First Aid Present

Lifestyle Modification এবং প্রাকৃতিক খাদ্য, পানীয়, শাকসবজি, গাছ, ডালপালা, ফল, মসলা, পাতা ও ফুল ইত্যাদির দ্বারা প্রাথমিক চিকিৎসা।

ভূমিকম্পের সময় কী করে বাঁচবেন?

ভূপৃষ্ঠে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ঝাঁকুনি! কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘটে যেতে পারে দুর্ঘটনা। ভূপৃষ্ঠের এ ঝাঁকুনি সম্প্রতি দেশে ঘন ঘন অনুভূত হওয়ায় জনমনে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। ভূমিকম্পে বাংলাদেশের ঝুঁকির অবস্থান জানতে চাইলে বুয়েট-জাপান ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার প্রিভেনশন অ্যান্ড আরবান সেফটির পরিচালক ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক তাহমীদ মালিক আল-হুসাইনী বলেন, ‘এ অঞ্চলে সর্বশেষ বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়েছিল ১৯৩০ সালে। তার আগে কিন্তু অনেকবার বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়েছিল। আর সাম্প্রতিক যে ভূমিকম্পগুলো হচ্ছে, তা এশিয়ান ও ইন্ডিয়ান প্লেটের ধাক্কায়। ফলে এ অঞ্চলের ভূ-অভ্যন্তরে চাপ জমা হচ্ছে। চাপ জমতে জমতে একসময় তা আর ধরে রাখা যাবে না। তাই আমাদের দেশে কিংবা আশপাশে বড় ধরনের ভূকম্পন এক বা একাধিকবার হওয়ার একটা আশঙ্কা রয়েছে।’

ভূমিকম্পে দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা (বিল্ডিং কোড) মেনে ভবন নির্মাণ করা হলে ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। ভূমিকম্পে করণীয়র ব্যাপারে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা রেড ক্রসের গাইডলাইন অনুসরণ করা যেতে পারে বলে মনে করেন তাহমীদ মালিক আল-হুসাইনী।

ভূমিকম্প কেন এবং কোন অঞ্চলে বেশি হয়?

ভূমিকম্পের পূর্বাভাস বা প্রেডিকশন খুবই জটিল। আমরা কোনো নির্দিষ্ট ভূমিকম্পকে সরাসরি নির্ণয় করতে পারি না, কিন্তু মাইক্রোসিসমিসিটি গবেষণা, ফোকাল ম্যাকানিজম গবেষণার মাধ্যমে সম্ভাব্য পূর্বাভাস এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থান, হাইসিসমিসিটি, লোসিসমিসিটি নির্ণয় করতে পারি, যা জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ জীবন ও সম্পদের ক্ষয়-ক্ষতি রোধে অত্যন্ত সহায়ক। ভূমিকম্পবিষয়ক দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য সরকারের একটি সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা জরুরি প্রয়োজন।

সাধারণত ডাকটাল রক এলাকায় ভূকম্পন তুলনামূলক কম হয়ে থাকে এবং ব্রাইটাল রক ভূকম্পনের জন্য যথেষ্ট উপযোগী। যখন ভূ-অভ্যস্তরে ক্রাস্টাল ডিফরমেশন ঘটে, তখন সে স্থানে স্ট্রেস অ্যাকুমোলেশন হতে থাকে। যখন অ্যাকুমোলেশন বেশি মাত্রায় পৌঁছায়, তখনই আর্থকোয়েক বা ভূকম্পনের মাধ্যমে এনার্জি রিলিজ হয়ে থাকে। আর্থকোয়েক ফোকাল ম্যাকানিজম গবেষণা থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দিকে কমপ্রিশন টেকটনিক স্ট্রেস লোডিং হচ্ছে, যা দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মধ্যাঞ্চলের চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। তা ছাড়া ট্রান্স এশিয়াটিক জোন, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভারত, হাইসিসমিসিটি জোন। ভারত ও মিয়ানমারের দিক থেকে চলে আসা ভূ-অন্তরিভাগ দুটোর সংযোগস্থলে সম্ভাব্য ফল্ট লাইনের প্রভাব এবং ওই লাইনের ভূগর্ভস্থ মাটির স্তর অধিকতর দুর্বল বলে রাঙামাটি পার্বত্য অঞ্চল দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মতো ঝুঁকিপূর্ণ। তা ছাড়া সিসমিসিটি গবেষণায় লক্ষ করা যায়, বাংলাদেশের ভূ-অভ্যন্তরীণ ক্রাস্টের গঠন কম স্তরায়িত এবং সময়ের সাপেক্ষে সিসমিসিটির পরিবর্তন লক্ষণীয়। এ কথা সত্য যে, ভূ-অভ্যন্তরে সিসমিক প্রিকারছারের পরিবর্তন বুঝতে পারা অত্যন্ত জটিল ও সূক্ষ্ম। তবে এসব গবেষণা ইঙ্গিত করে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ ভূকম্পনের।

