করোনাভাইরাস চিকিৎসা: বাড়িতে বসে কোভিড-১৯ চিকিৎসায় যে ছয়টি বিষয় মনে রাখবেন
যে কোন ব্যক্তির ভেতর যখন করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রাথমিক কিছু লক্ষণ দেখা দেয় তখন তিনি আতঙ্কিত হয়ে উঠেন।
কী করতে হবে? কোথায় যোগাযোগ করা প্রয়োজন? ডাক্তার পাবো কোথায়? হাসপাতালে যেতে হবে কি না? - এসব প্রশ্ন তখন সামনে আসে। সর্বপ্রথমে মনে রাখতে হবে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কোন সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই।
সারা পৃথিবীতে যত মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে তাদের ৮০ শতাংশেরও বেশি বাসায় থেকে নানাভাবে উপশমের চেষ্টা করছেন।
বাসায় অবস্থান করে চিকিৎসা নেবার নেবার ক্ষেত্রে যেসব বিষয় মনে রাখতে হবে সেগুলো নিচে তুলে ধরা হলো।
১. নিজেকে বিচ্ছিন্ন করুন:
যদি সন্দেহ হয় যে আপনার মধ্যে কোভিড-১৯-এর এক বা একাধিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে নিজেকে পরিবারের অন্য সদস্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন বা আইসোলেট করুন। এতে করে অন্যদের মাঝে সংক্রমণের আশংকা কমে আসবে।
আইসোলেশন এবং কোয়ারেন্টিন কী, কীভাবে ও কেন করা হয়:
কোয়ারেন্টিইন কি?
কোয়ারেন্টিইন এর অর্থ হল কেউ যদি কোন ছোঁয়াচে বা সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তখন তাকে সবার থেকে সাময়িক কালের জন্য আলাদা করা হয় অথবা তার চলাচল সীমাবদ্ধ করা হয় যেন ওই ব্যক্তির মধ্যে যেন কোন রোগ শনাক্ত হয় সেটা যেন অন্য কারও মধ্যে ছড়িয়ে না পড়ে। সাধারণত যারা সুস্থ মানুষ যাদের কোন রোগ নেই তারা যদি এমন কোন পরিবেশে থাকেন যাদের আশেপাশে কোনো সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়েছে তখন তাদেরকে কোয়ারেন্টিন করে পর্যবেক্ষণ করা হয় যেন তিনি সুস্থ না অসুস্থ সেটা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তার কাছে কেউ না আসতে পারে।
কোয়ারেন্টাইন এবং আইসোলেশন দুটি আলাদা বিষয়-
করেন্টিন করা হয় তাদেরকে যারা রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন তাদের এইরোগ থাকতেও পারে আবার নাও থাকতে পারে। আর আইসোলেশন হল যাদের মধ্যে ওই সংক্রামক ব্যাধি শনাক্ত করা হয়েছে আর সেই সংক্রমণ ঠেকাতে তাকে সবার থেকে আলাদা করতে হয় যতক্ষণ না তিনি পুরোপুরি সেরে উঠছেন।
কোয়ারেন্টাইন কেন প্রয়োজন?
যখন কোনো সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ে তখন এটি ঠেকানোর উপায় হল যারা অসুস্থ তাদেরকে আইসোলেশনে রাখা আর যারা ঝুঁকিতে আছেন তাদেরকে কোয়ারেন্টাইন করে রাখা কেননা তাদের আলাদা না করলে এ রোগের বিস্তার অনিয়ন্ত্রিত হারে ছড়িয়ে পড়বে এবং এটি মহামারী আকার নিতে পারে করেন্টিন বা আইসোলেটেড করলে গবেষকরা ওই রোগের প্রতিষেধক বা চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কারের সময় পান সেইসাথে চিকিৎসকরা তাদের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ এবং নিবিরভাবে পরিচর্যা সহ তাদের সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে পারেন।
কোয়ারেন্টিনে কতদিন থাকতে হয়-
কোয়ারেন্টিনের এ সময়কাল নির্ভর করে ওই রোগটি বা ভাইরাসটির বৈশিষ্ট্যের উপর। সম্প্রতি যে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে এটি শরীরের সংক্রমণ থেকে শুরু করে এটির লক্ষণ দেখা দেয়া পর্যন্ত মোট 14 দিন সময় নেয়। করোণা ভাইরাসের কারণে যাদেরকে কোয়ারেন্টিন করা হচ্ছে তাদেরকে দুই সপ্তাহ পর্যবেক্ষণে রাখতে বলা হচ্ছে।
কোয়ারেন্টিনে কি হয়?
কাউকে কোয়ারেন্টিনে আনার পর পরই তার শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করার পর সেগুলো পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়, রোগের উপস্থিতি আছে কিনা এটা বোঝার জন্য। করোনাভাইরাস এর ক্ষেত্রে ব্যক্তির নাক, গলা এবং শ্বাসতন্ত্র থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয় এবং 24 ঘন্টার মধ্যে ফলাফল পাওয়া। যায় স্বাস্থ্য পরীক্ষায় রোগ সনাক্ত হলে বা রোগের লক্ষণ দেখা দিলে রোগীকে হাসপাতালের বিশেষ ইউনিটে আইসোলেটেড করা হয়। আর রোগ সনাক্ত না হলে ওই ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চিকিৎসক-নার্স বা স্ক্রীনিং বিশেষজ্ঞরা পর্যবেক্ষণে রাখেন। লালালা কোয়ারেন্টিনে থাকাকালীন সময় চিকিৎসক-নার্স ব্যতীত অন্য কোন ব্যক্তি তার সঙ্গে সরাসরি দেখা করার অনুমতি নেই, তবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে। এক এক দেশে একেক রকম নিয়মে আইসোলেটেড বা কোয়ারেন্টিইন করা হয়।
কোয়ারেন্টিন করার নিয়ম:
কোয়ারেন্টিন করার আগে তাকে স্থান সময় এবং কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত বলতে হবে জোর করে নয় বরং তাকে বুঝিয়ে অনুমতি নিয়ে আলাদা করতে হবে, আশ্বস্ত করতে হবে যাতে তিনি ঘাবড়ে না যান, কারণ কোয়ারেন্টিন মানে কাউকে বন্দি করা নয়। কোয়ারেন্টিন করতে হবে জনসমাগম থেকে দূরে নিরিবিলি পরিবেশে যাতে বেষ্টনী আছে, প্রয়োজনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। ওই ব্যক্তিকে আনা-নেওয়া করতে হবে সম্পূর্ণ সুরক্ষিতভাবে। যেই বাহনে তিনি উঠবেন সেখানে সুস্থ মানুষ নেয়া যাবে না এবং ড্রাইভার বা স্ক্রু এবং চিকিৎসক হিসেবে যারা থাকবে তারা সম্পন্ন সুরক্ষিতভাবে থাকবে। কোয়ারেন্টিন করে রাখা প্রত্যেকের শোয়ার ব্যবস্থা থাকবে আলাদা। ভিতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং সেখানে গরম এবং ঠাণ্ডা পানির সু ব্যবস্থা থাকতে হবে, প্রয়োজনমতো খাওয়া এবং বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের পাশাপাশি পরিছন্নতা, সুষ্ঠু ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগের সুবিধা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে। এসব সেবা দিতে কোন বিভেদ করা যাবে না, সবাইকে সমান দৃষ্টিতে দেখতে হবে।
২. জ্বর আসলে কী করবেন:
করোনাভাইরাস সংক্রমণ থামানোর যেহেতু কোন ঔষধ নেই সেজন্য সাধারণ সর্দি-কাশির ক্ষেত্রে যে ধরণের পদক্ষেপ নেয়া হয় সেগুলো অনুসরণ করার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
ঢাকার বক্ষব্যধি হাসপাতালের চিকিৎসক কাজী সাইফুদ্দিন বেন্নুর বলেন, প্যারাসিটামল খাওয়া এবং গার্গল করা করা যেতে পারে।
জ্বর এলেই আতঙ্কিত না হাবার পরামর্শ দিচ্ছেন মি. বেন্নুর। পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
৩. কফ থাকলে যা করবেন:
যদি আপনার কফ জমে থাকে বসার সময় পিঠে ভর দিয়ে হেলান দিয়ে না বাসাই ভালো। মেরুদণ্ড সোজা করে বসুন। এতে কফ কিছুটা হালকা হয়ে আসতে পারে।
ব্রিটেনের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের ওয়েবসাইটে এ তথ্য দেয়া হয়েছে।
সেখানে আরো বলা হয়েছে, কফ হালকা করার জন্য এক চামচ মধু খেতে পারেন। এতে উপকার হতে পারে। তবে বারো বছর বয়সের নিচে বাচ্চাদের মধু দেবেন না।
৪. টেস্ট সেন্টারের ফোন নম্বর রাখুন:
বাংলাদেশে এখন ৪৫টির মেতো ল্যাবরেটরিতে করোনাভাইরাসের টেস্ট করানো হচ্ছে। আপনার নিকটস্থ টেস্ট সেন্টার কোথায় হতে পারে সে সংক্রান্ত খোঁজ রাখুন।
এখন কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাসায় গিয়ে নুমনা সংগ্রহ করছে। তাদের ফোন নম্বর সংগ্রহ করে রাখতে পারেন।
৫. অক্সিজেন ভাড়া নিতে পারেন:
শ্বাসকষ্ট হলে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করানোর প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রেই সেটি সম্ভব হচ্ছে না।
এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটোছুটি করতে করতে রোগীর অবস্থা আরো অবনতি হয়।
রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে না পারলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বাসায় অক্সিজেন নিতে পারেন।
ঢাকার বক্ষব্যধি হাসপাতালের চিকিৎসক কাজী সাইফুদ্দিন বেন্নুর বলেন, "অক্সিজেন বাসায় নেবার সিস্টেম আছে। আমরা যখন লং টাইম অক্সিজেন থেরাপি দেই, আমরা কখন অক্সিজেন বাসায় নিতে বলি রোগীদের।" তিনি বলেন, কোভিড১৯ রোগীদের ক্ষেত্রে হাই ফ্লো অক্সিজেন দিতে হবে।
৬. টেলিমেডিসিন সম্পর্কে জেনে রাখুন:
করোনা সংক্রমনের এই সময়টিতে অনেক চিকিৎসক রোগীদের সরাসরি দেখছেন না। অধিকাংশ ডাক্তারের চেম্বারও বন্ধ।
তবে গত দুইমাসে বহু ডাক্তার টেলিফোন এবং ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন।
বেশকিছু সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ডাক্তারদের মাধ্যমে টেলিফোনে অথবা ভিডিও কনফারেন্সের সাহায্যে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে।
যেসব প্রতিষ্ঠান এ ধরণের সুবিধা দিচ্ছে তাদের ফোন নম্বর হাতের কাছে রাখতে পারেন। টেলিফোন নম্বর জানা থাকলে প্রয়োজনের সময় দ্রুত কাজে লাগবে।
চিকিৎসক সাইফুদ্দিন বেন্নুর বলেন, ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা দিয়ে তিনি ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত সন্তুষ্ট হতে পারেন।
তিনি বলেন, বেশিরভাগে ক্ষেত্রে রোগীদের উদ্বেগ প্রশমনেও ভূমিকা রাখে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা।
তথ্যসূত্র:
- ঢাকার বক্ষব্যধি হাসপাতালের চিকিৎসক কাজী সাইফুদ্দিন বেন্নুর, বিবিসি বাংলা।
- Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই