Vitamin K অথবা খাদ্যপ্রাণ কে
কার্যকারিতা:
ভিটামিন-কে হলো এসেনশিয়াল ফ্যাট সলিউবল ভিটামিন।
ভিটামিন-সি এবং ভিটামিন-ডি আমাদের শরীরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে তা আমরা অনেকেই জানি। এ জন্য ভিটামিন-সি এবং ডি সমৃদ্ধ খাবার-দাবার খুঁজে নেই। কিন্তু ভিটামিন-কে সম্পর্কে আমরা ততটা জানিও না এবং গুরুত্বও দেই না। তবে এই ভিটামিন-কে দেহের জন্য অতি প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের তথ্য অনুযায়ী, নারীদের ক্ষেত্রে দৈনিক ১২২ মাইক্রোগ্রাম ও পুরুষের ক্ষেত্রে দৈনিক ১৩৮ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন কে প্রয়োজন পড়ে।
- রক্ত জমাটবাঁধা: মানবদেহে রক্ত জমাট বাঁধার জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিনগুলির সম্পূর্ণ সংশ্লেষণের জন্য ভিটামিন কে প্রয়োজন হয়। আমাদের শরীরে ভিটামিন-কে প্রথ্রোম্বিন নামক প্রোটিন তৈরি করে। প্রথ্রোম্বিন রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে। ভিটামিন কে ছাড়াই রক্ত জমাট বাঁধা গুরুতরভাবে ব্যহত হয় এবং অনিয়ন্ত্রিত রক্তপাত হয়। এবং শরীরে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে।
- হাড় ভাল রাখে: প্রাথমিক ক্লিনিকাল গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে ভিটামিন কে এর অভাব হাড়কে দুর্বল করতে পারে, সম্ভাব্য অস্টিওপোরোসিসের দিকে পরিচালিত করে এবং ধমনী এবং অন্যান্য নরম টিস্যুগুলির ক্যালসিফিকেশন হতে পারে।তাই হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ভিটামিন-কে জরুরি। এটি হাড়ের ফ্র্যাকচার কমাতে সাহায্য করে। এবং অস্টিওপোরোসিস থেকে বাঁচায়।
- হৃৎপিণ্ড ভালো রাখে: ভিটামিন-কে হৃৎপিণ্ডের জন্য খুবই উপকারী। এটি রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। এক গবেষণায় বলা হয়, ভিটামিন-কে কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ ও হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধে সাহায্য করে।
- ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে: ভিটামিন-কে কোলন, পাকস্থলী, লিভার, মুখগহ্বর, প্রোস্টেট ক্যান্সার প্রতিরোধে কাজ করে। অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ থেকে বাঁচায়।
- ঋতুস্রাবের ব্যথা কমায়: ভিটামিন-কে ঋতুস্রাবের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। এটি হরমোনের কার্যক্রমকে নিয়ন্ত্রণ করে ঋতুস্রাবের ব্যথা কমায়। পিরিয়ডের সময় অত্যধিক রক্তক্ষরণে বাধা দেয়।
- মস্তিষ্কের কার্যক্রম বৃদ্ধি করে: ভিটামিন-কে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যকে ভালো রাখে। এই ভিটামিনের মধ্যে আছে প্রদাহরোধী উপাদান। এটি অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের বিরুদ্ধে কাজ করে আলঝেইমার, পারকিনসন ইত্যাদি রোগ প্রতিরোধ করে। বুদ্ধির বিকাশ ঘটায়।
- ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ‘ডি’ ছাড়াও হাড়ের সুস্থতা ও ক্ষয় রোধে ভিটামিন ‘কে’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন। হাড়ক্ষয় রোধে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ‘ডি’, ফসফরাসের সঙ্গে কাজ করে এই ভিটামিন। ক্যালসিয়ামকে হাড়ের মধ্যে বসাতেও এটা বেশ ভূমিকা রাখে। হাড় এবং অন্যান্য টিস্যুতে ক্যালসিয়ামের বাঁধাই নিয়ন্ত্রণের করে।
