উচ্চ রক্তচাপ রোগীর খাদ্যাভ্যাস কি?
উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন শব্দটির সঙ্গে আমরা সবাই পরিচিত। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই দু–একজন হয়তো উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যায় ভুগছেন। আগে ধারণা করা হতো শুধু বয়স্ক ব্যক্তিরা উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হন। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে প্রাপ্তবয়স্ক এবং কম বয়সীরাও উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন।
উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন কী:
আমাদের দেহের স্বাভাবিক রক্তচাপ সিস্টোলিক ১২০ এবং ডায়াস্টোলিক ৮০। কোনো ব্যক্তির রক্তচাপ যখন নিয়মিত এই স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি (সিস্টোলিক ১৪০, ডায়াস্টোলিক ৯০) থাকে, তখন তাকে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন বলে।
উচ্চ রক্তচাপের কারণ:
উচ্চ রক্তচাপের কোনো কারণ সেভাবে জানা যায়নি। তবে প্রাত্যহিক জীবনযাপনে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলাকে উচ্চ রক্তচাপের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। যেমন:
অতিরিক্ত ওজন:
অতিরিক্ত ওজন উচ্চ রক্তচাপের একটি বিশেষ কারণ। ওজন বেশি থাকলে দেহে চর্বির পরিমাণ বেড়ে যায়। রক্তনালিতে চর্বি জমা হয়ে রক্তনালিকে সংকুচিত করে। এ কারণে উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস:
সুস্থ থাকার জন্য একটি সঠিক খাদ্যাভ্যাস খুবই জরুরি। হার্টকে সুস্থ রাখতে হলে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে পরিকল্পিত ডায়েটের কোনো বিকল্প নেই। অতিরিক্ত তেল, চর্বি, ভাজাপোড়া ও অস্বাস্থ্যকর খাবার উচ্চ রক্তচাপের কারণ হতে পারে।
মানসিক চাপ:
মানসিক চাপ উচ্চ রক্তচাপের ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলে। মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা, বিষণ্নতা ইত্যাদি স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপ্ত করে এবং অ্যাড্রিনালিন ও কর্টিসোল হরমোনের নিঃসরণকে অনেক বাড়িয়ে দেয়। এতে রক্তনালি সংকুচিত হয় এবং রক্তচাপ বেড়ে যায়।
পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের অভাব:
পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের অভাবে মানসিক চাপ ও অবসাদ বৃদ্ধি পায়। এ কারণে উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে।
ধূমপান ও মদ্যপান:
অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, ধূমপান ও মদ্যপান উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
কিছু শারীরিক সমস্যা, যেমন: কিডনি রোগ, থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা, ডায়াবেটিস ইত্যাদি কারণে উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ:
উচ্চ রক্তচাপের সাধারণত কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। এমন অনেকেই আছেন, যাঁরা নিজেরাই জানেন না যে তাঁরা উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। তাই উত্তর উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনকে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু কিছু অস্বস্তিকর অবস্থায় দেখা যেতে পারে। যেমন: মাথা ঘোরানো, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব ইত্যাদি।
উচ্চ রক্তচাপের ক্ষতিকর প্রভাব:
দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত ও চিকিৎসাবিহীন উচ্চ রক্তচাপের কারণে স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যায়। আরও কিছু মারাত্মক জটিলতা হতে পারে। যেমন:
* উচ্চ রক্তচাপের কারণে হৃৎপিণ্ডের মাংসপেশি দুর্বল হয়ে যায়। যার ফলে হৃৎপিণ্ডের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
* উচ্চ রক্তচাপের কারণে কিডনি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
* উচ্চ রক্তচাপের কারণে মস্তিষ্কে রক্তের চাপ বেড়ে যায় এবং এর কারণে স্ট্রোক হতে পারে।
* চোখের রেটিনাতে রক্তক্ষরণ হয়ে অন্ধত্ব হতে পারে।
হঠাৎ রক্তচাপ বেড়ে গেলে কী করবেন:
হঠাৎ রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া নিয়ে আমাদের কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। যেমন: অনেকেই মনে করেন লেবু–পানি অথবা তেঁতুল–পানি খাওয়ালে রক্তচাপ কমে যাবে। এ ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। হঠাৎ যদি কারও রক্তচাপ খুব বেড়ে যায়, সে ক্ষেত্রে মাথায় পানি দেওয়া হলে অথবা বরফ দেওয়া হলে রোগী কিছুটা স্বস্তি বোধ করতে পারেন। এ অবস্থায় রোগী যদি দাঁড়িয়ে থাকেন, তাহলে অবশ্যই বসে অথবা শুয়ে পড়তে হবে এবং তাঁর বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে হবে। জরুরি ব্যবস্থা হিসেবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে করণীয়:
* উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ডাক্তারের পরামর্শের পাশাপাশি একটি সুপরিকল্পিত খাদ্যতালিকা অনুসরণ করা খুবই জরুরি।
* ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
* অতিরিক্ত লবণ ও চিনিজাতীয় খাবার কম খেতে হবে।
* সোডিয়ামবহুল খাবার ও টিনজাত খাবার কম খেতে হবে।
*তেল ও চর্বিজাতীয় খাবার যথাসম্ভব কম খেতে হবে।
* প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট হাঁটতে হবে।
* পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম নিতে হবে।
* মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে হবে।
* ধূমপান ও মদ্যপান থেকে বিরত থাকতে হবে।
* গভীরভাবে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, যোগাসন অথবা মেডিটেশনও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে অনেক সময় কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
* রক্তচাপ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে উপকারী কিছু খাবার:
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের উৎকৃষ্ট পদ্ধতি হলো স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস। খাবারে থাকতে হবে পটাসিয়াম, ফাইবার, ম্যাগনেসিয়াম ও কম সোডিয়াম। তাহলে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কিছু খাবার আছে, যেগুলো উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। সেগুলো হলো:
* কলা: এতে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম থাকে, যা রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। দিনে কমপক্ষে একটি কলা খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
* আপেল: এতে থাকা পলিফেনোল রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। যাঁরা উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন, তাঁরা খাদ্যতালিকায় আপেল যুক্ত করবেন। আপেলে রয়েছে কুইয়ারসেটিন নামক উপাদান, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এ ছাড়া আপেলে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রক্তচাপজনিত নানা জটিলতার হাত থেকেও সুরক্ষা দেয়।
* আম: আমে রয়েছে প্রচুর ফাইবার ও বিটা-ক্যারোটিন। দুটো উপাদানই রক্তচাপ কমাতে কার্যকর। গবেষণায় দেখা গেছে, বিটা-ক্যারোটিনযুক্ত খাবার ডায়েটে রাখলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
* তরমুজ: তরমুজে রয়েছে সিট্রুলিন নামক অ্যামিনো অ্যাসিড, যা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। অ্যামিনো অ্যাসিড রক্তনালীকে শিথিল করতে সাহায্য করে এবং নমনীয়তা বাড়ায়। ফলে উচ্চ রক্তচাপ কমে।
* দেশীয় মৌসুমি ফল এবং ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল খেতে হবে। কারণ লেবু, কমলা, পেয়ারা, আমড়া ও আমলকীতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি ও অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট থাকে, যা রক্তনালির সুস্থতা বজায় রাখে এবং রক্তচাপ কমাতে সহায়তা করে।
রঙিন শাক ও সবজি:
* রঙিন শাকসবজিতে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও ফোলেট থাকে, যা রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে।
* পালং শাকে প্রচুর পটাশিয়াম থাকে, যা রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে।
* গাজর মিষ্টি ও রঙিন সবজি। এটি স্বাস্থ্যকর। এতে থাকা ফাইবার বা খাদ্য আঁশ ও পটাসিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এ ছাড়া গাজরে রয়েছে বিটা-ক্যারোটিন ও ভিটামিন সি, যা রক্তচাপ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। গাজরের ফেনোলিক যৌগ থাকে। এটি রক্তনালিকে শিথিল করে এবং রক্তচাপ কমায়।
* টমেটোতে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি উপাদান থাকে। এ ছাড়া পটাশিয়াম ও ক্যারোটিনয়েডসের আধিক্য থাকায় এটি রক্তচাপ কমায়।
* ব্রকলিতে থাকা ফ্ল্যাভোনয়েড ও অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট রক্তনালির কার্যকারিতা বাড়ায়। ফলে রক্তচাপ কমে।
* সামুদ্রিক ও তৈলাক্ত মাছে (ইলিশ) ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। এটি হৃৎপিণ্ডের সুস্থতা বজায় রাখে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
* রসুনের সালফার–জাতীয় যৌগ রক্তনালির স্থিতিস্থাপকতা বাড়ায়। এ ছাড়া রসুনে থাকা অ্যালিসিন হাইপারটেনশন রোগের ক্ষেত্রে দুর্দান্ত কাজ করে। প্রতিদিন খাবারের সঙ্গে এক থেকে দুই কোয়া রসুন খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
* ওটস উচ্চ রক্তচাপ আছে—এমন রোগীদের জন্য উপকারী একটি খাবার। ওটস থেকে কম ক্যালরি এবং উচ্চমাত্রার ফাইবার পাওয়া যায়, যা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
* বাদামে সোডিয়ামের পরিমাণ কম থাকে এবং পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। এ ছাড়া বাদামে আরও অনেক উপকারী পুষ্টি উপাদান থাকে, যা রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে।
* অলিভ অয়েল, সানফ্লাওয়ার অয়েল ইত্যাদি হার্টের জন্য উপকারী।
* বিটমূল বিটে রয়েছে উচ্চমাত্রায় নাইট্রিক অ্যাসিড, যা রক্তনালী খুলতে ও রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। আপনি বিট সেদ্ধ করে, ভাজি করে, এমনকি কাঁচাও খেতে পারেন। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন এক গ্লাস বিটের জুস পান করলে উচ্চ রক্তচাপ বেশ ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকে।
* ডার্ক চকলেট নিজেকে মিষ্টি থেকে বঞ্চিত করতে চান না? ডার্ক চকলেট খেতে পারেন। আর এটি রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। ডার্ক চকলেটে রয়েছে উচ্চমাত্রায় ফ্ল্যাভনয়েড, যা রক্তচাপ কমাতে সহায়ক। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব ডার্ক চকলেটে ন্যূনতম ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ কোকোয়া থাকে, সেসব ডার্ক চকলেট খেলে রক্তচাপ কমে। উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য এটি কার্যকর।
এ ছাড়া উচ্চ রক্তচাপ কমাতে পেঁয়াজ, স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি, বেশ কার্যকর। তবে মনে রাখতে হবে, উচ্চ রক্তচাপ কমাতে ডাক্তারের পরামর্শে ওষুধ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, দুটোই জরুরি। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি, না হলে এটি যেকোনো সময় বিপদ ডেকে আনতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপে ডিম ও দুধ খাওয়া:
উচ্চ রক্তচাপে প্রতিদিন একটি ডিম, বিশেষ করে সাদা ডিম উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য কার্যকর। প্রোটিন সমৃদ্ধ ডিম কোলেস্টেরল ও রক্তচাপের মাত্রা ঠিক রাখতে সাহায্য করে। সকালের নাশতায় ডিম খেলে প্রাকৃতিকভাবে রক্তচাপ কমায়।
এবং সরবিহীন এক কাপ দুধ খাওয়া যাবে। এটি শরীরকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখতে সহায়তা করবে।
তথ্যসূত্র:
- প্রথম আলো।
- বোল্ডস্কাই> এনটিভি।
- Edited: Natural_Healing.


কোন মন্তব্য নেই