ভূমিকম্প উৎপত্তি এবং এর গতিবিধি।
ভূমিকম্পের আগে যা করতে হবে:

  • বাড়ি বা কর্মস্থলের ভেতরে ও বাইরে নিরাপদ স্থানগুলো চিহ্নিত করুন, যেন ভূমিকম্পের সময় ভাবতে না হয় কোথায় আশ্রয় নেবেন। লক্ষ রাখতে হবে, সে স্থানের আশপাশে যেন উঁচু কোনো ফার্নিচার বা গায়ে পড়ার মতো জিনিস না থাকে।
  • অন্ধকারে দেখার জন্য হাতের কানছে টর্চ রাখুন।
  • দেয়ালে ঝোলানো ছবি, আয়না ইত্যাদি বিছানা থেকে দূরে রাখুন।
  • গ্যাস ও বিদ্যুচ্চালিত যন্ত্রপাতি নিরাপদ রাখুন। এগুলোর চাবি কোথায় আছে এবং কীভাবে বন্ধ করতে হয়, তা শিখে নিন।
  • মাঝেমধ্যে ভূমিকম্প ও জরুরি প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে বের হওয়ার মহড়া দিন, যাতে সবাই আয়ত্ত করতে পারে।
  • শুকনা খাবার ও জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম হাতের কাছে রাখুন।
  • ভূমিকম্প থেকে বাঁচার জন্য একটি শহরের প্রস্তুতির মধ্যে শহরের ভবনগুলো বিশেষ করে জরুরি সাহায্য যেমন হাসপাতাল, দমকলবাহিনীর ভবনগুলো ভূমিকম্প নিরোধক করতে হবে। 
  • শহরের মাঝে মাঝে খোলা মাঠ এবং খোলামেলা জায়গার খুব প্রয়োজন রয়েছে শুধুমাত্র ভূমিকম্পের সময় আশ্রয়স্থল নয় পরবর্তী আফটার শকের সময়গুলোতে সেখানে আশ্রয় নেওয়ার জন্য কয়েকটি বাড়ির পরপর খোলা জায়গার বিকল্প নেই।
  • বিদ্যুৎ ও গ্যাসলাইন বন্ধ করার নিয়মকানুন পরিবারের সবার জেনে রাখুন।
  • ঘরের ওপরের তাকে ভারী জিনিসপত্র না রাখা, পরিবারের সব সদস্যের জন্য হেলমেট রাখা।
  • পরিকল্পিত বাড়িঘর নির্মাণের জন্য বিল্ডিং কোড মেনে চলা। ভবনের উচ্চতা ও লোডের হিসাব অনুযায়ী শক্ত ভিত দেওয়া, রেইন ফোর্সড কংক্রিট ব্যবহার, পাশের বাড়ি থেকে নিরাপদ দূরত্বে বাড়ি নির্মাণ, গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইন নিরাপদভাবে স্থাপন করা। গর্ত ও নরম মাটিতে ভবন নির্মাণ না করা।

ভূমিকম্প চলাকালে:

  • সৃষ্টিকর্তার কাছে সাহায্য চান। নিজেকে ধীরস্থির ও শান্ত রাখুন, বাড়ির বাইরে থাকলে ঘরে প্রবেশ করবেন না
  • একতলা দালান হলে দৌড়ে বাইরে চলে যাওয়া। তা ছাড়া বহুতল দালানের ভেতরে থাকলে টেবিল বা খাটের নিচে চলে যাওয়া ও কাচের জিনিসের কাছ থেকে দূরে থাকা। লিফট ব্যবহার না করা।
  • উঁচু দালানের জানালা বা ছাদ থেকে লাফ দিয়ে নামার চেষ্টা না করা। ভূমি ধসে পড়ার সম্ভাবনা আছে এমন উঁচু ভূমি থেকে দূরে থাকা।
  • ভূমিকম্পের সময় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা।
  • ভূমিকম্প খুব অল্প সময়ের মধ্যে শেষ হয়। প্রলয় যা হবার তা হয় কয়েক সেকেন্ড কিংবা মিনিট সময়ের মধ্যে। এ সময়ে আপনি কি নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারবেন? রাস্তায় গিয়ে তো আরো বিপদে পড়তে হবে আপনাকে। বাড়ি ঘর হেলে গিয়ে ধসে পরে সব কিছুতো রাস্তার ওপরই পড়বে। বরং রাস্তায় থাকলে চাপা পড়ে, মাথা কিংবা শরীরের ওপরে কিছু পড়ে আপনি হতাহত হতে পারেন। যারা এক তলা কিংবা দোতলায় থাকেন পাশে খালি মাঠ থাকলে দ্রুত দৌড়ে যেতে পারেন। সেখানে যেতে যদি জঞ্জাল থাকে তা হলে সৃষ্টিকর্তাকে ভরসা করে শক্ত কোনো কিছুর নিচে অবস্থান নেয়াই শ্রেয়।
  • ভূমিকম্পের সময় সবচেয়ে উত্তম পন্থা হলো ‘ড্রপ-কাভার-হোল্ড অন’ বা ‘ডাক-কাভার’ পদ্ধতি। অর্থাত্ কম্পন শুরু হলে মেঝেতে বসে পড়ুন। তারপর কোনো শক্ত টেবিল বা ডেস্কের নিচে ঢুকে কাভার নিন, এমন ডেস্ক বেছে নিন বা এমনভাবে কাভার নিন যেন প্রয়োজনে আপনি কাভারসহ মুভ করতে পারেন। 
  • ভূমিকম্পের সময় কোন ফ্লোর নিরাপদ? অনেকে এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে চান। এটা ঐ জায়গার মাটির গঠন, বিল্ডিং কিভাবে তৈরি—এটার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করে। সাধারণত ভূমিকম্পের সময় চারভাবে ফ্লোর বা দালান ধসে পড়তে পারে। দালানের কোন্ তলা বেশি নিরাপদ—এক্ষেত্রে বেশিরভাগ মতামত যেটা পেয়েছি, তা হলো ভূমিকম্পের সময় ওপরের দিকের তলাগুলোতে দুলুনি হবে বেশি, নিচেরতলায় কম। কিন্তু দালান যদি উলম্ব বরাবর নিচের দিকে ধসে পড়ে, তবে নিচতলায় হতাহত হবে বেশি, কারণ ওপরের সব ফ্লোরের ওজন তখন নিচে এসে পড়বে। তাই ভূমিকম্পের সময় নিচে নামার চেষ্টা না করে যেখানে আছেন, সেখানেই সতর্ক অবস্থানে থাকুন। মনে রাখতে হবে, ভূমিকম্পে প্রলয় ঘটে কয়েক সেকেন্ডে তখন কোনো সুযোগই আপনি পাবেন না। 
  • যে ফ্লোরেই থাকুন না কেন ভূমিকম্পের সময় বেশি নড়াচড়া, বাইরে বের হবার চেষ্টা করা, জানালা দিয়ে লাফ দেবার চেষ্টা ইত্যাদি না করাই উত্তম। একটা সাধারণ নিয়ম হলো—এসময় যত বেশি মুভমেন্ট করবেন, তত বেশি আহত হবার সম্ভাবনা থাকবে। 
ভূমিকম্পের সময় এলিভেটর-লিফট ব্যবহারও উচিত নয়। রাতে বিছানায় থাকার সময় ভূমিকম্প হলে উদ্ধারকর্মী বলছে—গড়িয়ে ফ্লোরে নেমে পড়তে, এটা বিল্ডিং ধসার পার্সপেক্টিভেই। রেডক্রস বলছে, বিছানায় থেকে বালিশ দিয়ে কাভার নিতে, কারণ সিলিং ধসবে না, কিন্তু ফ্লোরে নামলে অন্যান্য কম্পনরত বস্তু থেকে আঘাত আসতে পারে।
ভূমিকম্পের সময় বাড়ির ভেতর থাকলে:

  • ড্রপ, কাভার ও হোল্ড–অন পদ্ধতিতে মেঝেতে বসে পড়ুন, কোনো মজবুত আসবাবের নিচে আশ্রয় নিন এবং কিছুক্ষণ বসে থাকুন। হেলমেট পরে বা হাত দিয়ে ঢেকে মাথাকে আঘাত থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে রক্ষা করুন।
  • বিছানায় থাকলে মাথা বাঁচাতে বালিশ ব্যবহার করুন। ঘরের ভেতরের দিকের মজবুত দেয়ালের কাছে বসে আশ্রয় নিতে পারেন।
  • বাড়ির বাইরের দিকের দেয়াল, কাচের জানালা বিপজ্জনক। এগুলো থেকে দূরে থাকুন।
  • বহুতল ভবনের ওপরের দিকে অবস্থান করলে ভূমিকম্প না থামা পর্যন্ত ঘরের ভেতরে থাকাই ভালো।
  • ভূকম্পন থেমে গেলে বের হয়ে আসুন।
  • নিচে নামতে চাইলে কোনোভাবেই লিফট ব্যবহার করবেন না। ধীরেসুস্থে সিঁড়ি দিয়ে হেঁটে নামুন

বাড়ির বাইরে থাকলে:

  • খোলা জায়গা খুঁজে আশ্রয় নিন। বহুতল ভবনের প্রান্তভাগের নিচে বা খুব কাছে, পাহাড়-পর্বতের নিচে কোনোভাবেই দাঁড়াবেন না। ওপর থেকে খণ্ড পড়ে আহত হতে পারেন।
  • লাইটপোস্ট, বিল্ডিং, ভারী গাছ বা বৈদ্যুতিক তার ও পোলের নিচে দাঁড়াবেন না।
  • রাস্তায় থাকলে ছোটাছুটি করবেন না। চলন্ত গাড়িতে থাকলে গাড়ি থামিয়ে খোলা জায়গায় পার্ক করে গাড়ির ভেতরেই আশ্রয় নিন।
  • কখনোই ব্রিজ, ফ্লাইওভারে থামবেন না। বহুতল ভবন কিংবা বিপজ্জনক স্থাপনা থেকে দূরে গাড়ি থামান।

ভূমিকম্পের পরে:

  • ক্ষতিগ্রস্ত ভবন থেকে ধীরস্থির ও শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে বের হ‌উন।
  • ভূমিকম্প শেষ হলেও আরও কম্পনের জন্য প্রস্তুত থাকুন। প্রায়ই পরপর কয়েকবার কম্পন হয়। কম্পন থেমে গেলেও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তারপর বের হোন। ওপর থেকে ঝুলন্ত জিনিসপত্র কিছুক্ষণ পরও পড়তে পারে।
  • নিজে আহত কি না পরীক্ষা করুন, অন্যকে সাহায্য করুন। বাড়িঘরের ক্ষতি পর্যবেক্ষণ করুন। নিরাপদ না হলে সবাইকে নিয়ে নিরাপদ স্থানে যান।
  • গ্যাসের সামান্যতম গন্ধ পেলে জানালা খুলে বের হয়ে যান এবং দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা করুন।
  • কোথাও বৈদ্যুতিক স্পার্ক চোখে পড়লে মেইন সুইচ বা ফিউজ বন্ধ করে দিন। ক্ষতিগ্রস্ত বিল্ডিং থেকে সাবধান থাকুন। অগ্নিকাণ্ড হতে পারে।
  • ব্যাটারিচালিত রেডিও রাখুন যেন প্রয়োজনীয় খবর শোনা যায়। সঙ্গে মুটোফোনও রাখবেন।
  • আগুন নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রাখুন। ফায়ার সার্ভিসের ফোন নম্বর রাখুন।
  • রেডিও টেলিভিশন থেকে জরুরি নির্দেশাবলি শোনা এবং তা মেনে চলা।
  • বিদ্যুৎ, গ্যাস, টেলিফোন লাইনে কোনো সমস্যা হয়েছে কি না, পরীক্ষা করে নেওয়া ও প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
  • সরকারি সংস্থাগুলোকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতা করা।
  • উদ্ধারকাজে নিজেকে নিয়োজিত করা। অস্থায়ী আশ্রয়স্থলে ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা। যোগাযোগব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সার্বিক সহযোগিতা করা।
* ভূমিকম্প বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানের পূর্বপ্রস্তুতি থাকা আবশ্যক। সে জন্য সম্ভাব্য ভূমিকম্প-পরবর্তী সময়ে সঠিকভাবে নিজেকে সেবায় মনোনিবেশ করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণসহ সব প্রতিষ্ঠানের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। বর্তমান কাঠামোতে ভূমিকম্পবিষয়ক সার্বিক প্রস্তুতি অত্যন্ত নগণ্য বিধায় পূর্বপ্রস্তুতির উন্নয়ন একান্ত আবশ্যক।

* ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার ও ত্রাণ কর্মসূচি নিশ্চিতকরণ। উদ্ধার কর্মসূচির অভাবে অসংখ্য প্রাণহানি ঘটে থাকে। পূর্বপ্রস্তুতি, দক্ষ প্রশিক্ষণ, উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী নেটওয়ার্ক উদ্ধার কর্মকাণ্ডের মূল চাবি। তা ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের জন্য প্রয়োজনীয় ত্রাণ/ওষুধ, চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা। উল্লেখ্য, ভূমিকম্পের দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন ফায়ার ব্রিগেড, সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিমানবাহিনী, রেড ক্রিসেন্ট, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি চমৎকার সম্পর্ক থাকা জরুরি।

ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়লে:

  • আগুন জ্বালাবেন না। বাড়িতে গ্যাসের লাইন লিক থাকলে দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।
  • ধুলাবালুর মধ্যে পড়লে কাপড় দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে নিন।
  • ধীরে নড়াচড়া করবেন। বাঁচার আশা ছাড়বেন না। উদ্ধারের অপেক্ষায় থাকবেন।
বাংলাদেশ প্লেট বাউন্ডারির অন্তর্ভুক্ত না হয়েও দুর্বল অবকাঠামো, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, প্রয়োজনীয় বিল্ডিং কোড মেনে না চলার কারণে এবং যত্রতত্র ভবন ও স্থাপনা নির্মাণের ফলে বাংলাদেশ বিশ্বের একটি অন্যতম ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। যেহেতু ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, একে থামিয়ে রাখা সম্ভব নয়। সেহেতু ভূমিকম্প পূর্বপ্রস্তুতি ও ক্ষয়ক্ষতি রোধে ভূমিকম্প-পরবর্তী শক্তিশালী এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই এই দুর্যোগ মোকাবিলা সম্ভব।
ভূমিকম্প সম্পর্কে কয়েকটি বিস্ময়কর তথ্য:
  • সারা পৃথিবীতে বছরে লাখ লাখ ভূমিকম্প হয়: যুক্তরাষ্ট্রে ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জিওলজিক্যাল সার্ভে বলছে, প্রত্যেক বছর গড়ে ১৭টি বড় ধরনের ভূমিকম্প হয় রিখটার স্কেলে যার মাত্রা সাতের উপরে। এবং আট মাত্রার ভূমিকম্প হয় একবার। তবে ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বছরে লাখ লাখ ভূমিকম্প হয়। এর অনেকগুলো হয়তো বোঝাই যায় না। বোঝা যায় না কারণ খুব প্রত্যন্ত এলাকায় এসব হয় অথবা সেগুলোর মাত্রা থাকে খুবই কম।
  • বেশিরভাগ ভূমিকম্পেরই উৎস প্রশান্ত মহাসাগর: পৃথিবীতে যতো ভূমিকম্প হয় তার অধিকাংশ, ৯০ শতাংশই হয় রিং অফ ফায়ার এলাকাজুড়ে। এই এলাকাটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে।
  • ভূমিকম্পের আগে স্থির পানি থেকে গন্ধ বের হয়: বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভূমিকম্পের আগে পুকুর, খাল-বিল, হ্রদ, জলাশয়ের স্থির পানি থেকে দুর্গন্ধ আসতে পারে। এমনকি সেই পানি সামান্য উষ্ণও হয়ে পড়তে পারে। প্লেট সরে যাওয়ার কারণে মাটির নিচ থেকে যে গ্যাস নির্গত হয় তার কারণে এটা হয়ে থাকে। এর ফলে ওই এলাকার বন্যপ্রাণীর আচরণেও পরিবর্তন ঘটতে পারে। ওপেন ইউনিভার্সিটির প্রাণী বিজ্ঞান বিভাগ বলছে, ২০০৯ সালে ইটালিতে এক ভূমিকম্পের সময় এক ধরনের ব্যাঙ সেখান থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিলো এবং ফিরে এসেছিলো ভূমিকম্পের পরে। বলা হয়, এই ব্যাঙ পানির রাসায়নিক পরিবর্তন খুব দ্রুত শনাক্ত করতে পারে।
  • ভূমিকম্পের পরেও পানিতে ঢেউ উঠতে পারে: ভূমিকম্পের পরেও পুকুরে কিম্বা সুইমিং পুলের পানিতে আপনি কখনো কখনো ঢেউ দেখতে পারেন। একে বলা হায় শ্যাস। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভূমিকম্প হয়তো শেষ হয়ে গেছে কিন্তু তারপরেও কয়েক ঘণ্টা ধরে অভ্যন্তরীণ এই পানিতে তরঙ্গ অব্যাহত থাকতে পারে। মেক্সিকোতে ১৯৮৫ সালে একবার ভূমিকম্প হয়েছিলো ১৯৮৫ সালে যেবার এই মেক্সিকো থেকে ২০০০ কিলোমিটার দূরে অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুইমিং পুলের পানি ছিটকে পড়তে পড়তে শেষ হয়ে গিয়েছিলো।
  • ভূমিকম্পের আগে প্রাণীর আচরণে পরিবর্তন ঘটে: ভূমিকম্পের ফলে যে শুধু ব্যাঙের আচরণেই পরিবর্তন ঘটে তা নয়, ইন্দোনেশিয়া এবং ২০০৪ সালে সুনামির আগে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন যে তারা অনেক পশু পাখিকে দেখেছেন উঁচু এলাকার দিকে ছুটে যেতে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ভূমিকম্পের আগে ছোট ছোট কম্পন পশুপাখিরা টের পেয়ে যায়।
জেনে রাখুন;
যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরে আপনাকে বেঁচে থাকতে হবে। যখন ধ্বংসাত্মক পর্যায়টি হ্রাস পাবে তখন ধ্বংসস্তুপ, ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন এবং ভাঙা অবকাঠামো প্রচুর থাকতে পারে। মৃতদেহও থাকতে পারে। পানীয় জল এবং আলো হিসাবে বেসিক পরিষেবাগুলি ধ্বংস বা বাধাগ্রস্থ হতে পারে। সম্ভবত কোনও খাবার সরবরাহ হবে না। রোগ, ট্রমা মানসিক চাপ, ব্যথা, ক্ষুধা এবং আঘাতের ঝুঁকি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঠিক পরে সুনামি-ভূমিকম্প-সাইক্লোন ইত্যাদির মতোই বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। ঠিক সেই মুহুর্তে আসার আগে থেকেই নিজেকে, আপনার পরিবার এবং সম্প্রদায়কে রক্ষা করার জন্য কী করা দরকার তা বিবেচনা করুন।

তথ্যসূত্র:

  • বুয়েট-জাপান ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার প্রিভেনশন অ্যান্ড আরবান সেফটির পরিচালক ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক তাহমীদ মালিক আল-হুসাইনী, গ্রন্থনায়- এস এম নজিবুল্লাহ চৌধুরী, প্রথম আলো।
  • দৈনিক ইনকিলাব।
  • বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাকিল আকতার, বিবিসি বাংলা।
  • মীর আব্দুল আলীম, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সমাজ গবেষক, দৈনিক ইত্তেফাক।
  • আবহাওয়াবিদ মো. মমিনুল ইসলাম, প্রথম আলো।
  • Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই

Popular Post

Blogger দ্বারা পরিচালিত.