- দেহের অতিরিক্ত গ্লুকোজকে গ্লাইকোজেন হিসেবে লিভারে জমা রাখে এবং ক্যানসারের কোষ গঠনে বাধা প্রদান করে।
- এ ছাড়া আমাদের শরীরের অনেক প্রয়োজনীয়তা পূরণ করে ভিটামিন- কে। শরীরের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলো যকৃত থেকে পিত্তরস নিঃসৃত হওয়া। পিত্তরস নিঃসরণে অসুবিধা হলে ভিটামিন-কে এর শোষণ কমে যায়। ভিটামিন-কে এর অভাবে ত্বকের নিচে ও দেহাভ্যন্তরে যে রক্ত ক্ষরণ হয় তা বন্ধ করার ব্যবস্থা না নিলে রোগী মারা যেতে পারে। এ ভিটামিনের অভাবে অপারেশনের রোগীর রক্তক্ষরণ সহজে বন্ধ হতে চায় না। এতে রোগীর জীবন নাশেরও আশংকা থাকে।
- গর্ভাবস্থায় মর্নিং সিকনেস কমাতে সাহায্য করে।
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে বেশ সাহায্য করে।
উৎস: আমাদের এতো উপকার যে ভিটামিনটি করে সেই ভিটামিন-কে সমৃদ্ধ খাবারগুলো বেশি বেশি করে খাওয়া সবারই উচিত। তার আগে জানতে হবে কোন কোন খাবারে ভিটামিন-কে বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়। সেগুলো হলো-
এই ভিটামিনের প্রধান উৎস সবুজ শাক-সবজি; যেমন—পালংশাক, শাকগম, সবুজ ফুলকপি, লেটুসপাতা, সরিষা, মুলা, বিট, গম, বার্লি, লাল মরিচ, কলা ও অন্যান্য সবুজ শস্য। পনির, দই, কলিজা (মাছের কলিজা), ডিমের কুসুম, ডাল, সয়াবিন, ভুট্টা, ফর্টিফায়েড দুধ ইত্যাদিতে যথেষ্ট পরিমাণ ভিটামিন ‘কে’ পাওয়া যায়।
শালগম:
শীতকালীন সবজি হিসেবে পরিচিত শালগম। এটি একপ্রকার রূপান্তরিত মূল এবং মাটির নিচের অংশ খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
আধা কাপ সেদ্ধ শালগমে ৪২৬ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন কে পাওয়া যায়। এতে রোগ প্রতিরোধী অনেক গুণ আছে। এটি প্রদাহনাশ করে। এমনকি ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করে। এটি চুল ও ত্বক ভালো রাখে। রক্তাল্পতা দূর করে। এটি বাজে কোলস্টেরল দূর করতে পারে। শালগম দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এর লিউটিন নামক উপাদান হৃদ্যন্ত্রের জন্য উপকারী। শালগমে প্রচুর আঁশ থাকায় এটি কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময় করে। শালগম রক্ত পরিশোধিত করে এবং রক্তকণিকা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। ক্ষুধামান্দ্য দূর করতেও শালগম বেশ উপকারী।
ব্রোকলি:
আধা কাপ সেদ্ধ ব্রোকলি থেকে ৮৫-১১০ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন কে পেতে পারেন। তবে ক্যানোলা বা জলপাইয়ের তেল দিয়ে রান্না করা ভালো। এতে খাবারে ভিটামিন ‘কে’ যোগ হওয়ার পাশাপাশি বাড়তি স্বাদও যোগ হয়।
পুষ্টিবিদেরা ব্রোকলিকে দারুণ পুষ্টিকর সবজি বলেন। এতে দুর্দান্ত কিছু উপকারী উপাদান আছে, যা দ্রুত বুড়িয়ে যাওয়া ঠেকাতে পারে।এতে প্রচুর ভিটামিন সি আছে। আমেরিকান ক্যানসার রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তালিকায় ক্যানসার প্রতিরোধী দশম খাবার হিসেবে স্থান করে নিয়েছে ব্রোকলি। পুষ্টিবিদদের তথ্য অনুযায়ী, ব্রোকলিতে আয়রনের পরিমাণ অনেক থাকে। ভিটামিন ‘এ’-এর একটি ভালো উৎস। এ ছাড়া এটি ত্বকের জন্য ভালো। কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে। প্রচুর অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট আছে এতে। এতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম রয়েছে। শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ দূর করতে সাহায্য করে।
