ডায়াবেটিস পুরোপুরি নিরাময় করতে জার্মানিতে অভিনব উদ্যোগ
ডায়াবেটিস আজও বিশ্বব্যাপী এক বড় সমস্যা৷ রোগীদের সাধারণত সারা জীবন ধরে ওষুধ ও ইনসুলিন ইঞ্জেকশনের উপর নির্ভর করতে হয়৷ কিন্তু প্রথম পর্যায়ে ওজন কমিয়ে ও কিছু নিয়ম মেনে এই রোগ পুরোপুরি দূর করা সম্ভব৷
জার্মানিতে প্রায় ৬০ লক্ষ ডায়াবেটিসের রোগী রয়েছেন৷ প্রতিদিন প্রায় হাজারখানেক মানুষ সেই তালিকায় যুক্ত হচ্ছেন৷ নাটকীয় এই পরিস্থিতির মাঝে এক গবেষণা অনুযায়ী, শুধু ওজন কমিয়ে ডায়াবেটিসের মোকাবিলা করা সম্ভব৷ পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ড. মাটিয়াস রিডেল বলেন, ‘‘আমার কাছে এটা একটা মাইলফলক৷ এটা স্পষ্ট, যে ডায়াবেটিস নিরাময় করা সম্ভব৷ আগের মতো এই রোগকে আর নিয়তি হিসেবে মেনে নিতে হবে না৷''ইংল্যান্ডের এই গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে, যে রোগ দেখা দেওয়ার পর প্রথম ৬ মাসের মধ্যে শুধু ওজন কমিয়ে সেটি নিরাময় করা সম্ভব৷ তাতে কোনো ওষুধের প্রয়োজন পড়ে না৷
এক পরীক্ষার আওতায় খাদ্য তালিকার অত্যন্ত কড়া নিয়ম অনুযায়ী অংশগ্রহণকারীদের খেতে দেওয়া হয়েছিল৷ তিন মাস ধরে তাঁদের দিনে শুধু ৯০০ ক্যালোরি পরিমাণ নিউট্রিশন শেক খেতে হয়েছে৷ সেইসঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা তাঁদের পরামর্শ দিয়েছেন৷ বেশ কিছু ব্যায়ামও করতে হয়েছে৷ তার ফল ছিল বেশ চমকপ্রদ৷
যারা ৭ কিলোগ্রাম পর্যন্ত ওজন কমাতে পেরেছেন, তাঁদের মধ্যে ৭ শতাংশ মানুষ পুরোপুরি ডায়াবেটিস ট্যাবলেট ছাড়াই সুস্থ হয়ে উঠেছেন৷ যারা ১৫ কিলো ওজন কমাতে পেরেছেন, তাঁদের মধ্যে ৮৬ শতাংশ এই লক্ষ্য পূরণ করতে পেরেছেন৷ ড. মাটিয়াস রিডেল এ বিষয়ে বলেন, ‘‘এই গবেষণা ডায়াবেটিস চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিপ্লব এনেছে৷ ডাক্তার ও রোগীদের নতুন করে ভাবতে হবে৷ সারা জীবন ধরে ট্যাবলেট ও ইনসুলিন গ্রহণ না করেও রোগ নিরাময় সম্ভব৷''
ডিয়র্ক ফন গ্রুবে নিজের ওজন কমিয়ে ইনসুলিন ইঞ্জেকশনের উপর নির্ভরতা কাটাতে পেরেছেন৷ আগে তিনি সব সময়ে কিছু না কিছু খেয়ে যেতেন৷ প্রচুর পরিমাণ কার্বোহাইড্রেট ও তার মাঝে মিষ্টি জাতীয় খাদ্য৷ এভাবে তিনি মোটা হতে হতে ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হন৷ ড. মাটিয়াস রিডেল এই প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘‘শরীরের ইন্দ্রিয়গুলি ও পেটে মেদের আধিক্যই ডায়াবেটিসের প্রধান কারণ৷ যত বেশি চর্বি, তত বেশি ইনসুলিনের প্রয়োজন হয়৷ ইনসুলিনের প্রয়োজনীয়তা যত বাড়ে, তত বেশি মেদ জমা হয়৷ এই দুষ্টচক্র অনেক মানুষের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক৷ এমনকি মৃত্যুও হতে পারে৷ তাই সেই চক্র ভেঙে দিতে হবে৷''
শরীর কার্বোহাইড্রেটকে গ্লুকোজে পরিণত করে৷ প্যানক্রিয়া বা অগ্ন্যাশয় ইনসুলিন উৎপাদন করে, যা রক্ত থেকে শর্করা শরীরের কোষে পাঠায়৷ এভাবে রক্তে শর্করার মাত্রা কম থাকে৷
অতিরিক্ত চিনি খেলে কোষগুলি ইনসুলিন প্রতিরোধ করতে শেখে৷ ফলে দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তিতে অগ্ন্যাশয়ের উপর বেশি চাপ পড়ে৷ কোনো এক সময় ইনসুলিন উৎপাদন কমে যায়৷ তখন শর্করা আর রক্ত থেকে কোষের মধ্যে যায় না৷ সেই শর্করা ভাঙতে তখন ইনসুলিন ইঞ্জেকশন দিতে হয়৷ ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ ড. ক্র্যোগার বলেন, ‘‘ওজন যত বেশি হবে, ইনসুলিনের প্রভাব তত খারাপ হবে৷ অর্থাৎ আমি ওজন কমানোর চেষ্টা না করলে আমার শরীরের মধ্যের ইনসুলিনের প্রভাবের আরও অবনতি হয়৷ এমনকি আমি ইনসুলিন ইঞ্জেকশন নিলে তার প্রভাবও খারাপ হয়৷ ফলে সহজেই ওজন বাড়তে থাকে৷''
ডিয়র্ক ফন গ্রুবে একজন পুষ্টি বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিয়ে নিজের খাদ্যাভ্যাস বদলে ফেলেছিলেন৷ এভাবে তিনি ২৩ কিলো ওজন কমিয়েছিলেন৷ ফলে তিনি ওষুধ খাওয়াও অনেক কমাতে পেরেছিলেন৷ ড. রিডেল তাঁকে মনে করিয়ে দেন, ‘‘যখন আপনি আমাদের কাছে এসেছিলেন, তখন অনেক ইঞ্জেকশন নিতে হতো৷ আর এখন সামান্য কিছু ট্যাবলেট খেতে হয়৷ এমনটা অব্যাহত থাকলে আরও উন্নতি হবে৷''
ডিয়র্ক ফন গ্রুবে রক্তের শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছেন৷ তবে তিনি অত্যন্ত ব্যতিক্রমী এক দৃষ্টান্ত৷ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চিকিৎসা হিসেবে পুষ্টি ও ব্যায়ামের উপকারিতা পরখ করার আগেই ডাক্তার ট্যাবলেট ও ইঞ্জেকশন লিখে দেন৷
ডায়েবেটিস থেকে সাবধান!
- শিশুকে বুকের দুধ পান করান: শিশুকে বুকের দুধ পান করালে তা মা ও শিশু দু’জনের জন্যই উপকারী৷যে মা শিশুকে তার দুধ পান করান, পরবর্তী দশ বছর তার ডায়েবেটিস ‘টাইপ টু’ হওয়ার ঝুঁকি শতকরা ৪০ ভাগ কমে যায়৷ এই তথ্য জানাচ্ছে, জার্মানির মিউনিখ শহরের হেল্মহল্জ সেন্টারের একটি গবেষণা৷
- সাইকেল চালান, ডায়েবেটিসকে দূরে রাখুন: ডেনমার্কের একটি বিশ্ববিদ্যলয়ের ৫২,০০০ জন মানুষকে নিয়ে করা এক সমীক্ষার ফলাফল থেকে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে যারা সাইকেল চালান, তাদের ডায়বেটিস ‘টাইপ টু’-র ঝুঁকি অনেক কম৷
- নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করানো: যদি কেউ হঠাৎ করে সকালে চোখে ঝাপসা এবং বিকেলে স্পষ্ট দেখেন, তার খুব তাড়াতাড়ি চোখের ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত, কারণ, এটা ডায়েবেটিস শুরু হওয়ার প্রথম লক্ষণ হতে পারে৷ চিনির মাত্রার ওঠা-নামার কারণে চোখের মণিতে পানি জমে তা চোখের রক্তের ধমনীর ক্ষতি করতে পারে৷ এ কথা জানিয়েছে, জার্মানির অপথ্যালমলোজিক্যাল সোসাইটি৷
- স্যাকারিন নয়: ডায়েবেটিস রোগীদের অনেকেই চিনির বিকল্প হিসেবে স্যাকারিন খান৷ তবে রক্তে চিনির মাত্রা কমে গেলে অনেকেই যখন মিষ্টি খাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন, তখন কিন্তু স্যাকারিন তা দমন করতে পারে না৷ আসল চিনিই কেবল সেক্ষেত্রে উপকারী৷ এ কথা জানিয়েছে সুইজারল্যান্ডের ল্যুজানে বিশ্ববিদ্যালয়৷
- হালকা খাবার: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ডায়েবেটিস রোগীর সংখ্যা বাড়ার মূল কারণ, অতিরিক্ত ওজন৷ ডায়েবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও ওজন কমাতে রাতে হালকা খাবার খাওয়া উচিত৷ রাতে ফুল প্লেট ভাত, পাস্তা বা নুডল খাওয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ জার্মান পুষ্টি গবেষণা কেন্দ্রের৷ কারণ রাতে শর্করা জাতীয় খাবার গ্রহণ করলে তা রক্তে চিনির মাত্রা বাড়িয়ে দেয়৷
ওষুধ ছাড়া ডায়বেটিসকে দূরে রাখার কিছু উপায় :
- খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এনে ওজন কমানো: খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এনে অতিরিক্ত ওজন কমানোর মাধ্যমে ডায়বেটিস শতকরা ৯০ ভাগ কমানো সম্ভব৷ যদি সে রোগীর ডায়বেটিসে ভোগার সময়কাল চার বছরের কম হয়ে থাকে৷ একথা জানান, জার্মান ডায়বেটিস বিশেষজ্ঞ প্রফেসার স্টেফান মার্টিন৷
- নুডলস যখন ‘বিষ’: নুডলস বা মিষ্টি জাতীয় খাবারের শর্করা রক্তে চিনির মাত্রা মুহূর্তের মধ্যেই বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে শরীরের কোষে ইনসুলিন হরমোন ছড়িয়ে পড়ে৷
- দিনে মাত্র ৬০০ ক্যালোরি: ২০০ ডায়বেটিস রোগী নিয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, ডায়বেটিস রোগীরা কড়া ডায়েটিং করে, অর্থাৎ দিনে মাত্র ৬০০ ক্যালরি প্রোটিনযুক্ত খাবার খাওয়ার পর ঔষুধ সেবন বন্ধ করতে পেরেছেন৷ তাছাড়া দীর্ঘ তিন মাস শর্করা জাতীয় খাবার পুরোপুরি বাদ দিয়ে শুধু প্রোটিনযুক্ত খাবার খেয়েও একই ফল পাওয়া গেছে৷
- সবজি ও বিভিন্ন সালাদ পাতা: এ সবে ক্যালরি প্রায় নাই বললেই চলে৷ তবে এতে থাকা পানি পেট ভরায় এবং খুব ধীরে ধীরে রক্তে প্রবেশ করে৷ সালাদের সাথে অলিভ অয়েল মিশিয়ে নিলে অনেকক্ষণ খিদেও পায় না৷ তাই প্রচুর সালাদ খাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা৷
- বাদামও খুব উপকারী: ডায়বেটিস রোগীকে প্রতিদিন এক মুঠো বাদাম, আখরোট খাওয়ার কথা পরামর্শ দেন ডাক্তাররা, কারণ, বাদামের ম্যাগনেশিয়াম ইনসুলিনের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণে রাখে৷
- তিন বেলা প্রোটিন: তিন সপ্তাহ ধরে তিন বেলাই প্রোটিনযুক্ত খাবার খেলে অবশ্যই রক্তে চিনির মাত্রা কমে যাবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ স্টেফান মার্টিন৷ মাছ, মুরগি, ডিম, মটরশুটি এবং দুধ জাতীয় খাবারে রয়েছে প্রচুর প্রোটিন৷
- বাইরের কেনা খাবার একেবারেই বাদ রাখুন: ডায়বেটিস রোগীর এক প্লেট খাবারের অর্ধেকটাই হতে হবে সালাদ বা সবজি৷ আর বাকি অর্ধেকে চার ভাগের তিন ভাগ প্রোটিনযুক্ত খাবার আর এক ভাগ থাকতে পারে শর্করা জাতীয় খাবার৷ বাইরের কেনা খাবার একেবারেই বাদ রাখুন৷ এই নিয়মগুলো মেনে চললে ডায়বেটিসকে নিয়ন্ত্রণে রাখা মোটেই কষ্টকর নয়৷
- স্ট্রবেরি, আপেল: এ সব ফলে অন্যান্য ফলের তুলনায় অনেক কম শর্করা রয়েছে৷ কাজেই ওজন কমাতে এবং ব্লাডপ্রেশার নিয়ন্ত্রণে রাখতে কোনো চিন্তা না করে এ ধরনের ফল যত খুশি খাওয়া যায়৷
তথ্যসূত্র:
- ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ ড. ক্র্যোগার,
- পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ড. মাটিয়াস রিডেল,
- উলরিকে হাইমেস/এসবি> ডয়চে ভেলে।
- Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই