শীতে নাক কান ও গলার রোগ বৃদ্ধি পায়, তাই সচেতনতা জরুরী
শীতের সময় রোগ বাড়ে না তবে কিছু রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। এর মধ্যে সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্টের পাশাপাশি নাক, কান ও গলার রোগগুলো অন্যতম। বলা যায়, এসব রোগে ছেলে-বুড়ো সবাই আক্রান্ত হয়।
শীতকালে বেশি সমস্যা হতে এমন কিছু রোগ থেকে ভালো থাকতে কিছু পরামর্শ দেয়া হলো :
এডিনয়েড:
এডিনয়েড রোগে শিশুরা বেশি ভোগে থাকে। শিশুদের নাকের পেছনে থাকা এক ধরনের টনসিলকেই এডিনয়েড বলে। এই এডিনয়েড বড় হয়ে গেলে নাক বন্ধ হয়ে শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা দেখা দেয়। শিশুরা তখন নাক দিয়ে নিঃশ্বাস নিতে পারে না। সব সময় মুখ খোলা রাখে, ঘুমের সময় হা করে থাকে বা মুখ দিয়ে শ্বাস নেয়, নাক ডাকে। কিছু শিশুর লালা ঝড়ে, কানে কম শোনে, তাদের বুদ্ধিমত্তা অনেকাংশে কমে যায়।
শুধু শারীরিক সমস্যাই নয়, মানসিক বিকাশও ব্যাহত হতে পারে এই এডিনয়েড সমস্যার কারণে।
কোনো শিশুর এ ধরনের সমস্যা মনে হলে দ্রুত কোনো নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ওষুধ দিয়ে উপকার না পেলে অনেক সময় অপারেশন করে এডিনয়েড ফেলে দিতে হয়। কানের সমস্যা থাকলে সেটাও একই সময় অপারেশন করা সম্ভব। অনেক মা-বাবা অপারেশনের কথা শুনেই ভয় পান। কিন্তু বাংলাদেশে এখন এডিনয়েডের শতভাগ সফল অপারেশন হচ্ছে এবং শিশুরাও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাচ্ছে।
শিশুদের মধ্যকর্ণে প্রদাহ:
শীতকালে শিশুদের মধ্যকর্ণে প্রদাহ বেশি দেখা দেয়। সাধারণত ঊর্ধ্ব শ্বাসনালির প্রদাহ, টনসিলের ইনফেকশন, এডিনয়েড নামক গুচ্ছ লসিকা গ্রন্থির বৃদ্ধি ইত্যাদি থেকে এই প্রদাহ দেখা দেয়। শীতকালে এই উপসর্গগুলো বেশি দেখা দেওয়ার ফলে হঠাৎ করেই মধ্যকর্ণে প্রদাহের সৃষ্টি হয়। এই রোগের কারণে কানে অনেক ব্যথা হয়, কান বন্ধ হয়ে যায়। সঠিক সময়ে এই রোগের চিকিৎসা না করলে কানের পর্দা ছিদ্র হয়ে যেতে পারে, ফলে কানপাকা রোগ হতে পারে। বিভিন্ন ওষুধের মাধ্যমে রোগের চিকিৎসা করা হয়।
অ্যালার্জিজনিত সমস্যা:
কোনো রকমের অ্যালার্জেন, যেমন : ধুলাবালি, গাড়ির ধোঁয়া নাকে ঢুকে যায়, তাহলে নাকে অ্যালার্জিজনিত প্রদাহ হতে পারে। এতে হাঁচি, নাক দিয়ে পানি পড়া, নাক বন্ধ ইত্যাদি উপসর্গ হতে পারে। বিভিন্ন ওষুধের মাধ্যমে এবং যে কারণে নাকে সর্দি ও অ্যালার্জি হয় তা থেকে দূরে থাকলে এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
সাধারণত দীর্ঘদিন নাকে অ্যালার্জি থাকলে পলিপ হতে পারে। পলিপ দেখতে অনেকটা আঙুর ফলের মতো। নাকের পলিপে নাক বন্ধ হয়ে যায় এবং সঙ্গে সাইনাসের ইনফেকশন হয়ে মাথা ব্যথা হতে পারে। এই সমস্যার চিকিৎসা হলো অপারেশন। প্রচলিত নিয়মে অপারেশনে আবার পলিপ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু আধুনিক এন্ডোস্কপিক সাইনাস সার্জারির মাধ্যমে সফলভাবে অপারেশন করা যায়। বর্তমানে আমাদের দেশে বড় বড় হাসপাতালে এন্ডোস্কপিক সাইনাস সার্জারি নিয়মিত হচ্ছে।