কপি: কপিকে ভিটামিন ‘কে’-এর রাজা বলা হয়। বিশেষ করে সবুজ কপি।
একে ‘সুপার ফুড’ বলা যায়। কারণ এটা ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম ও ফোলেট সমৃদ্ধ। এতে রয়েছে ভিটামিন ও খনিজ। ডায়াবেটিস ও স্থূলতার সমস্যা আছে এমন রোগীদের জন্য উপকারী।
লেটুস পাতা:
লেটুসের এক পাতায় ৩.৬২ এমসিজি ভিটামিন ‘কে’ থাকে। এ ছাড়া এতে ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট থাকে, যা মূলত অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। এসব উপাদান শরীরকে রোগমুক্ত ও সুস্থ রাখতে সহায়তা করে।
গাজরের রস: ৬ আউন্স গাজরের রসে ২৮ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন কে থাকে। গবেষকেরা বলেন, প্রতিদিন সকালে এক গ্লাস গাজরের রস খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। গাজরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে উপকারটি তা হলো দৃষ্টি শক্তি বৃদ্ধি পাওয়া। এ ছাড়াও আছে আরও অনেক স্বাস্থ্যগত সুবিধা। শরীরে ক্ষতিকর জীবাণু, ভাইরাস এবং বিভিন্ন ধরনের প্রদাহের বিরুদ্ধে কাজ করে। গাজরের জুসে ভিটামিন ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের খনিজ, পটাশিয়াম, ফসফরাস ইত্যাদি থাকে যা হাড় গঠন, নার্ভাস সিস্টেমকে শক্ত করা এবং মস্তিষ্কের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
বেদানার রস:
প্রতি ছয় আউন্সে ১৯ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন কে পাওয়া যায়। বেদানায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন, পটাশিয়াম। রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ ঠিক রাখতে প্রতিদিন এক কাপ বেদানার রস খাওয়া যেতে পারে।
পুষ্টিবিদ আলেয়া মাওলার তথ্য অনুযায়ী, ফলটা শুধু দেখতেই সুন্দর নয়, পুষ্টিগুণেও অনন্য। এতে আছে প্রচুর খনিজ। তাই যাদের রক্তশূন্যতা আছে, তাদের জন্য খুব ভালো। এ ছাড়া আছে প্রচুর পরিমাণে অ্যামাইনো অ্যাসিড, ফলিক অ্যাসিড, পটাশিয়াম, অ্যান্টি-অক্সিডেন্টসহ ভিটামিন এ, সি, ই প্রভৃতি পুষ্টি উপাদান।
পালংশাক: কচি পালংশাক রান্না করে খেলে তা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এটি ভিটামিন ‘কে’র ভালো উৎস। পালংশাক খাওয়ার অনেক উপকারিতা রয়েছে । পালংশাকে প্রচুর ভিটামিন ‘সি’ এবং বিটা ক্যারোটিন থাকায় তা কোলনের কোষগুলোকে রক্ষা করে। পালংশাক স্মৃতিশক্তি এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিতে খুবই কার্যকর। এ ছাড়া পালংশাক নানা রকমের পুষ্টি উপাদান, যেমন—ভিটামিন ‘এ’, ‘বি’, ‘ই’, ম্যাগনেসিয়াম, ফোলায়েট ও লৌহসমৃদ্ধ।
সয়াবিন: দুই ধরনের ভিটামিন ‘কে’ রয়েছে—ভিটামিন ‘কে-১’ ও ‘কে-২’। ভিটামিন ‘কে-১’ উদ্ভিদ থেকে আসে এবং ভিটামিন ‘কে-২’ সামান্য পরিমাণে প্রাণিজ উৎস এবং গাঁজানো খাবার, যেমন—পনির থেকে আসে। তবে সয়াবিন ও সয়াবিন তেল থেকেও ভিটামিন ‘কে-২’ পাওয়া যায়।
তথ্যসূত্র:
- এএইচ/এসি> ETV.
- উইকিপিডিয়া।
- প্রিভেনশন ডটকম।
- এনডিটিভি> প্রথম আলো।
- রেবেকা সুলতানা রুমা, পুষ্টিবিদ, নিউজিল্যান্ড ডেইরি প্রডাক্টস বাংলাদেশ লিমিটেড, কালের কণ্ঠ।
- Edited: Natural Healing.




.jpg)
.jpg)
.jpg)
কোন মন্তব্য নেই