নিরাপদ পানির সন্ধানে
সবার জন্য উন্নত উৎসের পানি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গেছে। ৯৭ শতাংশের বেশি মানুষের উন্নত উৎসের পানি পাওয়ার সুযোগ আছে, জানা যায় ২০১৩ সালের একটি জরিপে।
তবে পুরোপুরি নিরাপদ পানি পানের সুযোগ এখনও সীমিত, মাত্র ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ।
| বিশুদ্ধ পানি সব ধরনের মানবাধিকারের ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত। |
- এদেশে অগ্রগতি সত্ত্বেও এক কোটি ৯৪ লাখ মানুষ এখনও সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণে থাকা আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করছে। এছাড়া পানিতে ম্যাঙ্গানিজ, ক্লোরাইড ও লৌহ দূষণের কারণেও খাওয়ার পানির মান খারাপ থাকে।
- বাংলাদেশের এক তৃতীয়াংশ পানির উৎসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মানের চেয়ে বেশি মাত্রায় ম্যাঙ্গানিজের উপস্থিতি পাওয়া যায়।
- মলের জীবাণু রয়েছে এমন উৎসের পানি পান করছে ৪১ শতাংশের বেশি মানুষ। এক্ষেত্রে স্বল্প শিক্ষিত নগরবাসী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বলে ২০১৩ সালের জরিপে বলা হয়েছে।
- শহরাঞ্চলের এসব পরিবারে যে পানি খাওয়া হয় তার এক তৃতীয়াংশেই উচ্চমাত্রার ই-কোলাই ব্যাক্টেরিয়া থাকে, যা ডায়রিয়ার অন্যতম কারণ।
- জরিপের তথ্য অনুযায়ী, উৎস থেকে বাসাবাড়িতে পানি সরবরাহের সময় এতে আরও বেশি ভাইরাস-ব্যাক্টেরিয়া চলে যায়।
- প্রতি পাঁচটি পরিবারের মধ্যে দুটি, অর্থাৎ বাংলাদেশের ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস-ব্যাক্টেরিয়া দূষিত উৎসের পানি পান করে। আবার ঘরের কল বা টিউব-ওয়েলের আশপাশ পরিষ্কার না থাকায় বিভিন্ন অণুজীবযুক্ত পানি পানকারীর সংখ্যা হয়ে দাড়ায় নয় কোটি ৯০ লাখ।
| পার্বত্য চট্টগ্রামের খারিক্ষয়ন সরকারী বিদ্যালয়ে ছাত্ররা পানি সংগ্রহ করছে। |
- পাহাড়ি এলাকা, শহরের বস্তি, দ্বীপাঞ্চল, উপকূলীয় ও জলাভূমিতে এই পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। এসব জায়গায় বিশ্বাসযোগ্য পানির উৎস পাওয়া কঠিন
- সারা দেশের স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রগুলোতে পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও হাইজিনের অবস্থা ভালো না হওয়ায় সেগুলো থেকেও জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয় এবং তা নবজাতক ও মাতৃ মৃত্যু হার কমানোর অগ্রগতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশে ২০১৫ সালে যত নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে তার প্রায় ২০ শতাংশই হয়েছে জীবাণু সংক্রমণের কারণে।
- এছাড়া ঘনঘন বন্যা, ভূমিধ্বস ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেও পানির উৎস দূষিত হয়ে পড়ে। বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে শৌচাগার উপচে ময়লা ছড়িয়ে পানির উৎস দূষিত হয়ে পড়ে।
- জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং অধিক সংখ্যায় মানুষ নগরমুখী হওয়ার কারণে এসবের সম্মিলিত প্রভাবে বাংলাদেশে পরিবেশগত দুর্যোগ ঘটে।
- শিল্পবর্জ্য, সেচের জন্য অতিরিক্ত পানি উত্তোলন এবং জমিতে লবণাক্ত পানির কারণে সৃষ্ট পরিবেশ দূষণও বাংলাদেশে পানির গুণগত মানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