সাইনোসাইটিস:
শীতকালে নাকের দুই পাশের সাইনাসে ইনফেকশন দেখা দেয়, যাকে সাইনোসাইটিস বলা হয়। এতে নাকের দুই পাশে ব্যথা ও মাথা ব্যথা হতে পারে। সাইনাসের এক্স-রে করলে রোগ নির্ণয় করা যায়। তীব্র অবস্থায় ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা করা যায়। দীর্ঘমেয়াদি সাইনাস প্রদাহে ওয়াশ এবং শেষ পর্যায়ে অ্যান্ডোস্কপিক সাইনাস সার্জারি করা লাগতে পারে যাকে বলে ‘সাইনাস সার্জারি’।
টনসিলাইটিস বা গলা ব্যথা:
শীতকালে গলা ব্যথা হয়ে টনসিলে তীব্র প্রদাহ হতে পারে। তীব্র প্রদাহের জন্য গলা ব্যথা, জ্বর ও ঢোক গিলতে অসুবিধা হয়। ব্যাকটেরিয়াজনিত টনসিলের প্রদাহে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ সেবন করতে হয়। আর ভাইরাসজনিত গলা ব্যথা হলে হলে লবণ পানি দিয়ে গড়গড়া করলে এবং প্যারাসিটামলজাতীয় ওষুধ খেলে ভালো হয়ে যায়। অনেক সময় ঠাণ্ডা লেগে কণ্ঠনালিতে ইনফেকশন হতে পারে বা গলার স্বর পরিবর্তন হতে পারে।
সে ক্ষেত্রে অ্যান্টিহিস্টামিন ওষুধ সেবন ও মেন্থলের ভাপ নিলে উপকার মেলে। অতিরিক্ত ঠাণ্ডা লাগলে শিশুদের শ্বাসনালিতে ইনফেকশন হতে পারে, এমনকি নিউমোনিয়াও হতে পারে। তাই শিশু, বয়স্ক ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এমন মানুষদের অতিরিক্ত ঠাণ্ডা লাগলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
ফ্যারেনজাইটিস:
শীতে গলা ব্যথা, জ্বর বা খুসখুসে কাশি হয় অনেকের। এসব ফ্যারেনজাইটিসের লক্ষণ। অনেক সময় দেখা যায়, শীতের সময় অনেকেই ঘুম থেকে ওঠে আর কথা বলতে পারেন না। গলা ব্যথাও থাকে। ভাইরাসজনিত কারণে এই সমস্যা হয়।
ফ্যারেনজাইটিস থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রথম পদক্ষেপ হলো ঠাণ্ডা পরিহার করা। এ ছাড়া আক্রান্ত হলে হিট স্টিম বা মেন্থল দিয়ে গরম ভাপ নেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া নাকের ড্রপস, অ্যান্টিহিস্টামিন ব্যবহার করলে উপকার মেলে। কথা বলা খানিকটা সময়ের জন্য পরিহার করলেও এই রোগের প্রকোপ কমে যায়।
টনসিলাইটিস এবং ফ্যারেনজাইটিস এর মধ্যে সম্পর্ক:
গলায় ব্যথা, জ্বর, খুশখুশে কাশি... টনসিলাইটিসের চেনা লক্ষণ। টনসিলাইটিস ও ফ্যারেনজাইটিস পরস্পর সম্পর্কিত। আবার কোনও কারণে গলা ভেঙে যাওয়া বা গলার স্বর পরিবর্তন ল্যারেনজাইটিসের প্রধান লক্ষণ। ইএনটির এই তিনটি সমস্যা নিয়ে প্রায়শই অনেককে ভুগতে হয়। কারও ক্ষেত্রে সমস্যাগুলি ফিরে ফিরে আসে। তাই এই তিনটি সমস্যার উৎস, লক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা জরুরি।
টনসিলাইটিস:-
মুখ হাঁ করে আয়নায় গলার যে অংশটি দেখা যায়, সেটিই হল ফ্যারিংক্স। টনসিল হল ফ্যারিংক্সের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। টাকরা, তালু, আলজিভ, গলার পিছন দিকের দেওয়াল...এই পুরো অংশটি ফ্যারিংক্স। ওই অংশেই একাধিক টনসিল গ্রন্থি থাকে। ফ্যারিংক্সের সংক্রমণ মানেই ফ্যারেনজাইটিস। ফ্যারেনজাইটিস আলাদা রোগ কি না, তা নিয়ে চিকিৎসকদের ভিন্ন মত রয়েছে।
