লাল চা স্বাস্থ্যের জন্য কি আসলেই উপকার বয়ে আনে?
ইংরেজিতে ব্ল্যাক টি হলেও সোজা বাংলায় একে বলে 'রং চা'। অবশ্য পোশাকি নাম লাল চা। সকালে উঠে স্টোভে পানি গরম করে তাতে একটি চা পাতা ছিটিয়ে দিলেই লাল চা পাওয়া যাবে। তাতে দুধ মিশিয়ে দিলে দুধ চা। তবে অনেকে আয়েশ করে লাল চা'ই খেয়ে থাকেন। কেউ কেউ সাথে একটু গরম মশলা, তেজপাতা বা আদার টুকরোও মিশিয়ে নেন। ব্যাস! সকালের রিফ্রেশমেন্ট। গরমকালে এই লাল চা ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা বরফ দিয়ে পরিবেশন করলে নাম হয়ে যায় আইসড টি। সাথে একটু লেবুর রস চিপে স্বাদটা একটু রোমাঞ্চকর করে তোলা।
কিন্তু লাল চা কি আদপে স্বাস্থ্যের জন্যে ভালো? লাল চায়েও তো ক্যাফেইন পাওয়া যায়। সত্যি কথা বলতে কি, লাল চায়ের পরিচয় শুধু স্বাদেই নয়, গুণেও। আসুন জেনে নেই লাল চায়ে কি কি গুণ রয়েছে:কেন প্রতিদিন লাল চা খাবেন?
লাল চা হয়তো অনেকেই পান করি। একটু আদা, একটু পুদিনা পাতা এর স্বাদ বাড়িয়ে দেয় কয়েক গুণ। সুন্দর গন্ধ আর রঙের জন্য লাল চা মানুষের কাছে প্রচলিত। তবে আপনি কি জানেন, প্রতিদিন লাল চা খাওয়া শরীরের জন্য উপকারী?
লাল চা হার্টকে ভালো রাখে। লাল চায়ের মধ্যে পাওয়া যায় ক্যাফেইন, কার্বোহাইড্রেট, পটাশিয়াম, মিনারেল, ফ্লোরাইড, ম্যাঙ্গানিজ ও পলিফেনল। চা অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের ভালো উৎস। ট্যানিন, গুয়ানিন, এক্সাথিন, পিউরিন ইত্যাদিকে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বলা হয়।
লাল চায়ের মধ্যে রয়েছে অনেক স্বাস্থ্যকর গুণ। প্রতিদিন তিন কাপ লাল চা খেলে মনোযোগ বাড়ে। এর মধ্যে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সুরক্ষা দেয় বিভিন্ন রোগ থেকে।
জীবনধারাবিষয়ক ওয়েবসাইট বোল্ডস্কাইয়ের স্বাস্থ্য বিভাগে প্রকাশিত এক প্রতিদিনে বলা হয়েছে লাল চা খাওয়ার উপকারিতার কথা। চলুন, জেনে নিই সেসবের কথা।
হার্টের জন্য ভালো- গবেষণায় বলা হয়, লাল চা খাওয়া কার্ডিওভাসকুলার সমস্যা প্রতিরোধে সাহায্য করে। এর মধ্যে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের জারিত হওয়া প্রতিরোধে কাজ করে। নিয়মিত লাল চা খেলে হৃৎপিণ্ড ভালো রাখে।
ক্যানসার প্রতিরোধে- লাল চায়ের মধ্যে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রেক্টাল, জরায়ুর ক্যানসার, ফুসফুস ও ব্লাডার ক্যানসার প্রতিরোধ করে। এটি স্তন ক্যানসার, প্রোস্টেট ক্যানসার ও পাকস্থলীর ক্যানসারও প্রতিরোধে কাজ করে।
প্রতিদিন কয়েক কাপ লাল চা আপনাকে এই মারণ রোগের হাত থেকে বাঁচাতে পারে। আসলে এই পানীয়তে রয়েছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট প্রপার্টিজ সহ এমন কিছু উপাদান, যা লাং, প্রস্টেট, কলোরেকটাল, ব্লাডার, ওরাল এবং ওভারিয়ান ক্যান্সারকে দূরে রাখতে সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, লাল চা শরীরের যে কোনও অংশে ম্যালিগনেন্ট টিউমারের বৃদ্ধি আটকাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
এখনও পরিক্ষিত সত্য না হলেও একটি সমীক্ষা থেকে জানা যায় লাল চা খেলে হৃদরোগের আশঙ্কা কমে। বিশেষত নিয়মিত লাল চা পান করলে কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটুকু হ্রাস পায়৷
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়- লাল চা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এর মধ্যে থাকা ট্যানিন ফ্লু, ঠান্ডা, ইনফ্লুয়েঞ্জা আক্রমণ থেকে দেহকে সুরক্ষা দেয়। চার কাপ লাল চা প্রতিদিন গ্রহণ করলে প্রদাহ কমে।
মুখের স্বাস্থ্য ভালো রাখে- অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মুখের ক্যানসার প্রতিরোধ করে। এর মধ্যে থাকা অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান দাঁতের ক্ষয় তৈরিকারী ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধ করে। এ ছাড়া এর মধ্যে থাকা ফ্লোরাইড মুখের দুর্গন্ধ দূর করে।
মস্তিষ্ক ও স্নায়ু পদ্ধতিকে উদ্দীপ্ত করে- লাল চা রক্তের পরিবহনকে উন্নত করে। এটি মস্তিষ্ককে শিথিল করতে সাহায্য করে এবং কাজে মনোযোগ বাড়ায়। প্রতিদিন চার কাপ লাল চা খেলে মানসিক চাপ কমে।
লাল চায়ে ক্যাফিনের পরিমাণ কম থাকায় এই পানীয়টি মস্তিষ্কে রক্তচলাচলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। ফলে ব্রেনের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। সেই সঙ্গে স্ট্রেস কমে। প্রসঙ্গত, একটি গবেষণায় দেখা গেছে এক মাস টানা যদি লাল চা খাওয়া যায়, তাহলে পারকিনস রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেক কমে যায়।
হজম ভালো করে- এর মধ্যে থাকা ট্যানিন হজম প্রক্রিয়াকে সাহায্য করে। এটি অন্ত্রের সমস্যা এবং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার সঙ্গে লড়াই করে। লাল চা অন্ত্রের প্রদাহকেন প্রতিদিন লাল চা খাবেন?
শরীর আদ্র এবং তরতাজা রাখে- লাল চা খেলে শরীর আর্দ্র থাকে। লাল চায়ে প্রচুর উপকারি রাসায়নিক উপাদান শরীরে প্রবেশ করে। এসকল উপাদান শরীরে বিভিন্ন উপকার করে থাকে। ফলে আপনার হাড় সতেজ থাকে, মন ভালো থাকে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, শরীরের তাপমাত্রাও নিয়ন্ত্রণ করে। এমনি এমনিই তো আর সবাই সকালে এক কাপ চায়ের জন্যে হাঁসফাঁস করেনা।
এন্টি অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ- লাল চায়ে অনেক ধরণের এন্টি অক্সিডেন্ট পাওয়া যায়। হাল আমলে অনেকেই এন্টি অক্সিডেন্টের জন্যে গ্রিন টি এর শরণাপন্ন হন। গ্রিন টি এর মধ্যে প্রচুর এন্টি অক্সিডেন্ট আছে অবশ্যই। কিন্তু লাল চা কোনো অংশেই কম যায়না। অন্তত লাল চা সহজলভ্য এবং অনেকেরই ক্রয়ক্ষমতার ভেতরে থাকে। ফলে দিনে বেশ কয়েকবার লাল চা খাওয়া যায়।
ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই- খালি পেটে লাল চা খেলে অনেক সময় অস্বস্তি হয়৷ অনেকে ভাবেন এতে শরীরের ক্ষতি হচ্ছে। বদহজমের সমস্যাটা মাথাচাড়া দিলো বুঝি! আদপেও ব্যাপারটি এমন নয়। লাল চা খালি পেটের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া তাড়াতে সাহায্য করে। খাদ্যনালীতে জমে থাকা ব্যাকটেরিয়াকে খুব সহজেই কুপোকাত করে দিতে পারে লাল চা।
ওজন হ্রাস করে- লাল চা হজম ক্ষমতার উন্নতি ঘটায়। ফলে শরীরে অতিরিক্ত মেদ জমার সুযোগই পায় না। তাই আপনি যদি ওজন কমাতে বদ্ধপরিকর হন, তাহলে আজ থেকেই খাওয়া শুরু করুন এই পানীয়।
হাড়কে শক্তপোক্ত করে- লাল চায়ে উপস্থিত ফাইটোকেমিকালস হাড়কে শক্ত করে। ফলে আর্থ্রাইটিসের মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে।
স্ট্রেস কমায়- লাল চায়ে রয়েছে অ্যামাইনো অ্যাসিড, যা স্ট্রেস কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেই সঙ্গে মনকে চনমনে করে তুলতেও বিশেষ ভূমিকা নেয়।
আফ্রিকান লাল চায়ের স্বাস্থ্য উপকার:
বেশিরভাগ মানুষ দুধ চা ও কফি খেতে বেশি পছন্দ করেন। তবে লাল রঙের চা বা রং চায়ের গুণাগুণ অনেকেই জানেন না। এই লাল চায়ের রয়েছে অনেক স্বাস্থ্য উপকারিতা। ‘রুইবস চা’ হলো একটি লাল ভেষজ চা, যা আফ্রিকান রেড টি হিসেবে পরিচিত। অন্যান্য চায়ের তুলনায় এর স্বাস্থ্য উপকারিতা কয়েকগুণ বেশি।
গ্রিন টি বা ব্ল্যাক টির তুলনায় আফ্রিকান রেড টি ক্যাফেইন মুক্ত। অন্যান্য চায়ে ক্যাফেইন অতিরিক্ত থাকে বলে হৃৎপিণ্ডের সমস্যা, ঘুম এবং মাথাব্যথার সমস্যা দেখা দেয়। তবে আফ্রিকান রেড টিতে এটি না থাকার ফলে এই ধরনের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এই চা গর্ভবতী নারী ও শিশুদের জন্য উপকারী। আসুন জেনে নেই রেড টির স্বাস্থ্য উপকারিতা–
* এতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা হার্টের জন্য স্বাস্থ্যকর একটি উপাদান। পাশাপাশি এটি কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেমকে ঠিক রাখতেও সাহায্য করে।
* ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায় রেড টি। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা ফ্রি রেডিক্যালের বিরুদ্ধে লড়াই করে ক্যান্সার কোষগুলোকে মেরে ফেলে এবং স্বাস্থ্যকর কোষগুলোকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
* এই চা ট্যানিন মুক্ত, যা হজম ক্ষমতাকে বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। রেড চা ডায়রিয়া ও গ্যাস্ট্রিকের সমস্যাও প্রতিরোধ করে।
* রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় রেড টি। এই চায়ের পুষ্টি উপাদান দেহের রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে।
* গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই চায়ে বিভিন্ন ধরনের পলিফেনল রয়েছে, যা অস্টিওস্টের কার্যকলাপকে উন্নত করে। ক্যালসিয়াম ও ম্যাঙ্গানিজ থাকায় এটি হাড়ের বিকাশের জন্য অত্যন্ত কার্যকরী।
লাল চা এবং সবুজ চা এদের মধ্যে কোনটি?
গ্রিন টি: লাল চায়ের তুলনায় গ্রিন টি কম জারিত হয়। এই চা ক্যাটেকিন নামক অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট সমৃদ্ধ। এই উপাদানটি হৃদ্রোগ ও ক্যানসারের মতো বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ করতে সহায়তা করে। পাশাপাশি, এই চায়ে ক্যাফিনের পরিমাণ থাকে বেশ কম। যা স্বাস্থ্যের পক্ষে বেশ উপযোগী। দেহে অম্লত্বের পরিমাণ কমাতে, বিপাক হার বাড়াতে ও দেহ পরিশুদ্ধ করতে গ্রিন টি বেশ কার্যকর বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
লাল চা: গ্রিন টি-র তুলনায় লাল চায়ে ক্যাটেকিন নামক অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টটির পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম থাকে। কিন্তু অন্যান্য অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট এতে বেশ ভাল পরিমাণে থাকে। পাশাপাশি, দেহে জলের ঘাটতি পূরণ করতেও বেশ উপযোগী লাল চা।
সব মিলিয়ে দু’ধরনের চায়ের মধ্যেই রয়েছে হরেক রকম গুণ। পরিমিত পরিমাণে পান করলে দু’ধরনের চায়েই মিলতে পারে উপকার। কিন্তু সবার স্বাদ ও স্বাস্থ্য সমান নয়। তাই শরীর ও জিভের খেয়াল রেখে বেছে নিতে হবে যে কোনও এক রকমের চা।তথ্যসূত্র:
- ইত্তেফাক।
- এনটিভি।
- সময় টিভি।
- বোল্ড স্কাই।
- আনন্দবাজার।
- Edited: Natural_Healing.


কোন মন্তব্য নেই