- অঞ্চলভেদেও পানির মানে উল্লেখযোগ্য অসমতার প্রমাণ পেয়েছে ইউনিসেফ। যেমন রংপুর বিভাগে ৭১ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ ই-কোলাই ব্যাক্টেরিয়ামুক্ত পানি পান করে। সেখানে সিলেটে এ হার মাত্র ৩১ দশমিক ৬ শতাংশ।
- ধনী-দরিদ্র ভেদেও মানসম্পন্ন পানি পাওয়ার সুযোগে তফাৎ রয়েছে। ধনীরা নিজেদের বাড়িতেই খাওয়ার পানির ব্যবস্থা করে। অপরদিকে সরকারি বা অন্য কোনো উৎস থেকে পানি আনতে দরিদ্র মানুষরা আলাদা করে সময় আর শ্রম দিতে বাধ্য হয়।
ইউনিসেফের ২০১৩ সালের একটি জরিপে পানির সংগ্রহে নারী-পুরুষের ভূমিকার ভিন্নতা দেখা গেছে। ৮৯ দশমিক ৬ শতাংশ নারী পরিবারের জন্য পানি সংগ্রহ করেন। অপরদিকে এই দায়িত্ব পালন করেন মাত্র ৪ দশমিক ৬ শতাংশ পুরুষ।
নিরাপদ খাবার পানি এবং স্বাস্থ্যকর পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থার অভাব শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা, সুরক্ষাসহ অন্যান্য বিষয়ের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
উপরিউক্ত চ্যালেঞ্জের সমাধান তিনটি পর্যায়ে করা যেতে পারে;
বিশুদ্ধ পানির উৎস, সঠিকভাবে পানি পৌঁছানোর সেবা এবং পানি বিভিন্ন খাতে পরিবেশন যেমন...
- শিশু, বিশেষ করে সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া শিশুদের অধিকার রক্ষায় প্রয়োজনে সরকার অথবা বিভিন্ন সংস্থার সাথে সমন্বয় করে জরুরি পরিস্থিতিতে সবচেয়ে নাজুক ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের নিরাপদ পানি সরবরাহে ব্যবস্থা করতে হবে।
- শহর ও গ্রামাঞ্চলের পাড়া-মহল্লার পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পানি সরবরাহ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
- প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও পরিচ্ছন্নতার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে সহযোগিতা করতে হবে।
- স্বাস্থ্য সেবাই নবজাতক ও মায়েদের সুপেয় পানি প্রাপ্তির সুযোগ-সুবিধার প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে। কারণ বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ধাত্রীসেবার মান বৃদ্ধি করে এবং মা ও শিশুর মৃত্যুর হার কমায়।
- নিরাপদ পানি এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি এবং তাদের সেবাদাতাদের জন্যও অপরিহার্য। নিরাপদ পানির পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং উন্নত হাইজিন রোগীদের জীবাণু সংক্রমণ থেকে রক্ষা এবং তার জীবনমানের উন্নয়ন ঘটায়।
- অপুষ্টির অন্যতম কারণ ডায়রিয়া এবং অন্ত্রে প্রদাহজনিত রোগ এড়াতেও সুপেয় পানি ও স্যানিটেশনে সহযোগিতা করতে হবে।
- শহরের বস্তিগুলোতে এবং পাহাড়ি দুর্গম অঞ্চলে কম ব্যয়ে সেবা দেওয়ার জন্য সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করা যেতে পারে।
- উপকূলীয় এলাকার জমিতে লবণাক্ততা ঢোকা বন্ধে সমাধান বের করতে হবে।
২০৩০ সাল নাগাদ দুই কোটি ৪০ লাখ মানুষের জন্য সুপেয় পানি প্রাপ্তির টেকসই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সরকারের সঙ্গে কাজ করছে ইউনিসেফ।
প্রশ্ন: পানিতে কি ক্যালরি আছে?
উত্তর: শরীর প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ক্যালরি পায় তিন ধরনের খাবার থেকে। তা হলো প্রোটিন, ফ্যাট এবং কার্বোহাইড্রেট। পানিতে এ তিনটির একটিও না থাকায় এতে কোনো ক্যালরি নেই। তবে পানির অসংখ্য উপকারিতা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যালরির ভয়ে বাকি সব খাদ্য ও পানীয় নিয়ে চিন্তা করতে হলেও নিশ্চিন্তে পানি খেতে পারেন। কারণ পানিতে কোনো ক্যালরি নেই।
কিন্তু ক্যালরি নেই মানে এই নয় যে পানি শরীরে শক্তি দেয় না।
পানি আসলে খাবার থেকে পাওয়া শক্তিকে ভেঙে শরীরের বিভিন্ন অংশ পৌঁছে দেয়।
এছাড়া ক্যালরি ঝরাতেও পানি ভূমিকা রাখে। এ কারণে দৈনিক আট গ্লাস পানি পানের পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
পানির ঘাটতি এবং পানি পানের পরিমাণ:
আমাদের জীবন হয়ে গেছে দ্রুতগতির। আর এ জন্য অনেকেই পানি খাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। প্রাপ্তবয়স্কদের দেখে বাচ্চারাও এই অভ্যাস শিখছে। তাই পানি পানের বিষয়ে আমাদের সবাইকে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে।
শীতকাল ও পানি পান কম করা:
শীতে ঘাম কম হয়। ফলে পানির পিপাসাও কমে যায়। কিন্তু এ সময় পানি পান কমিয়ে দিতে হবে বিষয়টা এমন না। উল্টো শীতে শরীরে পানির চাহিদা থাকে। তাই এ সময় অবশ্যই পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে।
শরীরে পানির ঘাটতি থাকলে যেসব সমস্যা হয়?
পানির ঘাটতি হলে দেখা যেতে পারে এই সমস্যাগুলো-
১. মাথা ব্যথা।
২. কোষ্ঠকাঠিন্য।
৩. দুর্বলতা।
৪. ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া।
৫. অস্থিসন্ধিতে ব্যথা।
৬. মোটা হয়ে যাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি।
৭. লো ব্লাডপ্রেসারের সমস্যা।
৮. কিডনির সমস্যা ইত্যাদি।
পানির ঘাটতির লক্ষণ:
শরীরে পানির ঘাটতি তৈরি হলে প্রাথমিকভাবে এই উপসর্গগুলো দেখা যায়:
১. সব সময় খিদে পায়।
২. প্রস্রাব হলুদ হয়ে যায়। প্রস্রাব করার সময় জ্বালা করতে পারে।
৩. শ্বাসের মধ্যে দুর্গন্ধ থাকে।
৪. মাথা ব্যথা।
৫. দুর্বলতা।
এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে নিজে খেয়াল করে দেখুন আপনি কী পরিমাণ পানি পান করছেন। কম হলে আজই পানি পান বাড়িয়ে দিন।
কতটা পানি পান করতে হবে?
এভাবে কোনো মানদণ্ড নেই। একেকজন ব্যক্তির পানি পানের চাহিদা হবে একেক রকম। যিনি রোদে কাজ করেন তার পানির চাহিদা হবে বেশি আর যিনি অফিসে বসে কাজ করেন তার চাহিদা অবশ্যই কম হবে।
পানি কতটুকু পান করতে হবে তার একটা সাধারন হিসাব হলো তা প্রসাবের কালারের উপর নির্ভর করে যেমন; প্রসাবের স্বাভাবিক রং হলো তা হবে হালকা ব্রাউন রঙের। প্রস্রাব বেশি স্বচ্ছ হলে শরীরে পানি বেশি আছে বা শরীর hydrate আছে, আর যদি বেশি হলুদ হয় তাহলে শরীর Dehydrate বা পানি শূন্যের দিকে, এই দুইয়ের মাঝখানের অনুপাতে পানি খেতে হবে অর্থাৎ প্রসাবটা বেশি স্বচ্ছও না আবার বেশি হলুদও না এভাবে রেখে পানি খেতে হবে।
তথ্যসূত্র:
- unicef.org ।
- ডাক্তার মুজিবুর রহমান এম. ডি কার্ডিয়লজিস্ট, ফাউন্ডার ভেন্টেজ ন্যাচারাল হেল্থ সেন্টার, থাইল্যান্ড।
- Dr.Jahangir Kabir, Lifestyle Modifier, Primary Care Physician, Trained in Asthma, COPD & Diabetes Trainer in icddr, B & EFH, UK joint Secretary at Bangladesh Primary Care Respiratory Society.
- টাইমস অফ ইন্ডিয়া> সমকাল।
- Edited: Natural Healing.
কোন মন্তব্য নেই