ইএনটি বিশেষজ্ঞ ডা. দীপঙ্কর দত্তের মতে, ‘‘ফ্যারেনজাইটিস এবং টনসিলাইটিস সাধারণত একসঙ্গে হয়। টনসিলাইটিস হয়েছে মানেই তার ফ্যারেনজাইটিসও হয়েছে। তবে টনসিলের সমস্যা না হয়েও, ফ্যারেনজাইটিস হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সমস্যা ক্রনিক।’’
কারণ: কনকনে ঠান্ডা কিছু খাওয়ার ফলে টনসিলাইটিস বাড়ে। যেমন, ফ্রিজ থেকে বার করা ঠান্ডা জল সরাসরি পান করলে বা আইসক্রিম খাওয়ার পরে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। এসি ঘরে থেকেও টনসিলাইটিস হতে পারে। তবে পরিবেশগত ফ্যাক্টরের চেয়েও ঠান্ডা খাবার খাওয়া এ ক্ষেত্রে বেশি দায়ী।
লক্ষণ: কাশি, জ্বর (ক্ষেত্রবিশেষে তাপমাত্রা অনেকটাই বেড়ে যায়), গলায় প্রচণ্ড ব্যথা।
প্রকারভেদ: ১-গ্র্যানিউলার ফ্যারেনজাইটিস: অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, গলার পিছনের দেওয়ালের গ্র্যানিউলগুলি (গুটি গুটি লাল দানার মতো) বড় হয়ে গিয়েছে। একে বলা হয়, গ্র্যানিউলার ফ্যারেনজাইটিস।২-ফলিকিউলার টনসিলাইটিস: অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, টনসিলের মধ্যে সাদা সাদা ফলিকলগুলিতে পুঁজ জমে গিয়েছে। এটিকে বলা হয় ফলিকিউলার টনসিলাইটিস।
চিকিৎসা: বাড়াবাড়ি হলে ইএনটি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। সাধারণত টনসিলাইটিসের চিকিৎসা, বিশ্রাম নেওয়া। দিনে দু’বার গার্গল করতে দেওয়া হয়। জ্বর এবং গলা ব্যথার তীব্রতা বুঝে ওষুধ দেওয়া হয়।
ইএনটি বিশেষজ্ঞ অর্জুন দাশগুপ্তের মতে, ‘‘পাঁচ-ছয়, আট-বারো বছর বয়সিদের মধ্যে টনসিলাইটিস হওয়া স্বাভাবিক। এক বার হলে চিন্তার কোনও কারণ নেই। তবে বারবার হতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।’’
তাঁর মতে, টনসিলাইটিসের ক্ষেত্রে খুব বাড়াবাড়ি না হলে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ারও দরকার পড়ে না। রোগটি সারতে সময় লাগে, তবে সেরে যায়। ডা. দাশগুপ্তের মতে, ‘‘যাঁদের শিশুবয়সে টনসিল হয়েছে, তাঁদের একাংশের বড় বয়সে ফ্যারেনজাইটিস দেখা যায়।’’ কিন্তু সেটা টনসিলাইটিস না কি অন্য কারণে হচ্ছে, সেটা আগে দেখা প্রয়োজন।
অনেকের ক্রনিক নাক বন্ধ থাকে। তাঁরা মুখ দিয়ে শ্বাস গ্রহণ করেন তখন। নাকের তিনটি কাজ— এক, শ্বাসবায়ু ফিল্টার করা, দুই, সেটিকে গরম করা এবং তিন সেটিকে একটু ভিজে রাখা। মুখ দিয়ে যাঁরা শ্বাস নেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই কাজগুলি হয় না। তাই নাকের কোনও সমস্যার জন্য এ রকম হচ্ছে কি না, সেটা আগে দেখা হয়। তা যদি না হয়, তখন সমস্যাটি ফ্যারেনজাইটিস-টনসিলাইটিসজনিত বুঝতে হবে।
