অতিরিক্ত ভিটামিন ‘C’ শরীরের যে ক্ষতি করে
ভিটামিন ‘সি’ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এটি শরীরের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় উপাদান, তাই তো পুষ্টিবিদরা খাদ্যতালিকায় এ ভিটামিন রাখার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
কিন্তু কতটা পরিমাণ ভিটামিন সি খাবেন? অতিরিক্ত পরিমাণে এটি খেলে শরীরের বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
ভিটামিন সির কাজ:
ভিটামিন সি, যার আরেক নাম অ্যাসকরবিক অ্যাসিড। এটি ব্যাক্টেরিয়াল ইনফেকশনের বিরুদ্ধে লড়ে। এ ছাড়া হাড় ও দাঁতের জন্য এটি অনেক উপকারী এবং ত্বকের টিস্যুর গঠনেও এটি সরাসরি অংশ নেয়। এটি শরীরের বিভিন্ন কার্যকারিতা ঠিক রাখে। এই ভিটামিন মুখ, খাদ্যনালী, পেট এবং স্তন ক্যান্সারের মতো রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এটি চোখের ছানি প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখে। শরীরের প্রয়োজনীয় কোলাজেন তৈরির জন্য ভিটামিন সি প্রয়োজন। এটি দেহের ক্ষত সারিয়ে তুলতে এবং রক্তনালীর কার্যকারিতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে।
ভিটামিন সি সেরোটোনিন এবং নরেপাইনফ্রিনের মতো নিউরোট্রান্সমিটার উৎপাদনে সহায়তা করে। ভিটামিন সি অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট হিসাবে কাজ করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। এ কারণে করোনাকালে বেশিরভাগ মানুষই ভিটামিন সি গ্রহণ করছেন।
যে কোনো ক্ষত খুব তাড়াতাড়ি সারাতে এই ভিটামিনের বিকল্প নেই। ক্ষতিকর ফ্রি-রেডিক্যাল থেকেও রক্ষা করে এটি। সারিয়ে তোলে ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুও। ইমিউনিটি বাড়াতে, শরীর থেকে বিষ নিঃসরণ, শরীরকে শক্তিশালী করে তুলতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলতে এই ভিটামিনের জুড়ি নেই। তবে শীতকালে সর্দি-কাশির প্রবণতা বাড়ে, তখন অনেকেই ভিটামিন সি ট্যাবলেট খান। কিন্তু মনে রাখবেন, যে কোন ভিটামিনের অতিরিক্ত সেবন শরীরে খারাপ প্রভাব ফেলে।
শরীরে কতটুকু ভিটামিন সি প্রয়োজন:
আমাদের শরীর, খাবারে থাকা নানা ভিটামিনে সমৃদ্ধ হয়। কিন্তু ভিটামিন যত খাব তত ভালো এটা কখনই ঠিক নয়। বুঝতে হবে আপনার শরীর কতটা ভিটামিন সি নিতে সক্ষম।
স্বাস্থ্যবিদদের মতে, শূন্য থেকে ৩ বছর বয়সী শিশু ১৫ মিলি, বাচ্চা (৪-৮ বছর) ২৫ মিলি, বয়ঃসন্ধিকাল (৯-১৩ বছর) ৪৫ মিলি, কিশোর-কিশোরী (১৪-১৮ বছর) ৬৫-৭৫ মিলি, প্রাপ্তবয়স্ক নারী (১৯ বছর+) ৭৫ মিলিগ্রাম, প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ (১৯ বছর+ ) ৯০ মিলি, গর্ভবতী নারী (১৯ বছর+) ৮৫ মিলিগ্রাম, দুগ্ধদান নারী (১৯ বছর+) ১২০ মিলি। তবে এর মাত্রা দিনে সর্বোচ্চ ২০০০ মিলিগ্রাম হতে পারে।
এবং স্কার্ভির উপস্থিতিতে, প্রতিদিন ৩০০ মিলিগ্রাম থেকে ১ গ্রাম ডোজ দেওয়া বাঞ্ছনীয়। তবে, বিষাক্ততার প্রমাণ ছাড়াই প্রায় ৬ গ্রাম ভিটামিন-সি সাধারণ প্রাপ্তবয়স্কদের প্রেসক্রাইব করা যেতে পারে।
আমরা যে খাবার খাই তাতে কম-বেশি ভিটামিন সি থাকে। আবার ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে এই ভিটামিনটি বেশি খাওয়া জরুরি। কারণ ধূমপান করলে শরীরে ভিটামিন সি কমতে থাকে। সাধারণত কমলালেবু, লেবু, লাল মরিচ ভিটামিন সি-তে ভরপুর।
ভিটামিন সির ঘাটতি যেভাবে পূরণ হবে:
মূলত ফল ও কাঁচাসবজি থেকে ভিটামিন সির ঘাটতি পূরণ হয়। ফল ও সবজি কাঁচা খেলে ভিটামিন যথেষ্টভাবে শরীর গ্রহণ করে থাকে। এ ছাড়া বিভিন্ন শাকেও প্রচুর পরিমাণে এ ভিটামিন থাকে। তবে বেশিক্ষণ রান্না করার ফলে যে কোনো সবজি তার পুষ্টিগুণ হারিয়ে ফেলে। অতিরিক্ত তাপ ভিটামিনের রাসায়নিক গঠন ভেঙে দেয়। তবে অনেক সময় রান্না করা তরকারির ঝোলে ভিটামিন থেকে যায়। এ জন্য ভিটামিন সির ঘাটতি পূরণে সবজি কাঁচা অবস্থাতেই খাওয়ার পরামর্শ দেন বিষেশজ্ঞরা।
অতিরিক্ত ভিটামিন সি শরীরে যে প্রভাব ফেলে:
ভিটামিন সি দ্রবণীয় হওয়ায় অতিরিক্ত পরিমাণে গ্রহণ করলে তা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হয়। প্রাকৃতিক উৎস থেকে পাওয়া খাবারে পরিমিত ভিটামিন সি থাকে। অনেকেই এই ভিটামিন গ্রহণ করতে সাপ্লিমেন্ট সেবন করেন। অতিরিক্ত পরিমাণে ভিটামিন সি খেলে শরীরে নানা ধরনের সমস্যা হতে পারে। শরীরের অতিরিক্ত ভিটামিন স্বাভাবিকভাবেই মূত্রের মাধ্যমে বের হয়ে যায়। তবে
বেশি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে অনেক সময় তা পুরোপুরি শোষিত হয় না অর্থাৎ ভিটামিন সি অতিরিক্ত গ্রহণের ফলে শরীরে ভিটামিন শোষণ ক্ষমতা কমে আসে। তখন শরীরে নানা সমস্যা দেখা দেয় অর্থাৎ কিছু পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার কারণ হতে পারে। যেমন- ডায়রিয়া, বমি বমি ভাব, বুক জ্বালা পোড়া, মাথা ব্যথা, অনিদ্রা, তলপেটে অতিমাত্রায় ব্যথা হওয়া ইত্যাদি। এছাড়াও অতিরিক্ত ভিটামিন সি গ্রহণ করলে আরও যেসব সমস্যা দেখা দেয়-
১. ডায়রিয়া: দিনে ২০০০ মিলিগ্রামের বেশি ভিটামিন সি পাকস্থলীর সমস্যা বাড়িয়ে তুলতে পারে। এমনকী তা ডায়েরিয়া পর্যন্ত গড়াতে পারে।
২. কিডনিতে সমস্যা: কিডনিতে স্টোন (পাথর) তৈরি করে ক্যালসিয়াম অক্সালেটস। ভিটামিন সি-তে কিন্তু অক্সালেটস রয়েছে। তা থেকে কিডনি স্টোন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া অতিরিক্ত ভিটামিন সি গ্রহণ করলে শরীরে অতিরিক্ত ইউরিন উৎপন্ন হয়। এতে কিডনিতে পাথর জমতে শুরু করে। তাই অতিরিক্ত ভিটামিন সি খাওয়া থেকে সাবধান!
৩. অতিরিক্ত ফ্যাট: আপনি ফ্যাট কমানোর জন্য বা সর্দি-কাশি তাড়াতে যদি বেশি করে ভিটামিন সি খান, তবে শরীরের অপ্রয়োজনীয় ভিটামিন সি শরীর থেকে মল-মূত্রের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়। তখন প্রস্রাব কিংবা পায়খানা বার বার হতে পারে। তবে অন্য ভিটামিনের মতো শরীরে ভিটামিন সি বিষ হয়ে জমে থাকে না।
৪. দ্য রাস্টিং থিওরি: ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরে কোনে ধরনের আঘাত পেলে, প্রদাহ হলে এবং দৈনিক ১০০ মিলিগ্রামের বেশি ভিটামিন সি গ্রহণ করলে শরীরে অভ্যন্তরে ক্ষতি করতে পারে।
তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বা কোনো পরীক্ষা ছাড়া ভিটামিন সির সাপ্লিমেন্ট কোনোভাবেই নেওয়া যাবে না।
৫. হাড়ের স্বাস্থ্য: ভিটামিন সি কোলাজেন গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কোলাজেন হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয়। উচ্চ মাত্রায় ভিটামিন সি গ্রহণ করলে শরীরে প্রোটিনের কার্যকারিতা বেড়ে যায়। দীর্ঘ দিন ধরে ভিটামিন সি উচ্চ মাত্রায় গ্রহণ করলে হাড়ের রোগ হতে পারে।
৬. পুষ্টির শোষণ: অতিরিক্ত ভিটামিন সি গ্রহণ করলে শরীরে ভিটামিন বি ১২ এর শোষণে বাঁধা দেয়। এ কারণে এই দুটি ভিটামিন গ্রহণের ক্ষেত্রে কমপক্ষে দুই ঘণ্টা ব্যবধান রাখার পরামর্শ দেয়া হয়। ভিটামিন সি শরীরে কপার গ্রহণের পরিমাণও হ্রাস করে।
তথ্যসূত্র:
- হাবিবা নাজলীন লীনা; শিক্ষানবিস, খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান, RTV.
- যুগান্তর।
- এএইচ/ > একুশে টিভি।
- এমএস/এসি > একুশে টিভি।
- Edited: Natural_Healing.

কোন মন্তব্য নেই