার মাংসেও প্রচুর জিংক থাকে। মাংসাশী হলে জিঙ্কের সরবরাহ নিয়ে ভাবনা কম। কারণ, ১০০ গ্রাম কাঁচা মাটনে প্রায় ৪.৮ মিগ্রা জিঙ্ক আছে অর্থাৎ গ্রাম বা উন্মুক্ত অঞ্চলের গরু যেটাকে আমরা অর্গানিক গরু বলে থাকি, সেই গরুর ১০০ গ্রাম মাংসে ৪.৮ মিলিগ্রাম জিংক থাকে। আর ৮৫ গ্রাম চিকেনে আছে ২.৪ মিগ্রা। এছাড়াও গরুর মাংসে প্রোটিন, আয়রন, বি ভিটামিনসহ গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির এক দুর্দান্ত উৎস। তবে চর্বি বেশি থাকে বলে নিয়মিত মাটন খাওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে যাঁদের হৃদরোগ. কোলেস্টেরল-প্রেশার-সুগার বা ওবেসিটি আছে। তাঁরা মাটনের পরিবর্তে চিকেন খেতে পারেন। অন্য উপকারের পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়বে। তবে দেশি চিকেনে উপকারের পাল্লা ভারী।
• ডিমে থাকা পরিমিত জিংক দৈনিক চাহিদা পূরণ করতে পারে। ডিমে ক্যালোরি, প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি, বি ভিটামিন, সেলেনিয়ামসহ আরো অনেক ভিটামিন ও খনিজ রয়েছে।
• শস্যজাতীয় খাবার: ব্রাউন রাইস, হোল হুইট ব্রেড বা ঘরোয়া আটার রুটি ও আধুনিক কিনোয়াও জিঙ্কের বড় উৎস। গম, ভাত এবং ওটসে কিছু পরিমাণ জিংক পাওয়া যা। এই খাবারগুলো স্বাস্থ্যের জন্য যথেষ্ট ভালো। শস্য জাতীয় খাবারে ফাইবার, বি ভিটামিন, আয়রন, ফসফরাস, ম্যাগনেসিয়াম এবং সেলেনিয়াম রয়েছে। এসব খুবই স্বাস্থ্যকর এবং গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির একটি ভালো উৎস। সকালের আধবাটি ওটস থেকে ১.৩ মিগ্রা। তার সঙ্গে ২৫০ গ্রাম লো-ফ্যাট ইয়োগার্ট থাকলে ২.৩৮ মিগ্রা আর লো-ফ্যাট দুধ থাকলে ১.০২ মিগ্রা।
• পনির বা দুধের মতো দুগ্ধজাত খাবারে প্রচুর পুষ্টি উপাদান এবং জিংক রয়েছে। দেহ এই জিংক সহজে শোষণ করতে পারে। এই খাদ্যগুলো প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি-সহ হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
• কাঁকড়া বা চিংড়িতেও আছে প্রচুর দস্তা। সবচেয়ে বেশি আছে ওয়েস্টারে, ৫০ গ্রামে ৮.৫ মিগ্রা। তবে আমাদের দেশে এটি খাওয়ার খুব একটা চল নেই।
• নিরামিষাশী হলে খান সব রকম ডাল, রাজমা, ছোলা, বিন, মটরশুঁটি। ৫০ গ্রাম মুসুর ডাল খেলে ২.৪ মিগ্রা জিঙ্ক পাবেন। ৯০ গ্রাম রাজমায় ২.৫ মিগ্রা, ৮০ গ্রাম ছোলায় ১.২৫ মিগ্রা। কল বেরোনো মুগ বা ছোলা খেলে আরও ভাল।
• মাঝেমধ্যে বাদাম ও বীজ খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তো কথাই নেই। ২৮ গ্রাম কাজু আর কুমড়োর বীজে যথাক্রমে ১.৬ মিগ্রা ও ২.২ মিগ্রা জিঙ্ক আছে। আমন্ড ও অন্যান্য বাদাম ও বীজেও প্রচুর জিঙ্ক থাকে। চিনাবাদাম, পাইন বাদামের মতো বিভিন্ন জিংকসমৃদ্ধ বাদাম হৃদরোগ, ক্যান্সার ও ডায়াবেটিস থেকে মুক্তি পেতে সহায়তা করতে পারে। বাদামে স্বাস্থ্যকর চর্বি এবং ফাইবারসহ অন্যান্য পুষ্টি থাকে।
• কুমড়া, তিল এবং লাউ এর বীজগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণে জিঙ্ক রয়েছে। এছাড়া এই বীজগুলোতে স্বাস্থ্যকর ভিটামিন, খনিজ উপাদান পাওয়া যায়।
• মাঝেমধ্যে মাশরুম খেতে পারেন। লো-ক্যালোরির এই সব্জিতে জিঙ্কও আছে পর্যাপ্ত। ২১০ গ্রামে ১.২ মিগ্রা। উপরি পাওনা ভিটামিন এ-সি-ই ও প্রচুর আয়রন।
• খেতে পারেন পালংশাক, ব্রকোলি ও রসুন। সাধারণত ফল ও শাকসবজিতে তেমন জিংক থাকে না। কিছু সবজিতে অবশ্য এটা মেলে। যেমন আলু ও সবুজ মটরশুঁটিতে জিংক আছে। তবে এসবে পর্যাপ্ত জিংক না মিললেও হৃদরোগ ও ক্যান্সারের মতো রোগের ঝুঁকি কমায়।
• ডার্ক চকোলেটের অনেক গুণ। মূল খাবার খাওয়ার পর এক টুকরো খেলে তৃপ্তি যেমন হয়, ওজনও কম থাকে বলে বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। ফ্ল্যাভনয়েড ও জিঙ্কের কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতেও তা খুবই কার্যকর। তবে তাতে যত বেশি পরিমাণে কোকা থাকবে, অর্থাৎ তা যত বেশি ডার্ক হবে, তত উপকার। ১০০ গ্রাম ৭০-৮০ শতাংশ ডার্ক চকলেটে জিঙ্ক থাকে ৩.৩ মিগ্রা।
কাজেই সুষম খাবার খাওয়ার অভ্যাস থাকলে জিঙ্ক নিয়ে খুব বেশি ভাবার দরকার নেই। অভ্যাসের সামান্য একটু বদল আনতে পারলেই জিঙ্কের অভাবে অন্তত রোগ প্রতিরোধহীনতায় ভুগতে হবে না। এর পরেও যদি জিঙ্কের জোগান নিয়ে সন্দেহ থাকে, তা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রতি দিন একটি করে জিঙ্ক ট্যাবলেটও খেতে পারেন।
জিংকের ঘাটতির লক্ষণ:
খাবারে পর্যাপ্ত জিংকের উপস্থিতি থাকলেও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। যাঁদের অন্ত্রনালির রোগ যেমন ক্রোনস রোগ রয়েছে, যাঁরা নিরামিষভোজী, অন্তঃসত্ত্বা ও বুকের দুধ দেওয়া মা, শুধু বুকের দুধের ওপর নির্ভরশীল ছয় মাসের বেশি বয়সী শিশু, ক্রনিক কিডনি কিংবা লিভারের রোগী, সিকল সেল অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত রোগী, অ্যালকোহলসেবী আর অপুষ্টিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জিংকের ঘাটতির ঝুঁকি বেশি।
জিংকের ঘাটতি দেখা দিলে শরীরে কিছু লক্ষণ প্রকাশ পায়। এগুলো হলো—
- স্বাদ ও ঘ্রাণের অনুভূতি কমে যাওয়া
- ক্ষুধামান্দ্য বা অরুচি
- হতাশা ভাব
- ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া
- ডায়রিয়া
- চুল পড়া ইত্যাদি।
- জিংকের আধিক্য কপার শোষণে বাধা দেয়,
- ফলে অ্যানিমিয়া হতে পারে,
- এ ছাড়া বমি ভাব, বমি,
- অরুচি,
- পেটব্যথা,
- মাথাব্যথা,
- পাতলা পায়খানা দেখা দিতে পারে।
আমাদের শরীরের কার্যক্রম ঠিক রাখার জন্য জিংক অতি প্রয়োজনীয় একটি মিনারেল। শরীরে জিংকের অভাব হলে নানা ধরনের সমস্যা হয়। যেমন : একজিমা, র্যাশ ইত্যাদি। জিংকের অভাবে ডায়রিয়া বা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়া ছাড়াও কনজাংকটিভার প্রদাহ, পায়ে বা জিহ্বায় ক্ষত, একজিমা, ব্রণ বা সোরিয়াসিস-জাতীয় ত্বকের প্রদাহ, ছত্রাকসহ বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণজনিত অসুস্থতা এবং শরীরের ক্ষত শুকাতে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়।
রোগ-প্রতিরোধক তন্ত্রকে উজ্জীবিত করে তুলে জিংক এ ধরনের সমস্যা প্রতিরোধ করতে, জটিল জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত থেকে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে শরীরের কোষকলাকে ফ্রি-রেডিকেলের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে এবং ক্ষতের সুস্থতা ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করে।
শরীরে জিংকের ঘাটতি হলে যা হয় রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমায় জিংক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে একটি বড় ভূমিকা পালন করে। এর অভাবে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়। স্মৃতিশক্তির অভাব জিংক আমাদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য বড় ভূমিকা পালন করে। জিংকের অভাব হলে এই কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং নিউরোলজিক্যাল পদ্ধতি ব্যাহত হয়। এটি শেখার অক্ষমতাও তৈরি করতে পারে। চুল পাতলা হয়ে যায় শরীরের জিংকের অভাব হলে মাথার চুল পড়ে যায়। এটি মাথার কোষগুলোকে দুর্বল করে দেয়। এতে চুল শুষ্ক হয়ে যায় এবং চুল ভেঙে যেতে পারে। এতে চুল পাতলা হয়ে যায়।
হাড় দুর্বল করে জিংক স্বাস্থ্যকর হাড়ের জন্য জরুরি। এটি হাড়ের গঠনে উদ্দীপকের ভূমিকা পালন করে। জিংকের অভাবে হাড় দুর্বল হয় এবং গাঁটে ব্যথা হয়।
দৃষ্টিশক্তিতে সমস্যা স্বাস্থ্যকর দৃষ্টিশক্তির জন্য জিংক খুব প্রয়োজন। এটি চোখের সুরক্ষা দেয় এবং রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করে। গবেষণায় বলা হয়, জিংকের অভাবে দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার সমস্যা হতে পারে।
আবার অনেকের ক্ষেত্রেই খাদ্যে প্রাপ্ত জিংকের পাশাপাশি অতিরিক্ত সরবরাহের প্রয়োজন পড়ে কখনো কখনো। সে ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে জিংক ট্যাবলেট, সিরাপ অথবা লজেন্স দেওয়া যেতে পারে। তবে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, জিংকের ঘাটতি যেমন ক্ষতিকর, অতিরিক্ত গ্রহণও তেমন ক্ষতিকর।
তথ্যসূত্র:
- ডা. মো. শরিফুল ইসলাম, মেডিসিনন বিভাগ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, প্রথম আলো।
- হেল্থলাইন> কালের কণ্ঠ।
- আনন্দবাজার।
- বাংলাদেশ প্রতিদিন।
- Edited: Natural Healing.

কোন মন্তব্য নেই