ডা. দত্ত এবং ডা. দাশগুপ্ত একটি বিষয়ে সহমত। ফ্যারেনজাইটিসের আর একটি কারণ হচ্ছে, অ্যাসিড রিফ্লাক্স। পাকস্থলী থেকে অ্যাসিড রিফ্লাক্স হয়ে গলায় উঠে এসে গলার পিছনের দেওয়ালের ক্ষতি করে। এটিকে বলা হয় গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজ়অর্ডার (জিইআরডি)।
টনসিলের মধ্যে কিছু ক্রিপ্টস (গর্ত) থাকে, যার মধ্যে খাদ্যকণা ঢুকে গিয়ে সংক্রমণ ছড়িয়ে টনসিলাইটিস হতে পারে। যাঁদের এই সমস্যা রয়েছে, তাঁদের খাওয়ার পরে গার্গল করার পরামর্শ দেওয়া হয়। সারা বছরই যেন তাঁরা এটা পথ্যের মতো মেনে চলেন।
পেরি-টনসিলাইটিস: টনসিলাইটিস যদি বাড়াবাড়ি পর্যায়ে যায়, তখন আলজিভ, টাকরা-সহ পুরো অঞ্চলটি লাল হয়ে গিয়ে পুঁজ জমে যায়। ক্ষেত্রবিশেষে অস্ত্রোপচার করে সেই পুঁজ বার করতে হয়।
ল্যারেনজাইটিস:-
গলা ব্যথা, কাশির সঙ্গে যদি গলার স্বর পরিবর্তিত হয়, তবে বুঝতে হবে স্বরযন্ত্র বা ভোকাল কর্ডে সংক্রমণ ছড়িয়েছে। এটিই মূলত ল্যারেনজাইটিস।
| বিশ্রাম এবং নিয়মিত ভেপার নিলে অ্যাকিউট ল্যারেনজাইটিস সেরে যায়। |
কারণ: যাঁরা বেশি ধূমপান করেন, খুব দূষিত অঞ্চলে কাজ করেন, ক্লোরিন নিয়ে কাজ করেন, তাঁদের ল্যারেনজাইটিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ঠান্ডা থেকে শুধু নয়, চেঁচামেচি করলে গলা বসে যায়। চিকিৎসক, সাংবাদিক, সেলসের কাজ যাঁরা করেন অর্থাৎ বেশি কথা বলতে হয়, তাঁদের এটি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। সংক্রমণের জন্য রোগ না-ও হতে পারে। পেশির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলেও গলার স্বর বসে যেতে পারে। তবে সংক্রমণজনিত কারণে হলে পরামর্শ নিতে হবে।
চিকিৎসা: টনসিলাইটিসের সম্পূর্ণ বিপরীত চিকিৎসা এ ক্ষেত্রে করা হয়। অর্থাৎ গলা বসে গেলে গার্গল একেবারেই করা যাবে না। স্টিম বা ভেপার নিতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে এই ভেপার অব্যর্থ ওষুধের মতো কাজ করে। তবে বাড়াবাড়ি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক এবং স্টেরয়েড পর্যন্ত দেওয়া হয়।
এ ধরনের সমস্যা থাকলে সতর্কতা মেনে চলা জরুরি। গলাকে বিশ্রাম দেওয়া, চেঁচিয়ে কথা না বলা সমস্যার হাত থেকে বাঁচাতে পারে।
ঠান্ডা লেগে বা খুব চেঁচামেচি করে গলার স্বর পরিবর্তন হয়ে যাওয়া তো খুবই সাধারণ উপসর্গ। কিন্তু আচমকা এবং দীর্ঘদিন ধরে গলার স্বরে পরিবর্তন হলেও, অনেকে সজাগ হন না। ধরতেও পারেন না। কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন বড় রোগের লক্ষণ হতে পারে। যদি সাধারণ ঠান্ডা লেগে গলা বসে যায় বা কণ্ঠস্বর পাল্টে যায়, তা দিনকয়েকের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তা না হলে ইএনটি বিশেষজ্ঞের সঙ্গে অবশ্যই যোগাযোগ করতে হবে।
প্রশ্ন : কিছু কিছু রোগের বেলায় আমরা দেখি, শীত আসার সঙ্গে সঙ্গে তার প্রকোপ বা মাত্রা বেড়ে যায়। তার মধ্যে নাক-কান-গলার সম্পর্কিত অনেক রোগের সংক্রমণ বাড়ে। আপনি বলবেন কি নাক কান গলার কোন রোগগুলো শীতের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এ সময় বেশি দেখা দেয়?
উত্তর : শীতের সময় যেহেতু পরিবেশটা একটু ভিন্ন। ঠান্ডা পরিবেশ, ধুলোবালু বেড়ে যায়, হঠাৎ করে শরীর তখন খাপ খাওয়াতে গিয়ে একটু সমস্যা হয়। তখন দেখা যায়, আসলে প্রথমত মানুষের যেই জিনিসগুলো এই সময়ে আক্রান্ত হয়ে থাকে, এর মধ্যে নাক গলা। এর মধ্যে কান হয়তো একটু পরে আক্রান্ত হয়। যেমন হাঁচি বেড়ে যায়। যাকে আমরা বলি ‘অ্যালার্জিক রাইনাইটিস’। ঠান্ডার জন্য বা ধুলোবালুর জন্য এই সমস্যা হয়। এটি একটি সমস্যা হয়। তারপর নাক বন্ধ হয়ে যায়। আরেকটি হচ্ছে গলা ব্যথা বেড়ে যায়। এটাও তাই। একই পরিবেশের জন্য গলাটা একটু খুসখুস করতে থাকে। কারো কারো চুলকায়। কারো কারো ব্যথা করে। অনেকের অনেক বেশি ব্যথা করতে পারে গলা। আর যদি কারো আগে থেকেই টনসিলের সমস্যা থাকে। সেগুলো এই সময়ে একটু বেড়ে যেতে পারে। আর নাক গলা যখন আক্রান্ত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই পাশে যে কান থাকে, তখন এর যে পথটি সেটিও একটু রুদ্ধ হয়ে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়। তখন দেখা যায় কানেও ব্যথা করছে। সাধারণত যেটাকে বলি কানে তালা দেওয়া, সে বিষয়গুলো দেখা যায়। শিশুরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় এই সব সমস্যায়, বড়দের চেয়ে।
প্রশ্ন : শীতের সঙ্গে রোগগুলোর সম্পর্ক কোথায়? শীত এলে রোগগুলো বাড়ে কেন?
উত্তর : শীতের পরিবেশটা তো একটা শুষ্ক পরিবেশ। এটি একটি বিষয়। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা অনেক কম থাকে। আর শীতের যে ঠান্ডা পরিবেশ সেটিই অনেক সময় অ্যালার্জির উদ্রেগ করতে পারে। একই সঙ্গে ধুলোবালু তাতে আরো সহযোগিতা করে। এটি আরেকটি বিষয়। আর বাচ্চারা বেশি আক্রান্ত হয়, কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকে। আর যাদের আগে থেকেই টনসিলের সমস্যা রয়েছে বা অ্যালার্জির রাইনাইটিস বা নাকের হাঁচি-সর্দির সমস্যা রয়েছে, তারা একটু আগে আগেই আক্রান্ত হয়। এবং বেশি পরিমাণে আক্রান্ত হয়। বিষয়টি মূলত পরিবেশগত। কিছু কিছু ভাইরাস বিচরণ বা বংশবৃদ্ধির জন্য এই সময়টি একটি উপযুক্ত পরিবেশ। সে কারণেও সমস্যা হতে পারে।
প্রশ্ন : শীতের সঙ্গে গলা ব্যথার সম্পর্ক কী?
উত্তর : আসলে ঠান্ডাতে যেটা হয়, ঠান্ডার এই পরিবেশটি একটি বিষয়। কারণ আপনি জানেন যে, মুখের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে কিছু ব্যাকটেরিয়া থাকে। কিছু খারাপ ব্যাকটেরিয়াও এই সময় ঢুকতে পারে। কারণ এই ঠান্ডা পরিবেশে যেটা হয়,ওই ব্যাকটেরিয়ার বংশ বৃদ্ধি করার জন্য এবং তার বেঁচে থাকার জন্য খুব উপযোগী একটি পরিবেশ। সেই পরিবেশটি যখন সে পায় তখন দ্রুত বংশ বৃদ্ধি করে। এবং টনসিল হচ্ছে সে রকম একটি জায়গা যেখানে ব্যাকটেরিয়াগুলো বাসা বাঁধতে পারে। স্বাভাবিকভাবে তার বাসা বাঁধা এবং বংশ বিস্তারের জন্য একটি উপযুক্ত পরিবেশ পেয়ে সে গলাকে আক্রান্ত করে, তখন তার প্রভাব পড়ে টনসিলের ওপর। টনসিলটা প্রদাহযুক্ত হয়ে যায় এবং তখন দেখা যায় ব্যথা হচ্ছে। মূলত এ কারণেই ঠান্ডা এড়িয়ে যেতে বলা হয়।
এ জন্য এই সব সমস্যায় আমরা বলি উষ্ণ গরম পানি দিয়ে গারগেল করবেন। একটু লবণ দিয়ে। লবণ একটি অ্যালকেলাই সলিউশন। এর মধ্যে ব্যাকটেরিয়া যেমন বাঁচতে পারে না, একই সময় যখন উষ্ণ গরম পানি দিয়ে গড়গড়া করা হয়, তখনো ওই পানির জন্য ব্যাকটেরিয়া টিকতে পারে না। জীবাণুকে ধ্বংস করে, সংখ্যা কমায়। একই সঙ্গে মিউকাস সিক্রিয়েশনকে তরল করে বের করছে। এর সঙ্গে ও ব্যাকটেরিয়াগুলো বের হয়ে যাচ্ছে।
প্রশ্ন : শীত এলে বড়দের এবং শিশুদের একটি সাধারণ সমস্যা হয়। তবে সেটি অসাধারণ বিরক্তিকর হয়। সেটি হচ্ছে সর্দি। এই যে নাকে-মুখে সর্দি আসা সঙ্গে কিছুটা জ্বরও। এই বিষয়টি বাড়ে কেন?
উত্তর : এটির একটি দল আছে যাকে আমরা বলি ফ্লু। ফ্লু-টা আপনি জানেন ভাইরাসজনিত। আমাদের দেশে হয়তো এটি এতটা বেশি নয়। তবে উন্নত বিশ্বের লোকজন এই ফ্লুর জন্য এতটা অসুস্থ হয় যে এটি ফুসফুস পর্যন্ত আক্রান্ত করে থাকে। এবং কিছু কিছু ভাইরাস আছে যার কারণে মৃত্যুও হয়। মানুষ কাজে যেতে পারে না। স্কুলে যেতে পারে না। এ কারণে উন্নত বিশ্বে আমরা দেখেছি সেখানে ফ্লু শটের একটি বিষয় আছে। প্রত্যেক বছরেই একটি নির্দিষ্ট সময়, সাধারণত আগস্ট, সেপ্টেম্বরের দিকে এই ফ্লু শট নেওয়া হয়। এটা এক বছর মেয়াদে কার্যকর থাকে। এটি নিলে খারাপ ধরনের যে ভাইরাসগুলো আছে, সেগুলো যেন আক্রান্ত না করতে পারে। সে জন্য এই ভ্যাকসিনটা কাজ করে থাকে। তবে আমাদের দেশে ফ্লু শটের তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। আমরা এক দিক থেকে ভাগ্যবান আমাদের যে পরিবেশ এর কারণে। কারণ এই তাপমাত্রায় ভাইরাসগুলো বংশ বৃদ্ধি করতে পারে না। আমাদের অতটা ক্ষতি করতে পারে না। তারপরও আমরা যখন আক্রান্ত হয়ে যাই এগুলো দুর্বল ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস দিয়ে হয়। একে আমরা বলি ফ্লু। এ ক্ষেত্রে উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা করতে হয়। নাক যদি বন্ধ থাকে একটি ড্রপ দিয়ে পরিষ্কার করা বা অ্যান্টি-অ্যালার্জিক ওষুধ খেয়ে একটু দমিয়ে রাখা, যাতে নাকের সর্দি একটু কমে। এসব ক্ষেত্রে বেশির ভাগ সময় দেখা যায় অ্যান্টিবায়োটিক লাগে না। এ ক্ষেত্রে অ্যান্টি হিস্টামিন-জাতীয় ওষুধ দেওয়া হয়। এ সময় গারগেল করা, গরম খাবার খাওয়া, একটু স্যুপ-এগুলো খেলে ভালো হয়। বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়, স্যুপ অনেকটা কার্যকরী এই ক্ষেত্রে। কারণ এতে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়।
এ ছাড়া অন্য কারণে সমস্যা হতে পারে। তবে সেগুলো খুবই সামান্য। তবে যেহেতু রোগটি ভাইরাসজনিত, তাই এত ওষুধপত্র দেওয়ার পরও খুব বেশি উন্নতি হয় না। কারণ এটি ভাইরাসজনিত। একটি সময় পরে এটি ঠিক হয়ে যায়। তবে একটু কষ্ট হয়।
প্রশ্ন : ভাইরাসে আক্রান্ত যাতে না হই, এ জন্য জীবনযাপনের ধরনের পরিবর্তন কতটুকু জরুরি? এ বিষয়ে আপনার পরামর্শ কী?
উত্তর : লাইফস্টাইল (জীবনযাপনের ধরন) একটি বড় বিষয়। কারণ আপনি দেখবেন কেউ কেউ হয়তো বিষয়টি লক্ষ রাখে না। যেমন : ধরুন কারো বাসায় যদি কার্পেট থাকে বা বাসায় যদি সে কোনো পশু পালে। কারো যদি এই সমস্যা থাকে, তার এগুলো করা ঠিক নয়। অথবা ধুলোবালি যদি বেশি থাকে বাসায়, তাহলে সমস্যা হতে পারে। পারলে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে পরিষ্কার করুন। কার্পেট তুলে ফেলে, যদি জাজিম থাকে, সেটাকে বছরে একবার করে বা দুবার করে ভালোভাবে রোদে দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। সোফাগুলোকে পরিষ্কার করা। কারণ আপনি জানেন ধুলোর মধ্যে ছোট ছোট অনেক জীবাণু থাকে। যেগুলো অ্যালার্জির উদ্রেক করে। ঘরের মধ্যেই এর উৎস থেকে যায়। অ্যালার্জেনের এই উৎসগুলোকে বন্ধ করতে হবে। জীবন-যাপনের পরিবেশের মধ্যে এটা থাকে যে আমি কী পরিবেশে থাকছি। আর দ্বিতীয়ত, আমি যখন বাইরে বের হচ্ছি, আমি যখন জানি আমার ধুলোতে সমস্যা হয়, গাড়ির ধোঁয়ায় সমস্যা হয়। যদি সম্ভব হয়, আমি মাস্ক ব্যবহার করব। যদি গাড়িতে চলি, তাহলে এসি ব্যবহার করব যেন ধুলোবালু ভেতরে না ঢোকে। বা সেই পরিবেশে আমি যাব না, যেখানে সমস্যা হয়। অনেকে রয়েছে খুব গরম পরিবেশে গেলে বা কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে গেলে সমস্যা হয়। এমন হলে তিনি সেটা এড়িয়ে যাবেন। আসলে জীবনযাপনের পরিবর্তন খুব জরুরি। এখন আমি জানি ঠান্ডা খেলে গলা ব্যথা হবে, আমি আইসক্রিম খেলাম, তাহলে তো হলো না। বা ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করলাম তাহলে তো ঠান্ডা লাগবেই। অথবা হঠাৎ করে রাতে আমি একটু বারান্দায় দাঁড়ালাম গরম কাপড় ছাড়াই, তখন সমস্যা হয়ে যেতে পারে। এ রকম সামান্য ঘটনা থেকেই ঠান্ডা-সর্দি লেগে যাচ্ছে। দু-তিনদিন অসুস্থ হয়ে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে।
প্রশ্ন : একজন শিশুর বেলায় সর্দি কেমন হলে তার চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত?
উত্তর : সর্দি যখন লাগে, সাধারণত যখন হাঁচি দেয়, পানি পড়ে নাক দিয়ে তখন শিশুকে লক্ষ রাখব। পারলে একটু অ্যান্টি হিসটামিন-জাতীয় খুব সাধারণ যেসব ওষুধ রয়েছে সেগুলো খাইয়ে দেব। অথবা নাকে সাধারণ স্যালাইন পাওয়া যায় সেগুলো দিলে নাক পরিষ্কার থাকবে। এটি করার পর দুই থেকে তিনদিন অপেক্ষা করতে হবে। তারপর যদি দেখা যায় সর্দিটা একটু হলুদাভ রঙের হয়ে যাচ্ছে, পেকে যাচ্ছে বা আরো বেশি আঠালো হচ্ছে এবং সেটি যাচ্ছে না, তখন একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কথা চিন্তা করতে হবে। একই সঙ্গে শুধু সর্দি, সামান্য সর্দি তবে অনেক বেশি কাশি, বাচ্চা রাতে ঘুমাতে পারে না সে ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সবচেয়ে বড় কথা ঠান্ডা-সর্দির সঙ্গে যদি জ্বর থাকে এবং অবশ্যই লক্ষ রাখা উচিত জ্বরের মাত্রা কতটুকু। যদি ১০০-এর মতো থাকে, তাহলে প্যারাসিটামল দিয়ে অপেক্ষা করেন, ওষুধ দেন। তবে জ্বর যদি অনেক বেশি হয়, বুকের ভেতরে যদি একটু শব্দ করে, একটু শ্বাসকষ্ট হয়, বুকের ওঠানামা যদি স্বাভাবিক মনে না হয়, বুকের ঘড়ঘড় শব্দ হচ্ছে, রাতে ঘুমাতে পারছে না; তখন অবশ্যই একজন শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে ফুসফুসের চিকিৎসা নেওয়া উচিত। আর সেই ক্ষেত্রে যদি দরকারি চিকিৎসা দেয় সেই ক্ষেত্রে বাচ্চাটা ঝুঁকিমুক্ত থাকবে।
আরেকটি হচ্ছে ঠান্ডা সর্দি লাগছে বাচ্চা বলছে অনেক কান ব্যথা করছে, এ ক্ষেত্রেও দ্রুত একজন নাক কান গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ পরামর্শ না নিলে ঠান্ডা সর্দি মধ্য কর্ণে প্রদাহ তৈরি করে ফেলে এবং অল্প সময়ের মধ্যে এমনকি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেখা যায়, কানের পর্দা ফুটো হয়ে যেতে পারে। তবে একই জিনিস যদি আপনি ঠিক সময়ে চিকিৎসা নেন তাহলে কানের এই রোগটি পুরোপুরি সেরে যাবে।
শীতকালের কিছু সতর্কবাণী:
► শীতকালে যাতে ঠাণ্ডা না লাগে সে জন্য গরম কাপড় পরতে হবে। বিশেষ করে শিশু ও প্রবীণদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যত্ন নিতে হবে।
► ঠাণ্ডা লাগলে প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা নিন। এতে প্রথমেই রোগ ভালো হয়ে যায় এবং নানা জটিলতা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
► শীতকালে অ্যাজমা বা হাঁপানি রোগীদের উচিত নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ ও ইনহেলার ব্যবহার করা। কেননা সর্দি, অ্যালার্জি ও হাঁপানির মধ্যে যোগসূত্র আছে।
► অ্যালার্জি থেকে রক্ষা পেতে নিয়মিত গোসল করা ভালো। তবে ঠাণ্ডা লাগা প্রতিরোধে সহনীয় গরম পানিতে গোসল করা উচিত।
► শীতের সময় বাতাসে ধুলিকণার পরিমাণ বেশি থাকে বলে বাইরে কম বেরোনো ভালো। বাইরে বেরোলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করুন।
► এই সময় রোদের তাপ কম থাকে বলে সূর্যতাপ তেমন মেলে না। তবুও চেষ্টা করা উচিত নিয়মিত রোদ পোহানো। এতে শরীর ভিটামিন ‘ডি’ গ্রহণ করে, যা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে কাজ করে।
তথ্যসূত্র:
- অধ্যাপক ডা. এম এ মতিন, বিভাগীয় প্রধান, নাক, কান ও গলা বিভাগ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, কালের কণ্ঠ।
- ইএনটি বিশেষজ্ঞ অর্জুন দাশগুপ্ত, এবং ইএনটি বিশেষজ্ঞ ডা. দীপঙ্কর দত্ত, আনন্দবাজার।
- হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের নাক-কান-গলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সজল আশফাক, এনটিভি।
- নিউজ ১৮ বাংলা।
- Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই